কঠোর বিধিনিষেধ কাল থেকে

তবে খোলা থাকবে শিল্প-কারখানা বন্ধ ব্যাংক, সরকারি বেসরকারি গণপরিবহন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাবে না

দেশে করোনা সংক্রমণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আগামীকাল ১৪ এপ্রিল (বুধবার) থেকে সাতদিনের জন্য চলাচলে বিধিনিষেধ (কঠোর লকডাউন) ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত জরুরি সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস এবং গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। এমনকি বন্ধ থাকবে ব্যাংক। তবে খোলা থাকবে শিল্প-কারখানা। আর অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের বাড়ি থেকে বের হতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে ৭/৮দিন মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ (লকডাউন) জারি করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। তাদের মতে কম করে হলেও ১৪ থেকে ২১ দিনের ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি করা এবং তা কঠোরভাবে মনিটর করা প্রয়োজন।

দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ দেখা দেয় গত বছর ৮ মার্চ। এরপর ১৮ মার্চ করোনা আক্রান্ত একজনের মৃত্যু হয়। এরপর গত বছর ২৬ মার্চ থেকে সরকার মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তবে মে-জুন থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবির মুখে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।

কিন্তু এ বছর মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়তে শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে গত ৫ এপ্রিল থেকে ১১এপ্রিল পর্যন্ত বিধি-নিষেধ (লকডাউন) জারি করে সরকার। কিন্তু শুরু থেকেই কারখানা খোলা রাখা এবং দু’দিন পর দোকানপাট-শপিংমলসহ গণপরিবহন খুলে দেয়ার কারণে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় সরকার আবার সাত দিনের ‘কঠোর’ নিষেধাজ্ঞা (সর্বাত্মক লকডাউন) জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়।

গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে জারি করা বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিবদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিধিনিষেধগুলো হলো-

১. সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিসগুলো এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।

২. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।

৩. সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এ আদেশ প্রযোজ্য হবে না।

৪. শিল্প-কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। তবে শ্রমিকদের স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান থেকে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেয়া নিশ্চিত করতে হবে।

৫. আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা, যেমন- কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরগুলোর (স্থল, নদী ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে।

৬. অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। তবে টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে।

৭. খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কেবল খাদ্য বিক্রয়/সরবরাহ করা যাবে। শপিংমলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে।

৮. কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। বাজার কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

৯. বোরো ধান কাটার জরুরি প্রয়োজনে কৃষি শ্রমিক পরিবহনে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন সমন্বয় করবে।

১০. সারাদেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন উল্লেখিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদপেক্ষ গ্রহণ করবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল জোরদার করবে।

১১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তার পক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন।

১২. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জুমা ও তারাবির নামাজে জমায়েত বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করবে।

১৩. উপরোক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ প্রয়োজনে সম্পূরক নির্দেশনা জারি করতে পারবে।

এদিকে, কারখানা মালিকদের চাপে এবারের বিধিনিষেধেও পোশাক কারখানা চালু থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে কম করে হলেও ১৪ থেকে ২১ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা প্রয়োজন। তাদের মতে, লকডাউন বা সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা যাই বলা হোক না কেন, তা কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা তা যথার্থভাবে মনিটর করতে হবে।

এ ব্যাপারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, ‘কারো শরীরে করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর ১৪ দিনের মধ্যে তা প্রকাশ পায় এবং রোগ দেখা দেয়ার পর কমপক্ষে ১৪ দিনের আইসোলেশন এবং চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হন। এই ১৪ দিন তিনি করোনা ছড়াতে থাকবেন। তবে যাদের অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ে তাদের কম করে হলেও ২১ দিন চিকিৎসা (আইসিইউতে রাখাসহ) দিতে হয়। এই ২১ দিন তিনি রোগ ছড়াতে থাকবেন। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এভাবে ১৪ থেকে ২১ দিন একজন রোগীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করা মানে তাকে সম্পূর্ণ আইসোলেশনে রাখতে এবং চিকিৎসা দিতে হবে। এ রোগী যাতে অন্যদের সংক্রমিত করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য ১৪ থেকে ২১ দিন দেশব্যাপী মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।’

জানতে চাইলে হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সংবাদকে বলেন, বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন কমপক্ষে ২ সপ্তাহ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সুপ্তিকাল ১৪ দিন। অর্থাৎ করোনাভাইরাস শরীরে ১৪ দিন পর্যন্ত ঘাপটি মেরে থাকতে সমর্থ। শরীরে প্রবেশের ১৪তম দিনেও ভাইরাসটি রোগ তৈরিতে সক্ষম। এ জন্য বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন দিলে কমপক্ষে ২ সপ্তাহ হওয়া উচিত। এক সপ্তাহের লকডাউন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, ‘লকডাউন শেষ হওয়ার পরও করোনা নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী ধাপগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে সবাইকে বাধ্য করতে হবে। লকডাউনের পর নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী ধাপগুলো কী হবে তা সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে আরেকটি বড় ব্যাপার হচ্ছেÑ পুরো বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা। বিধি-নিষেধ জারি করা হলো কোথায়, তা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা, তা দেখে ব্যবস্থা নেয়া, এ বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

লকডাউনে বিধিনিষেধের বাইরে থাকবে যা

আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিল দেশব্যাপী লকডাউনে বিধিনিষেধে কিছু সেবা ও প্রতিষ্ঠানকে বাইরে রাখা হয়েছে। জরুরি সেবা ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব লকডাউনে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।

সূত্র জানিয়েছে, আগামী বুধবার থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আটদিনের লকডাউন (বিধিনিষেধ) দিয়েছে সরকার। গতকাল এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বিধিনিষেধের মধ্যে পালনের জন্য ১৩টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কিছু সেবা ও প্রতিষ্ঠানকে বিধিনিষেধের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা যেমন- কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরগুলোর (স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।

শিল্প-কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। তবে শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেয়া নিশ্চিত করতে হবে। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস/আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে ও সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং এ সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে, পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না।

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানায়

‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ ঘোষণায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে উভয়মুখী যাত্রীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। লঞ্চ বন্ধ থাকলেও ফেরি, স্পিডবোট, ট্রলারে হাজার হাজার যাত্রী গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে পারাপার হচ্ছে। ফেরিতে যাত্রীদের চাপ সামলাতে কম যানবাহন নিয়েই ফেরি পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে বাড়তি ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা। কোথাও দেখা যায়নি স্বাস্থ্যবিধি মানার লক্ষণ। এদিকে ফেরি চলাচল সীমিত থাকায় ঘাট এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের জট রয়েছে। শতাধিক কাঁচামালবাহী ট্রাক আটকে মালে পচন ধরেছে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার কাঁচামালবাহী ট্রাক সঠিকভাবে পার হতে না পারায় দ্রব্যমূল্যে প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে একাধিক সূত্রে জানা যায়, ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ফলে সোমবার সকাল থেকেই শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে দক্ষিণাঞ্চল ও ঢাকাগামী যাত্রী এবং যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। শিমুলিয়া থেকে এ চাপ আরও বেশি ছিল। দুপুরের পর ভিড় রূপ নেয় উপচেপড়ায়। শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার ঘাটে আসা প্রতিটি ফেরি ছিল যাত্রী ও যানবাহনে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। যাত্রী চাপে যানবাহন কম নিয়েই পার হতে বাধ্য হয় ফেরিগুলো। লঞ্চ বন্ধ থাকলেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা স্পিডবোট ও ট্রলারে পারাপার হয় শতশত যাত্রী।

ঘাট এলাকায় এসে মানুষ ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ বিকল্প যানবাহনে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেন। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে পৌঁছতে ৪ গুণেরও বেশি ভাড়া পড়ে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে ৩-৪ গুণ ভাড়া গুনে শিমুলিয়া থেকে স্পিডবোটে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৪শ’-৫শ’ টাকা, ট্রলারে ভাড়া নেয়া হচ্ছে দেড়শ’ টাকা। ঘাটে নেমে ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলে বরিশালে ৫শ’-৬শ’ টাকা, গোপালগঞ্জ ৫শ’ টাকা, খুলনা ৭শ’ টাকা, মাদারীপুর ২শ’ টাকা, বাগেরহাট ৬শ’৫০ টাকাসহ প্রতিটি যানবাহনেই কয়েকগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এদিকে উভয় ঘাটেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো উভয় ঘাটে আটকে রয়েছে বেশ কয়েকদিন ধরে।

সপরিবারে ঢাকা থেকে বরিশালগামী ইউসুফ মিয়া বলেন, ঢাকা থেকে ঘাটে পৌঁছাতেই পকেটের টাকা ফুরিয়ে গেল। পরে আবার বিকাশে টাকা এনে বরিশাল রওনা দিচ্ছি। বাসে বরিশাল ভাড়া ১শ’৮০ টাকা সিএনজিতে নিচ্ছে ৫শ’ টাকা। খুলনাগামী রুমা আক্তার বলেন, ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। করোনার ভয়তে বাড়ি চলে যাচ্ছি। কাশেম মিয়া নামের তরমুজ ব্যবসায়ী বলেন, ৩ গাড়ি তরমুজ নিয়ে ৩ দিন ধরে ঘাটে আটকা, ঢাকা যাব। ১টা পার হইছে। বাকিগুলো আটকা। তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। এ কেমন আইন! কাঁচামালও আটকে রাখে। এতে জনগণেরও লস, ব্যবসায়ীদেরও লস। অনেক কাঁচামালের গাড়ি আটকা এতে ঢাকায় মালের দাম বেড়ে যাবে।

বিআইডব্লিউটিসির বাংলাবাজার ঘাট ম্যানেজার মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ফেরি চলাচল সীমিত করায় ঘাটে ট্রাকের দীর্ঘ সারি পড়েছে। আর জনগণকে আমরা স্বাস্থ্যবিধি বোঝানোর চেষ্টা করছি।

মঙ্গলবার, ১৩ এপ্রিল ২০২১ , ৩০ চৈত্র ১৪২৭ ২৯ শাবান ১৪৪২

কঠোর বিধিনিষেধ কাল থেকে

তবে খোলা থাকবে শিল্প-কারখানা বন্ধ ব্যাংক, সরকারি বেসরকারি গণপরিবহন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হওয়া যাবে না

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

দেশে করোনা সংক্রমণ মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আগামীকাল ১৪ এপ্রিল (বুধবার) থেকে সাতদিনের জন্য চলাচলে বিধিনিষেধ (কঠোর লকডাউন) ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। ১৪ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত জরুরি সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস এবং গণপরিবহন বন্ধ থাকবে। এমনকি বন্ধ থাকবে ব্যাংক। তবে খোলা থাকবে শিল্প-কারখানা। আর অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষের বাড়ি থেকে বের হতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে ৭/৮দিন মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ (লকডাউন) জারি করে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। তাদের মতে কম করে হলেও ১৪ থেকে ২১ দিনের ‘নিষেধাজ্ঞা’ জারি করা এবং তা কঠোরভাবে মনিটর করা প্রয়োজন।

দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ দেখা দেয় গত বছর ৮ মার্চ। এরপর ১৮ মার্চ করোনা আক্রান্ত একজনের মৃত্যু হয়। এরপর গত বছর ২৬ মার্চ থেকে সরকার মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। তবে মে-জুন থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর দাবির মুখে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়।

কিন্তু এ বছর মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়তে শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে গত ৫ এপ্রিল থেকে ১১এপ্রিল পর্যন্ত বিধি-নিষেধ (লকডাউন) জারি করে সরকার। কিন্তু শুরু থেকেই কারখানা খোলা রাখা এবং দু’দিন পর দোকানপাট-শপিংমলসহ গণপরিবহন খুলে দেয়ার কারণে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় সরকার আবার সাত দিনের ‘কঠোর’ নিষেধাজ্ঞা (সর্বাত্মক লকডাউন) জারি করার সিদ্ধান্ত নেয়।

গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে জারি করা বিধি-নিষেধ কঠোরভাবে পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিবদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিধিনিষেধগুলো হলো-

১. সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিসগুলো এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।

২. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।

৩. সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এ আদেশ প্রযোজ্য হবে না।

৪. শিল্প-কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। তবে শ্রমিকদের স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান থেকে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেয়া নিশ্চিত করতে হবে।

৫. আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা, যেমন- কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরগুলোর (স্থল, নদী ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য, সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে।

৬. অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া (ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয়, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। তবে টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে।

৭. খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কেবল খাদ্য বিক্রয়/সরবরাহ করা যাবে। শপিংমলসহ অন্যান্য দোকান বন্ধ থাকবে।

৮. কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। বাজার কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে।

৯. বোরো ধান কাটার জরুরি প্রয়োজনে কৃষি শ্রমিক পরিবহনে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন সমন্বয় করবে।

১০. সারাদেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন উল্লেখিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে কার্যকর পদপেক্ষ গ্রহণ করবে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত টহল জোরদার করবে।

১১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তার পক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন।

১২. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জুমা ও তারাবির নামাজে জমায়েত বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করবে।

১৩. উপরোক্ত নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ প্রয়োজনে সম্পূরক নির্দেশনা জারি করতে পারবে।

এদিকে, কারখানা মালিকদের চাপে এবারের বিধিনিষেধেও পোশাক কারখানা চালু থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে কম করে হলেও ১৪ থেকে ২১ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করা প্রয়োজন। তাদের মতে, লকডাউন বা সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা যাই বলা হোক না কেন, তা কঠোরভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা তা যথার্থভাবে মনিটর করতে হবে।

এ ব্যাপারে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোস্তাক হোসেন বলেন, ‘কারো শরীরে করোনা সংক্রমণ হওয়ার পর ১৪ দিনের মধ্যে তা প্রকাশ পায় এবং রোগ দেখা দেয়ার পর কমপক্ষে ১৪ দিনের আইসোলেশন এবং চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হন। এই ১৪ দিন তিনি করোনা ছড়াতে থাকবেন। তবে যাদের অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ে তাদের কম করে হলেও ২১ দিন চিকিৎসা (আইসিইউতে রাখাসহ) দিতে হয়। এই ২১ দিন তিনি রোগ ছড়াতে থাকবেন। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে এভাবে ১৪ থেকে ২১ দিন একজন রোগীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণ করা মানে তাকে সম্পূর্ণ আইসোলেশনে রাখতে এবং চিকিৎসা দিতে হবে। এ রোগী যাতে অন্যদের সংক্রমিত করতে না পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য ১৪ থেকে ২১ দিন দেশব্যাপী মানুষের চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।’

জানতে চাইলে হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সংবাদকে বলেন, বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন কমপক্ষে ২ সপ্তাহ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সুপ্তিকাল ১৪ দিন। অর্থাৎ করোনাভাইরাস শরীরে ১৪ দিন পর্যন্ত ঘাপটি মেরে থাকতে সমর্থ। শরীরে প্রবেশের ১৪তম দিনেও ভাইরাসটি রোগ তৈরিতে সক্ষম। এ জন্য বৈজ্ঞানিক বিবেচনা থেকে লকডাউন দিলে কমপক্ষে ২ সপ্তাহ হওয়া উচিত। এক সপ্তাহের লকডাউন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, ‘লকডাউন শেষ হওয়ার পরও করোনা নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী ধাপগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে সবাইকে বাধ্য করতে হবে। লকডাউনের পর নিয়ন্ত্রণের পরবর্তী ধাপগুলো কী হবে তা সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে জানাতে হবে। এক্ষেত্রে আরেকটি বড় ব্যাপার হচ্ছেÑ পুরো বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটর করা। বিধি-নিষেধ জারি করা হলো কোথায়, তা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা, তা দেখে ব্যবস্থা নেয়া, এ বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

লকডাউনে বিধিনিষেধের বাইরে থাকবে যা

আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে ২১ এপ্রিল দেশব্যাপী লকডাউনে বিধিনিষেধে কিছু সেবা ও প্রতিষ্ঠানকে বাইরে রাখা হয়েছে। জরুরি সেবা ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব লকডাউনে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।

সূত্র জানিয়েছে, আগামী বুধবার থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আটদিনের লকডাউন (বিধিনিষেধ) দিয়েছে সরকার। গতকাল এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বিধিনিষেধের মধ্যে পালনের জন্য ১৩টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কিছু সেবা ও প্রতিষ্ঠানকে বিধিনিষেধের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিষেবা যেমন- কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস/জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরগুলোর (স্থলবন্দর, নদীবন্দর ও সমুদ্রবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে।

শিল্প-কারখানাগুলো স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে। তবে শ্রমিকদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাপনায় আনা-নেয়া নিশ্চিত করতে হবে। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস/আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে ও সব কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করবেন। তবে বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থলবন্দর এবং এ সংশ্লিষ্ট অফিসগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, সব ধরনের পরিবহন (সড়ক, নৌ, রেল, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট) বন্ধ থাকবে। তবে, পণ্য পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থা ও জরুরি সেবাদানের ক্ষেত্রে এই আদেশ প্রযোজ্য হবে না।

শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানায়

‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ ঘোষণায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে উভয়মুখী যাত্রীদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। লঞ্চ বন্ধ থাকলেও ফেরি, স্পিডবোট, ট্রলারে হাজার হাজার যাত্রী গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে পারাপার হচ্ছে। ফেরিতে যাত্রীদের চাপ সামলাতে কম যানবাহন নিয়েই ফেরি পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে বাড়তি ভাড়া দিয়ে বাড়ি ফিরছেন যাত্রীরা। কোথাও দেখা যায়নি স্বাস্থ্যবিধি মানার লক্ষণ। এদিকে ফেরি চলাচল সীমিত থাকায় ঘাট এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাকের জট রয়েছে। শতাধিক কাঁচামালবাহী ট্রাক আটকে মালে পচন ধরেছে। দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার কাঁচামালবাহী ট্রাক সঠিকভাবে পার হতে না পারায় দ্রব্যমূল্যে প্রভাব পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে একাধিক সূত্রে জানা যায়, ১৪ এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ফলে সোমবার সকাল থেকেই শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে দক্ষিণাঞ্চল ও ঢাকাগামী যাত্রী এবং যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। শিমুলিয়া থেকে এ চাপ আরও বেশি ছিল। দুপুরের পর ভিড় রূপ নেয় উপচেপড়ায়। শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার ঘাটে আসা প্রতিটি ফেরি ছিল যাত্রী ও যানবাহনে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। যাত্রী চাপে যানবাহন কম নিয়েই পার হতে বাধ্য হয় ফেরিগুলো। লঞ্চ বন্ধ থাকলেও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা স্পিডবোট ও ট্রলারে পারাপার হয় শতশত যাত্রী।

ঘাট এলাকায় এসে মানুষ ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ বিকল্প যানবাহনে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছেন। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে পৌঁছতে ৪ গুণেরও বেশি ভাড়া পড়ে যাচ্ছে। ঢাকা থেকে ৩-৪ গুণ ভাড়া গুনে শিমুলিয়া থেকে স্পিডবোটে যাত্রীপ্রতি ভাড়া নেয়া হচ্ছে ৪শ’-৫শ’ টাকা, ট্রলারে ভাড়া নেয়া হচ্ছে দেড়শ’ টাকা। ঘাটে নেমে ইজিবাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলে বরিশালে ৫শ’-৬শ’ টাকা, গোপালগঞ্জ ৫শ’ টাকা, খুলনা ৭শ’ টাকা, মাদারীপুর ২শ’ টাকা, বাগেরহাট ৬শ’৫০ টাকাসহ প্রতিটি যানবাহনেই কয়েকগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এদিকে উভয় ঘাটেই যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। পণ্যবাহী ট্রাকগুলো উভয় ঘাটে আটকে রয়েছে বেশ কয়েকদিন ধরে।

সপরিবারে ঢাকা থেকে বরিশালগামী ইউসুফ মিয়া বলেন, ঢাকা থেকে ঘাটে পৌঁছাতেই পকেটের টাকা ফুরিয়ে গেল। পরে আবার বিকাশে টাকা এনে বরিশাল রওনা দিচ্ছি। বাসে বরিশাল ভাড়া ১শ’৮০ টাকা সিএনজিতে নিচ্ছে ৫শ’ টাকা। খুলনাগামী রুমা আক্তার বলেন, ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য শুরু হয়েছে। করোনার ভয়তে বাড়ি চলে যাচ্ছি। কাশেম মিয়া নামের তরমুজ ব্যবসায়ী বলেন, ৩ গাড়ি তরমুজ নিয়ে ৩ দিন ধরে ঘাটে আটকা, ঢাকা যাব। ১টা পার হইছে। বাকিগুলো আটকা। তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। এ কেমন আইন! কাঁচামালও আটকে রাখে। এতে জনগণেরও লস, ব্যবসায়ীদেরও লস। অনেক কাঁচামালের গাড়ি আটকা এতে ঢাকায় মালের দাম বেড়ে যাবে।

বিআইডব্লিউটিসির বাংলাবাজার ঘাট ম্যানেজার মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ফেরি চলাচল সীমিত করায় ঘাটে ট্রাকের দীর্ঘ সারি পড়েছে। আর জনগণকে আমরা স্বাস্থ্যবিধি বোঝানোর চেষ্টা করছি।