ক্রিস্টাল মেথ আইসে ঝুঁকছে মাদক কারবারিরা

টেকনাফ সীমান্তের ১৫শ টাকার আইস ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ২৫ হাজার টাকায়

ইয়াবার চেয়ে লাভ বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিরা ক্রিস্টাল মেথ আইস ব্যবসায় ঝুঁকছে। টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে একশ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকায় কেনে। সমুদ্র ও নদীপথে প্রথমে কক্সবাজার আনে। এরপর পরিবহনসহ নানাভাবে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় এনে বিক্রি করে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। এর খুচরা মূল্য আরও বেশি। মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে গড়িমসি করলে দেখানো হতো আগ্নেয়াস্ত্র। এ জন্য মাদক চোরাকারবারিরা সঙ্গে অস্ত্রও রাখতেন। র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনী সম্প্রতি ক্রিস্টার মেথ আইসের একাধিক চালান আটক করেছে।

গত শুক্রবার গভীর রাতে র‌্যাব সদস্যরা রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ কেজি ক্রিস্টাল মেথ আইস, বিদেশি অস্ত্র ও গুলিসহ মাদক আইস সিন্ডিকেটের হোতা মো. হোছেন ওরফে খোকন ও তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে। র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৫ এর বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তদারকৃতরা হলো, ১. মো. হোছেন ওরফে খোকন, পিতা মো. ইউনুছ, থানা টেকনাফ ও জেলা কক্সবাজার। ২. মোহাম্মদ রফিক, পিতা মো. সুলতান, থানা টেকনাফ, জেলা কক্সবাজার।

উদ্ধারকৃত পাঁচ কেজি ৫০ গ্রাম মাদক আইসের মূল্য সাড়ে ১২ কোটি টাকা। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দুটি মোবাইল ফোন সেট ও তিনটি দেশি-বিদেশি সিমকার্ড উদ্ধার ও মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত ২০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।

গ্রেপ্তহারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তারা টেকনাফ কেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য। এ চক্রটি গত কয়েক বছর ধরে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের কারবার করে আসছে। এ চক্রে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছে।

এ চক্র সাধারণত নৌপথে মাদকের চালান দেশে আনে। চক্রটি ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত। চক্রটি গত কয়েক মাস ধরে আইস পাচার করে আসছিল।

রাজধানীর অভিজাত উত্তরা, বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তাদের মাদক স্পট রয়েছে। ওই সব স্থানে এসব মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। এ চক্র কাপড় ও আচার ব্যবসার আড়ালে মাদকের চালান দেশে এনে বিভিন্ন স্থানে পাঠাত। এছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও এ মাদকের চাহিদা রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত হোছেনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ সাতটি মামলা রয়েছে। আর তার সহযোগী রফিক টেকনাফে অটোরিকশা চালানোর আড়ালে মাদক পরিবহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেত।

র‌্যাবের মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সম্প্রতি র‌্যাব সদস্যরা ক্রিস্টাল মেথ আইসের একাধিক চালান আটক করেছে। ওই সময় গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে, যাত্রাবাড়িতে এ চালান আটক করা হয়েছে। এ চক্রে আরও কারা জড়িত আছে, তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মাদক চোরাচালানি ও কারবারি চক্রটির হুন্ডির মাধ্যমে মাদকের টাকা লেনদেন হতো। আইনশঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কোন মাদক জব্দ হলে গড ফাদাররা ওই মাদকের টাকা নেয় না। পরে আবার চালান পাঠায়। এক গ্রুপ আটক হলে অন্য গ্রুপ মাদক বহন করে। টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্রগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিজাত শ্রেণীর সন্তানরা এ মাদক সেবন করে।

মাদক বিশেষজ্ঞের মতে, মায়ানমার ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ, সেন্টমার্টিনের মধ্যবর্তী নৌপথ দিয়ে দেশে ক্রিস্টাল মেথ আইস আনা হচ্ছে। চায়ের ফ্লেভারের প্যাকেটযোগে এসব মাদক আনা হয়। টেকনাফের গোপন আস্তানায় এ মাদক মজুত রাখা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে সরবরাহ করা হয়। আটক করা হলে সেই মাদকের টাকা লাগে না, ববং আসামিদের ছাড়ানোর জন্য নানা তৎপরতা চালানো হয়।

র‌্যাবের মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদেরকে জানান, সমুদ্র পথে মালবাহী বোটে আইস ও ইয়াবার চালান আসে। নিরাপদে মাদক খালাস করা হয় লাইট সিগনাল ব্যবহার করে। এরপর গভীর রাতে সুবিধাজনক সময়ে তীরে বোট ভিড়িয়ে মাদক খালাস করে গোপন আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তারা বার্মিজ কাপড়ের প্যাকেটে অভিনব কৌশলে ঢুকিয়ে পাচার করে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ মাদক সেবনের ফলে অনিদ্রা, অতি উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, মস্তিস্ক বিকৃতি, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, মানসিক অবসাদ ও আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এ মাদক সেবনের ফলে তরুণ ও তরণীরা অস্বাভাবিক আচরণ করে। আবার অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১ , ০১ কার্তিক ১৪২৮ ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ক্রিস্টাল মেথ আইসে ঝুঁকছে মাদক কারবারিরা

টেকনাফ সীমান্তের ১৫শ টাকার আইস ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ২৫ হাজার টাকায়

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

ইয়াবার চেয়ে লাভ বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানিরা ক্রিস্টাল মেথ আইস ব্যবসায় ঝুঁকছে। টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে একশ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকায় কেনে। সমুদ্র ও নদীপথে প্রথমে কক্সবাজার আনে। এরপর পরিবহনসহ নানাভাবে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় এনে বিক্রি করে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায়। এর খুচরা মূল্য আরও বেশি। মাদক বিক্রির টাকা নিয়ে গড়িমসি করলে দেখানো হতো আগ্নেয়াস্ত্র। এ জন্য মাদক চোরাকারবারিরা সঙ্গে অস্ত্রও রাখতেন। র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃংখলা বাহিনী সম্প্রতি ক্রিস্টার মেথ আইসের একাধিক চালান আটক করেছে।

গত শুক্রবার গভীর রাতে র‌্যাব সদস্যরা রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ কেজি ক্রিস্টাল মেথ আইস, বিদেশি অস্ত্র ও গুলিসহ মাদক আইস সিন্ডিকেটের হোতা মো. হোছেন ওরফে খোকন ও তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে। র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১৫ এর বিশেষ টিম অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তদারকৃতরা হলো, ১. মো. হোছেন ওরফে খোকন, পিতা মো. ইউনুছ, থানা টেকনাফ ও জেলা কক্সবাজার। ২. মোহাম্মদ রফিক, পিতা মো. সুলতান, থানা টেকনাফ, জেলা কক্সবাজার।

উদ্ধারকৃত পাঁচ কেজি ৫০ গ্রাম মাদক আইসের মূল্য সাড়ে ১২ কোটি টাকা। এছাড়াও তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, পাঁচ রাউন্ড গুলি, দুটি মোবাইল ফোন সেট ও তিনটি দেশি-বিদেশি সিমকার্ড উদ্ধার ও মাদক ব্যবসায় ব্যবহৃত ২০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।

গ্রেপ্তহারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তারা টেকনাফ কেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেটের সদস্য। এ চক্রটি গত কয়েক বছর ধরে ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকের কারবার করে আসছে। এ চক্রে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছে।

এ চক্র সাধারণত নৌপথে মাদকের চালান দেশে আনে। চক্রটি ইয়াবা কারবারের সঙ্গে জড়িত। চক্রটি গত কয়েক মাস ধরে আইস পাচার করে আসছিল।

রাজধানীর অভিজাত উত্তরা, বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তাদের মাদক স্পট রয়েছে। ওই সব স্থানে এসব মাদক বেচাকেনা হচ্ছে। এ চক্র কাপড় ও আচার ব্যবসার আড়ালে মাদকের চালান দেশে এনে বিভিন্ন স্থানে পাঠাত। এছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামেও এ মাদকের চাহিদা রয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত হোছেনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ সাতটি মামলা রয়েছে। আর তার সহযোগী রফিক টেকনাফে অটোরিকশা চালানোর আড়ালে মাদক পরিবহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেত।

র‌্যাবের মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সম্প্রতি র‌্যাব সদস্যরা ক্রিস্টাল মেথ আইসের একাধিক চালান আটক করেছে। ওই সময় গ্রেপ্তারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে, যাত্রাবাড়িতে এ চালান আটক করা হয়েছে। এ চক্রে আরও কারা জড়িত আছে, তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মাদক চোরাচালানি ও কারবারি চক্রটির হুন্ডির মাধ্যমে মাদকের টাকা লেনদেন হতো। আইনশঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কোন মাদক জব্দ হলে গড ফাদাররা ওই মাদকের টাকা নেয় না। পরে আবার চালান পাঠায়। এক গ্রুপ আটক হলে অন্য গ্রুপ মাদক বহন করে। টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্রগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিজাত শ্রেণীর সন্তানরা এ মাদক সেবন করে।

মাদক বিশেষজ্ঞের মতে, মায়ানমার ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী টেকনাফ, সেন্টমার্টিনের মধ্যবর্তী নৌপথ দিয়ে দেশে ক্রিস্টাল মেথ আইস আনা হচ্ছে। চায়ের ফ্লেভারের প্যাকেটযোগে এসব মাদক আনা হয়। টেকনাফের গোপন আস্তানায় এ মাদক মজুত রাখা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে সরবরাহ করা হয়। আটক করা হলে সেই মাদকের টাকা লাগে না, ববং আসামিদের ছাড়ানোর জন্য নানা তৎপরতা চালানো হয়।

র‌্যাবের মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদেরকে জানান, সমুদ্র পথে মালবাহী বোটে আইস ও ইয়াবার চালান আসে। নিরাপদে মাদক খালাস করা হয় লাইট সিগনাল ব্যবহার করে। এরপর গভীর রাতে সুবিধাজনক সময়ে তীরে বোট ভিড়িয়ে মাদক খালাস করে গোপন আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তারা বার্মিজ কাপড়ের প্যাকেটে অভিনব কৌশলে ঢুকিয়ে পাচার করে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ মাদক সেবনের ফলে অনিদ্রা, অতি উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, মস্তিস্ক বিকৃতি, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা, মানসিক অবসাদ ও আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এ মাদক সেবনের ফলে তরুণ ও তরণীরা অস্বাভাবিক আচরণ করে। আবার অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।