শামসুজ্জামান খানের ভাবনায় বাঙালি সংস্কৃতির উদ্যাপন

ওবায়েদ আকাশ

একজন মানুষকে চেনার উপায় তার সৃজনমগ্নতা ও সৃজনবহির্ভূতার ভেতরে থেকে সমানভাবে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের গভীর অনুধ্যান। এ কাজ যেমন সনিষ্ঠ পরিশ্রমের, তেমনি একান্ত সদিচ্ছার। বিশিষ্ট ফোকলোর বিশেষজ্ঞ, বাঙালির স্বকীয়তা সন্ধানী, লেখক ও অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানকে আমাদের বাঙালি সমাজ ঠিক এভাবেই চিনে নিয়েছে। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য, জন্ম, উত্থান এবং সৃজনশীলতার ভিতর থেকে বাঙালি তার একজন পৃষ্ঠপোষককে আবিষ্কার করে গর্বিত হয়েছে। শামসুজ্জামান খানের স্বজাতির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের জন্য যে অধ্যবসায় ও সাধনা তা বৃহৎ পরিসরে আমরা পেয়েছি নানা কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে। এছাড়া সংস্কৃতিশিল্পসাহিত্যনির্ভর কিছু প্রতিষ্ঠানের মেধাবী পরিচালনার ভিতর দিয়েও তিনি তাঁর প্রতিভা প্রকাশ করেছেন। বাংলা একাডেমিতে তিনবার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন, সর্বশেষ সভাপতির দায়িত্ব পালন এবং জাতীয় জাদুঘর ও শিল্পকলা একাডেমির সফল দায়িত্ব পালন তাঁর জীবনের অন্যতম বিবেচ্য দিক। তিনি অনেকটা সরাসরি এবং প্রকাশ্য হয়েই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, সত্যিকারের বাঙালি কারা, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি কী, বাঙালি জাতীয়তাবাদ কী। বাঙালির নানা আন্দোলন-সংগ্রাম, একটি নিজস্ব ভাষার দাবিদার হওয়া থেকে একটি স্বাধীন দেশের জন্মইতিহাস তিনি যেন বিবিধ লেখালেখি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের সামনে নিয়ে এলেন। আবিষ্কার করে নিলেন সত্যিকারের বাঙালি ও তার জন্মবৃত্তান্ত খুঁজে পেতে হলে তার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির দ্বারোন্মোচনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ পথ আর হতে পারে না। বিশিষ্ট লেখক ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার গোপাল হালদারও এ প্রবহমান বঙ্গ সংস্কৃতিকে ‘পল্লী-প্রধান বাঙ্গালি সংস্কৃতি’ বলে অভিহিত করলেন। শামসুজ্জামান খান সেই পল্লীপ্রধান বাঙালি সংস্কৃতির অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করে নিজেও তাঁর নবায়নের ধারাটি লক্ষ্য করলেন। দেখলেন এবং দেখালেন যে, কোনো জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি চর্চা কখনো পুরনো হয় না। তার একটি প্রবহমানতা থাকে। সংস্কৃতি তার নিজস্বতা রক্ষা করেও ধরন বদলায়। সুতরাং আধুনিকতা চর্চার সঙ্গে যে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে তা তিনি বিশ্বাস করতেন না। সময় এবং প্রযুক্তির সাথে জাতি ও জনগোষ্ঠির যাপিত জীবনের স্বভাব পরিবর্তন ঘটে। আচার, কৃষ্টি, উৎসব উদ্যাপনেরও অনেক অনেক পরিববর্তন ঘটে। এই যে লোক-সংস্কৃতি বা ফোকলোরচর্চা, সময়ের নানা পরিবর্তনে তার স্বাভাবিকতা বদলাবে এবং সেই চর্চা তার নিজস্ব ও অনিবার্য বলেই বিবেচিত হবে। এখানেই শামসুজ্জামান খান আরো বেশি বিশিষ্টতার দাবি করতে পারেন যে, তিনি অসাম্প্রদায়িক, উদার, মুক্তমনা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের একজন মানুষ হয়ে শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, যে কোনো ধরনের কুসংস্কার, দীর্ঘদিনের চিরাচরিত ধারণা থেকে বেরিয়ে, তার নিবিষ্ট চিন্তার এলাকাগুলোতে গতির সঞ্চার করেছেন। আজকে যে বাঙালি সংস্কৃতিতে নানামুখী উৎসব-পার্বণ চর্চার শুরু হয়েছে, তার নবরূপায়ন ঘটেছে, এ সম্পর্কে তিনি মুখ খুলেছেন। বাঙালির উৎসব-পার্বণ-ঐতিহ্য চর্চায় এসেছে নানামুখী পরিবর্তন। তিনি হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি বা উৎসব উদযাপনকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি তার ক্রমবিবর্তন ও বর্তমান অবস্থার বাস্তবতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। উৎসব-উদ্যাপনকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। আমাদের একদার অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও আধুনিককালের শিক্ষিত

সংস্কৃতিপ্রেমিকে মানসিক ক্ষুধা নিবৃত্তিতে কলম ধরেছেন। মীমাংসা দিয়েছেন। বাঙালির মধ্যে তাদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের আকাক্সক্ষা, নিজেকে আবিষ্কারের যে নেশা ও সেখান থেকে নিজেকে ফিরে পাওয়া- এটিই সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে এই সংস্কৃতিবোদ্ধা অধ্যাপককে।

শামসুজ্জামান খানের বাবা এমআর খান কলকাতার সরকারি বাড়িতে অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁর দাদার দাদা এলহাদাদ খান এবং তার ভাই আদালাত খান ঔপনিবেশিক ভারতে অত্যন্ত প্রশংসিত নামী বুদ্ধিজীবী ছিলেন। শামসুজ্জামান খানের বাবা এবং তিনি নিজেও বড় বড় রাজনীতিক ও লেখক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে বন্ধুতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পারিবারিক কারণেই তাঁর মধ্যে পড়াশোনা ও লেখালেখির আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথম জীবনে সাম্যবাদী রাজনীতির আদর্শে নিজেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন এবং পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এবং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখালেখি শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি রাজনীতি ছেড়ে ফোকলোর গবেষণা, বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে কাজ করেন। বাঙালির উৎসব-উদযাপন, সংস্কৃতিচর্চা, আচার-ঐহিত্য নিয়ে কাজে মগ্ন হন। বাঙালির উৎসব-পার্বণ সম্পর্কে তাঁর রচিত “বাঙালির ঐতিহাসিক উৎসবের নবায়ন” নামের এক প্রবন্ধের অংশ বিশেষের কথা মনে করতে পারি:

“বাংলাদেশকে বলা হয় ‘বারো মাসে তেরো পার্বণে’র দেশ। এ থেকে এ কথা কিন্তু বোঝায় না যে বাংলাদেশে উৎসব-অনুষ্ঠান লেগেই আছে। তা নয় মোটেই। কারণ উৎসব আর পার্বণের মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। ‘উৎসব’ মূলত সার্বজনীন- অর্থাৎ সকলে মিলে উদ্যাপন করার একটি বিষয়। সে দিক থেকে দেখলে উৎসব চরিত্রগতভাবে সেক্যুলার (ঝধপঁষধৎ)। উৎসবে ধর্ম-সম্পৃক্ততা নেই এমন নয়- তবে তার দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য। এক. ধর্মীয় উৎসব হলে তাতে ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি বা করণক্রিয়া থাকতেই পারে। যেমন মুসলিম-বাঙালির ঈদ উৎসব আবার সর্বজনীন (Universal)। এতে ধর্মীয় করণক্রিয়াটুকু (Rituals) কেন্দ্রীয় (Central) বিষয়, কিন্তু এর আনুষঙ্গিকতাও (Periphery) আছে। এবং মজার ব্যাপার বৃহৎ উৎসবে সামাজিক ও আন্তঃধর্ম সম্প্রদায়গত অংশগ্রহণগত চাপও এতটা বৃদ্ধি পায় যে উৎসবে কেন্দ্রীয় বিষয় আর মুখ্য ও আধিপত্যবাদী অবস্থানে থাকে না। ঢাকার বাঙালি মুসলমানের ঈদোৎসব এবং কলকাতার বাঙালি হিন্দুর সার্বজনীন দুর্গাপূজায় এমনটি যে ঘটে গেছে, সাম্প্রতিককালের ইতিহাস তার সাক্ষী। এজন্য পার্বণ কিন্তু মূলতই ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা করণক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে সাধারণ সামাজিক বা আন্তঃসম্প্রদায়গত কোনও সম্পৃক্তির চাপ থাকে না। পার্বণ ছোট, সীমাবদ্ধ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ।... কিন্তু কোনও কোনও উৎসবের ভেতরগত অন্তঃসারের মধ্যে সামাজিক সংহতি বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমবেতভাবে উদ্যাপনের উপাদান থাকায় তার বিপুল বিস্তার এবং গুণমানগত উন্নয়ন ঘটেছে। এর নানা রকম চমৎকারিত্ব, শক্তিমত্তা ও সামাজিক সংহতির উদাহরণ পেশ করা যায়।”

এ প্রবন্ধে তিনি উৎসব-পার্বণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, আবার কোনটি ধর্মীয় এবং কোনটি অসাম্প্রদায়িক সেটাও বর্ণনা করেছেন। পার্বণ যে ধর্মভিত্তিক এবং উৎসব যে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার ও বিস্তৃত পরিসরের তার এ বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়েছে। তবে বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংস্কৃতি হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃস্টান মিলে একত্রে উৎসবে মেতে ওঠার ঐহিত্য রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একই কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ উৎসব এবং হিন্দুদের দুর্গাপূজাতে সমন্বিত আনন্দ উদ্যাপনের ব্যাপারটিও লক্ষ্যণীয়। তবে আমাদের যে পহেলা বৈশাখ বা নবান্ন উৎসব তাতে কোনো সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় না। এ উৎসব শুধুই বাঙালির। আলোচ্য প্রবন্ধে তিনি বাঙালির ঐতিহাসিক উৎসবের যে নবায়ন হয়েছে- সে কথা ব্যাখ্যা করেছেন। প্রাচীন কৃষি সমাজে যে রীতিতে চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হতো, এখন তার পরিবর্তন ঘটেছে। রমনার বটমূলে বা চারুকলার দেয়ালচিত্র, সড়কচিত্রে উৎসবে এসেছে বিপুল বৈচিত্র্য। এটি এ উৎসবের নবায়ন, কিন্তু বিলুপ্তি ঘটেছে পুরনো পদ্ধতির:

“চারুকলা অনুষ্ঠানের মঙ্গল শোভাযাত্রায় এর অন্তঃসারকে (Essence) গ্রহণ করা হয়েছে এবং জাদুবিশ্বাসজাত এ অনুষ্ঠানকে এখন সামাজিক শ্রেয়োচেতনা এবং অমঙ্গলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শক্তিকে মিছিলের দ্রোহচেতনা এবং পূর্বকালের লোক ও জাদুবিশ্বাসজাত অমঙ্গলের প্রতীক প্রাণীর প্রতিকৃতি এবং মুখোশের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তা সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক উপাদানকে উদ্ভাবনাময় এবং সমাজ ও রাজনীতি ক্ষেত্রের অপশক্তিকে চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় সদাসতর্ক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অসাধারণ।”

আবার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমানদের ঈদ উৎসব উদ্যাপনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক তিনি উত্থাপন করেছেন “ঈদ-উৎসব ও সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণি” নামের অন্য একটি প্রবন্ধে। ঈদ উৎসব যে শুধু উৎসব ছাড়িয়ে ব্যবসাবাণিজ্য এবং খাওয়াদাওয়া, বাহারি পোশাকপরিচ্ছদে গড়িয়েছে এ দিকটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেছেন। তুলে ধরেছেন বাস্তবতা। এটাও যে উৎসব উদ্যাপনের তুমুল নবায়ন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে উন্মোচিত হয়েছে উৎসবের বহুমাত্রিকতা কিংবা প্রাচীর ভাঙার নান্দনিকতাও:

“ঈদ-উৎসব এখন আর শুধু উৎসব নয়, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও এটি একটি সুফলদায়ক বিষয়। এ দেশে এখন সারা বছর যতো না ব্যবসা হয়, ঈদের সময় তার কয়েকগুণ বেশি হয়। খাবার-দাবারের সামগ্রী থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি বিনোদনের জগতেও বিরাট বাণিজ্যের সুযোগ করে দেয় এই উৎসবটা। চ্যানেলে চ্যানেলে আজ যে এতো আয়োজনের পসরা- তার কারণ এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর উৎসব-উদযাপনের ব্যাপকতা।”

কিন্তু আমরা যতোই আধুনিক হই, যতোই তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করি না কেন, আমাদের উৎসব আয়োজন যে এখনো পাশ্চাত্যের রূপ পায়নি, তা খুব স্পষ্ট করেই বলা যায়। কারণ পাশ্চাত্যবাসী যে যেখান থেকে এসে বসতী গেড়েছে, সে সেখানে তার সব কিছুর প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কিংবা আদিবাসীরা তাদের স্ব স্ব ভৌগোলিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। সেখানকার রীতিতে নিবিষ্টতা খুঁজেছে। কিন্তু আমাদের এখানে শিল্প-বিপ্লব বা পুঁজির বিকাশ হয়নি; ভূমি সংস্কার হয়নি বলে বাঙালি যতোই শহরবাসী বা নগরকেন্দ্রিক হোক, তাদের আদি শেকড় যে এখনো গ্রামেই প্রোথিত তা কোনো উৎসব-আয়োজনে যথার্থই সপ্রতিভ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঈদের সময়ের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বছরের দুইটি ঈদ যখন আসে তখন বাঙালিকে আর শহরে বেঁধে রাখা যায় না; হাজারো কষ্ট সহ্য করে তারা গ্রামে ফিরে যাবেই। এ সম্পর্কে একই প্রবন্ধে শামসুজ্জামান খান বলেন-

“লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের ঈদ-উৎসবের এই ধরনটা পাশ্চাত্যের উন্নত কিছু দেশের উৎসবের চেয়ে ভিন্ন। ওখানে যোড়শ শতকেই পুঁজির বিরাট বিকাশ ঘটেছে। শিল্প-বিপ্লব হয়েছে। বিরাট সব কলকারখানা গড়ে উঠেছে। এর ফলে ওখানে মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে বিরাট একটা বিপ্লব বা রেনেসাঁও সাধিত হয়েছে। এর ফলে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া মানুষগুলো শহরেই থেকে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার শেকড় থেকে। এভাবেই সেখানে নাগরিক-আধুনিকতার বিকাশ ঘটেছে। উৎসব-উদযাপনও তাই সেখানে শহরভিত্তিক। আমাদের এখানে শিল্প-বিপ্লব বা পুঁজির বিকাশ হয়নি। গত কয়েক বছরে নানা কারণে বরং কৃষি-বিপ্লব সাধিত হয়েছে। কিন্তু ভূমি-সংস্কার হয়নি বলে পাশ্চাত্যের নাগরিক-আধুনিকতাও এখানে নেই। তাই এখানে অনিবার্যভাবেই উৎসব-উদযাপনের জন্য মানুষ গ্রামেই ফিরে যায়। আর নতুন বিকশিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই উৎসবগুলোকে নিজেদের রঙে রাঙিয়ে দেয়।”

এর বাইরে আমাদের বিভিন্ন জাতীয় দিবস, বইমেলা কিংবা বাঙালিত্বের চেতনাধারী কিংবা জাতীয় উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিবসেও বাঙালি উৎসবে মেতে ওঠে। প্রতিটি বাঙালিই রাজনীতি সচেতন। সে তার অধিকার প্রয়োগে সদা উদ্গ্রীব। সবচেয়ে বড় বিষয়, আমাদের ওপর বিভিন্ন স্বৈরশাসক তাদের ক্ষমতার দম্ভ চাপিয়েছে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে অন্যান্য সম্প্রদায়কে অপমানিত করেছে; কিন্তু তাতে বাঙালি তাদের অসাম্প্রদায়িক উৎসব পালনে বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি। যেমন একদা বাঙালিকে রুখতে পারেনি পাকিস্তানের রক্তচক্ষুও। বাঙালি ছিনিয়ে এনেছে তার সাফল্য কিংবা সফলতা। শামসুজ্জামান খানেরও এ সম্পর্কিত বক্তব্য স্পষ্ট:

“বাংলাদেশের বাঙালি একুশে ফেব্রুয়ারির জাতীয় শোক দিবসকেও যথাযোগ্য মাত্রা ও তাৎপর্যে তাদের নবজাগৃতির স্মারক উৎসবে পরিণত করেছে। এর মধ্য দিয়ে তার বাঙালিত্বের চেতনা যেমন তীক্ষèতা পায় তেমনি এই উৎসবের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইহজাগতিকতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সাফল্য-ব্যর্থতারও যেন একটা পরিমাপ করা হয়, বইমেলা ও তার জন্য প্রকাশিত অসংখ্য গ্রন্থের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বাঙালির নিজেদের নির্মাণ করে নেবার প্রয়াস সমকালীন ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় ঘটনা। এই বিষয়গুলো সমাজবিজ্ঞানীদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে। এই বাঙালির শত সহস্র বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শেকড় স্বদেশের মাটির গভীরে প্রোথিত হলেও আর্থিক বা সামাজিক কৌলিন্য তেমন না থাকায় এই অর্জনকে চমকপ্রদই বলতে হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী স্বৈরশাসকেরা বাংলাদেশ, জাতীয়তাবাদ বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেও তাই বাঙালির নিজস্ব বা আত্মনির্মাণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। প্রবল প্রতাপশালী জিন্নাহর উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্র ভাষার হুংকার, আর ছোট ডিকটেটরদের রাষ্ট্রধর্ম এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে’র নোশখা বাংলাদেশের বাঙালি গ্রহণ করেনি। এখানেই এ বাঙালি পুরাণের চাঁদ সদাগর, সাহিত্যের হানিফ, বা তোরাপ এবং বাস্তবের শেখ মুজিব। উৎসবের অন্তর্নিহিত অর্থ মানুষের মানুষের মিলন, আনন্দের আয়োজনে সমবেত হওয়া, অসূয়া ও বিদ্বেষকে ঝেড়ে ফেলে মৌল মানবিক স্বার্থে সম্প্রীতি গড়ে তোলা। এতেই উৎসবের সাফল্য ও সার্থকতা।”

বাঙালির উৎসব উৎযাপন, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-পার্বণ সম্পর্কে আমাদের পূর্বসূরি শ্রদ্ধেয় লোকগবেষকগণ নানা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন; কিন্তু শামসুজ্জামান খান সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি-আসক্ত মানসের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের লোক সংস্কৃতি বা ফোকলোরচর্চার যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, তা স্বভাবতই অগ্রসর ও সুদূর প্রসারি চিন্তার সমন্বয় ও নবায়ন, সন্দেহ নেই।

image

শামসুজ্জামান খান / জন্ম : ২৯ ডিসেম্বর ১৯৪০; মৃত্যু : ১৪ এপ্রিল ২০২১

আরও খবর
এক খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তক
ফোকলোরচর্চার সেকাল ও একাল
শিকিবু
মুরাকামির কল্পধাম
পত্রপাঠ
সাময়িকী কবিতা

বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১ , ৯ বৈশাখ ১৪২৮ ৯ রমজান ১৪৪২

শামসুজ্জামান খানের ভাবনায় বাঙালি সংস্কৃতির উদ্যাপন

ওবায়েদ আকাশ

image

শামসুজ্জামান খান / জন্ম : ২৯ ডিসেম্বর ১৯৪০; মৃত্যু : ১৪ এপ্রিল ২০২১

একজন মানুষকে চেনার উপায় তার সৃজনমগ্নতা ও সৃজনবহির্ভূতার ভেতরে থেকে সমানভাবে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের গভীর অনুধ্যান। এ কাজ যেমন সনিষ্ঠ পরিশ্রমের, তেমনি একান্ত সদিচ্ছার। বিশিষ্ট ফোকলোর বিশেষজ্ঞ, বাঙালির স্বকীয়তা সন্ধানী, লেখক ও অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানকে আমাদের বাঙালি সমাজ ঠিক এভাবেই চিনে নিয়েছে। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য, জন্ম, উত্থান এবং সৃজনশীলতার ভিতর থেকে বাঙালি তার একজন পৃষ্ঠপোষককে আবিষ্কার করে গর্বিত হয়েছে। শামসুজ্জামান খানের স্বজাতির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের জন্য যে অধ্যবসায় ও সাধনা তা বৃহৎ পরিসরে আমরা পেয়েছি নানা কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীলতার ভেতর দিয়ে। এছাড়া সংস্কৃতিশিল্পসাহিত্যনির্ভর কিছু প্রতিষ্ঠানের মেধাবী পরিচালনার ভিতর দিয়েও তিনি তাঁর প্রতিভা প্রকাশ করেছেন। বাংলা একাডেমিতে তিনবার মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন, সর্বশেষ সভাপতির দায়িত্ব পালন এবং জাতীয় জাদুঘর ও শিল্পকলা একাডেমির সফল দায়িত্ব পালন তাঁর জীবনের অন্যতম বিবেচ্য দিক। তিনি অনেকটা সরাসরি এবং প্রকাশ্য হয়েই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, সত্যিকারের বাঙালি কারা, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি কী, বাঙালি জাতীয়তাবাদ কী। বাঙালির নানা আন্দোলন-সংগ্রাম, একটি নিজস্ব ভাষার দাবিদার হওয়া থেকে একটি স্বাধীন দেশের জন্মইতিহাস তিনি যেন বিবিধ লেখালেখি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের সামনে নিয়ে এলেন। আবিষ্কার করে নিলেন সত্যিকারের বাঙালি ও তার জন্মবৃত্তান্ত খুঁজে পেতে হলে তার হাজার বছরের লোকসংস্কৃতির দ্বারোন্মোচনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ পথ আর হতে পারে না। বিশিষ্ট লেখক ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার গোপাল হালদারও এ প্রবহমান বঙ্গ সংস্কৃতিকে ‘পল্লী-প্রধান বাঙ্গালি সংস্কৃতি’ বলে অভিহিত করলেন। শামসুজ্জামান খান সেই পল্লীপ্রধান বাঙালি সংস্কৃতির অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করে নিজেও তাঁর নবায়নের ধারাটি লক্ষ্য করলেন। দেখলেন এবং দেখালেন যে, কোনো জাতির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি চর্চা কখনো পুরনো হয় না। তার একটি প্রবহমানতা থাকে। সংস্কৃতি তার নিজস্বতা রক্ষা করেও ধরন বদলায়। সুতরাং আধুনিকতা চর্চার সঙ্গে যে বাঙালি সংস্কৃতিচর্চার বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে তা তিনি বিশ্বাস করতেন না। সময় এবং প্রযুক্তির সাথে জাতি ও জনগোষ্ঠির যাপিত জীবনের স্বভাব পরিবর্তন ঘটে। আচার, কৃষ্টি, উৎসব উদ্যাপনেরও অনেক অনেক পরিববর্তন ঘটে। এই যে লোক-সংস্কৃতি বা ফোকলোরচর্চা, সময়ের নানা পরিবর্তনে তার স্বাভাবিকতা বদলাবে এবং সেই চর্চা তার নিজস্ব ও অনিবার্য বলেই বিবেচিত হবে। এখানেই শামসুজ্জামান খান আরো বেশি বিশিষ্টতার দাবি করতে পারেন যে, তিনি অসাম্প্রদায়িক, উদার, মুক্তমনা, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষের একজন মানুষ হয়ে শুধু ব্যক্তিজীবনে নয়, যে কোনো ধরনের কুসংস্কার, দীর্ঘদিনের চিরাচরিত ধারণা থেকে বেরিয়ে, তার নিবিষ্ট চিন্তার এলাকাগুলোতে গতির সঞ্চার করেছেন। আজকে যে বাঙালি সংস্কৃতিতে নানামুখী উৎসব-পার্বণ চর্চার শুরু হয়েছে, তার নবরূপায়ন ঘটেছে, এ সম্পর্কে তিনি মুখ খুলেছেন। বাঙালির উৎসব-পার্বণ-ঐতিহ্য চর্চায় এসেছে নানামুখী পরিবর্তন। তিনি হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি বা উৎসব উদযাপনকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছেন, তেমনি তার ক্রমবিবর্তন ও বর্তমান অবস্থার বাস্তবতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। উৎসব-উদ্যাপনকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। আমাদের একদার অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও আধুনিককালের শিক্ষিত

সংস্কৃতিপ্রেমিকে মানসিক ক্ষুধা নিবৃত্তিতে কলম ধরেছেন। মীমাংসা দিয়েছেন। বাঙালির মধ্যে তাদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের আকাক্সক্ষা, নিজেকে আবিষ্কারের যে নেশা ও সেখান থেকে নিজেকে ফিরে পাওয়া- এটিই সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে এই সংস্কৃতিবোদ্ধা অধ্যাপককে।

শামসুজ্জামান খানের বাবা এমআর খান কলকাতার সরকারি বাড়িতে অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁর দাদার দাদা এলহাদাদ খান এবং তার ভাই আদালাত খান ঔপনিবেশিক ভারতে অত্যন্ত প্রশংসিত নামী বুদ্ধিজীবী ছিলেন। শামসুজ্জামান খানের বাবা এবং তিনি নিজেও বড় বড় রাজনীতিক ও লেখক বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে বন্ধুতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। পারিবারিক কারণেই তাঁর মধ্যে পড়াশোনা ও লেখালেখির আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথম জীবনে সাম্যবাদী রাজনীতির আদর্শে নিজেকে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করেন এবং পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। এবং সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লেখালেখি শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি রাজনীতি ছেড়ে ফোকলোর গবেষণা, বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে কাজ করেন। বাঙালির উৎসব-উদযাপন, সংস্কৃতিচর্চা, আচার-ঐহিত্য নিয়ে কাজে মগ্ন হন। বাঙালির উৎসব-পার্বণ সম্পর্কে তাঁর রচিত “বাঙালির ঐতিহাসিক উৎসবের নবায়ন” নামের এক প্রবন্ধের অংশ বিশেষের কথা মনে করতে পারি:

“বাংলাদেশকে বলা হয় ‘বারো মাসে তেরো পার্বণে’র দেশ। এ থেকে এ কথা কিন্তু বোঝায় না যে বাংলাদেশে উৎসব-অনুষ্ঠান লেগেই আছে। তা নয় মোটেই। কারণ উৎসব আর পার্বণের মধ্যে মূলগত পার্থক্য আছে। ‘উৎসব’ মূলত সার্বজনীন- অর্থাৎ সকলে মিলে উদ্যাপন করার একটি বিষয়। সে দিক থেকে দেখলে উৎসব চরিত্রগতভাবে সেক্যুলার (ঝধপঁষধৎ)। উৎসবে ধর্ম-সম্পৃক্ততা নেই এমন নয়- তবে তার দুই ধরনের বৈশিষ্ট্য। এক. ধর্মীয় উৎসব হলে তাতে ধর্মীয় আচার ও রীতিনীতি বা করণক্রিয়া থাকতেই পারে। যেমন মুসলিম-বাঙালির ঈদ উৎসব আবার সর্বজনীন (Universal)। এতে ধর্মীয় করণক্রিয়াটুকু (Rituals) কেন্দ্রীয় (Central) বিষয়, কিন্তু এর আনুষঙ্গিকতাও (Periphery) আছে। এবং মজার ব্যাপার বৃহৎ উৎসবে সামাজিক ও আন্তঃধর্ম সম্প্রদায়গত অংশগ্রহণগত চাপও এতটা বৃদ্ধি পায় যে উৎসবে কেন্দ্রীয় বিষয় আর মুখ্য ও আধিপত্যবাদী অবস্থানে থাকে না। ঢাকার বাঙালি মুসলমানের ঈদোৎসব এবং কলকাতার বাঙালি হিন্দুর সার্বজনীন দুর্গাপূজায় এমনটি যে ঘটে গেছে, সাম্প্রতিককালের ইতিহাস তার সাক্ষী। এজন্য পার্বণ কিন্তু মূলতই ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা করণক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে সাধারণ সামাজিক বা আন্তঃসম্প্রদায়গত কোনও সম্পৃক্তির চাপ থাকে না। পার্বণ ছোট, সীমাবদ্ধ ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ।... কিন্তু কোনও কোনও উৎসবের ভেতরগত অন্তঃসারের মধ্যে সামাজিক সংহতি বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমবেতভাবে উদ্যাপনের উপাদান থাকায় তার বিপুল বিস্তার এবং গুণমানগত উন্নয়ন ঘটেছে। এর নানা রকম চমৎকারিত্ব, শক্তিমত্তা ও সামাজিক সংহতির উদাহরণ পেশ করা যায়।”

এ প্রবন্ধে তিনি উৎসব-পার্বণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, আবার কোনটি ধর্মীয় এবং কোনটি অসাম্প্রদায়িক সেটাও বর্ণনা করেছেন। পার্বণ যে ধর্মভিত্তিক এবং উৎসব যে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার ও বিস্তৃত পরিসরের তার এ বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়েছে। তবে বাঙালির যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংস্কৃতি হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খৃস্টান মিলে একত্রে উৎসবে মেতে ওঠার ঐহিত্য রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একই কারণে মুসলিম সম্প্রদায়ের ঈদ উৎসব এবং হিন্দুদের দুর্গাপূজাতে সমন্বিত আনন্দ উদ্যাপনের ব্যাপারটিও লক্ষ্যণীয়। তবে আমাদের যে পহেলা বৈশাখ বা নবান্ন উৎসব তাতে কোনো সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় না। এ উৎসব শুধুই বাঙালির। আলোচ্য প্রবন্ধে তিনি বাঙালির ঐতিহাসিক উৎসবের যে নবায়ন হয়েছে- সে কথা ব্যাখ্যা করেছেন। প্রাচীন কৃষি সমাজে যে রীতিতে চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ উদ্যাপিত হতো, এখন তার পরিবর্তন ঘটেছে। রমনার বটমূলে বা চারুকলার দেয়ালচিত্র, সড়কচিত্রে উৎসবে এসেছে বিপুল বৈচিত্র্য। এটি এ উৎসবের নবায়ন, কিন্তু বিলুপ্তি ঘটেছে পুরনো পদ্ধতির:

“চারুকলা অনুষ্ঠানের মঙ্গল শোভাযাত্রায় এর অন্তঃসারকে (Essence) গ্রহণ করা হয়েছে এবং জাদুবিশ্বাসজাত এ অনুষ্ঠানকে এখন সামাজিক শ্রেয়োচেতনা এবং অমঙ্গলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শক্তিকে মিছিলের দ্রোহচেতনা এবং পূর্বকালের লোক ও জাদুবিশ্বাসজাত অমঙ্গলের প্রতীক প্রাণীর প্রতিকৃতি এবং মুখোশের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তা সংস্কৃতির ঐতিহ্যিক উপাদানকে উদ্ভাবনাময় এবং সমাজ ও রাজনীতি ক্ষেত্রের অপশক্তিকে চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় সদাসতর্ক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিচ্ছে। এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অসাধারণ।”

আবার বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলমানদের ঈদ উৎসব উদ্যাপনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক তিনি উত্থাপন করেছেন “ঈদ-উৎসব ও সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণি” নামের অন্য একটি প্রবন্ধে। ঈদ উৎসব যে শুধু উৎসব ছাড়িয়ে ব্যবসাবাণিজ্য এবং খাওয়াদাওয়া, বাহারি পোশাকপরিচ্ছদে গড়িয়েছে এ দিকটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করেছেন। তুলে ধরেছেন বাস্তবতা। এটাও যে উৎসব উদ্যাপনের তুমুল নবায়ন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে উন্মোচিত হয়েছে উৎসবের বহুমাত্রিকতা কিংবা প্রাচীর ভাঙার নান্দনিকতাও:

“ঈদ-উৎসব এখন আর শুধু উৎসব নয়, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও এটি একটি সুফলদায়ক বিষয়। এ দেশে এখন সারা বছর যতো না ব্যবসা হয়, ঈদের সময় তার কয়েকগুণ বেশি হয়। খাবার-দাবারের সামগ্রী থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি বিনোদনের জগতেও বিরাট বাণিজ্যের সুযোগ করে দেয় এই উৎসবটা। চ্যানেলে চ্যানেলে আজ যে এতো আয়োজনের পসরা- তার কারণ এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর উৎসব-উদযাপনের ব্যাপকতা।”

কিন্তু আমরা যতোই আধুনিক হই, যতোই তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করি না কেন, আমাদের উৎসব আয়োজন যে এখনো পাশ্চাত্যের রূপ পায়নি, তা খুব স্পষ্ট করেই বলা যায়। কারণ পাশ্চাত্যবাসী যে যেখান থেকে এসে বসতী গেড়েছে, সে সেখানে তার সব কিছুর প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কিংবা আদিবাসীরা তাদের স্ব স্ব ভৌগোলিকতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। সেখানকার রীতিতে নিবিষ্টতা খুঁজেছে। কিন্তু আমাদের এখানে শিল্প-বিপ্লব বা পুঁজির বিকাশ হয়নি; ভূমি সংস্কার হয়নি বলে বাঙালি যতোই শহরবাসী বা নগরকেন্দ্রিক হোক, তাদের আদি শেকড় যে এখনো গ্রামেই প্রোথিত তা কোনো উৎসব-আয়োজনে যথার্থই সপ্রতিভ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ঈদের সময়ের কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বছরের দুইটি ঈদ যখন আসে তখন বাঙালিকে আর শহরে বেঁধে রাখা যায় না; হাজারো কষ্ট সহ্য করে তারা গ্রামে ফিরে যাবেই। এ সম্পর্কে একই প্রবন্ধে শামসুজ্জামান খান বলেন-

“লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের ঈদ-উৎসবের এই ধরনটা পাশ্চাত্যের উন্নত কিছু দেশের উৎসবের চেয়ে ভিন্ন। ওখানে যোড়শ শতকেই পুঁজির বিরাট বিকাশ ঘটেছে। শিল্প-বিপ্লব হয়েছে। বিরাট সব কলকারখানা গড়ে উঠেছে। এর ফলে ওখানে মানুষের চিন্তা-চেতনার জগতে বিরাট একটা বিপ্লব বা রেনেসাঁও সাধিত হয়েছে। এর ফলে গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া মানুষগুলো শহরেই থেকে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে তার শেকড় থেকে। এভাবেই সেখানে নাগরিক-আধুনিকতার বিকাশ ঘটেছে। উৎসব-উদযাপনও তাই সেখানে শহরভিত্তিক। আমাদের এখানে শিল্প-বিপ্লব বা পুঁজির বিকাশ হয়নি। গত কয়েক বছরে নানা কারণে বরং কৃষি-বিপ্লব সাধিত হয়েছে। কিন্তু ভূমি-সংস্কার হয়নি বলে পাশ্চাত্যের নাগরিক-আধুনিকতাও এখানে নেই। তাই এখানে অনিবার্যভাবেই উৎসব-উদযাপনের জন্য মানুষ গ্রামেই ফিরে যায়। আর নতুন বিকশিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই উৎসবগুলোকে নিজেদের রঙে রাঙিয়ে দেয়।”

এর বাইরে আমাদের বিভিন্ন জাতীয় দিবস, বইমেলা কিংবা বাঙালিত্বের চেতনাধারী কিংবা জাতীয় উন্নয়নসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দিবসেও বাঙালি উৎসবে মেতে ওঠে। প্রতিটি বাঙালিই রাজনীতি সচেতন। সে তার অধিকার প্রয়োগে সদা উদ্গ্রীব। সবচেয়ে বড় বিষয়, আমাদের ওপর বিভিন্ন স্বৈরশাসক তাদের ক্ষমতার দম্ভ চাপিয়েছে, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে অন্যান্য সম্প্রদায়কে অপমানিত করেছে; কিন্তু তাতে বাঙালি তাদের অসাম্প্রদায়িক উৎসব পালনে বিন্দুমাত্র পিছপা হয়নি। যেমন একদা বাঙালিকে রুখতে পারেনি পাকিস্তানের রক্তচক্ষুও। বাঙালি ছিনিয়ে এনেছে তার সাফল্য কিংবা সফলতা। শামসুজ্জামান খানেরও এ সম্পর্কিত বক্তব্য স্পষ্ট:

“বাংলাদেশের বাঙালি একুশে ফেব্রুয়ারির জাতীয় শোক দিবসকেও যথাযোগ্য মাত্রা ও তাৎপর্যে তাদের নবজাগৃতির স্মারক উৎসবে পরিণত করেছে। এর মধ্য দিয়ে তার বাঙালিত্বের চেতনা যেমন তীক্ষèতা পায় তেমনি এই উৎসবের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইহজাগতিকতা এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে সাফল্য-ব্যর্থতারও যেন একটা পরিমাপ করা হয়, বইমেলা ও তার জন্য প্রকাশিত অসংখ্য গ্রন্থের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বাঙালির নিজেদের নির্মাণ করে নেবার প্রয়াস সমকালীন ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় ঘটনা। এই বিষয়গুলো সমাজবিজ্ঞানীদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে। এই বাঙালির শত সহস্র বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শেকড় স্বদেশের মাটির গভীরে প্রোথিত হলেও আর্থিক বা সামাজিক কৌলিন্য তেমন না থাকায় এই অর্জনকে চমকপ্রদই বলতে হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী স্বৈরশাসকেরা বাংলাদেশ, জাতীয়তাবাদ বা রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেও তাই বাঙালির নিজস্ব বা আত্মনির্মাণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। প্রবল প্রতাপশালী জিন্নাহর উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্র ভাষার হুংকার, আর ছোট ডিকটেটরদের রাষ্ট্রধর্ম এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে’র নোশখা বাংলাদেশের বাঙালি গ্রহণ করেনি। এখানেই এ বাঙালি পুরাণের চাঁদ সদাগর, সাহিত্যের হানিফ, বা তোরাপ এবং বাস্তবের শেখ মুজিব। উৎসবের অন্তর্নিহিত অর্থ মানুষের মানুষের মিলন, আনন্দের আয়োজনে সমবেত হওয়া, অসূয়া ও বিদ্বেষকে ঝেড়ে ফেলে মৌল মানবিক স্বার্থে সম্প্রীতি গড়ে তোলা। এতেই উৎসবের সাফল্য ও সার্থকতা।”

বাঙালির উৎসব উৎযাপন, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-পার্বণ সম্পর্কে আমাদের পূর্বসূরি শ্রদ্ধেয় লোকগবেষকগণ নানা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেছেন; কিন্তু শামসুজ্জামান খান সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি-আসক্ত মানসের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের লোক সংস্কৃতি বা ফোকলোরচর্চার যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, তা স্বভাবতই অগ্রসর ও সুদূর প্রসারি চিন্তার সমন্বয় ও নবায়ন, সন্দেহ নেই।