ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় শাল্লার তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্তরা

দুই ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও পদক্ষেপ নেই উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিয়ে

সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট ও নির্যাতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। যদিও সেদিনের তাণ্ডবলীলার কথা এখনও ভুলতে পারছেন না এলাকাবাসী। এখনও তারা সেই দৃশ্য মনে হলে আঁতকে ওঠেন।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ঘটনাস্থলের পাশে রয়েছে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। ইতোমেধ্য দায়িত্বে অবহেলার দায়ে শাল্লা থানার ওসিকে সাময়িক বরখাস্ত ও পার্শ্ববর্তী দিরাই থানার ওসিকে বদলি করা হলেও শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যানের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এই হামলার আগে স্থানীয়রা বার বার বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমেই পুলিশকে অবগত করেছিলেন।

স্থানীয় রঞ্জন দাসসহ কয়েকজন গত ২০ মার্চ এ প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, ঘটনার আগের দিন হামলাকারীরা উপজেলা চেয়ারম্যানকে নাকি আশ্বস্থ করেছিলেন এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটবে না। তবে শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। প্রশাসন থেকে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ টাকা, টিন, চাল দেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪১ জনকে।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামনুল হককে কটাক্ষ করে নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক মৃত গোপেশ দাসের ছেলে ঝুমন দাস আপনের ফেইসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনে এই তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পায় পুলিশ।

এতে অন্তত ৮৭টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। তবে কেউ কেউ বলছেন, এ ঘটনার পাশাপাশি জলমহাল বিরোধের কারণে আরেকটি গোষ্ঠী এই হামলায় যোগ দিতে পারে। তবে এই বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। ঘটনার দিন শাল্লা ও দিরাইয়ের কয়েক গ্রামের মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করে হিন্দু অধ্যুষিত ওই গ্রামটিতে হামলা ও লুটপাট চালায়।

ঘটনার পর থেকে গ্রামটির নিকটবর্তী বাজারে অবস্থান করছে পুলিশ। যদিও নোয়াগাঁওয়ের বাসিন্দা ও হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুলের দাবি, এলাকায় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকার থেকে টিন, চালসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দেয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল-মুক্তাদির হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। গ্রামের লোকজন এখন ধানকাটা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর নির্মাণ ও মেরামতের জন্য টিন, চাল ও নগদ টাকা দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ঢেউটিন ও ক্ষতিগ্রস্তসহ গ্রামের দরিদ্র সবাইকে সাড়ে ১৪ মেট্রিকটন চাল দেয়া হয়েছে। এছাড়া ধর্মপ্রতিমন্ত্রী নিজে গিয়ে সাড়ে ৪ লাখ ও জেলা পরিষদ থেকে দুই লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত তাণ্ডবলীলার আগেরদিন ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া যুবক পাপনকে এলাকার লোকজন পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এরপরও পার্শ্ববর্তী বাজার থেকে মাইক দিয়ে হামলার কথা বলা হলে স্থানীয়রা বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মাহমুদকে জানান। তিনি তাদের বলেছিলেন, যেহেতু কটূক্তিদাতা ছেলেটিকে আটক করে পুলিশে দেয়া হয়েছে, সেহেতু তাদের কেউ আক্রমণ করবে না।

ঘটনার দিন সকালে যখন নদীর পাড়ে হাজার হাজার লোকজন চলে আসে তখনও তাকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানানো হয়। তিনি বলেছিলেন, ওরা প্রতিবাদ মিছিল করে শাল্লা সদরে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। ঘটনার পর থেকে পুলিশ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। পরে তদন্তে শাল্লা ও দিরাই থানার ওসির গাফিলতির বিষয়টি ধরা পড়ে। অতি সম্প্রতি শাল্লা থানার ওসি নাজগুল হককে বরখাস্ত ও দিরাই থানার ওসিকে বদলি করা হয়। তবে অদূরদর্শীতা ও অবহেলার বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান সম্পর্কে কান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার পর থেকেই নোয়াগাঁওয়ে আতঙ্ক নেই বললেই চলে। যেহেতু অপরাধীরা এলাকা ছাড়া। এছাড়া ঘটনার পর মোট ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চলছে। তদন্তে আরও যাদের নাম আসবে মামলায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১ , ২৬ চৈত্র ১৪২৭ ২৫ শাবান ১৪৪২

ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় শাল্লার তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্তরা

দুই ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও পদক্ষেপ নেই উপজেলা চেয়ারম্যানকে নিয়ে

আকাশ চৌধুরী

সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লার নোয়াগাঁওয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা-লুটপাট ও নির্যাতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। যদিও সেদিনের তাণ্ডবলীলার কথা এখনও ভুলতে পারছেন না এলাকাবাসী। এখনও তারা সেই দৃশ্য মনে হলে আঁতকে ওঠেন।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ঘটনাস্থলের পাশে রয়েছে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প। ইতোমেধ্য দায়িত্বে অবহেলার দায়ে শাল্লা থানার ওসিকে সাময়িক বরখাস্ত ও পার্শ্ববর্তী দিরাই থানার ওসিকে বদলি করা হলেও শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যানের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এই হামলার আগে স্থানীয়রা বার বার বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যানের মাধ্যমেই পুলিশকে অবগত করেছিলেন।

স্থানীয় রঞ্জন দাসসহ কয়েকজন গত ২০ মার্চ এ প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, ঘটনার আগের দিন হামলাকারীরা উপজেলা চেয়ারম্যানকে নাকি আশ্বস্থ করেছিলেন এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটবে না। তবে শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। প্রশাসন থেকে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ টাকা, টিন, চাল দেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪১ জনকে।

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামনুল হককে কটাক্ষ করে নোয়াগাঁও গ্রামের যুবক মৃত গোপেশ দাসের ছেলে ঝুমন দাস আপনের ফেইসবুকে দেয়া একটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনে এই তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা পায় পুলিশ।

এতে অন্তত ৮৭টি হিন্দু বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। তবে কেউ কেউ বলছেন, এ ঘটনার পাশাপাশি জলমহাল বিরোধের কারণে আরেকটি গোষ্ঠী এই হামলায় যোগ দিতে পারে। তবে এই বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। ঘটনার দিন শাল্লা ও দিরাইয়ের কয়েক গ্রামের মানুষ বিক্ষোভ মিছিল করে হিন্দু অধ্যুষিত ওই গ্রামটিতে হামলা ও লুটপাট চালায়।

ঘটনার পর থেকে গ্রামটির নিকটবর্তী বাজারে অবস্থান করছে পুলিশ। যদিও নোয়াগাঁওয়ের বাসিন্দা ও হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুলের দাবি, এলাকায় পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সরকার থেকে টিন, চালসহ অন্যান্য জিনিসপত্র দেয়া হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল-মুক্তাদির হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। গ্রামের লোকজন এখন ধানকাটা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর নির্মাণ ও মেরামতের জন্য টিন, চাল ও নগদ টাকা দেয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা, ঢেউটিন ও ক্ষতিগ্রস্তসহ গ্রামের দরিদ্র সবাইকে সাড়ে ১৪ মেট্রিকটন চাল দেয়া হয়েছে। এছাড়া ধর্মপ্রতিমন্ত্রী নিজে গিয়ে সাড়ে ৪ লাখ ও জেলা পরিষদ থেকে দুই লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত তাণ্ডবলীলার আগেরদিন ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া যুবক পাপনকে এলাকার লোকজন পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এরপরও পার্শ্ববর্তী বাজার থেকে মাইক দিয়ে হামলার কথা বলা হলে স্থানীয়রা বিষয়টি উপজেলা চেয়ারম্যান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মাহমুদকে জানান। তিনি তাদের বলেছিলেন, যেহেতু কটূক্তিদাতা ছেলেটিকে আটক করে পুলিশে দেয়া হয়েছে, সেহেতু তাদের কেউ আক্রমণ করবে না।

ঘটনার দিন সকালে যখন নদীর পাড়ে হাজার হাজার লোকজন চলে আসে তখনও তাকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানানো হয়। তিনি বলেছিলেন, ওরা প্রতিবাদ মিছিল করে শাল্লা সদরে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। ঘটনার পর থেকে পুলিশ ও উপজেলা চেয়ারম্যানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। পরে তদন্তে শাল্লা ও দিরাই থানার ওসির গাফিলতির বিষয়টি ধরা পড়ে। অতি সম্প্রতি শাল্লা থানার ওসি নাজগুল হককে বরখাস্ত ও দিরাই থানার ওসিকে বদলি করা হয়। তবে অদূরদর্শীতা ও অবহেলার বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান সম্পর্কে কান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার পর থেকেই নোয়াগাঁওয়ে আতঙ্ক নেই বললেই চলে। যেহেতু অপরাধীরা এলাকা ছাড়া। এছাড়া ঘটনার পর মোট ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চলছে। তদন্তে আরও যাদের নাম আসবে মামলায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।