চুরির অপবাদ দিয়ে গাছে বেঁধে শিশুকে নির্যাতন

গলাচিপার ডাকুয়া গ্রামে মোবাইল চুরির অভিযোগে রাকিব গাজী নামে ১৩ বছরের এক শিশুকে গরুর রশি দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন করে কাঁচি দিয়ে মাথার চুল কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় শিশুটির বাবা-মাকেও নির্যাতন করা হয়। এর কিছু পরেই পুরো ঘটনাটি নির্যাতনকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকেও ছেড়ে দেয় নির্যাতনের ছবিটি। এ ঘটনায় গলাচিপা থানায় একটি মামলা হলে ফেইসবুক থেকে ছবিটি মুুছে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গলাচিপা থানা পুলিশ সোহেল মৃধা (৩৮) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। এদিকে মামলা করে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শিশুটির পরিবার। পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গলচিপা থানার ওসি এমআর শওকত আনোয়ার ইসলাম।

মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে জানাগেছে, গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলখালী গ্রামের জুয়েল মৃধার মোবাইল চুরির অভিযোগে শুক্রবার সকালে ডাকুয়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণপুর গ্রামের মকবুল গাজীর ছেলে রাকিব গাজীকে (১৩) ঘর থেকে ডেকে নেয়। এর পর ফুলখালী রেজাউল মৃধার বাড়ির সামনে পাকা রাস্তার দক্ষিণ পাশে রাকিবকে গরু বাঁধার রশি দিয়ে আম গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করে ফুলখালী গ্রামের জুয়েল মৃধা, রাকিব মৃধা, সোহেল মৃধা, এমাদুল মৃধা ও জাকির মৃধাসহ অজ্ঞাত আরও দুই/তিনজন। রাকিবের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় তিন ঘণ্টা ধরে অকথ্য নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের এক পর্যায় রাকিবের বাবা মকুল গাজীকেও ঘর থেকে টেনেহিচড়ে নামিয়ে আনে। তাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ছেলের পাশে আনে এবং ছেলের সামনে তাকেও অমানুষিক নির্যাতন করে। এতে মকবুল গাজী অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে বাঁচাতে স্ত্রী মোর্শেদা বেগম ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং স্বামীকে (মকবুল গাজীকে) উদ্ধার করতে চাইলে তাকেও নির্যাতন করা হয়। এসব ঘটনা দুর্বৃত্তরা মোবাইলে ভিডিও করে।

এ ঘটনা শুনে মোর্শেদা বেগমের চাচা স্থানীয় রুহুল মোল্লা এসে রাকিবের বাঁধন খুলে দিলে তাকেও অপমান করে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নির্যাতনের শিকার শিশু রাকিব বলেন, ‘আমারে ঘর থেকে রেজাউল মৃধা ডাইক্কা নেয়। রাস্তায় উঠলে আমার পকেটে তার একটা মোবাইল ঢুকাইয়া দেয়। এর পর রেজাউল মৃধার বাড়ি নিয়া বলে ‘চোর পাইছি’। এ সময় এমাদুল মৃধা, রাকিব মৃধা, সোহেল মৃধাসহ কয়েক জন মিল্লা (মিলে) একটি গরুর দড়ি দিয়া আম গাছের লগে বাঁইন্দা আমারে বাঁশের লাডি দিয়া পিডাইছে। হেরা (তারা) লোয়ার (লোহা) রড দিয়া চোখ উডাইয়া দেওয়ার ভয় দেহাইছে।’ এ বিষয় নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা মোর্শেদা বেগম বলেন, ‘রেজাউল ও জুয়েল মৃধাসহ ৪-৫ জনে আমার ছেলে রাকিবকে ঘর থেকে ডাইক্কা (ডেকে) নেয়। রেজাউল মৃধার বাড়িতে নিয়ে আমার পোলারে (রাকিবকে) (বেঁধে) আমগাছের লগে হাত-পা বাঁইন্দা নির্যাতন পিডাইছে। এর কিছু পরেই আমার স্বামী মকবুল গাজীকে মৃধাবাড়ির জুয়েল মৃৃধা ও রাকিব মৃধা গলায় গামছা পেঁচিয়ে নিয়ে যায়। বাপ-পোলারে একখানে কইররা পোলার সামনেই নির্যাতন করে এবং ছেলে আমার পোলা রাকিবের মাথার চুল কেচি (কাঁচি) দিয়ে কাইট্টা দেয়। আমার স্বামীকে উদ্ধার করতে গেলে আমারেও মারধর করে। এতে আমার ছায়া ব্লাউজ বাদে সব খুলে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যহন থানায় মামলা করতে যাই তহন আমার বাড়িতে যাইয়া আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হুমকি দিয়ে আসে। আমি ভয়তে আছি।’

এ প্রসঙ্গে গলাচিপা থানার ওসি এমআর শওকত আনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা মোর্শেদা বেগম বাদী হয়ে জুয়েল মৃধা, রাকিব মৃধা ও সোহেল মৃধাকে প্রধান আসামি করে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত তিনজনের নামে একটি মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে অভিযুক্ত সোহেল মৃধাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১ , ২৮ চৈত্র ১৪২৭ ২৭ শাবান ১৪৪২

চুরির অপবাদ দিয়ে গাছে বেঁধে শিশুকে নির্যাতন

প্রতিনিধি, পটুয়াখালী

image

গলাচিপার ডাকুয়া গ্রামে মোবাইল চুরির অভিযোগে রাকিব গাজী নামে ১৩ বছরের এক শিশুকে গরুর রশি দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন করে কাঁচি দিয়ে মাথার চুল কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় শিশুটির বাবা-মাকেও নির্যাতন করা হয়। এর কিছু পরেই পুরো ঘটনাটি নির্যাতনকারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকেও ছেড়ে দেয় নির্যাতনের ছবিটি। এ ঘটনায় গলাচিপা থানায় একটি মামলা হলে ফেইসবুক থেকে ছবিটি মুুছে ফেলে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গলাচিপা থানা পুলিশ সোহেল মৃধা (৩৮) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। এদিকে মামলা করে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শিশুটির পরিবার। পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গলচিপা থানার ওসি এমআর শওকত আনোয়ার ইসলাম।

মামলার বিবরণ ও পুলিশ সূত্রে জানাগেছে, গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলখালী গ্রামের জুয়েল মৃধার মোবাইল চুরির অভিযোগে শুক্রবার সকালে ডাকুয়ার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্ণপুর গ্রামের মকবুল গাজীর ছেলে রাকিব গাজীকে (১৩) ঘর থেকে ডেকে নেয়। এর পর ফুলখালী রেজাউল মৃধার বাড়ির সামনে পাকা রাস্তার দক্ষিণ পাশে রাকিবকে গরু বাঁধার রশি দিয়ে আম গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করে ফুলখালী গ্রামের জুয়েল মৃধা, রাকিব মৃধা, সোহেল মৃধা, এমাদুল মৃধা ও জাকির মৃধাসহ অজ্ঞাত আরও দুই/তিনজন। রাকিবের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় তিন ঘণ্টা ধরে অকথ্য নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের এক পর্যায় রাকিবের বাবা মকুল গাজীকেও ঘর থেকে টেনেহিচড়ে নামিয়ে আনে। তাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে ছেলের পাশে আনে এবং ছেলের সামনে তাকেও অমানুষিক নির্যাতন করে। এতে মকবুল গাজী অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে বাঁচাতে স্ত্রী মোর্শেদা বেগম ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং স্বামীকে (মকবুল গাজীকে) উদ্ধার করতে চাইলে তাকেও নির্যাতন করা হয়। এসব ঘটনা দুর্বৃত্তরা মোবাইলে ভিডিও করে।

এ ঘটনা শুনে মোর্শেদা বেগমের চাচা স্থানীয় রুহুল মোল্লা এসে রাকিবের বাঁধন খুলে দিলে তাকেও অপমান করে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নির্যাতনের শিকার শিশু রাকিব বলেন, ‘আমারে ঘর থেকে রেজাউল মৃধা ডাইক্কা নেয়। রাস্তায় উঠলে আমার পকেটে তার একটা মোবাইল ঢুকাইয়া দেয়। এর পর রেজাউল মৃধার বাড়ি নিয়া বলে ‘চোর পাইছি’। এ সময় এমাদুল মৃধা, রাকিব মৃধা, সোহেল মৃধাসহ কয়েক জন মিল্লা (মিলে) একটি গরুর দড়ি দিয়া আম গাছের লগে বাঁইন্দা আমারে বাঁশের লাডি দিয়া পিডাইছে। হেরা (তারা) লোয়ার (লোহা) রড দিয়া চোখ উডাইয়া দেওয়ার ভয় দেহাইছে।’ এ বিষয় নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা মোর্শেদা বেগম বলেন, ‘রেজাউল ও জুয়েল মৃধাসহ ৪-৫ জনে আমার ছেলে রাকিবকে ঘর থেকে ডাইক্কা (ডেকে) নেয়। রেজাউল মৃধার বাড়িতে নিয়ে আমার পোলারে (রাকিবকে) (বেঁধে) আমগাছের লগে হাত-পা বাঁইন্দা নির্যাতন পিডাইছে। এর কিছু পরেই আমার স্বামী মকবুল গাজীকে মৃধাবাড়ির জুয়েল মৃৃধা ও রাকিব মৃধা গলায় গামছা পেঁচিয়ে নিয়ে যায়। বাপ-পোলারে একখানে কইররা পোলার সামনেই নির্যাতন করে এবং ছেলে আমার পোলা রাকিবের মাথার চুল কেচি (কাঁচি) দিয়ে কাইট্টা দেয়। আমার স্বামীকে উদ্ধার করতে গেলে আমারেও মারধর করে। এতে আমার ছায়া ব্লাউজ বাদে সব খুলে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যহন থানায় মামলা করতে যাই তহন আমার বাড়িতে যাইয়া আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হুমকি দিয়ে আসে। আমি ভয়তে আছি।’

এ প্রসঙ্গে গলাচিপা থানার ওসি এমআর শওকত আনোয়ার ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা মোর্শেদা বেগম বাদী হয়ে জুয়েল মৃধা, রাকিব মৃধা ও সোহেল মৃধাকে প্রধান আসামি করে ৫ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত তিনজনের নামে একটি মামলা দায়ের করেছে। এর মধ্যে অভিযুক্ত সোহেল মৃধাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’