সাময়িকী কবিতা

ঐহিক

সোনালী ঘোষ

বিশ্বাস ভেঙে গেলে শিশু হয়ে উঠি

শরীরে নদী আসে

আর ঝপাৎ করে কেউ মাছ ধরতে নামে...

উপেক্ষা করি তাকে,

ছলছল করে ওঠা হৃদয়টির কাছে

কে যেন রেখে গেছে রুপলি

নূপুর, ধার দেই রোজ

নির্জন দৃশ্যের পাশে

একটি ছায়া ছিপ হাতে, অনবরত সে জল থেকে

শূন্যতা তুলে আনছে... সে এক আশ্চর্য দৃশ্য।

এসব ঘোরের মধ্যে চলে অপাপবিদ্ধ কিছু খেলা।

হৃদয়লতা

মাসুদুল হক

মেয়েটার পাখির মতো স্বভাব;

বিচিত্র সব ফুল-ফল খুঁজে বেড়ায়

একদিন দুপুরে মেয়েটার পেছনে আমরা ছায়া হয়ে যাই...

দুপুরটা শীতল রোদের পেটে

ঘুমিয়ে থাকে রাণীদের পদ্মপুকুরে

আমরা হৃদয়লতায় ফুলের মতো

ছায়া হয়ে নড়তে থাকি ভর দুপুরে

মেয়েটা আমাদের হৃদয় টিপে টিপে

বেলুনের মতো ফুটাতে থাকে...

সাজেক ভ্যালির মেঘ

হাসান কল্লোল

আমাদের শরীরে জমেছে শ্যাওলা; আমাদের

দেয়ালের চেয়েও ঘণীভূত আগাছা।

শ্যাওলা খুঁটে খুঁটে প্রজন্ম তাদের বার্গারে

লেটুস পাতার সাথে মিশিয়ে খাচ্ছে

প্রপিতামহের দালানের ঐতিহ্য,

চেটে নিচ্ছে পলেস্তারায় জমা পেজো মেঘ।

মেঘ হলে আমাদের দাদী-নানী উঠোন থেকে

সব কাপড়চোপড়, সব বিছানো শস্যদানা উঠিয়ে নিতেন-

এখন বৃষ্টি আসবে শুনে সব আউটিং-র স্পট

ঠিক করে, বের করে গাড়ির কাগজ!

দূরে বহুদূরে উপত্যকায় মেঘ ভেসে যায়

আমরা যারা উপরে তাকাতাম

কী এক বিস্ময়ে দেখি জানালা দিয়ে বাতাসের

সাথে ঘোলা ঘোলা মেঘ ঢুকছে

ঢুকছে নতুন প্রজন্ম।

আর আমরা কিছুটা ভীত হয়ে

‘ঠাণ্ডা লাগছে’ বলে টেনে নিচ্ছি গায়ে

সাজেক ভ্যালির কাঁথা!!

দলছুট আমি

রেবেকা ইসলাম

বোসদের ভরা পুকুরে কি একটা ভেসে উঠেছে

বন্ধুরা দৌড়ে গেল ওদিকে হন্তদন্ত হয়ে,

আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠে না;

শালবনে আটকে গেছে আমার খোলা চুল।

ভরভর্তি যৌবন নিয়ে

কী অহমিকায় সারি সারি বৃক্ষরাজি দাঁড়িয়ে

ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের হলদে ছটা,

মাঝে মাঝে বাতাসের দুরন্তপনায়

হঠাৎ স্থানচ্যুত রেশমি আঁচল,

আবার অদূরে মরা নদীর হা-হুতাশ,

পাতার শন শন শব্দ আমায় তাড়িয়ে নেয়।

নৈঃশব্দ্যের অচেনা গন্ধ শরীরে মেখে

মিশ্র অনুভূতির এক শাল গায়ে জড়িয়ে

দাঁড়িয়ে থাকি নিশ্চল, দলছুট আমি।

কোনো এক মধুময় মাসে

সৌম্য সালেক

কোনো এক মধুময় মাসে তোমার

পত্র এসে পৌঁছে যাবে

সামান্য আলো এসে স্থির হবে পটে

বারবার তাড়া দিবে গোপন ভাষণ

ভুলে যাওয়া তোমার আশ্বাসে শুভ

কীসব অঘ্রান লাগে, কী সব অর্ঘ-চেতনা

চকিতে হবো না লীন

আর চকিতে হবো না লীন

আঁধারের অধিরথে কুলাবো না ক্ষয় আর

আ¤্রসার বনে বনে পড়ে যাবে সাড়া

কাঁঠালের গন্ধে মাতাল সন্ধ্যায়

পানসির ভিড় জমে ওঠে- এক, দুই, তিন

হাটুরের অনেক পদাঘাত

পরেদিন পর্ণমোচী আসে

উপল অস্থিজুড়ে পাতা ঝরে পাংশু হলুদ

অগণ্য-অর্বুদ স্বপ্ন হেসে নিশিভর

পরেদিন বিন্দু শিশিরের পথে হেসে রবে

নিবিড় আশ্বাসে শুভ-

অনুকূল সৌরশিষ ছুঁয়ে যাবে তোমার কপাল

পরেদিন আনত পায়ে পায়ে তুমিও রৌদ্রবাসক হবে পার

মুখোমুখি মুঞ্জরিত নদী হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খাবে

সুরে সুরে পালের দখিনা জাগে, মধুকর

ভাসানের গান কও মধুকর- ওষ্ঠ কোমল করি

‘প্রিয়তম হে জাগো, জাগো, জাগো...’

জলের ফসিল

কেয়া ওয়াহিদ

জলের প্রতি কবিতার অকৃত্রিম মায়া

লিখতে গেলে যতিচিহ্নসহ ভিজতে

থাকে ঝুম বৃষ্টিতে,

জল মায়া নিয়ে যাবতীয়

কথন, পঠন, গল্প-গুজব,

দ্বান্দ্বিকতার পা ঝুলিয়ে বসে

থাকে মেঘের কার্নিশে

স্নানঘরের বাষ্পে লেখা নাম,

আয়নার কপালে অস্পষ্ট লাল টিপ,

সাদা বাথটাবে ভাসে মৃদু মোমালো-

ঈষদুষ্ণ জলে গোলাপ পাপড়ির আলিঙ্গন ছেড়ে

জল ছুটে যায় সোমেশ্বরীর কাছে

প্রহরায় পাহাড়-

বিরিশিরি সবুজ আব্রু ঘেরা

নিমগ্ন স্নানে জলজ অনুভূতি...

পাড়ে বসে থাকা যুগল ঠোঁট

পুনর্জন্ম জলের ফসিলে

জন্মের কাবাঘরে

কাঙাল শাহীন

খাঁ-খাঁ দুপুরপোড়া রোদও উড়ে যায়, আহা!

ও-রোদ

ও-বৃষ্টি

হাতটা ভিজিয়ে কতোটা উত্তাপ নিয়ে যাও

নিয়ে যাও আমারে পলিমাটির ঘরে-

পাটের ঝুলন্ত শিকায়; যেখানে আম্মার

স্বামীহারা ব্যথিত হৃদয় পড়ে আছে।

দাউ-দাউ আগুনে আম্মার স্বপ্ন যে পুড়ছে, আহা!

ও-আকাশ

ও-বাতাস

স্বপ্নপোড়া গন্ধ যতোদূর, ততোদূর নিয়ে যাও

নিয়ে যাও আমারে, কড়ইতলে পিতার নিঃশব্দ ঘরে

সানকিভরা পোড়াভাতের সুবাস ছড়ানো বেলায়;

আব্বার আযান-সুরে, আম্মার ঘামমোছা আঁচলে।

ধোঁয়া-ধোঁয়া ধানসেদ্ধ পাতিলে সোনার স্বপ্ন যে হাসে, আহা!

ও-দিন

ও-রাত

বিছুনের বাউয়ে চরকি চরকি সুখের দিনে নিয়ে যাও

নিয়ে যাও আমারে, খড়বিছানো জন্মের কাবাঘরে।

সত্য

চন্দ্রশিলা ছন্দা

হয়তো একথা ঠিক, সবাই

মিথ্যা বলা পছন্দ করে না।

অথচ কেউ কেউ এই উচ্চারণকেই

চরম মিথ্যা মনে করে।

হয়তো তারা জানে না

পছন্দ-অপছন্দ শব্দটি আমি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

কেউ কেউ বলেন মিথ্যের পর মিথ্যে না সাজালে

কোনো কিছুই নির্মাণ হয় না,

পৌঁছানো যায় না শিল্পের সত্যে।

আমার শিক্ষক বললেন, সাধারণ সত্য

এবং শিল্পের সত্যের মধ্যে কি ফারাক আছে

এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করো।

আমি ভাবতে শুরু করলাম

বুঝলাম ভাবনার ক্ষমতা না থাকলে

আমাকে হয়তো মৃতদের দলেই পড়তে হতো

বেঁচে আছি এরচেয়ে বড় সত্য আর কীইবা হতে পারে!

বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১ , ৯ বৈশাখ ১৪২৮ ৯ রমজান ১৪৪২

সাময়িকী কবিতা

ঐহিক

সোনালী ঘোষ

বিশ্বাস ভেঙে গেলে শিশু হয়ে উঠি

শরীরে নদী আসে

আর ঝপাৎ করে কেউ মাছ ধরতে নামে...

উপেক্ষা করি তাকে,

ছলছল করে ওঠা হৃদয়টির কাছে

কে যেন রেখে গেছে রুপলি

নূপুর, ধার দেই রোজ

নির্জন দৃশ্যের পাশে

একটি ছায়া ছিপ হাতে, অনবরত সে জল থেকে

শূন্যতা তুলে আনছে... সে এক আশ্চর্য দৃশ্য।

এসব ঘোরের মধ্যে চলে অপাপবিদ্ধ কিছু খেলা।

হৃদয়লতা

মাসুদুল হক

মেয়েটার পাখির মতো স্বভাব;

বিচিত্র সব ফুল-ফল খুঁজে বেড়ায়

একদিন দুপুরে মেয়েটার পেছনে আমরা ছায়া হয়ে যাই...

দুপুরটা শীতল রোদের পেটে

ঘুমিয়ে থাকে রাণীদের পদ্মপুকুরে

আমরা হৃদয়লতায় ফুলের মতো

ছায়া হয়ে নড়তে থাকি ভর দুপুরে

মেয়েটা আমাদের হৃদয় টিপে টিপে

বেলুনের মতো ফুটাতে থাকে...

সাজেক ভ্যালির মেঘ

হাসান কল্লোল

আমাদের শরীরে জমেছে শ্যাওলা; আমাদের

দেয়ালের চেয়েও ঘণীভূত আগাছা।

শ্যাওলা খুঁটে খুঁটে প্রজন্ম তাদের বার্গারে

লেটুস পাতার সাথে মিশিয়ে খাচ্ছে

প্রপিতামহের দালানের ঐতিহ্য,

চেটে নিচ্ছে পলেস্তারায় জমা পেজো মেঘ।

মেঘ হলে আমাদের দাদী-নানী উঠোন থেকে

সব কাপড়চোপড়, সব বিছানো শস্যদানা উঠিয়ে নিতেন-

এখন বৃষ্টি আসবে শুনে সব আউটিং-র স্পট

ঠিক করে, বের করে গাড়ির কাগজ!

দূরে বহুদূরে উপত্যকায় মেঘ ভেসে যায়

আমরা যারা উপরে তাকাতাম

কী এক বিস্ময়ে দেখি জানালা দিয়ে বাতাসের

সাথে ঘোলা ঘোলা মেঘ ঢুকছে

ঢুকছে নতুন প্রজন্ম।

আর আমরা কিছুটা ভীত হয়ে

‘ঠাণ্ডা লাগছে’ বলে টেনে নিচ্ছি গায়ে

সাজেক ভ্যালির কাঁথা!!

দলছুট আমি

রেবেকা ইসলাম

বোসদের ভরা পুকুরে কি একটা ভেসে উঠেছে

বন্ধুরা দৌড়ে গেল ওদিকে হন্তদন্ত হয়ে,

আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠে না;

শালবনে আটকে গেছে আমার খোলা চুল।

ভরভর্তি যৌবন নিয়ে

কী অহমিকায় সারি সারি বৃক্ষরাজি দাঁড়িয়ে

ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের হলদে ছটা,

মাঝে মাঝে বাতাসের দুরন্তপনায়

হঠাৎ স্থানচ্যুত রেশমি আঁচল,

আবার অদূরে মরা নদীর হা-হুতাশ,

পাতার শন শন শব্দ আমায় তাড়িয়ে নেয়।

নৈঃশব্দ্যের অচেনা গন্ধ শরীরে মেখে

মিশ্র অনুভূতির এক শাল গায়ে জড়িয়ে

দাঁড়িয়ে থাকি নিশ্চল, দলছুট আমি।

কোনো এক মধুময় মাসে

সৌম্য সালেক

কোনো এক মধুময় মাসে তোমার

পত্র এসে পৌঁছে যাবে

সামান্য আলো এসে স্থির হবে পটে

বারবার তাড়া দিবে গোপন ভাষণ

ভুলে যাওয়া তোমার আশ্বাসে শুভ

কীসব অঘ্রান লাগে, কী সব অর্ঘ-চেতনা

চকিতে হবো না লীন

আর চকিতে হবো না লীন

আঁধারের অধিরথে কুলাবো না ক্ষয় আর

আ¤্রসার বনে বনে পড়ে যাবে সাড়া

কাঁঠালের গন্ধে মাতাল সন্ধ্যায়

পানসির ভিড় জমে ওঠে- এক, দুই, তিন

হাটুরের অনেক পদাঘাত

পরেদিন পর্ণমোচী আসে

উপল অস্থিজুড়ে পাতা ঝরে পাংশু হলুদ

অগণ্য-অর্বুদ স্বপ্ন হেসে নিশিভর

পরেদিন বিন্দু শিশিরের পথে হেসে রবে

নিবিড় আশ্বাসে শুভ-

অনুকূল সৌরশিষ ছুঁয়ে যাবে তোমার কপাল

পরেদিন আনত পায়ে পায়ে তুমিও রৌদ্রবাসক হবে পার

মুখোমুখি মুঞ্জরিত নদী হাওয়ায় হাওয়ায় দোল খাবে

সুরে সুরে পালের দখিনা জাগে, মধুকর

ভাসানের গান কও মধুকর- ওষ্ঠ কোমল করি

‘প্রিয়তম হে জাগো, জাগো, জাগো...’

জলের ফসিল

কেয়া ওয়াহিদ

জলের প্রতি কবিতার অকৃত্রিম মায়া

লিখতে গেলে যতিচিহ্নসহ ভিজতে

থাকে ঝুম বৃষ্টিতে,

জল মায়া নিয়ে যাবতীয়

কথন, পঠন, গল্প-গুজব,

দ্বান্দ্বিকতার পা ঝুলিয়ে বসে

থাকে মেঘের কার্নিশে

স্নানঘরের বাষ্পে লেখা নাম,

আয়নার কপালে অস্পষ্ট লাল টিপ,

সাদা বাথটাবে ভাসে মৃদু মোমালো-

ঈষদুষ্ণ জলে গোলাপ পাপড়ির আলিঙ্গন ছেড়ে

জল ছুটে যায় সোমেশ্বরীর কাছে

প্রহরায় পাহাড়-

বিরিশিরি সবুজ আব্রু ঘেরা

নিমগ্ন স্নানে জলজ অনুভূতি...

পাড়ে বসে থাকা যুগল ঠোঁট

পুনর্জন্ম জলের ফসিলে

জন্মের কাবাঘরে

কাঙাল শাহীন

খাঁ-খাঁ দুপুরপোড়া রোদও উড়ে যায়, আহা!

ও-রোদ

ও-বৃষ্টি

হাতটা ভিজিয়ে কতোটা উত্তাপ নিয়ে যাও

নিয়ে যাও আমারে পলিমাটির ঘরে-

পাটের ঝুলন্ত শিকায়; যেখানে আম্মার

স্বামীহারা ব্যথিত হৃদয় পড়ে আছে।

দাউ-দাউ আগুনে আম্মার স্বপ্ন যে পুড়ছে, আহা!

ও-আকাশ

ও-বাতাস

স্বপ্নপোড়া গন্ধ যতোদূর, ততোদূর নিয়ে যাও

নিয়ে যাও আমারে, কড়ইতলে পিতার নিঃশব্দ ঘরে

সানকিভরা পোড়াভাতের সুবাস ছড়ানো বেলায়;

আব্বার আযান-সুরে, আম্মার ঘামমোছা আঁচলে।

ধোঁয়া-ধোঁয়া ধানসেদ্ধ পাতিলে সোনার স্বপ্ন যে হাসে, আহা!

ও-দিন

ও-রাত

বিছুনের বাউয়ে চরকি চরকি সুখের দিনে নিয়ে যাও

নিয়ে যাও আমারে, খড়বিছানো জন্মের কাবাঘরে।

সত্য

চন্দ্রশিলা ছন্দা

হয়তো একথা ঠিক, সবাই

মিথ্যা বলা পছন্দ করে না।

অথচ কেউ কেউ এই উচ্চারণকেই

চরম মিথ্যা মনে করে।

হয়তো তারা জানে না

পছন্দ-অপছন্দ শব্দটি আমি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

কেউ কেউ বলেন মিথ্যের পর মিথ্যে না সাজালে

কোনো কিছুই নির্মাণ হয় না,

পৌঁছানো যায় না শিল্পের সত্যে।

আমার শিক্ষক বললেন, সাধারণ সত্য

এবং শিল্পের সত্যের মধ্যে কি ফারাক আছে

এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করো।

আমি ভাবতে শুরু করলাম

বুঝলাম ভাবনার ক্ষমতা না থাকলে

আমাকে হয়তো মৃতদের দলেই পড়তে হতো

বেঁচে আছি এরচেয়ে বড় সত্য আর কীইবা হতে পারে!