এবার ৭ দিনের সর্বাত্মক লকডাউন

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহ দেশজুড়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সময় জরুরি সেবা ছাড়া অফিস-আদালত-কলকারখানা সবকিছু বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে অন্তত দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউন ছাড়া করোনাভাইরাসের বর্তমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে মনে করছে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় দুই সপ্তাহের পূর্ণ লকডাউন দেয়ার সুপারিশ করেছে এই কমিটি। দুই সপ্তাহের এই লকডাউন শেষ হওয়ার আগে সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে বলে পরামর্শ তাদের।

সম্প্রতি করোনা সংক্রমণ অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করলে সরকার বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৫ থেকে ১১ এপ্রিল ঢাকাসহ সারাদেশে এক সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু তা যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। মানুষজনকেও তা মানতে দেখা যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের কোন সংস্থাকেও বিধিনিষেধ কার্যকর করতে তৎপর হতে দেখা যায়নি। এ প্রেক্ষাপটে আগামীতে যে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ ঘোষণা করা হবে তার সংজ্ঞা পরিষ্কার করে দেয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় পরামর্শক কমিটি।

গতকাল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, করোনা ঠেকাতে গত ২৯ মার্চ থেকেই মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। ৪ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেও জনমত তৈরি, মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ নানা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে যেভাবে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটছে, কঠোর লকডাউনের মাধ্যমেই এটি ঠেকাতে হবে, বিশেষজ্ঞদের তাই পরামর্শ বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কঠোর এই লকডাউনের সময় জরুরি সেবা ছাড়া সব অফিস-আদালত-কলকারখানা সবকিছু বন্ধ থাকবে। দোকানপাট খোলা রাখার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের জন্য মার্কেট খোলা রাখা হয়েছে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপরই এক সপ্তাহ কড়া লকডাউন প্রয়োজন। কড়া লকডাউন না হলে করোনার বিস্তার ও মৃত্যুর সংখ্যা ঠেকানো যাবে না।’

এর আগে গতকাল সরকারের জ্যেষ্ঠমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, ‘দেশের করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। বেড়েছে জনগণের অবহেলা ও উদাসীনতা। এমতাবস্থায় সরকার জনস্বার্থে ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সর্বাত্মক লকডাউনের বিষয়ে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছে। চলমান এক সপ্তাহের লকডাউনে জনগণের উদাসীন মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না বলেও জানান তিনি।’

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশ

গত বুধবার রাতে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩০তম সভায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউনের সুপারিশ করা হয়। কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

কমিটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সারাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে ১৮টি নির্দেশনা জারি হয়েছিল, সেগুলো সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। তাই ‘বিধিনিষেধ আরও শক্তভাবে অনুসরণ করা দরকার’।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত একমাস ধরে করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদে থেকে বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে তবুও বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না, যে কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বেড়েছে। এই সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আরও দুই সপ্তাহের লকডাউন করা যেতে পারে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের এলাকা ও উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোয় দুই সপ্তাহের পূর্ণ লকডাউন দেয়া যেতে পারে। সংক্রমণ বিবেচনা করে আবার বিধিনিষেধ দেয়া যেতে পারে।

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, সাধারণ বেড, আইসিইউ অক্সিজেন সরবরাহে জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২শ’ শয্যা বিশিষ্ট দেশের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতাল চালু হচ্ছে। সরকারের এমন কার্যক্রমের মধ্যে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। তাই আরও দূরত্ব আরও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

এতে আরও বলা হয়, করোনার সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোয় ভিড় বেড়েছে। টেস্ট করাতে ও ফল পেতে সময় লাগছে। যারা পরীক্ষা করাতে আসছে তাদের অধিকাংশই বিদেশগামী যাত্রী। কমিটির মতে, বিদেশে অভিবাসী কর্মজীবী মানুষ ছাড়া অন্যদের পরীক্ষার জন্য বেসরকারি পরীক্ষাগারে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে রোগীদের পরীক্ষা ও রিপোর্ট দ্রুত প্রদান করে আইসোলেশন নিশ্চিত করা যাবে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের টিকা কার্যক্রম ফলপ্রসূ হয়েছে। এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আমদানি করার সুপারিশ করা হয়।

কেন কার্যকর হচ্ছে না ‘বিধিনিষেধ’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়হীনতা প্রমাণ করে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই ‘লকডাউন’ কিংবা ‘বিধিনিষেধ’ সংক্রান্ত পদক্ষেপটি গ্রহণ করা হয়েছিল। এ কারণে শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ে ওই বিধিনিষেধের কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়নি।

গত ৫ এপ্রিল থেকে যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, তা প্রথম দিন থেকেই ঢিলেঢালা ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা ওই ব্যবস্থাকে ‘বিধিনিষেধ’ বলা হলেও সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী একে ‘লকডাউন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু শুরু থেকে কোথাও লকডাউনের লেশমাত্র ছিল না। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কেন বিধিনিষেধগুলো কার্যকর করতে পারল না?

বিশেষজ্ঞরা বিধিনিষেধ কার্যকর করতে না পারার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন। সরকারি বিধিনিষেধের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস শুধু জরুরি কাজ সম্পাদনের জন্য সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় জনবলকে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেয়া করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের যানবাহন সরবরাহ করেনি। এতে দুর্ভোগে পড়েন চাকরিজীবীরা।

আবার বাস মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরা মনে করেছিলেন, গত বছরের মতো দীর্ঘ সময় ধরে পরিবহন বন্ধ থাকবে। এ জন্য তারাও সরকারি সিদ্ধান্ত মানতে চাইছিলেন না। আবার গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও সড়কে শত শত ব্যক্তিগত গাড়ি চলেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকে বলেছেন, গরিব আটকে রেখে ধনীদের চলাচলের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় গত বুধবার গণপরিবহন চালু করা হয়।

লকডাউনের আগে সরকারি প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়ে কাজ করাবে। সরকারি অফিস-আদালতে ওই নির্দেশনা কার্যকর করা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা কার্যকর হয়নি। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

নির্দেশনা জারির পরপরই গত ৫ এপ্রিল বিকেল থেকে শিল্পকারখানা খোলা, সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলা রেখে দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয় রাজধানীতে। ধাপে ধাপে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও তা সংঘাতে রূপ নেয়।

দোকান মালিকরা বলেছেন, বিধিনিষেধের নামে তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, শিল্পকারখানা, অফিস-আদালত খোলা রেখে মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রাখা দ্বিমুখী আচরণ। এমনকি বইমেলাও চালু রাখা হয়েছে। গত বছর লকডাউনের কারণে ঈদ ও পহেলা বৈশাখের বেচাবিক্রি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ধাক্কা তারা এখনও সামলে উঠতে পারেননি। সামনে ঈদ, তার আগে আবারও দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ করা হলে এবারও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

সংক্রমণ পরিস্থিতি

সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পর এ বছর মার্চের শেষে প্রথমবারের মতো দেশে একদিনে পাঁচ হাজারের বেশি রোগী শনাক্তের খবর আসে। তা বাড়তে বাড়তে দৈনিক শনাক্ত সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়। গত বুধবার দেশে রেকর্ড ৭ হাজার ৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ হাজার ৪৬২ জন আক্রান্ত এবং ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১ , ২৬ চৈত্র ১৪২৭ ২৫ শাবান ১৪৪২

এবার ৭ দিনের সর্বাত্মক লকডাউন

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহ দেশজুড়ে ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সময় জরুরি সেবা ছাড়া অফিস-আদালত-কলকারখানা সবকিছু বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে অন্তত দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউন ছাড়া করোনাভাইরাসের বর্তমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না বলে মনে করছে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্তত সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় দুই সপ্তাহের পূর্ণ লকডাউন দেয়ার সুপারিশ করেছে এই কমিটি। দুই সপ্তাহের এই লকডাউন শেষ হওয়ার আগে সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে বলে পরামর্শ তাদের।

সম্প্রতি করোনা সংক্রমণ অস্বাভাবিক হারে বাড়তে শুরু করলে সরকার বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৫ থেকে ১১ এপ্রিল ঢাকাসহ সারাদেশে এক সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু তা যথাযথভাবে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। মানুষজনকেও তা মানতে দেখা যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারের কোন সংস্থাকেও বিধিনিষেধ কার্যকর করতে তৎপর হতে দেখা যায়নি। এ প্রেক্ষাপটে আগামীতে যে ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ ঘোষণা করা হবে তার সংজ্ঞা পরিষ্কার করে দেয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় পরামর্শক কমিটি।

গতকাল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন জানান, করোনা ঠেকাতে গত ২৯ মার্চ থেকেই মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। ৪ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেও জনমত তৈরি, মাস্ক পরা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ নানা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে যেভাবে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটছে, কঠোর লকডাউনের মাধ্যমেই এটি ঠেকাতে হবে, বিশেষজ্ঞদের তাই পরামর্শ বলে জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কঠোর এই লকডাউনের সময় জরুরি সেবা ছাড়া সব অফিস-আদালত-কলকারখানা সবকিছু বন্ধ থাকবে। দোকানপাট খোলা রাখার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের আন্দোলন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের জন্য মার্কেট খোলা রাখা হয়েছে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপরই এক সপ্তাহ কড়া লকডাউন প্রয়োজন। কড়া লকডাউন না হলে করোনার বিস্তার ও মৃত্যুর সংখ্যা ঠেকানো যাবে না।’

এর আগে গতকাল সরকারের জ্যেষ্ঠমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানান, ‘দেশের করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। বেড়েছে জনগণের অবহেলা ও উদাসীনতা। এমতাবস্থায় সরকার জনস্বার্থে ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য সর্বাত্মক লকডাউনের বিষয়ে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছে। চলমান এক সপ্তাহের লকডাউনে জনগণের উদাসীন মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না বলেও জানান তিনি।’

জাতীয় পরামর্শক কমিটির সুপারিশ

গত বুধবার রাতে জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩০তম সভায় করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে দুই সপ্তাহের কঠোর লকডাউনের সুপারিশ করা হয়। কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাহর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

কমিটি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সারাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত যে ১৮টি নির্দেশনা জারি হয়েছিল, সেগুলো সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। তাই ‘বিধিনিষেধ আরও শক্তভাবে অনুসরণ করা দরকার’।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত একমাস ধরে করোনার সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতি ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ১৮ দফা নির্দেশনা জারি হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদে থেকে বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছে তবুও বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না, যে কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বেড়েছে। এই সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণে আরও দুই সপ্তাহের লকডাউন করা যেতে পারে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের এলাকা ও উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোয় দুই সপ্তাহের পূর্ণ লকডাউন দেয়া যেতে পারে। সংক্রমণ বিবেচনা করে আবার বিধিনিষেধ দেয়া যেতে পারে।

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, সাধারণ বেড, আইসিইউ অক্সিজেন সরবরাহে জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২শ’ শয্যা বিশিষ্ট দেশের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতাল চালু হচ্ছে। সরকারের এমন কার্যক্রমের মধ্যে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। তাই আরও দূরত্ব আরও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

এতে আরও বলা হয়, করোনার সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোয় ভিড় বেড়েছে। টেস্ট করাতে ও ফল পেতে সময় লাগছে। যারা পরীক্ষা করাতে আসছে তাদের অধিকাংশই বিদেশগামী যাত্রী। কমিটির মতে, বিদেশে অভিবাসী কর্মজীবী মানুষ ছাড়া অন্যদের পরীক্ষার জন্য বেসরকারি পরীক্ষাগারে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। এতে রোগীদের পরীক্ষা ও রিপোর্ট দ্রুত প্রদান করে আইসোলেশন নিশ্চিত করা যাবে, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের টিকা কার্যক্রম ফলপ্রসূ হয়েছে। এ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আমদানি করার সুপারিশ করা হয়।

কেন কার্যকর হচ্ছে না ‘বিধিনিষেধ’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়হীনতা প্রমাণ করে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই ‘লকডাউন’ কিংবা ‘বিধিনিষেধ’ সংক্রান্ত পদক্ষেপটি গ্রহণ করা হয়েছিল। এ কারণে শুরু থেকেই মাঠপর্যায়ে ওই বিধিনিষেধের কার্যকারিতা লক্ষ্য করা যায়নি।

গত ৫ এপ্রিল থেকে যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, তা প্রথম দিন থেকেই ঢিলেঢালা ছিল। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা ওই ব্যবস্থাকে ‘বিধিনিষেধ’ বলা হলেও সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী একে ‘লকডাউন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু শুরু থেকে কোথাও লকডাউনের লেশমাত্র ছিল না। প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কেন বিধিনিষেধগুলো কার্যকর করতে পারল না?

বিশেষজ্ঞরা বিধিনিষেধ কার্যকর করতে না পারার পেছনে কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন। সরকারি বিধিনিষেধের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস শুধু জরুরি কাজ সম্পাদনের জন্য সীমিত পরিসরে প্রয়োজনীয় জনবলকে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেয়া করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের যানবাহন সরবরাহ করেনি। এতে দুর্ভোগে পড়েন চাকরিজীবীরা।

আবার বাস মালিক ও পরিবহন শ্রমিকরা মনে করেছিলেন, গত বছরের মতো দীর্ঘ সময় ধরে পরিবহন বন্ধ থাকবে। এ জন্য তারাও সরকারি সিদ্ধান্ত মানতে চাইছিলেন না। আবার গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও সড়কে শত শত ব্যক্তিগত গাড়ি চলেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকে বলেছেন, গরিব আটকে রেখে ধনীদের চলাচলের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় গত বুধবার গণপরিবহন চালু করা হয়।

লকডাউনের আগে সরকারি প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, সরকারি-বেসরকারি অফিস প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়ে কাজ করাবে। সরকারি অফিস-আদালতে ওই নির্দেশনা কার্যকর করা হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা কার্যকর হয়নি। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

নির্দেশনা জারির পরপরই গত ৫ এপ্রিল বিকেল থেকে শিল্পকারখানা খোলা, সরকারি-বেসরকারি অফিস খোলা রেখে দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয় রাজধানীতে। ধাপে ধাপে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও তা সংঘাতে রূপ নেয়।

দোকান মালিকরা বলেছেন, বিধিনিষেধের নামে তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, শিল্পকারখানা, অফিস-আদালত খোলা রেখে মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রাখা দ্বিমুখী আচরণ। এমনকি বইমেলাও চালু রাখা হয়েছে। গত বছর লকডাউনের কারণে ঈদ ও পহেলা বৈশাখের বেচাবিক্রি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ধাক্কা তারা এখনও সামলে উঠতে পারেননি। সামনে ঈদ, তার আগে আবারও দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ করা হলে এবারও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা।

সংক্রমণ পরিস্থিতি

সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পর এ বছর মার্চের শেষে প্রথমবারের মতো দেশে একদিনে পাঁচ হাজারের বেশি রোগী শনাক্তের খবর আসে। তা বাড়তে বাড়তে দৈনিক শনাক্ত সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়। গত বুধবার দেশে রেকর্ড ৭ হাজার ৬২৬ জন নতুন রোগী শনাক্তের খবর দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ হাজার ৪৬২ জন আক্রান্ত এবং ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।