পয়লা বৈশাখ ঘরে ঘরে উদ্যাপিত হোক

বছর ঘুরে আবার এলো পহেলা বৈশাখ। এ দিনটি বাঙালিরই শুধু নয়- বাংলা ভাষাভাষী আদিবাসী, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন-জগতে স্বপ্নময় নতুন বছরের শুভসূচনা ঘটায়। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৮।

করোনা মহামারি থেকে সহসা মুক্তির প্রত্যাশা নিয়েই বিশ্বের বাঙালি গত বছরের ন্যায় এবারও নতুন বছরকে বরণ করে নেবে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই। ইতোমধ্যে ১৪ এপ্রিল থেকে ‘কঠোর লকডাউনের’ ঘোষণা এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রতিদিন মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে, স্বল্প পরিসরে ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে নববর্ষের অনুষ্ঠান উদ্যাপন করা হবে।

কোথাও উৎসব নেই, হুল্লোড় নেই; নেই ভেঁপু, ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, নাগরদোলার ক্যাচকাচ শব্দ। নেই চিরচেনা বৈশাখী মেলা। নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রা। নেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, যা আমাদের বর্ষবরণ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বিবর্ণ নববর্ষের কথা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। তবুও এটাই বাস্তব। আসলে ঘরের বাইরে না বেরিয়ে নববর্ষ উদযাপন, বাঙালি জীবনে এ যেন কল্পনাই করা যায় না।

প্রকৃত অর্থেই, নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। গ্রামগঞ্জে খোলা মাঠের বিশাল পরিসরে ছোটদের খেলনা, হাতে তৈরি বিভিন্ন মৃৎশিল্পের সামগ্রী, খই, মুড়ি, বাতাসা, জিলাপি, মিষ্টিসহ হরেক রকম খাদ্যসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসে ব্যবসায়ীরা। পাওয়া যায় কাঠ-বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি জিনিসপত্র থেকে শুরু করে প্রসাধনসামগ্রী পর্যন্ত। এ ছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী। দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যের। আর সার্কাস, পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ।

পহেলা বৈশাখের একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র থাকায় এ দিনটির একটি প্রতীকী তাৎপর্যও রয়েছে। আমরা জানি, প্রতিক্রিয়াশীলরা গণতন্ত্র, প্রগতি, বাঙালি সংস্কৃতি- এসবকিছুরই বিরুদ্ধে। দুই দশক আগে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার কথা আমরা ভুলে যাইনি। তেমনি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ধর্মান্ধ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলাম আবার নতুন করে সহিংস তা-ব চালিয়েছে কয়েকটি জেলায়। হেফাজতীদের আক্রমণের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। তারা ধ্বংস করতে চায় বাংলাদেশের মূল বিষয়গুলোকে: বঙ্গবন্ধু, অসাম্প্রদায়িকতা, আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞান, রাষ্ট্র ও সরকার। তারা প্রগতিবিরোধী। তারা বাংলাদেশ বিরোধী। তারা সাম্প্রদায়িক। নববর্ষ উদযাপনের মূল চেতনা এ ধরনের হামলাকারীসহ সব অপশক্তির বিরুদ্ধে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করে, প্রগতির পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চরিত্র আরও বিকশিত করেই অপশক্তিকে রুখতে হবে।

বশিরুল ইসলাম

বুধবার, ১৪ এপ্রিল ২০২১ , ১ বৈশাখ ১৪২৮ ১ রমজান ১৪৪২

পয়লা বৈশাখ ঘরে ঘরে উদ্যাপিত হোক

image

বছর ঘুরে আবার এলো পহেলা বৈশাখ। এ দিনটি বাঙালিরই শুধু নয়- বাংলা ভাষাভাষী আদিবাসী, নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জীবন-জগতে স্বপ্নময় নতুন বছরের শুভসূচনা ঘটায়। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৮।

করোনা মহামারি থেকে সহসা মুক্তির প্রত্যাশা নিয়েই বিশ্বের বাঙালি গত বছরের ন্যায় এবারও নতুন বছরকে বরণ করে নেবে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই। ইতোমধ্যে ১৪ এপ্রিল থেকে ‘কঠোর লকডাউনের’ ঘোষণা এসেছে সরকারের পক্ষ থেকে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রতিদিন মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে, স্বল্প পরিসরে ভার্চুয়ালি বা অনলাইনে নববর্ষের অনুষ্ঠান উদ্যাপন করা হবে।

কোথাও উৎসব নেই, হুল্লোড় নেই; নেই ভেঁপু, ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, নাগরদোলার ক্যাচকাচ শব্দ। নেই চিরচেনা বৈশাখী মেলা। নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে বের করা মঙ্গল শোভাযাত্রা। নেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, যা আমাদের বর্ষবরণ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বিবর্ণ নববর্ষের কথা কেউ দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। তবুও এটাই বাস্তব। আসলে ঘরের বাইরে না বেরিয়ে নববর্ষ উদযাপন, বাঙালি জীবনে এ যেন কল্পনাই করা যায় না।

প্রকৃত অর্থেই, নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। গ্রামগঞ্জে খোলা মাঠের বিশাল পরিসরে ছোটদের খেলনা, হাতে তৈরি বিভিন্ন মৃৎশিল্পের সামগ্রী, খই, মুড়ি, বাতাসা, জিলাপি, মিষ্টিসহ হরেক রকম খাদ্যসামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসে ব্যবসায়ীরা। পাওয়া যায় কাঠ-বাঁশের তৈরি গৃহস্থালি জিনিসপত্র থেকে শুরু করে প্রসাধনসামগ্রী পর্যন্ত। এ ছাড়া রয়েছে হরেক রকমের কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের বাহারি প্রদর্শনী। দেখা মেলে বাংলার ঐতিহ্য মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যের। আর সার্কাস, পুতুলনাচের আসরও এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ।

পহেলা বৈশাখের একটি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র থাকায় এ দিনটির একটি প্রতীকী তাৎপর্যও রয়েছে। আমরা জানি, প্রতিক্রিয়াশীলরা গণতন্ত্র, প্রগতি, বাঙালি সংস্কৃতি- এসবকিছুরই বিরুদ্ধে। দুই দশক আগে রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার কথা আমরা ভুলে যাইনি। তেমনি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপনকে কেন্দ্র করে ধর্মান্ধ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলাম আবার নতুন করে সহিংস তা-ব চালিয়েছে কয়েকটি জেলায়। হেফাজতীদের আক্রমণের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। তারা ধ্বংস করতে চায় বাংলাদেশের মূল বিষয়গুলোকে: বঙ্গবন্ধু, অসাম্প্রদায়িকতা, আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞান, রাষ্ট্র ও সরকার। তারা প্রগতিবিরোধী। তারা বাংলাদেশ বিরোধী। তারা সাম্প্রদায়িক। নববর্ষ উদযাপনের মূল চেতনা এ ধরনের হামলাকারীসহ সব অপশক্তির বিরুদ্ধে। আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করে, প্রগতির পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চরিত্র আরও বিকশিত করেই অপশক্তিকে রুখতে হবে।

বশিরুল ইসলাম