মুক্তিযুদ্ধে চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুর

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের অভ্যন্তরে কয়েকটি অঞ্চলে বামপন্থিদের নেতৃত্বে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। গেরিলা বাহিনী গঠন ও ঘাঁটি স্থাপন করে তারা ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তৎকালীন মহকুমা সদর বাগেরহাটের চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুরে গড়ে ওঠা গেরিলা ঘাঁটি এবং ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধ এ রকম একটি উদাহরণ। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব-বাংলা সমন্বয় কমিটির আঞ্চলিক প্রধান রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দুর্ভেদ্য গেরিলা ঘাঁটি গড়ে ওঠে।

বিষ্ণুপুরে গেরিলারা একটি শক্তিশালী অবস্থান অঞ্চল (খড়ফমবসবহঃ অৎবধ) গড়ে তোলেন এবং কয়েকটি গেরিলা ঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যুহ নির্মাণ করেন। বাগেরহাট শহরের বুক চিরে প্রবাহিত ভৈরব-দড়াটানা নদীর উত্তর তীরে বিষ্ণুপুরের খালিশপুর গ্রামে ছিল এই বিপ্লবী যোদ্ধাদের সদর দপ্তর। অন্য দুটি ঘাঁটি ছিল সন্তোষপুর প্রাইমারি স্কুল ও চিতলমারীর ইউনিয়নের সুড়িগাতী গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধকালে তারা প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হন।

বাগেরহাটে মুক্তিযুদ্ধ : কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি।

অস্ত্র ও গোলা-বারুদ সংগ্রহ : রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে আগে থেকেই একটি গ্রুপ সংগঠিত হচ্ছিল। তারা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণ গ্রহণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯ এপ্রিল রফিক, জুবায়ের নোমা, শংকর বিশ্বাস, খসরুসহ মোট ১১ জন বিষ্ণুপুর হাইস্কুলে অবস্থান নেন। পার্টির কর্মী আসাদ একটি রিভলবার সংগ্রহ করেন। এটি ছিল বাহিনীর প্রথম অস্ত্র।

২৭ এপ্রিল রফিকের নেতৃত্বে একটি দল অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দড়াটানা পার হয়ে মুনিগঞ্জে আসেন। খেয়া ঘাটে এসে তারা একটি আরোহীবিহীন জিপ স্টার্ট দিতে সক্ষম হলে সকলে মিলে জিপে চড়ে বসেন। তাদের সঙ্গে অস্ত্র ছিল ৩টি থ্রি-নট-থ্রি (৩০৩) রাইফেল ও ১টি রিভলভার। শহরের কেন্দ্রস্থলে ফাইন আর্ট প্রেসের সামনে তারা অবস্থান নেন। বিকাল ৫টার দিকে চারজন টহলরত পুলিসসহ একজন আনসারের কাছ থেকে ৫টি ৩০৩ রাইফেল ছিনিয়ে নেন। জিপ পুনরায় স্টার্ট নিতে ব্যর্থ হলে তারা পায়ে হেঁটে ঘাঁটিতে ফিরে যান। চলার পথে একজন আনসারের কাছ থেকে তারা আরো একটি রাইফেল সংগ্রহ করেন।

বাহিরদিয়ায় মানস ঘোষ আগে থেকেই প্রতিরোধ সংগঠিত করছিলেন। পিরোজপুরে পার্টি নেতা ফজলুল হকের (ফজলু) নেতৃত্বে ট্রেজারির অস্ত্রাগার লুট করা হয়। সেখান থেকে তিনি ১৯টি .৩০৩ রাইফেল বিষ্ণুপুরের জন্য পাঠিয়ে দেন। বাগেরহাট সদরের ডেমা থেকে সংগৃহীত হয় আরও ৬টি .৩০৩ রাইফেল এবং বারুইপাড়া থেকে ১টি ব্যাটাগান ও কার্তুজ সংগ্রহ করা হয়।

প্রতিরোধ পর্ব

এপ্রিলের শেষের দিকে রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বাধীন বাহিনী, যা পরে রফিক বাহিনী নামে খ্যাতি লাভ করে, স্থানীয় তরুণ-যুবা ও পার্টির বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীরা যোগ দিতে শুরু করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক দন্দ্বের ফলশ্রুতিতে চিতলমারীর দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার কমান্ডার হাবিব ২৭ এপ্রিল রাতে হালিশহর গ্রামের নৃপেনের বাড়িতে আসে এবং চরম হুমকি প্রদান করে। খবর বিষ্ণুপুর ঘাঁটিতে পৌঁছলে পরের দিন হিল্লোল, ইসমাইল হোসেন (মেজো), মান্নান চৌধুরী, শংকরসহ একটি দল হাবিবের হুমকির জবাব দিতে গেলে প্রতিপক্ষের আক্রমণে বেলা ১১টায় গুলিবিদ্ধ হন হিল্লোল। বিকাল ৪টার দিকে তিনি মারা যান। গোলাম মোস্তফা হিল্লোল (ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের শ্যালক) মুক্তিযুদ্ধে বিষ্ণুপুর রনাঙ্গনের প্রথম শহীদ।

বাগেরহাট সদর থানা আক্রমণ

ইতোমধ্যে বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারী মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ অজিয়র রহমান শহরে ফিরে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে বাগেরহাট থানা হাজতে রাখা হয়। দল-মত নির্বিশেষে জনপ্রিয় এই নেতাকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় রফিক বাহিনী। কামরুজ্জামান টুকু তার বাহিনী নিয়ে এই হামলায় অংশগ্রহণ করেন। ৩০ এপ্রিল রাতে তারা থানা আক্রমণের উদ্দেশ্যে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। তাদের জানা ছিল না ওই দিন সন্ধ্যায়ই অজিয়র রহমানকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল রাত ১২টার পরে ০১ মে’র প্রথম প্রহরে রফিক বাহিনী ও টুকু বাহিনী একযোগে আক্রমণ চালান। আক্রমণে দুই পুলিশ নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। টুকু বাহিনীর দুজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। অজিয়র রহমানকে তারা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এই আক্রমণে রফিক, জুবায়ের, খসরু, আসাদ, আনিস, গোবিন্দ, মধু, মজবুলসহ ২০/২২ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন।

দালাল-রাজাকার নিধন কর্মসূচি

বিষ্ণুপুরের মুক্তিযোদ্ধারা এলাকার শত্রুমুক্ত করার প্রয়োজনে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় দালাল-রাজাকার নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। বাগেরহাট শহরের দালালদের তৎপরতা ও অত্যাচার বৃদ্ধি পেলে প্রধান প্রধান দালালদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান সহযোগী দালাল প্রধান রজব আলীকে তারা প্রথম টার্গেট হিসেবে বেছে নেন।

১৪ মে মাঝ রাতে রফিক, জুবায়ের, সমীর বাচ্চু, বাদল, মান্নান চৌধুরী বাগেরহাট খান জাহান (র.) এর দরগাহ সড়কের পাশে সুশীল দামের পোড়োবাড়িতে অবস্থান নেন। ১৫ মে পাক বাহিনী দ্বিতীয় দফায় বাগেরহাট শহরে আসে। এখানে প্রায় তিন দিন অবস্থানের পরে ১৭ মে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর দেখা পান বটে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ঐদিন সকালে কয়েক ট্রাক পাকিস্তানি হানাদার পরিবেষ্টিত রজব আলী সড়ক অতিক্রম করে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা মুলতবি করে ফিরে আসেন।

দালাল প্রধান নিধনে স্যুইসাইডাল স্কোয়াড

অন্যদিকে বিষ্ণুপুরের রফিক বাহিনীর গেরিলারা তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, ছোট-খাটো আক্রমণ ও দালাল নিধন কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। ১১ জুন যাত্রাপুরের আফসার বেগের বাড়ি থেকে একটি বন্দুক ও একটি রিভলবার সংগ্রহ করে। ৭ জুলাই বাহিনীর বিশেষ বৈঠকে রজব আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে জুবায়ের ও কেষ্ট ঘোষ সমন্বয়ে স্যুইসাইডাল স্কোয়াড গঠিত হয়।

শহরের আমলাপাড়ায় ওয়াপদা রেস্ট হাউসে অবস্থানরত রজব আলীকে স্টেন দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করতেই দেহরক্ষীকে সামনে টেনে নিয়ে আসে রজব। হতভাগা লোকটি সঙ্গে সঙ্গেই নিহত হয়। পিঠে ও বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পালাতে গেলে কেষ্ট পুনরায় গুলি করে রজব আলীকে। গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় আহত রজব আলীকে তারা স্টেন ও রিভলবারের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা চালান। এ সময় ওয়াপদার জনৈক কর্মকর্তার ছেলের ছোড়া বন্দুকের গুলিতে কেষ্ট আহত হন। এ অবস্থায় দ্রুত তারা মুনিগঞ্জ খেয়া পেরিয়ে বিষ্ণুপুরে ফিরে আসেন। খবর পেয়ে উল্লাসিত জনতা ঘাড়ে তুলে গেরিলাদের ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাদের দ্রুত তৎপরতায় যশোর ক্যান্টনমেন্টে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে রজব আলী সে যাত্রা রক্ষা পায়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হলে রজব আলী আত্মহত্যা করে।

কচুয়া থানা আক্রমণ ও মাধবকাঠির যুদ্ধ

জুলাই মাসের প্রথম দিকে রাশেদ খান মেনন (মতান্তরে, হায়দার আকবর খান রণো) বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে গেরিলাদের সঙ্গে মিলিত হন। দিনব্যাপী এক আলোচনায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে জনযুদ্ধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২২ জুলাই হাবিব কমান্ডারের সঙ্গে রফিক বাহিনীর সঙ্গে একটি আপোষ আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় পরস্পরের প্রতি আর কেউ আক্রমণ চালাবে না। ২৪ জুলাই রাজাকারদের বহনকারী রূপসা থেকে বাগেরহাটগামী একটি বিশেষ ট্রেনে বাহিরদিয়ার মানস ঘোষের বাহিনী ও রফিক বাহিনী সম্মিলিত আক্রমণ চালায়। অনেক রাজাকার হতাহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। ইতোমধ্যেই রফিক বাহিনী বাগেরহাটের কচুয়া থানায় আক্রমণ চালিয়ে ৮টি .৩০৩ রাইফেল, ২টি নেস্টনগান ও ১টি রিভলভার সংগ্রহ করেন।

১ আগস্ট পাকিস্তানি হানাদাররা বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে এবং মুক্তিযোদ্ধা কান্তর দুই ভাই নিরোদ ও কালিপদকে হত্যা করে শহরে প্রত্যাবর্তন করে। বিষ্ণুপুরের গেরিলারা এ সময় এলাকায় জনগণকে সংগঠিত করতে প্রচারপত্র ও যুদ্ধের নির্দেশিকা ছড়িয়ে দেন। ৬ আগস্ট মাধবকাঠি মাদরাসায় অবস্থান নেয়ার জন্য পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের একটি দল আসে। ৭ আগস্ট কমান্ডার হাবিরের দল তাদের ঘিরে রাখে। অপরদিক থেকে একই দিনে বিষ্ণুপুরের গেরিলারা মাধবকাঠি মাদরাসায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান ঘিরে ফেলে। রাত ১২টায় জিরো আওয়ারে সম্মিলিত আক্রমণ শুরু হয়। পরের দিন বেলা ২টা পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। এ সময় মাদরাসার দক্ষিণ দিক থেকে গেরিলাদের একটি অগ্রবর্তী দল ঢুকে পড়লে হানাদার ও রাজাকাররা পালিয়ে নদীর ঘাটে থাকা লঞ্চে ওঠার চেষ্টা চালায়। যুদ্ধে তিন পাকিস্তানি সেনাসহ ১৬ রাজাকার নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল অগণিত।

(অসমাপ্ত)

রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১ , ২৮ চৈত্র ১৪২৭ ২৭ শাবান ১৪৪২

মুক্তিযুদ্ধে চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুর

শাহাদত হোসেন বাচ্চু

’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের অভ্যন্তরে কয়েকটি অঞ্চলে বামপন্থিদের নেতৃত্বে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল। গেরিলা বাহিনী গঠন ও ঘাঁটি স্থাপন করে তারা ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তৎকালীন মহকুমা সদর বাগেরহাটের চিরুলিয়া-বিষ্ণুপুরে গড়ে ওঠা গেরিলা ঘাঁটি এবং ৯ মাসব্যাপী সশস্ত্র যুদ্ধ এ রকম একটি উদাহরণ। কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব-বাংলা সমন্বয় কমিটির আঞ্চলিক প্রধান রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দুর্ভেদ্য গেরিলা ঘাঁটি গড়ে ওঠে।

বিষ্ণুপুরে গেরিলারা একটি শক্তিশালী অবস্থান অঞ্চল (খড়ফমবসবহঃ অৎবধ) গড়ে তোলেন এবং কয়েকটি গেরিলা ঘাঁটির প্রতিরক্ষা ব্যুহ নির্মাণ করেন। বাগেরহাট শহরের বুক চিরে প্রবাহিত ভৈরব-দড়াটানা নদীর উত্তর তীরে বিষ্ণুপুরের খালিশপুর গ্রামে ছিল এই বিপ্লবী যোদ্ধাদের সদর দপ্তর। অন্য দুটি ঘাঁটি ছিল সন্তোষপুর প্রাইমারি স্কুল ও চিতলমারীর ইউনিয়নের সুড়িগাতী গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধকালে তারা প্রায় ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে সক্ষম হন।

বাগেরহাটে মুক্তিযুদ্ধ : কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি।

অস্ত্র ও গোলা-বারুদ সংগ্রহ : রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বে আগে থেকেই একটি গ্রুপ সংগঠিত হচ্ছিল। তারা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণ গ্রহণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯ এপ্রিল রফিক, জুবায়ের নোমা, শংকর বিশ্বাস, খসরুসহ মোট ১১ জন বিষ্ণুপুর হাইস্কুলে অবস্থান নেন। পার্টির কর্মী আসাদ একটি রিভলবার সংগ্রহ করেন। এটি ছিল বাহিনীর প্রথম অস্ত্র।

২৭ এপ্রিল রফিকের নেতৃত্বে একটি দল অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দড়াটানা পার হয়ে মুনিগঞ্জে আসেন। খেয়া ঘাটে এসে তারা একটি আরোহীবিহীন জিপ স্টার্ট দিতে সক্ষম হলে সকলে মিলে জিপে চড়ে বসেন। তাদের সঙ্গে অস্ত্র ছিল ৩টি থ্রি-নট-থ্রি (৩০৩) রাইফেল ও ১টি রিভলভার। শহরের কেন্দ্রস্থলে ফাইন আর্ট প্রেসের সামনে তারা অবস্থান নেন। বিকাল ৫টার দিকে চারজন টহলরত পুলিসসহ একজন আনসারের কাছ থেকে ৫টি ৩০৩ রাইফেল ছিনিয়ে নেন। জিপ পুনরায় স্টার্ট নিতে ব্যর্থ হলে তারা পায়ে হেঁটে ঘাঁটিতে ফিরে যান। চলার পথে একজন আনসারের কাছ থেকে তারা আরো একটি রাইফেল সংগ্রহ করেন।

বাহিরদিয়ায় মানস ঘোষ আগে থেকেই প্রতিরোধ সংগঠিত করছিলেন। পিরোজপুরে পার্টি নেতা ফজলুল হকের (ফজলু) নেতৃত্বে ট্রেজারির অস্ত্রাগার লুট করা হয়। সেখান থেকে তিনি ১৯টি .৩০৩ রাইফেল বিষ্ণুপুরের জন্য পাঠিয়ে দেন। বাগেরহাট সদরের ডেমা থেকে সংগৃহীত হয় আরও ৬টি .৩০৩ রাইফেল এবং বারুইপাড়া থেকে ১টি ব্যাটাগান ও কার্তুজ সংগ্রহ করা হয়।

প্রতিরোধ পর্ব

এপ্রিলের শেষের দিকে রফিকুল ইসলাম খোকনের নেতৃত্বাধীন বাহিনী, যা পরে রফিক বাহিনী নামে খ্যাতি লাভ করে, স্থানীয় তরুণ-যুবা ও পার্টির বিভিন্ন অঞ্চলের কর্মীরা যোগ দিতে শুরু করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক দন্দ্বের ফলশ্রুতিতে চিতলমারীর দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার কমান্ডার হাবিব ২৭ এপ্রিল রাতে হালিশহর গ্রামের নৃপেনের বাড়িতে আসে এবং চরম হুমকি প্রদান করে। খবর বিষ্ণুপুর ঘাঁটিতে পৌঁছলে পরের দিন হিল্লোল, ইসমাইল হোসেন (মেজো), মান্নান চৌধুরী, শংকরসহ একটি দল হাবিবের হুমকির জবাব দিতে গেলে প্রতিপক্ষের আক্রমণে বেলা ১১টায় গুলিবিদ্ধ হন হিল্লোল। বিকাল ৪টার দিকে তিনি মারা যান। গোলাম মোস্তফা হিল্লোল (ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের শ্যালক) মুক্তিযুদ্ধে বিষ্ণুপুর রনাঙ্গনের প্রথম শহীদ।

বাগেরহাট সদর থানা আক্রমণ

ইতোমধ্যে বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারী মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ অজিয়র রহমান শহরে ফিরে পাকিস্তান বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে বাগেরহাট থানা হাজতে রাখা হয়। দল-মত নির্বিশেষে জনপ্রিয় এই নেতাকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় রফিক বাহিনী। কামরুজ্জামান টুকু তার বাহিনী নিয়ে এই হামলায় অংশগ্রহণ করেন। ৩০ এপ্রিল রাতে তারা থানা আক্রমণের উদ্দেশ্যে তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেন। তাদের জানা ছিল না ওই দিন সন্ধ্যায়ই অজিয়র রহমানকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল রাত ১২টার পরে ০১ মে’র প্রথম প্রহরে রফিক বাহিনী ও টুকু বাহিনী একযোগে আক্রমণ চালান। আক্রমণে দুই পুলিশ নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। টুকু বাহিনীর দুজন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। অজিয়র রহমানকে তারা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। এই আক্রমণে রফিক, জুবায়ের, খসরু, আসাদ, আনিস, গোবিন্দ, মধু, মজবুলসহ ২০/২২ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন।

দালাল-রাজাকার নিধন কর্মসূচি

বিষ্ণুপুরের মুক্তিযোদ্ধারা এলাকার শত্রুমুক্ত করার প্রয়োজনে পাকিস্তানি বাহিনীর দেশীয় দালাল-রাজাকার নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। বাগেরহাট শহরের দালালদের তৎপরতা ও অত্যাচার বৃদ্ধি পেলে প্রধান প্রধান দালালদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান সহযোগী দালাল প্রধান রজব আলীকে তারা প্রথম টার্গেট হিসেবে বেছে নেন।

১৪ মে মাঝ রাতে রফিক, জুবায়ের, সমীর বাচ্চু, বাদল, মান্নান চৌধুরী বাগেরহাট খান জাহান (র.) এর দরগাহ সড়কের পাশে সুশীল দামের পোড়োবাড়িতে অবস্থান নেন। ১৫ মে পাক বাহিনী দ্বিতীয় দফায় বাগেরহাট শহরে আসে। এখানে প্রায় তিন দিন অবস্থানের পরে ১৭ মে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর দেখা পান বটে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ঐদিন সকালে কয়েক ট্রাক পাকিস্তানি হানাদার পরিবেষ্টিত রজব আলী সড়ক অতিক্রম করে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা পরিকল্পনা মুলতবি করে ফিরে আসেন।

দালাল প্রধান নিধনে স্যুইসাইডাল স্কোয়াড

অন্যদিকে বিষ্ণুপুরের রফিক বাহিনীর গেরিলারা তাদের যুদ্ধ প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ, ছোট-খাটো আক্রমণ ও দালাল নিধন কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন। ১১ জুন যাত্রাপুরের আফসার বেগের বাড়ি থেকে একটি বন্দুক ও একটি রিভলবার সংগ্রহ করে। ৭ জুলাই বাহিনীর বিশেষ বৈঠকে রজব আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে জুবায়ের ও কেষ্ট ঘোষ সমন্বয়ে স্যুইসাইডাল স্কোয়াড গঠিত হয়।

শহরের আমলাপাড়ায় ওয়াপদা রেস্ট হাউসে অবস্থানরত রজব আলীকে স্টেন দিয়ে ব্রাশ ফায়ার শুরু করতেই দেহরক্ষীকে সামনে টেনে নিয়ে আসে রজব। হতভাগা লোকটি সঙ্গে সঙ্গেই নিহত হয়। পিঠে ও বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পালাতে গেলে কেষ্ট পুনরায় গুলি করে রজব আলীকে। গুলি ফুরিয়ে যাওয়ায় আহত রজব আলীকে তারা স্টেন ও রিভলবারের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা চালান। এ সময় ওয়াপদার জনৈক কর্মকর্তার ছেলের ছোড়া বন্দুকের গুলিতে কেষ্ট আহত হন। এ অবস্থায় দ্রুত তারা মুনিগঞ্জ খেয়া পেরিয়ে বিষ্ণুপুরে ফিরে আসেন। খবর পেয়ে উল্লাসিত জনতা ঘাড়ে তুলে গেরিলাদের ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাদের দ্রুত তৎপরতায় যশোর ক্যান্টনমেন্টে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে রজব আলী সে যাত্রা রক্ষা পায়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হলে রজব আলী আত্মহত্যা করে।

কচুয়া থানা আক্রমণ ও মাধবকাঠির যুদ্ধ

জুলাই মাসের প্রথম দিকে রাশেদ খান মেনন (মতান্তরে, হায়দার আকবর খান রণো) বিষ্ণুপুর ক্যাম্পে গেরিলাদের সঙ্গে মিলিত হন। দিনব্যাপী এক আলোচনায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে জনযুদ্ধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২২ জুলাই হাবিব কমান্ডারের সঙ্গে রফিক বাহিনীর সঙ্গে একটি আপোষ আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত হয় পরস্পরের প্রতি আর কেউ আক্রমণ চালাবে না। ২৪ জুলাই রাজাকারদের বহনকারী রূপসা থেকে বাগেরহাটগামী একটি বিশেষ ট্রেনে বাহিরদিয়ার মানস ঘোষের বাহিনী ও রফিক বাহিনী সম্মিলিত আক্রমণ চালায়। অনেক রাজাকার হতাহত হয় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলা-বারুদ উদ্ধার করা হয়। ইতোমধ্যেই রফিক বাহিনী বাগেরহাটের কচুয়া থানায় আক্রমণ চালিয়ে ৮টি .৩০৩ রাইফেল, ২টি নেস্টনগান ও ১টি রিভলভার সংগ্রহ করেন।

১ আগস্ট পাকিস্তানি হানাদাররা বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে এবং মুক্তিযোদ্ধা কান্তর দুই ভাই নিরোদ ও কালিপদকে হত্যা করে শহরে প্রত্যাবর্তন করে। বিষ্ণুপুরের গেরিলারা এ সময় এলাকায় জনগণকে সংগঠিত করতে প্রচারপত্র ও যুদ্ধের নির্দেশিকা ছড়িয়ে দেন। ৬ আগস্ট মাধবকাঠি মাদরাসায় অবস্থান নেয়ার জন্য পাকিস্তানি হানাদার ও রাজাকারদের একটি দল আসে। ৭ আগস্ট কমান্ডার হাবিরের দল তাদের ঘিরে রাখে। অপরদিক থেকে একই দিনে বিষ্ণুপুরের গেরিলারা মাধবকাঠি মাদরাসায় পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান ঘিরে ফেলে। রাত ১২টায় জিরো আওয়ারে সম্মিলিত আক্রমণ শুরু হয়। পরের দিন বেলা ২টা পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। এ সময় মাদরাসার দক্ষিণ দিক থেকে গেরিলাদের একটি অগ্রবর্তী দল ঢুকে পড়লে হানাদার ও রাজাকাররা পালিয়ে নদীর ঘাটে থাকা লঞ্চে ওঠার চেষ্টা চালায়। যুদ্ধে তিন পাকিস্তানি সেনাসহ ১৬ রাজাকার নিহত ও আহতের সংখ্যা ছিল অগণিত।

(অসমাপ্ত)