ইয়াসের ক্ষতিগ্রস্তরা ১৫ দিনেও ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে

‘কপোতাক্ষের কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের পাশে পাক্কা বাড়ি ছিল আমার। তিন যুগ আগে বাঁধ ভাঙি নদীতি পড়ে। পরে জমি কিনি আবার বাড়ি বানাই। সেই বাড়িও নদী খাইয়ে ফেলে। পরে দৃষ্টিনন্দন এলাকায় ক্লোজারের পাশে ঘরসহ বাড়ি কিনি। সে বাড়িও নদীতে যায়। ৩বিঘে জমিও খাইছে কপোতাক্ষ। সব হারিয়ে এখন আমি নি:স্ব। আমার একন জাগা হয়িচে বেড়িবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে। খায়ি-না খায়ি বুড়ো-বুড়ির জীবন কাটতিচে কোনরহমে।’ কাঁপা গলায় এভাবেই নিজের জীবনের গল্প বলছিলেন আশাশুনির শেষ সীমানা উপকূলীয় দৃষ্টিনন্দন এলাকায় বেড়িবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাসরত ৯১ বছরের বয়োবৃদ্ধ নরিম ঢালী। তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেরা আমাগের দেখেনা। দান-খয়রাতে প্যাটটা চলে। যে খুপড়িতে বসবাস করতিছি, একিন থাকতি ডর লাগে। ইয়াসে বাঁধ ভাঙি গেছে। খুপরীর নীচি মাটি ধ্বসে যাতিছ। যেকন-তেকন ঘর ধ্বসি বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটতি পারে। সরকারিভাবে একটা ঘর পালি বাচি যাতাম। শেষ জীবনে বুড়ো-বুড়ি সেকিন থাকতি পারতাম।’ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার ২২টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সাড়ে তিন হাজার ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ১৫ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি হয়। আশাশুনির প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়ে। তবে ইয়াসের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি উপকূলীয় এলাকার মানুষ। জোয়ার-ভাটা খেলা করছে দুটি প্রধান নদ-নদীর ৬টি পয়েন্টে। ফলে এখনো পানিবন্দী হয়ে রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ পুনর্বাসনের দাবি দুর্গত এলাকার জলাবদ্ধ মানুষের। আশাশুনির কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের আমজেদ আলী জানান, ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে আমরা আশ্রয় কেন্দ্রে উঠতে পারিনি। বাড়ির সব পানিতে শেষ। আমাদের কিছু নেই। খাদ্য-খাবারও সব ভাসায়ে নিয়ে গেছে। না খেয়ে-না দেয়ে আছি। পানির কষ্ট, গোসলের কষ্ট। বহুবিধ সমস্যা। বাঁধ না হলে, কখনো এই সমস্যার সমাধান হবে না। লোনা পানিতে শাক-সবজিও শেষ। মাছও শেষ। একদিন খাই তো আরেকদিন খাইনা। এভাবে বেচে আছি। তালতলা এলাকার গৃহবধু আমেনা খাতুন জানান, বুড়ে গেলে (পানিতে তলিয়ে) দু’তিন দিন কিছুই খাইনি। খাটের পর ইট দিয়ে রান্না করার চেষ্টা করিছি। একই এলাকায় আরেক গৃহবধু আছমা খাতুন জানান, চারিদিকে সব ডুবানো। চারিদিকে পানি, তার মধ্যি আমাগির বাড়ি। রান্না-বান্না ও খাওয়া-দাওয়া খুব কষ্ট। যে কষ্টে আছি, এভাবে থাকা যায়না। বন্যতলা এলাকার সমীর সাহা জানান, আমপানের পরে ৯ মাস আমরা পানি বন্দী ছিলাম। মাত্র ২ মাস শুকনো থাকার পরে আবারো ইয়াসে পানিবন্দী। যোগাযোগ ব্যবস্থা একদম বিচ্ছিন্ন। বাড়ি থেকে কোথাও যেতে গেলে নৌকায় যেতে হয়। এভাবে বসবাস করা যায়না। অনেকে এখান থেকে চলে গেছে। আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই বলে পড়ে আছি। বেড়িবাঁধ সংস্কারের বিষয়ে সাতক্ষীরার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান জানান, ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরায় ২২ টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এর মধ্যে ৬টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ফলে এখনো জোয়ার-ভাটা খেলা করছে ওই সব এলাকায়। জেলার ৬৮৩ কি.মি. বেড়িবাঁধের মধ্যে ৩০কি.মি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে। তবে ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা। তবে পানিবন্দী মানুষকে সরকারিভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে বলে জানান জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকার বিস্তির্ণ অঞ্চল পানির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে ১১ মে.টন খাদ্য শস্য দেওয়া হয়েছে।

শনিবার, ১২ জুন ২০২১ , ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮ ৩০ শাওয়াল ১৪৪২

ইয়াসের ক্ষতিগ্রস্তরা ১৫ দিনেও ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে

image

সাতক্ষীরা : ইয়াসে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি সংস্কার করতে পারেনি অর্থাভাবে -সংবাদ

‘কপোতাক্ষের কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাটের পাশে পাক্কা বাড়ি ছিল আমার। তিন যুগ আগে বাঁধ ভাঙি নদীতি পড়ে। পরে জমি কিনি আবার বাড়ি বানাই। সেই বাড়িও নদী খাইয়ে ফেলে। পরে দৃষ্টিনন্দন এলাকায় ক্লোজারের পাশে ঘরসহ বাড়ি কিনি। সে বাড়িও নদীতে যায়। ৩বিঘে জমিও খাইছে কপোতাক্ষ। সব হারিয়ে এখন আমি নি:স্ব। আমার একন জাগা হয়িচে বেড়িবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে। খায়ি-না খায়ি বুড়ো-বুড়ির জীবন কাটতিচে কোনরহমে।’ কাঁপা গলায় এভাবেই নিজের জীবনের গল্প বলছিলেন আশাশুনির শেষ সীমানা উপকূলীয় দৃষ্টিনন্দন এলাকায় বেড়িবাঁধের ওপর খুপড়ি ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাসরত ৯১ বছরের বয়োবৃদ্ধ নরিম ঢালী। তিনি আরও বলেন, ‘ছেলেরা আমাগের দেখেনা। দান-খয়রাতে প্যাটটা চলে। যে খুপড়িতে বসবাস করতিছি, একিন থাকতি ডর লাগে। ইয়াসে বাঁধ ভাঙি গেছে। খুপরীর নীচি মাটি ধ্বসে যাতিছ। যেকন-তেকন ঘর ধ্বসি বড় ধরণের দূর্ঘটনা ঘটতি পারে। সরকারিভাবে একটা ঘর পালি বাচি যাতাম। শেষ জীবনে বুড়ো-বুড়ি সেকিন থাকতি পারতাম।’ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকার ২২টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। সাড়ে তিন হাজার ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ১৫ কোটি টাকার মাছের ক্ষতি হয়। আশাশুনির প্রতাপনগর, আনুলিয়া ও শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, কৈখালী, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়ে। তবে ইয়াসের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি উপকূলীয় এলাকার মানুষ। জোয়ার-ভাটা খেলা করছে দুটি প্রধান নদ-নদীর ৬টি পয়েন্টে। ফলে এখনো পানিবন্দী হয়ে রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ। বেড়িবাঁধ নির্মাণসহ পুনর্বাসনের দাবি দুর্গত এলাকার জলাবদ্ধ মানুষের। আশাশুনির কুড়িকাহুনিয়া গ্রামের আমজেদ আলী জানান, ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে আমরা আশ্রয় কেন্দ্রে উঠতে পারিনি। বাড়ির সব পানিতে শেষ। আমাদের কিছু নেই। খাদ্য-খাবারও সব ভাসায়ে নিয়ে গেছে। না খেয়ে-না দেয়ে আছি। পানির কষ্ট, গোসলের কষ্ট। বহুবিধ সমস্যা। বাঁধ না হলে, কখনো এই সমস্যার সমাধান হবে না। লোনা পানিতে শাক-সবজিও শেষ। মাছও শেষ। একদিন খাই তো আরেকদিন খাইনা। এভাবে বেচে আছি। তালতলা এলাকার গৃহবধু আমেনা খাতুন জানান, বুড়ে গেলে (পানিতে তলিয়ে) দু’তিন দিন কিছুই খাইনি। খাটের পর ইট দিয়ে রান্না করার চেষ্টা করিছি। একই এলাকায় আরেক গৃহবধু আছমা খাতুন জানান, চারিদিকে সব ডুবানো। চারিদিকে পানি, তার মধ্যি আমাগির বাড়ি। রান্না-বান্না ও খাওয়া-দাওয়া খুব কষ্ট। যে কষ্টে আছি, এভাবে থাকা যায়না। বন্যতলা এলাকার সমীর সাহা জানান, আমপানের পরে ৯ মাস আমরা পানি বন্দী ছিলাম। মাত্র ২ মাস শুকনো থাকার পরে আবারো ইয়াসে পানিবন্দী। যোগাযোগ ব্যবস্থা একদম বিচ্ছিন্ন। বাড়ি থেকে কোথাও যেতে গেলে নৌকায় যেতে হয়। এভাবে বসবাস করা যায়না। অনেকে এখান থেকে চলে গেছে। আমাদের যাওয়ার জায়গা নেই বলে পড়ে আছি। বেড়িবাঁধ সংস্কারের বিষয়ে সাতক্ষীরার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান জানান, ইয়াসের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরায় ২২ টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ ভেঙে যায়। এর মধ্যে ৬টি পয়েন্টের বেড়িবাঁধ সংস্কার করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তর। ফলে এখনো জোয়ার-ভাটা খেলা করছে ওই সব এলাকায়। জেলার ৬৮৩ কি.মি. বেড়িবাঁধের মধ্যে ৩০কি.মি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে। তবে ভেঙে যাওয়া বাঁধ সংস্কারে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে বলে জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই কর্মকর্তা। তবে পানিবন্দী মানুষকে সরকারিভাবে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে বলে জানান জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল। তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকার বিস্তির্ণ অঞ্চল পানির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে ১১ মে.টন খাদ্য শস্য দেওয়া হয়েছে।