লকডাউনে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখা হয়নি

পোশাক শ্রমিকদের জন্য নেই পরিবহন ব্যবস্থা

সম্প্রতি চলমান লকডাউন আরোপে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি তৌহিদুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘সরকার সর্বাত্মক লকডাউন দিল, কিন্তু সব কারখানা চালু রাখা হলো। পোশাকশিল্পের ৪৫ লাখ শ্রমিককে কারখানায় যেতে হয় কিন্তু পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কারখানায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকরা অনিরাপদ থেকে যাচ্ছেন।’

গতকাল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত ‘কোভিডকালীন শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার : ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপ আয়োজন করে। সংলাপে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তিনি বলেন, ‘সুখী কর্মী সব সময় ভালো কর্মী। একজন শ্রমিক যদি প্রতিদিন তিন-চার মাইল হেঁটে কারখানায় আসেন, আবার একই পথ হেঁটে ঘরে ফেরেন, তাহলে তার কাছে কতটা উৎপাদন আশা করেন? মালিকপক্ষ যদি ন্যূনতম মজুরি দিতে না পারে, তাহলে কী উৎপাদনশীলতা আশা করেন? শ্রমিকদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা মালিকদের খুব কঠিন কাজ নয়।’

অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষায় গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘শুধু কারখানায় নিরাপদ থাকার পাশাপাশি শ্রমিকেরা বাসায় কতটা নিরাপদ, তাও বিবেচনায় আনতে হবে। কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী রাখা, এসব ঠিক রাখতে হবে। এছাড়া শ্রমিকদের আনা-নেয়ার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা উচিত। করোনা সংকটের এই সময় এসব জরুরি। কারখানা ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকের বাসস্থান নিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো কাজ করতে পারে। তবে তার আক্ষেপ, কোভিডকালীন এসব নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। করোনার সময়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারছে না।’

মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন বলেন, ‘যখন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তখন শ্রমিকদের জন্য পরিবহনব্যবস্থা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মালিকপক্ষ তা করেনি। ফলে শ্রমিকেরা সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখেই হেঁটে হেঁটে কারখানায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’

বিলসের উপদেষ্টা নাইমুল আহসান বলেন, ‘কোভিডে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শ্রমিকেরা। সব পক্ষের সামাজিক সংলাপের মাধ্যমে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। সরকারের নানা কর্মসূচি থেকে তারা কী পেয়েছেন, তা জানি না। প্রায় দুই কোটি মানুষ শহর থেকে গ্রামে গিয়েছেন। তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেই।’

বিলসের আরেক উপদেষ্টা আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘গতবার করোনার সময় দুই লাখ পোশাকশ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে দেড় লাখ কাজ ফিরে পেয়েছেন। এখনও ৫০ হাজার পোশাকশ্রমিক বেকার। এমন অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা এসেছে। তাই আগামী ঈদের ১০ দিন আগে বেতন-বোনাস দিতে হবে, করোনার দোহাই দিয়ে বেতন-ভাতা কাটছাঁট করা যাবে না।’

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘করোনা সংকটে শ্রমিকেরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। শ্রমিকদের কাছে প্রণোদনার পর্যাপ্ত অর্থ পৌঁছায়নি। বরাদ্দও পর্যাপ্ত ছিল না। শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে বলার মতো ট্রেড ইউনিয়নও নেই। মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ ইউনিয়নভুক্ত।’

সংলাপের বিশেষ অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আবদুস সালাম বলেন, ‘সব স্টেকহোল্ডার সমস্যাগুলো সমান গুরুত্ব সহকারে শোনা হয় এবং কেন্দ্রীয় তদারকি কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে।’

আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর টুওমো পটিয়াইনন সংলাপে আরেক বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সংগঠিত এবং অসংগঠিত উভয় ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা সরবরাহের আওতায় আনার দিকে সরকারের মনোনিবেশ করা উচিত।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিলসের ভাইস চেয়ারম্যান শিরীন আখতার আবারও সামাজিক সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আরও বেশি শ্রমিকদের সংগঠিত তালিকভুক্ত করতে কাজ করা উচিত।’

রবিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২১ , ৫ বৈশাখ ১৪২৮ ৫ রমজান ১৪৪২

লকডাউনে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখা হয়নি

পোশাক শ্রমিকদের জন্য নেই পরিবহন ব্যবস্থা

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

সম্প্রতি চলমান লকডাউন আরোপে শ্রমিকদের স্বার্থ দেখা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি তৌহিদুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘সরকার সর্বাত্মক লকডাউন দিল, কিন্তু সব কারখানা চালু রাখা হলো। পোশাকশিল্পের ৪৫ লাখ শ্রমিককে কারখানায় যেতে হয় কিন্তু পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়নি। কারখানায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শ্রমিকরা অনিরাপদ থেকে যাচ্ছেন।’

গতকাল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত ‘কোভিডকালীন শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার : ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপ আয়োজন করে। সংলাপে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তিনি বলেন, ‘সুখী কর্মী সব সময় ভালো কর্মী। একজন শ্রমিক যদি প্রতিদিন তিন-চার মাইল হেঁটে কারখানায় আসেন, আবার একই পথ হেঁটে ঘরে ফেরেন, তাহলে তার কাছে কতটা উৎপাদন আশা করেন? মালিকপক্ষ যদি ন্যূনতম মজুরি দিতে না পারে, তাহলে কী উৎপাদনশীলতা আশা করেন? শ্রমিকদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা মালিকদের খুব কঠিন কাজ নয়।’

অনুষ্ঠানে সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষায় গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘শুধু কারখানায় নিরাপদ থাকার পাশাপাশি শ্রমিকেরা বাসায় কতটা নিরাপদ, তাও বিবেচনায় আনতে হবে। কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী রাখা, এসব ঠিক রাখতে হবে। এছাড়া শ্রমিকদের আনা-নেয়ার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করা উচিত। করোনা সংকটের এই সময় এসব জরুরি। কারখানা ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকের বাসস্থান নিয়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো কাজ করতে পারে। তবে তার আক্ষেপ, কোভিডকালীন এসব নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। করোনার সময়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারছে না।’

মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন বলেন, ‘যখন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তখন শ্রমিকদের জন্য পরিবহনব্যবস্থা করার পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মালিকপক্ষ তা করেনি। ফলে শ্রমিকেরা সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখেই হেঁটে হেঁটে কারখানায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’

বিলসের উপদেষ্টা নাইমুল আহসান বলেন, ‘কোভিডে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শ্রমিকেরা। সব পক্ষের সামাজিক সংলাপের মাধ্যমে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। সরকারের নানা কর্মসূচি থেকে তারা কী পেয়েছেন, তা জানি না। প্রায় দুই কোটি মানুষ শহর থেকে গ্রামে গিয়েছেন। তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেই।’

বিলসের আরেক উপদেষ্টা আমিরুল হক আমিন বলেন, ‘গতবার করোনার সময় দুই লাখ পোশাকশ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে দেড় লাখ কাজ ফিরে পেয়েছেন। এখনও ৫০ হাজার পোশাকশ্রমিক বেকার। এমন অবস্থায় করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা এসেছে। তাই আগামী ঈদের ১০ দিন আগে বেতন-বোনাস দিতে হবে, করোনার দোহাই দিয়ে বেতন-ভাতা কাটছাঁট করা যাবে না।’

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘করোনা সংকটে শ্রমিকেরাই সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন। শ্রমিকদের কাছে প্রণোদনার পর্যাপ্ত অর্থ পৌঁছায়নি। বরাদ্দও পর্যাপ্ত ছিল না। শ্রমিকদের স্বার্থ নিয়ে বলার মতো ট্রেড ইউনিয়নও নেই। মোট শ্রমশক্তির মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ ইউনিয়নভুক্ত।’

সংলাপের বিশেষ অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব কেএম আবদুস সালাম বলেন, ‘সব স্টেকহোল্ডার সমস্যাগুলো সমান গুরুত্ব সহকারে শোনা হয় এবং কেন্দ্রীয় তদারকি কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চলছে।’

আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর টুওমো পটিয়াইনন সংলাপে আরেক বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সংগঠিত এবং অসংগঠিত উভয় ক্ষেত্রে শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা সরবরাহের আওতায় আনার দিকে সরকারের মনোনিবেশ করা উচিত।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিলসের ভাইস চেয়ারম্যান শিরীন আখতার আবারও সামাজিক সংলাপের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আরও বেশি শ্রমিকদের সংগঠিত তালিকভুক্ত করতে কাজ করা উচিত।’