দক্ষিণাঞ্চলে নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততা দ্বিগুণ বেড়েছে

পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

উজানে পনি প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমেছে। সাগরের মাত্রাতিরিক্ত নোনা পানি উঠে এসে দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের মধ্যভাগের নদ-নদীর পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। এতে মাত্রাতিরিক্ত নোনা পানি শুধু ফসলি জমিরই ক্ষতি করছে না, তা মৎস্য ও উপকূলীয় বনজ সম্পদের জন্যও হুমকি স্বরূপ। আশঙ্কা করা হচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়ের।

বঙ্গোপসাগরের জোয়ারে উপর ভর করে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি সাগর মোহনা থেকে ১শ কিলোমিটার উজানে চাঁদপুরের মেঘনা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বরিশালের পাশে প্রবাহমাণ কির্তনখোলা নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিকের দ্বিগুণেরও বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। পানি বিশেজ্ঞগণ এটাকে স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত দুঃসংবাদ বলে সতর্ক করে উজানে পানির প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টির পরিমাণ কম হওয়াকে দায়ী করেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্রের মতে ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের কির্তনখোলা নদীর পানিতে যেখানে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল ৬১০-৬৩০ পার্সেন্ট পার মিলিয়ন-পিপিএম, সেখানে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তা ৯১০ পিপিএম-এ পৌঁছে। ২০১৮ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ২০১৯ সালে একই নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা প্রায় ৯শ পিপিএমে বৃদ্ধি পায়। গত বছর জানুয়ারিতেও লবণাক্ততার মাত্রা ছিল প্রায় ৯শ পিপিএমের কাছে।

কিন্তু গত ডিসেম্বরের পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়তে শুরু করে। গতমাস থেকে পরিস্থিতি আরও নাজুক আকার ধারণ করেছে। চলতি মাসের শুরু থেকে বরিশালে কির্তনখোলার পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ১ হাজার পিপিএম অতিক্রম করেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। আর লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে। এখন কীর্তনখোলার পানিতে গোছল করলে শরীর আঠালো হয়ে চুলকানি শুরু হয়। চায়ের দোকানদাররা এর আগে নদীর পানি দিয়ে সুস্বাদু চা তৈরি করলেও বর্তমানে বিস্বাদ হয়ে যায়।

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মাসহ সীমান্তের ওপার থেকে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানির হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করায় বা উজানের নদীগুলোতে পানি কম থাকায় উজান থেকে আমাদের সাগরমুখী মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। সঙ্গে গত কয়েক বছর থেকেই শীত বিদায়ের পরে বসন্তে দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গে বৃষ্টিপাত কম হবার কারণেও ভাটিতে মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাসের সুযোগে সাগরের নোনা পানি অতিমাত্রায় উজানে উঠে আসছে। গত মাসে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮০ ভাগ কম। যা বরিশাল অঞ্চলে ৯৯.৫% ও রাজশাহী অঞ্চলে ছিল ৯৪.২% কম। বরিশাল অঞ্চলে ৫৩ মিলিমিটারের স্থলে মাত্র .০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় মার্চ মাসে। গত জনুয়ারি মাসে বরিশাল অঞ্চলে কোন বৃষ্টিপাতই হয়নি। আর ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ মিলিমিটার। উজানের প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে কমে যাওয়ায় নদ-নদীতে মিঠাপানির প্রবাহে ক্রমশ ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় সাগরের নোনা পানি সেই স্থান পূরণ করছে।

এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ফসলি জমিসহ একাধিক জনপদে লবণাক্ত পানি ঢুকে নতুন করে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। এমনকি গত পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে বরিশাল ছাড়িয়ে চাঁদপুরের ভাটিতে পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি পৌঁছে যায়। মাত্রাতিরিক্ত এই নোনা পানি শুধু ফসলি জমিরই ক্ষতি করছে না, তা মৎস্য ও উপকূলীয় বনজ সম্পদের জন্যও ক্রমশ হুমকির সৃষ্টি করছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, আমাদের ফসল ও মৎস্য সম্পদসহ পরিবেশ যেখানে ৫শ পিপিএম পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে সেখানে ইতোমধ্যে তার মাত্রা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি যথেষ্ট হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে উজানে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই বলেও মনে করেন পানি বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ পরিবেশ সুরক্ষার দিকে নজর দেয়ারও তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১ , ২৮ চৈত্র ১৪২৭ ২৭ শাবান ১৪৪২

উজানে পানি প্রবাহ কমে গেছে

দক্ষিণাঞ্চলে নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততা দ্বিগুণ বেড়েছে

পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

মানবেন্দ্র বটব্যাল, বরিশাল

উজানে পনি প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমেছে। সাগরের মাত্রাতিরিক্ত নোনা পানি উঠে এসে দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের মধ্যভাগের নদ-নদীর পানির লবণাক্ততা বেড়েছে। এতে মাত্রাতিরিক্ত নোনা পানি শুধু ফসলি জমিরই ক্ষতি করছে না, তা মৎস্য ও উপকূলীয় বনজ সম্পদের জন্যও হুমকি স্বরূপ। আশঙ্কা করা হচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়ের।

বঙ্গোপসাগরের জোয়ারে উপর ভর করে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি সাগর মোহনা থেকে ১শ কিলোমিটার উজানে চাঁদপুরের মেঘনা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বরিশালের পাশে প্রবাহমাণ কির্তনখোলা নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিকের দ্বিগুণেরও বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে। পানি বিশেজ্ঞগণ এটাকে স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত দুঃসংবাদ বলে সতর্ক করে উজানে পানির প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টির পরিমাণ কম হওয়াকে দায়ী করেছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি সূত্রের মতে ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের কির্তনখোলা নদীর পানিতে যেখানে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল ৬১০-৬৩০ পার্সেন্ট পার মিলিয়ন-পিপিএম, সেখানে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তা ৯১০ পিপিএম-এ পৌঁছে। ২০১৮ সালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ২০১৯ সালে একই নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা প্রায় ৯শ পিপিএমে বৃদ্ধি পায়। গত বছর জানুয়ারিতেও লবণাক্ততার মাত্রা ছিল প্রায় ৯শ পিপিএমের কাছে।

কিন্তু গত ডিসেম্বরের পর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়তে শুরু করে। গতমাস থেকে পরিস্থিতি আরও নাজুক আকার ধারণ করেছে। চলতি মাসের শুরু থেকে বরিশালে কির্তনখোলার পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ১ হাজার পিপিএম অতিক্রম করেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। আর লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে। এখন কীর্তনখোলার পানিতে গোছল করলে শরীর আঠালো হয়ে চুলকানি শুরু হয়। চায়ের দোকানদাররা এর আগে নদীর পানি দিয়ে সুস্বাদু চা তৈরি করলেও বর্তমানে বিস্বাদ হয়ে যায়।

নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মাসহ সীমান্তের ওপার থেকে প্রবাহিত ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানির হিস্যা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করায় বা উজানের নদীগুলোতে পানি কম থাকায় উজান থেকে আমাদের সাগরমুখী মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। সঙ্গে গত কয়েক বছর থেকেই শীত বিদায়ের পরে বসন্তে দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গে বৃষ্টিপাত কম হবার কারণেও ভাটিতে মিঠা পানির প্রবাহ হ্রাসের সুযোগে সাগরের নোনা পানি অতিমাত্রায় উজানে উঠে আসছে। গত মাসে দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৮০ ভাগ কম। যা বরিশাল অঞ্চলে ৯৯.৫% ও রাজশাহী অঞ্চলে ছিল ৯৪.২% কম। বরিশাল অঞ্চলে ৫৩ মিলিমিটারের স্থলে মাত্র .০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয় মার্চ মাসে। গত জনুয়ারি মাসে বরিশাল অঞ্চলে কোন বৃষ্টিপাতই হয়নি। আর ফেব্রুয়ারিতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ মিলিমিটার। উজানের প্রবাহ হ্রাসের সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ উদ্বেগজনক হারে কমে যাওয়ায় নদ-নদীতে মিঠাপানির প্রবাহে ক্রমশ ঘাটতি সৃষ্টি হওয়ায় সাগরের নোনা পানি সেই স্থান পূরণ করছে।

এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ফসলি জমিসহ একাধিক জনপদে লবণাক্ত পানি ঢুকে নতুন করে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। এমনকি গত পূর্ণিমার ভরা জোয়ারে বরিশাল ছাড়িয়ে চাঁদপুরের ভাটিতে পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের নোনা পানি পৌঁছে যায়। মাত্রাতিরিক্ত এই নোনা পানি শুধু ফসলি জমিরই ক্ষতি করছে না, তা মৎস্য ও উপকূলীয় বনজ সম্পদের জন্যও ক্রমশ হুমকির সৃষ্টি করছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, আমাদের ফসল ও মৎস্য সম্পদসহ পরিবেশ যেখানে ৫শ পিপিএম পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে সেখানে ইতোমধ্যে তার মাত্রা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি যথেষ্ট হুমকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

এ থেকে উত্তরণে উজানে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই বলেও মনে করেন পানি বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ পরিবেশ সুরক্ষার দিকে নজর দেয়ারও তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।