বজ্রপাতে মৃত্যু ও বিলুপ্ত তালগাছ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

বজ্রপাত আজ বাংলাদেশে এক মহাআতঙ্কের নাম। বৃষ্টি আর বজ্রপাত স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত অন্যসব গাছের চেয়ে ওকগাছে বেশি বজ্রপাত হয়। বাংলাদেশে ওকগাছ নেই। তবে কেন এত বজ্রপাত, এত কেন মৃত্যু মানুষের? বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বজ্রমেঘের পরিমাণও বেড়ে গেছে কয়েক বছর ধরে। পরিবেশ দূষণও গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশে বজ্রমেঘ বৃদ্ধির সময়টা এপ্রিল ও মে মাস। গবেষণা বলছে, ভৌগলিক ও আবহাওয়াজনিত কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। তবে মৌসুমগত আবহাওয়ার পরিবর্তনই বজ্রপাতের মূল কারণ। এ জন্য জুন-জুলাইয়েও বজ্রপাতের বড় বড় ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগেও বজ্রপাত নিয়ে দেশের মানুষের মনে তেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল না। অথচ বর্ষাকালে আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বিদ্যুৎ চমকানো ও বজ্রপাত ঠিকই ছিল। দুয়েকটা বজ্র মাটি অবধি এসে পৌঁছালেও বেশির ভাগ আকাশেই মিলিয়ে যেত। মাঝেমধ্যে বজ্রপাতজনিত কারণে দুয়েকজন মানুষের মৃত্যু ঘটলেও এ নিয়ে মানুষের মনে তেমন আতঙ্ক ছিল কম।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ২ হাজার ৪০০ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে থাকে। আর বিশে^ প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ২ হাজার মারাই যায়। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে বজ্রপাতে যত লোক মারা যাচ্ছে তার এক-চতুর্থাংশই মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে ২০০ মানুষ মারা যায় বলে ধারণা করা হয়ে। তবে এ সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা বেশি। আবহাওয়াবিদদের মতে, সত্যিকারে বজ্রপাত হয় অনেক বেশি, তবে সব বজ্রপাত মাটি পর্যন্ত স্পর্শ করে না বলে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। খোলা মাঠে কাজ করা মানুষেরা বজ্রপাতে বেশি শিকার হন। আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা না থাকা এবং অসচেতনতার কারণেই বজ্রপাতে প্রাণহানি বেশি ঘটে।

উঁচু স্থানে বজ্রপাত বেশি হয়। আগে গ্রামগঞ্জে বট, তাল ও নারকেল গাছের মতো উঁচু গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। তালগাছের মতো উঁচুগাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে কাছে টেনে নিয়ে বজ্রপাত ঠোকয়ে দিত। ফলে বজ্র মাটির কাছে খুব একটা পৌঁছাত না। তাই বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুও কম ঘটতো। এখন উঁচু গাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় বজ্র সরাসরি মাটিতে লোকালয়ে এসে পড়ে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটায়। একই ভাবে বজ্রপাতের সময় যারা খোলা মাঠের মতো বিশাল উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করেন তারাই বজ্রপাতে বেশি আক্রান্ত হন। অতি সম্প্রতি পদ্মাপাড়ে একটি ঘাটঘরে এক দল বরযাত্রীর ওপর বজ্রাঘাতে ১৬ সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। ১৯১৬ সালেই বজ্রপাতের ঘটনা আনেক বেশি ঘটেছে। ওই বছরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই দিনে ৫৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর ৬ জুন একদিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন। এর পরই ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আট বছরে সারাদেশে বজ্রপাতে বিপুলসংখ্যক গবাদি পশু এবং এক হাজার ৮০০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।

বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুযোগ ঘোষণার পর ২০১৭ সালে সরকার বজ্রপাতে প্রাণহানি হ্রাসে দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করে। কিন্তু ২০১৮ সালে জানা যায় তালগাছ লাগানোর বদলে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার দুপাশে ৩১ লাখ তালের আটি রোপণ করা হয়েছে। উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে এগুলোর বেড়ে ওঠার ব্যাপারে তেমন কোনো সন্তোষজনক খবর পাওয়া যায়নি। বজ্রপাত ঠেকাতে রাস্তার পাশের চেয়ে খোলা মাঠের তালগাছই বেশি কার্যকর বলে মনে করেন অভিজ্ঞজন। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো তালগাছ রোপণের নজির নেই। এমনকি গ্রামগঞ্জে রাস্তার দুপাশে তালগাছের যে দীর্ঘ সারি এক সময় চোখে পড়তো তাও এখন আর দেখা যাচ্ছে না। এমনিতে দেশে ফল হিসাবে তালের কদরও কমে গেছে। সুস্বাদু পাকা তাল আজকাল বাজারে খুব কমই দেখা মেলে। পাকা তালের গোলা দিয়ে বানানো নানা ধরনের পিঠা খাওয়ার প্রচলনও আজ আর গ্রামেও নেই। শুধু চৈত্রের দুপুরে শহর ও গ্রামে তৃষ্ণা মিটাতে কচি তালের শাঁস খেতে দেখা যায় অনেককে। একটি তালগাছ লাগানোর পর তাতে ফল ধরতে অনেক বছর লেগে যায়। যিনি গাছটি লাগান তিনি সে গাছের ফল খেতে পারেন না। তাই অনেকেই তালগাছ রোপণে আগ্রহী হন না। তবে নিজের লাগানো গাছে পরের প্রজন্ম যদি উপকৃত হয় তবে সেটা তো কম কথা নয়।

বজ্রপাত এক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমাতে অবশ্যই বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। বজ্রাঘাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে দেশের সর্বত্র বেশি করে উঁচু গাছ যেমন তাল, নারিকেল, সুপারি, খেজুর গাছ লাগাতে হবে। বজ্রঝড় সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ সেকেণ্ড স্থায়ী হয়। এই সময়ে বাড়ির বাইরে বের না হওয়া শ্রেয়। ঘরে থেকে দরজা, জানালা বন্ধ রেখে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় ঘরের বাইরে অবস্থান করলে খোলা মাঠে বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। একান্তই যদি থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, তবে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে কানে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। আর যত দ্রুত সম্ভব কোনো ভবন বা কংক্রীটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেয়া নিরাপদ। বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তার, সেলফোন টাওয়ার থেকে দূরে চলে যেতে হবে। এমনকি আকাশে ঘন মেঘে বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখলে নদী, পুকুর বা ডোবা এবং যে কোনো জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। এসব স্থান বজ্রকে বেশি আকর্ষণ করে। বজ্রপাতের সময় গাড়ি বা বাসের ভেতর থাকলে কোনো ধাতব অংশকে শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা যাবে না। বজ্রপাতের সময় লোহা বা অন্য ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহারও নিরাপদ নয়। একইভাবে বজ্রপাতের সময় বাড়ির থাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ স্পর্শ করা যাবে না। বজ্রপাতের সময় সেলফোন ও কম্পিউটার ব্যবহার এবং টেলিভিশন দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। ফ্রিজসহ সব রকম বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সুইচ বন্ধ রাখতে হবে। তা না হলে বজ্রপাতে এসব নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রতিটি ভবনে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার হাওর অঞ্চলে টাওয়ার নির্মাণ পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। এছাড়া দেশের আটটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বসানো হয়েছে। রাজধানী ছাড়াও সাত স্থানে ২৫০ কিলোমিটার রেঞ্জের সেন্সর বসানো হয়েছে। এ দিয়ে এসব এলাকায় বজ্রপাতের আগাম সতর্ককার্তা দেয়া সম্ভব। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার কমাতে সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে বেশি করে উঁচু গাছ লাগাতে উদ্যোগী হতে হবে। উন্মুক্ত স্থানে বসাতে হবে লাইটনিং টাওয়ার বা উঁচু ধাতব পোস্ট। আর গড়ে তুলতে হবে গণসচেতনতা। আত্মসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বজ্রপাতের মতো অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও শিক্ষক]

রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১ , ০১ কার্তিক ১৪২৮ ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বজ্রপাতে মৃত্যু ও বিলুপ্ত তালগাছ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

বজ্রপাত আজ বাংলাদেশে এক মহাআতঙ্কের নাম। বৃষ্টি আর বজ্রপাত স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত অন্যসব গাছের চেয়ে ওকগাছে বেশি বজ্রপাত হয়। বাংলাদেশে ওকগাছ নেই। তবে কেন এত বজ্রপাত, এত কেন মৃত্যু মানুষের? বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বজ্রমেঘের পরিমাণও বেড়ে গেছে কয়েক বছর ধরে। পরিবেশ দূষণও গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। বাংলাদেশে বজ্রমেঘ বৃদ্ধির সময়টা এপ্রিল ও মে মাস। গবেষণা বলছে, ভৌগলিক ও আবহাওয়াজনিত কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে। তবে মৌসুমগত আবহাওয়ার পরিবর্তনই বজ্রপাতের মূল কারণ। এ জন্য জুন-জুলাইয়েও বজ্রপাতের বড় বড় ঘটনা ঘটে। কিছুদিন আগেও বজ্রপাত নিয়ে দেশের মানুষের মনে তেমন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল না। অথচ বর্ষাকালে আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বিদ্যুৎ চমকানো ও বজ্রপাত ঠিকই ছিল। দুয়েকটা বজ্র মাটি অবধি এসে পৌঁছালেও বেশির ভাগ আকাশেই মিলিয়ে যেত। মাঝেমধ্যে বজ্রপাতজনিত কারণে দুয়েকজন মানুষের মৃত্যু ঘটলেও এ নিয়ে মানুষের মনে তেমন আতঙ্ক ছিল কম।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে ২ হাজার ৪০০ বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে থাকে। আর বিশে^ প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ বজ্রপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ২ হাজার মারাই যায়। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে বজ্রপাতে যত লোক মারা যাচ্ছে তার এক-চতুর্থাংশই মারা যাচ্ছে বাংলাদেশে। গড়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে ২০০ মানুষ মারা যায় বলে ধারণা করা হয়ে। তবে এ সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিলেট ও শ্রীমঙ্গলে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা বেশি। আবহাওয়াবিদদের মতে, সত্যিকারে বজ্রপাত হয় অনেক বেশি, তবে সব বজ্রপাত মাটি পর্যন্ত স্পর্শ করে না বলে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। খোলা মাঠে কাজ করা মানুষেরা বজ্রপাতে বেশি শিকার হন। আগাম সতর্কতার ব্যবস্থা না থাকা এবং অসচেতনতার কারণেই বজ্রপাতে প্রাণহানি বেশি ঘটে।

উঁচু স্থানে বজ্রপাত বেশি হয়। আগে গ্রামগঞ্জে বট, তাল ও নারকেল গাছের মতো উঁচু গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। তালগাছের মতো উঁচুগাছ বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে কাছে টেনে নিয়ে বজ্রপাত ঠোকয়ে দিত। ফলে বজ্র মাটির কাছে খুব একটা পৌঁছাত না। তাই বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুও কম ঘটতো। এখন উঁচু গাছের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় বজ্র সরাসরি মাটিতে লোকালয়ে এসে পড়ে এবং মানুষের মৃত্যু ঘটায়। একই ভাবে বজ্রপাতের সময় যারা খোলা মাঠের মতো বিশাল উন্মুক্ত স্থানে অবস্থান করেন তারাই বজ্রপাতে বেশি আক্রান্ত হন। অতি সম্প্রতি পদ্মাপাড়ে একটি ঘাটঘরে এক দল বরযাত্রীর ওপর বজ্রাঘাতে ১৬ সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। ১৯১৬ সালেই বজ্রপাতের ঘটনা আনেক বেশি ঘটেছে। ওই বছরের মে মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই দিনে ৫৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর ৬ জুন একদিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ জন। এর পরই ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত আট বছরে সারাদেশে বজ্রপাতে বিপুলসংখ্যক গবাদি পশু এবং এক হাজার ৮০০ জন মানুষের মৃত্যু ঘটেছে।

বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুযোগ ঘোষণার পর ২০১৭ সালে সরকার বজ্রপাতে প্রাণহানি হ্রাসে দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা করে। কিন্তু ২০১৮ সালে জানা যায় তালগাছ লাগানোর বদলে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার দুপাশে ৩১ লাখ তালের আটি রোপণ করা হয়েছে। উপযুক্ত পরিচর্যার অভাবে এগুলোর বেড়ে ওঠার ব্যাপারে তেমন কোনো সন্তোষজনক খবর পাওয়া যায়নি। বজ্রপাত ঠেকাতে রাস্তার পাশের চেয়ে খোলা মাঠের তালগাছই বেশি কার্যকর বলে মনে করেন অভিজ্ঞজন। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো তালগাছ রোপণের নজির নেই। এমনকি গ্রামগঞ্জে রাস্তার দুপাশে তালগাছের যে দীর্ঘ সারি এক সময় চোখে পড়তো তাও এখন আর দেখা যাচ্ছে না। এমনিতে দেশে ফল হিসাবে তালের কদরও কমে গেছে। সুস্বাদু পাকা তাল আজকাল বাজারে খুব কমই দেখা মেলে। পাকা তালের গোলা দিয়ে বানানো নানা ধরনের পিঠা খাওয়ার প্রচলনও আজ আর গ্রামেও নেই। শুধু চৈত্রের দুপুরে শহর ও গ্রামে তৃষ্ণা মিটাতে কচি তালের শাঁস খেতে দেখা যায় অনেককে। একটি তালগাছ লাগানোর পর তাতে ফল ধরতে অনেক বছর লেগে যায়। যিনি গাছটি লাগান তিনি সে গাছের ফল খেতে পারেন না। তাই অনেকেই তালগাছ রোপণে আগ্রহী হন না। তবে নিজের লাগানো গাছে পরের প্রজন্ম যদি উপকৃত হয় তবে সেটা তো কম কথা নয়।

বজ্রপাত এক ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমাতে অবশ্যই বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। বজ্রাঘাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে দেশের সর্বত্র বেশি করে উঁচু গাছ যেমন তাল, নারিকেল, সুপারি, খেজুর গাছ লাগাতে হবে। বজ্রঝড় সাধারণত ৩০ থেকে ৪৫ সেকেণ্ড স্থায়ী হয়। এই সময়ে বাড়ির বাইরে বের না হওয়া শ্রেয়। ঘরে থেকে দরজা, জানালা বন্ধ রেখে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে নিতে হবে। বজ্রপাতের সময় ঘরের বাইরে অবস্থান করলে খোলা মাঠে বা উঁচু স্থানে থাকা যাবে না। একান্তই যদি থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, তবে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে কানে আঙুল দিয়ে চেপে ধরে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। আর যত দ্রুত সম্ভব কোনো ভবন বা কংক্রীটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নেয়া নিরাপদ। বজ্রপাতের সম্ভাবনা দেখা দিলে উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা তার, সেলফোন টাওয়ার থেকে দূরে চলে যেতে হবে। এমনকি আকাশে ঘন মেঘে বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখলে নদী, পুকুর বা ডোবা এবং যে কোনো জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। এসব স্থান বজ্রকে বেশি আকর্ষণ করে। বজ্রপাতের সময় গাড়ি বা বাসের ভেতর থাকলে কোনো ধাতব অংশকে শরীরের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা যাবে না। বজ্রপাতের সময় লোহা বা অন্য ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহারও নিরাপদ নয়। একইভাবে বজ্রপাতের সময় বাড়ির থাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ স্পর্শ করা যাবে না। বজ্রপাতের সময় সেলফোন ও কম্পিউটার ব্যবহার এবং টেলিভিশন দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। ফ্রিজসহ সব রকম বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সুইচ বন্ধ রাখতে হবে। তা না হলে বজ্রপাতে এসব নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

প্রতিটি ভবনে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড রাখা বাধ্যতামূলক করা দরকার। বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকার হাওর অঞ্চলে টাওয়ার নির্মাণ পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। এছাড়া দেশের আটটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বসানো হয়েছে। রাজধানী ছাড়াও সাত স্থানে ২৫০ কিলোমিটার রেঞ্জের সেন্সর বসানো হয়েছে। এ দিয়ে এসব এলাকায় বজ্রপাতের আগাম সতর্ককার্তা দেয়া সম্ভব। বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার কমাতে সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়ে বেশি করে উঁচু গাছ লাগাতে উদ্যোগী হতে হবে। উন্মুক্ত স্থানে বসাতে হবে লাইটনিং টাওয়ার বা উঁচু ধাতব পোস্ট। আর গড়ে তুলতে হবে গণসচেতনতা। আত্মসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বজ্রপাতের মতো অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও শিক্ষক]