চতুর্থ দফা ভোটে ব্যাপক সহিংসতা : নিহত ৫

তৃণমূল নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছে

রাজ্যবাসীর আশঙ্কাই সত্যি হলো, পশ্চিম বঙ্গ বিধান সভার চতুর্থ দফা নির্বাচনেও সেই একই চিত্র। নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারির মধ্যে ভোট গ্রহণ চললেও ভোটপর্বের শুরু থেকেই কলকাতাসহ গ্রামীণ বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যাপক সহিংসতা বোমা, গোলাগুলি, ভাঙচুর, মারধর ভোট দিতে বাধাদানসহ গোলযোগের মধ্য দিয়ে চার দফার নির্বাচন সম্পন্ন হলেও এই ঘটনায় গতকাল নিহত হয়েছে পাঁচজন।

সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কোচবিহার। দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে শীতলকুচি এলাকা। চতুর্থ দফা ভোটে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে কোচবিহার জেলার শীতলকুচি এলাকার মাথাভাঙ্গা জোটপাটকি গ্রামের ৫/১২৬ নম্বর বুথে। সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে ঘটনাস্থলেই ৪ জনের মৃত্যু ঘটে। নিহতরা হলেন, হামিদুল মিয়া, সামিউল হক, মনিরুল হক এবং আমজাদ হোসেন। নিহত ব্যক্তিরা সবাই তৃণমূল কর্মী-সমর্থক বলে তৃণমূল নেতারা দাবি করছেন। আহত হয়েছে আরও চারজন। গুলিবিদ্ধ ঐ চারজনকে গুরুতর জখম অবস্থায় কোচবিহার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

অপর এক ঘটনায় গতকাল সকালে শীতলকুচি বিধানসভার পাগলাপীরে বুথের সামনে আচমকাই গুলি চলে। এ ঘটনায় মৃত্যু হয় আনন্দ বর্মণ নামে আরও একজন নতুন ভোটার। আভিযোগের তীর তৃণমূলের দিকে। সে বিজেপি সমর্থক বলে বিজেপি জেলা নেতৃত্বের দাবি। তার রেশ কাটতে না কাটতেই শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রের অধীন মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের জোরপাটকি গ্রামে সোয়া ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালায়।

সূত্রের খবর, বুথে ঢুকে ভাঙচুরসহ ভোটকর্মীদের মারধর এবং কমিশনের ওয়েব ক্যামেরা ভাঙচুরের ঘটনার জেরে এই গুলি চলানো হয় বলে একটি সূত্রে জানানো হয়। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে ভাঙচুর এবং মারধরের ঘটনা অস্বীকার করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা আলিজার রহমান অভিযোগ করেন, ‘প্রথমে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের উপর বিনা প্ররোচনায় লাঠিচার্জ এবং গুলি চালায় কেন্দ্রীয় বাহিনী।’ আচমকা এই ঘটনার জেরে জোরপাটকি এলাকার মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কমিশনের নির্দেশে শীতলকুচির ১২৬ নম্বর বুথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশন বিকেল ৫টার মধ্যে প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে।

উল্লেখ্য, শীতলকুচির ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধাসেনা এক সিনিয়র অফিসার জানিয়েছেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে, ভোটকেন্দ্র থেকে কিছু দূরে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসার পথে আটকে দেয়া হয়েছে। তখন সেখানে দ্রুত কেন্দ্রীয় কোম্পানি কমান্ড্যান্ট যায় সেখানে। তখনই কয়েক লোক ওই অফিসারের বন্দুক কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এই সময়েই শূন্যে গুলি ছোড়া হয়। জানা গেছে, বুথ থেকে ৩০০ মিটার দূরেই এ ঘটনাটি ঘটে। সিনিয়র ঐ আধা সেনা অফিসার জানান, তখনকার মতো ঝামেলা মিটে যায়। ফের শুরু হয় ভোটগ্রহণ। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ফের ৩০০-৪০০ জনের একটি দল চড়াও হয়। প্রথমে তারা এক পুলিশকে মারধর করে। এরপর তার এক প্রিসাইডিং অফিসারকেও মারধর করে নিমিষেই ঘিরে ফেলা হয় ফোর্সকে। দু-পক্ষের ঝামেলা থামাতে এবং নিজেদের আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালাতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী, বলেছেন ওই অফিসার।

এদিকে শনিবার নির্বাচনী প্রচারে শিলিগুড়িতে আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শিলিগুড়ির কাওয়াখালির ময়দানে জনসভায় যোগ দিয়েছেন তিনি। এদিন সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী কোচবিহর শীতলকুচির ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন কোচবিহারে যা হয়েছে খুব খারাপ হয়েছে। বিজেপির ব্যাপক সমর্থন দেখেই তৃণমূলের গু-াবাহিনী ক্ষেপে গেছে। হিংসা করে বা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আক্রমণ করে কিছু হবে না। তিনি কমিশনকে ঘটনার কড়া ব্যবস্থা নিতে আবেদন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, তিনি একটা ভিডিও দেখেছেন তৃণমূলের একজন মন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বলছে বিজেপিকে ভোট দিলে দিদির লোক তাদের বাইরে ফেলে দেবে। এটাই দিদির ১০ বছরের শাসনের ফল। বাংলার সব মানুষ এখানেই থাকবে। দিদিকেই চলে যেতে হবে। তার সঙ্গে তোলাবাজ, কাটমানিও যাবে। তিনি জানান, উত্তরবঙ্গের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে তৃণমূল যাচ্ছে ও বিজেপি আসছে।

চতুর্থ দফার ভোটে শনিবার আধা সেনার গুলিতে ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনার প্রতিবাদে আগামীকাল রাজ্যজুড়ে কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদ মিছিল করবে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে, নিহত ও আহতদের পরিবারদের পাশে দাঁড়াতে আগামীকাল (আজ) শীতলকুচিও যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল সূত্রে খবর, এদিন উত্তর ২৪ পরগনায় পৃথক তিনটি সভা শেষে সন্ধ্যা নাগাদ শিলিগুড়ি পৌঁছোবেন মুখ্যমন্ত্রী। আজ সকালেই কোচবিহারের শীতলকুচিতে পৌঁছে তিনি নিহত এবং আহতের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করবেন।

শীলকুচির ঘটনা ছাড়াও চতুর্থ দফা ভোটে অন্যান্য কেন্দ্র থেকেও ব্যাপকভাবে অশান্তির খবর পাওয়া গেছে। হুগলী পা-ুয়ায় শশীভূষণ সাহা উচ্চ বিদ্যালয়ে গ-গোল হয়েছে। এখানে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র থেকে বের করে দেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। এ নিয়ে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জওয়ানদের সঙ্গে। তর্কাতর্কি চলার সময় জওয়ানরা তাকে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই কেন্দ্রের ভোটার সংযুক্ত মোর্চার সিপিএমের প্রার্থী আমজাদ হোসেন, তিনি ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করছেন। কসবায় সংযুক্ত মোর্চার এজেন্টকে বসতে না দেয়ার অভিযোগ। বুথে উত্তেজনা, অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। যাদবপুরে সুজন চক্রবর্তীর পোলিং এজেন্টকে ব্যাপক মারধর করা হয়। অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। জখম ওই মহিলা পোলিং এজেন্টের অভিযোগ তাকে প্রাণে মারারও হুমকি দিয়েছে অভিযুক্তরা।

কলকাতার একাংশসহ ৫ জেলার ৪৪টি আসনে ভোটগ্রহণ চলে। এর মধ্যে হাওড়ায় ৯টি, আলিপুরদুয়ারের ৫টি, কোচবিহারের ৯টি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১১টি ও হুগলীর ১০টি আসনে ভোটগ্রহণ ছিল।

সুষ্ঠুভাবে ভোট করার জন্যই

বাহিনীকে ঘেরাও করতে বলেছি

কমিশনকে জবাব মমতার

এদিকে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নোটিশের জবাব দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নোটিশের জবাব দিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। আমি গণতান্ত্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বোঝাতে ঘেরাও শব্দ ব্যবহার করেছি।

কয়েকদিন আগে কোচবিহারের সভা থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘেরাওয়ের বার্তা দিয়েছিলেন মমতা। কর্মীদের প্রতি কেন এমন নিদান? তার ব্যাখ্যায় নির্বাচন কমিশনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘দেশকে সুরক্ষিত রাখতে আধা সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে সম্মান করি। তবে ৬ এপ্রিল তারকেশ্বরের রামননগরে এক শিশুকন্যাকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে অজ্ঞাতপরিচয় জাওয়ানদের বিরুদ্ধে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। এফআইআর হয়েছে থানায় অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেয়নি নির্বাচন কমিশন। তাছাড়া প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোটে আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোটরাদের প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। প্রথম তিনটি দফায় কমিশনে আমরা ৬,৮ ও ১৩৪টি অভিযোগ করেছি। তার মধ্যে কয়েকটি মাত্র অভিযোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত সিআরপিএফ জওয়ানদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপই নেয়া হয়নি অথচ বিজেপির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিজি, ডিজি নিরাপত্তা, এডিজি আইনশৃঙ্খলা. হাওড়া গ্রামীণ, আলিপুরদুয়ার, ডায়মন্ড হারবার, কোচবিহার, কলকাতা দক্ষিণের এসপি, ডিসি, ডিএসপি ও ইনস্পেক্টরেদর সরানো হয়েছে।

সেদিন কোচবিহারের জনসভায় কী বলেছিলেন, তার উল্লেখ করেছেন মমতা। তার দাবি, ‘সিআরপিএফ গ-গোল করলে ওদের ঘেরাও করে রাখবেন বাড়ির মেয়েদের একটা দল। আর একটা দল যাবে ভোট দিতে। শুধু ঘেরাও করলে ভোট দেয়া যাবে না। এটাই বিজেপির পরিকল্পনা।’ উপরোক্ত বিষয়ে মমতার ব্যাখ্যা, ‘আমার ভাষণে বলেছি, ভোটাধিকার বাধাদান হলে ভোটারদের বিশেষ করে মহিলাদের গণতান্ত্রিকভাবে ঘেরাও করতে বলেছি। প্রতিবাদের একটা মাধ্যম ঘেরাও। ১৯৬০ সাল থেকে ঘেরাও শব্দের চল বাংলার রাজনীতিতে। শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহের জন্য তা ব্যবহার হয়। আমি এটুকু বলতে চেয়েছি, ভোটাররা যেন নির্বিঘেœ ভোটটা দিতে পারে। ভোটদানে সিআরপিএফ বাধা দিলেও মানা হবে না। ঘেরাও মানে কথাবার্তা, তা ঘিরে ধরা নয়। সিআরপিএফের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া ও ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। গণতন্ত্র ও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করাই আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য। আমি নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করিনি।’

রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১ , ২৮ চৈত্র ১৪২৭ ২৭ শাবান ১৪৪২

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন

চতুর্থ দফা ভোটে ব্যাপক সহিংসতা : নিহত ৫

তৃণমূল নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছে

দীপক মুখার্জী, কলকাতা

রাজ্যবাসীর আশঙ্কাই সত্যি হলো, পশ্চিম বঙ্গ বিধান সভার চতুর্থ দফা নির্বাচনেও সেই একই চিত্র। নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারির মধ্যে ভোট গ্রহণ চললেও ভোটপর্বের শুরু থেকেই কলকাতাসহ গ্রামীণ বিভিন্ন কেন্দ্রে ব্যাপক সহিংসতা বোমা, গোলাগুলি, ভাঙচুর, মারধর ভোট দিতে বাধাদানসহ গোলযোগের মধ্য দিয়ে চার দফার নির্বাচন সম্পন্ন হলেও এই ঘটনায় গতকাল নিহত হয়েছে পাঁচজন।

সকাল থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কোচবিহার। দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে শীতলকুচি এলাকা। চতুর্থ দফা ভোটে সবচেয়ে বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটেছে কোচবিহার জেলার শীতলকুচি এলাকার মাথাভাঙ্গা জোটপাটকি গ্রামের ৫/১২৬ নম্বর বুথে। সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে ঘটনাস্থলেই ৪ জনের মৃত্যু ঘটে। নিহতরা হলেন, হামিদুল মিয়া, সামিউল হক, মনিরুল হক এবং আমজাদ হোসেন। নিহত ব্যক্তিরা সবাই তৃণমূল কর্মী-সমর্থক বলে তৃণমূল নেতারা দাবি করছেন। আহত হয়েছে আরও চারজন। গুলিবিদ্ধ ঐ চারজনকে গুরুতর জখম অবস্থায় কোচবিহার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

অপর এক ঘটনায় গতকাল সকালে শীতলকুচি বিধানসভার পাগলাপীরে বুথের সামনে আচমকাই গুলি চলে। এ ঘটনায় মৃত্যু হয় আনন্দ বর্মণ নামে আরও একজন নতুন ভোটার। আভিযোগের তীর তৃণমূলের দিকে। সে বিজেপি সমর্থক বলে বিজেপি জেলা নেতৃত্বের দাবি। তার রেশ কাটতে না কাটতেই শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রের অধীন মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের জোরপাটকি গ্রামে সোয়া ৯টার দিকে কেন্দ্রীয় বাহিনী গুলি চালায়।

সূত্রের খবর, বুথে ঢুকে ভাঙচুরসহ ভোটকর্মীদের মারধর এবং কমিশনের ওয়েব ক্যামেরা ভাঙচুরের ঘটনার জেরে এই গুলি চলানো হয় বলে একটি সূত্রে জানানো হয়। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে ভাঙচুর এবং মারধরের ঘটনা অস্বীকার করা হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা আলিজার রহমান অভিযোগ করেন, ‘প্রথমে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের উপর বিনা প্ররোচনায় লাঠিচার্জ এবং গুলি চালায় কেন্দ্রীয় বাহিনী।’ আচমকা এই ঘটনার জেরে জোরপাটকি এলাকার মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কমিশনের নির্দেশে শীতলকুচির ১২৬ নম্বর বুথ বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশন বিকেল ৫টার মধ্যে প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে।

উল্লেখ্য, শীতলকুচির ঘটনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধাসেনা এক সিনিয়র অফিসার জানিয়েছেন, ‘আমাদের কাছে খবর আসে, ভোটকেন্দ্র থেকে কিছু দূরে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে আসার পথে আটকে দেয়া হয়েছে। তখন সেখানে দ্রুত কেন্দ্রীয় কোম্পানি কমান্ড্যান্ট যায় সেখানে। তখনই কয়েক লোক ওই অফিসারের বন্দুক কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এই সময়েই শূন্যে গুলি ছোড়া হয়। জানা গেছে, বুথ থেকে ৩০০ মিটার দূরেই এ ঘটনাটি ঘটে। সিনিয়র ঐ আধা সেনা অফিসার জানান, তখনকার মতো ঝামেলা মিটে যায়। ফের শুরু হয় ভোটগ্রহণ। এর কিছুক্ষণের মধ্যে ফের ৩০০-৪০০ জনের একটি দল চড়াও হয়। প্রথমে তারা এক পুলিশকে মারধর করে। এরপর তার এক প্রিসাইডিং অফিসারকেও মারধর করে নিমিষেই ঘিরে ফেলা হয় ফোর্সকে। দু-পক্ষের ঝামেলা থামাতে এবং নিজেদের আত্মরক্ষার্থেই গুলি চালাতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী, বলেছেন ওই অফিসার।

এদিকে শনিবার নির্বাচনী প্রচারে শিলিগুড়িতে আসেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শিলিগুড়ির কাওয়াখালির ময়দানে জনসভায় যোগ দিয়েছেন তিনি। এদিন সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী কোচবিহর শীতলকুচির ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যুতে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন কোচবিহারে যা হয়েছে খুব খারাপ হয়েছে। বিজেপির ব্যাপক সমর্থন দেখেই তৃণমূলের গু-াবাহিনী ক্ষেপে গেছে। হিংসা করে বা কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আক্রমণ করে কিছু হবে না। তিনি কমিশনকে ঘটনার কড়া ব্যবস্থা নিতে আবেদন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, তিনি একটা ভিডিও দেখেছেন তৃণমূলের একজন মন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মানুষকে ভয় দেখিয়ে বলছে বিজেপিকে ভোট দিলে দিদির লোক তাদের বাইরে ফেলে দেবে। এটাই দিদির ১০ বছরের শাসনের ফল। বাংলার সব মানুষ এখানেই থাকবে। দিদিকেই চলে যেতে হবে। তার সঙ্গে তোলাবাজ, কাটমানিও যাবে। তিনি জানান, উত্তরবঙ্গের মানুষ বুঝিয়ে দিয়েছে তৃণমূল যাচ্ছে ও বিজেপি আসছে।

চতুর্থ দফার ভোটে শনিবার আধা সেনার গুলিতে ৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঘটনার প্রতিবাদে আগামীকাল রাজ্যজুড়ে কালো ব্যাজ পরে প্রতিবাদ মিছিল করবে তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে, নিহত ও আহতদের পরিবারদের পাশে দাঁড়াতে আগামীকাল (আজ) শীতলকুচিও যাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল সূত্রে খবর, এদিন উত্তর ২৪ পরগনায় পৃথক তিনটি সভা শেষে সন্ধ্যা নাগাদ শিলিগুড়ি পৌঁছোবেন মুখ্যমন্ত্রী। আজ সকালেই কোচবিহারের শীতলকুচিতে পৌঁছে তিনি নিহত এবং আহতের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করবেন।

শীলকুচির ঘটনা ছাড়াও চতুর্থ দফা ভোটে অন্যান্য কেন্দ্র থেকেও ব্যাপকভাবে অশান্তির খবর পাওয়া গেছে। হুগলী পা-ুয়ায় শশীভূষণ সাহা উচ্চ বিদ্যালয়ে গ-গোল হয়েছে। এখানে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র থেকে বের করে দেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। এ নিয়ে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জওয়ানদের সঙ্গে। তর্কাতর্কি চলার সময় জওয়ানরা তাকে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। মলয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, এই কেন্দ্রের ভোটার সংযুক্ত মোর্চার সিপিএমের প্রার্থী আমজাদ হোসেন, তিনি ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করছেন। কসবায় সংযুক্ত মোর্চার এজেন্টকে বসতে না দেয়ার অভিযোগ। বুথে উত্তেজনা, অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। যাদবপুরে সুজন চক্রবর্তীর পোলিং এজেন্টকে ব্যাপক মারধর করা হয়। অভিযোগ তৃণমূলের বিরুদ্ধে। জখম ওই মহিলা পোলিং এজেন্টের অভিযোগ তাকে প্রাণে মারারও হুমকি দিয়েছে অভিযুক্তরা।

কলকাতার একাংশসহ ৫ জেলার ৪৪টি আসনে ভোটগ্রহণ চলে। এর মধ্যে হাওড়ায় ৯টি, আলিপুরদুয়ারের ৫টি, কোচবিহারের ৯টি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১১টি ও হুগলীর ১০টি আসনে ভোটগ্রহণ ছিল।

সুষ্ঠুভাবে ভোট করার জন্যই

বাহিনীকে ঘেরাও করতে বলেছি

কমিশনকে জবাব মমতার

এদিকে কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নোটিশের জবাব দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নোটিশের জবাব দিতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। আমি গণতান্ত্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বোঝাতে ঘেরাও শব্দ ব্যবহার করেছি।

কয়েকদিন আগে কোচবিহারের সভা থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঘেরাওয়ের বার্তা দিয়েছিলেন মমতা। কর্মীদের প্রতি কেন এমন নিদান? তার ব্যাখ্যায় নির্বাচন কমিশনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘দেশকে সুরক্ষিত রাখতে আধা সামরিক বাহিনীর ভূমিকাকে সম্মান করি। তবে ৬ এপ্রিল তারকেশ্বরের রামননগরে এক শিশুকন্যাকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে অজ্ঞাতপরিচয় জাওয়ানদের বিরুদ্ধে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। এফআইআর হয়েছে থানায় অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেয়নি নির্বাচন কমিশন। তাছাড়া প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোটে আধা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে ভোটরাদের প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে। প্রথম তিনটি দফায় কমিশনে আমরা ৬,৮ ও ১৩৪টি অভিযোগ করেছি। তার মধ্যে কয়েকটি মাত্র অভিযোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্ত সিআরপিএফ জওয়ানদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপই নেয়া হয়নি অথচ বিজেপির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিজি, ডিজি নিরাপত্তা, এডিজি আইনশৃঙ্খলা. হাওড়া গ্রামীণ, আলিপুরদুয়ার, ডায়মন্ড হারবার, কোচবিহার, কলকাতা দক্ষিণের এসপি, ডিসি, ডিএসপি ও ইনস্পেক্টরেদর সরানো হয়েছে।

সেদিন কোচবিহারের জনসভায় কী বলেছিলেন, তার উল্লেখ করেছেন মমতা। তার দাবি, ‘সিআরপিএফ গ-গোল করলে ওদের ঘেরাও করে রাখবেন বাড়ির মেয়েদের একটা দল। আর একটা দল যাবে ভোট দিতে। শুধু ঘেরাও করলে ভোট দেয়া যাবে না। এটাই বিজেপির পরিকল্পনা।’ উপরোক্ত বিষয়ে মমতার ব্যাখ্যা, ‘আমার ভাষণে বলেছি, ভোটাধিকার বাধাদান হলে ভোটারদের বিশেষ করে মহিলাদের গণতান্ত্রিকভাবে ঘেরাও করতে বলেছি। প্রতিবাদের একটা মাধ্যম ঘেরাও। ১৯৬০ সাল থেকে ঘেরাও শব্দের চল বাংলার রাজনীতিতে। শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহের জন্য তা ব্যবহার হয়। আমি এটুকু বলতে চেয়েছি, ভোটাররা যেন নির্বিঘেœ ভোটটা দিতে পারে। ভোটদানে সিআরপিএফ বাধা দিলেও মানা হবে না। ঘেরাও মানে কথাবার্তা, তা ঘিরে ধরা নয়। সিআরপিএফের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া ও ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে। গণতন্ত্র ও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষা করাই আমার বক্তব্যের উদ্দেশ্য। আমি নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করিনি।’