সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

দেশে আবার স্লোগান উঠলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখুন। বছরে দুই তিন বার এ ধরনের স্লোগান শুনা যায়। কুমিল্লার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে বিষটা ছড়াতে পারেনি।

প্রশ্ন হলো, কুমিল্লার যে ঘটনাটি ঘটেছে তা কি কোন সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন মানুষেরা ঘটাতে পারে? আবার যার মস্তিস্ক অসুস্থ তার পক্ষে এরকম ঘটনা ঘটনো সম্ভব না? কারণ সে বিষয়টি বুঝবেই না। তাহলো ঘটলো কেন? দেশের দুইটি ধর্ম পালকারী মানুষ গুলো মাঝে পারস্পারিক সম্পর্কটা যে বৈরী তা কুমিল্লার ঘটনা থেকে বোঝা যায়। কুমিল্লার ঘটনাটি উনুনে ঘি ঢালার মতো। বিবাদমান মনোভাবে একটু বারুদের ছোঁয়া। এই ঘটনা থেকে দেখা যায় যে, দেশে সব ধর্মের অনুশীলন বাড়ছে কিন্তু কমে যাচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ। সারা দেশে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধর্মপালনকারীদের জন্য তৈরি করে দেয়া হচ্ছে উপাসনালয়, এর ফলে কিন্তু সামাজিক বা ধর্মীয় সম্প্রীতি সদ্ভাব তৈরি হচ্ছে না। এটা সহজেই অনুমেয় হয়ে যায় যে, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে ধর্মীয় বিদ্ধেষ তৈরি করা হয়। সারা দেশে গত তিন যুগ ধরে জনসাধারণের মাঝে ধর্ম চর্চা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয়গুলোতে বিশৃঙ্খলা রোধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাহাড়া দিতে হয়। অথচ আজ থেকে তিন যুগ আগে ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে পুলিশ পাহাড়ার প্রয়োজন হতো না। ধর্মীয় উপাসানলয়গুলোতে দুর্বৃত্ত তো দুরের কথা চোর ছেচ্ছর পর্যন্ত ঢুকতে ভয় পেতো। সরকারি ভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় তৈরি করায় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিটা কি তাহলে সংহিস হয়ে উঠলো? বার বার প্রমাণ হচ্ছে যে, ধর্ম চর্চা মানুষকে মননশীল করছে না বরং উগ্রতার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

কুমিল্লার ঘটনার পর দেখা গেল, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা সবাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে তাদের কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কার্যক্রম বন্ধসহ ইন্টারনেট ব্যবস্থার গতিটা বেশ কম ছিল, যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলেছে এটা কারিগরি ত্রুটি, যদি এটা কারিগরি ত্রুটিও হয় তা শাপে বর ছিল। সর্বোপরি বিষয়টা এমন যে, গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো অবস্থা। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের অনুশীলন এমন একপর্যায়ে পৌঁছে যে, আফগানিস্তানের মতো তালেবান গজিয়ে উঠলে তা রুখতে কষ্ট সাধ্য হয়ে যাবে সরকারের। দেশের প্রতিটি পাড়া মহল্লা, অফিস, আদালত গড়ে উঠছে ধর্মপালানের স্থান। দেশের প্রতিটি বিল্ডিং (দশতলা হলে) রাখা হচ্ছে নামাজের জায়গা। সরকারি ব্যয়ে বিশাল বিশাল ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ে উঠছে? প্রশ্ন হলো এগুলোতে মূলত কি চর্চা হয়? তা কি সরকারিভাবে মনিটরিং হয় কখনো? দেশের গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে ঘরা নামাজের কাজে ব্যবহার করা হয়। অথচ দেখা যায় বিদ্যালয় থেকে ঢিল ছোড়া দূরে রয়েছে মসজিদ। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে পড়ুয়ারা ইসলাম ধর্ম পালনকারী পরিবার থেকে এসেছে তাদের শিক্ষকরা বাধ্য করান নামাজের ঘরে যেতে। অপর দিকে বিভিন্ন ধর্মের পরিবার থেকে আসা কমসংখ্যক শিক্ষার্থীরা নামাজের সময় গাছের তলা বা বিদ্যালয়ের মাঠে ঘুরাঘুরি করে সময় কাটায়।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উপাসনার বিষয়টি সমান না। যদি সব ধর্মপালনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি করে কক্ষ ধর্মীয় উপাসনার জন্য বরাদ্দ করা হয়, তাহলে বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে একটু ভেবে দেখুন। নিয়মানুসারে তো সব শিক্ষাথীদের বিদ্যালয়ে সমান অধিকার রয়েছে। সবার জন্য বিদ্যালয়ে উপাসনার বিষয়টি যদি সমান না হয় তাহলে অন্য ধর্মপালনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায্যতা করা হচ্ছে না , আর এই অন্যায্যতার পরিবেশে অন্য ধর্মের পড়–য়ারা এক ধরনের হীনমন্যতায় বেড়ে উঠছে। তাই দেখা যায় যে , বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী যারা ধর্ম চর্চার সুযোগ পায় তারা কম সংখ্যার ধর্ম পালনকারী শিক্ষার্থীদের বি ক্লাস বা দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ মনে করে। তাছাড়া আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় তাহলে মেয়ে পড়ুয়াদের স্কুল ইউনিফর্মের ক্ষেত্রে। ইসলাম ধর্ম পালনকারী পরিবার থেকে আসা পড়ুয়া মেয়েদের স্কল ইউনিফর্মে হিজাবের ব্যবস্থা রাখা হয়। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে তা থাকে না। বিদ্যালয়ে মানসিক বিভাজনের এটি একটি বিষয়। বিদ্যালয়ের পড়–য়াদের ইউনিফর্মে কেন ধরনের ভিন্নতা তৈরি করা হয়? সব মেয়ে শিক্ষার্থীর ইউনিফর্ম এক হলে সমস্যাটি কোথায়? শিক্ষাঙ্গনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ভাবে ধর্মীয় চিহ্নটি এরকম করে কারো শরীরে এঁকে দেয়াটা কি ঠিক?।

এভাবেই একটি মানসিক বিদ্বেষ নিয়ে দেশের কিশোর-কিশোরীরা বেড়ে উঠে। এর ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে পরিবর্তে একে অপরকে ঘৃণা করতে শেখে। পারস্পরিক হৃদতায় না বেড়ে উঠে মানুষ বেড়ে উঠছে বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে। আর তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক শত্রুতার সম্পর্ক। ফলে সুযোগসন্ধানীরা এ ধরনের সৃষ্ট ঘৃণানলে ঘি ঢালে এতেই সৃষ্ট হয় ধর্মীয় হাঙ্গামা। সৃষ্ট হাঙ্গমাটা হয়ে যায় রাজনৈতিক পুঁজি একে কেন্দ্র করে শুরু হয় রাজনৈতিক বাক্যালাপ, যে বাক্যালাপ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই মনে হয় এক ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির জন্য হাঙ্গামাটি তৈরি করা হয়। প্রতিটি ঘটনার পর সম্প্রীতি সম্প্রীতি বজায় রাখার স্লোগান উঠে। কাজের কাজ কতটা হয় তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই কার্যকরি কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

সরকারের উচিত দেশের সব ধর্মের ধর্মীয় উপাসনাগুলোতে ধর্ম চর্চা হয় না কি অন্য ধর্ম সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তা মনিটরিং করা। যদি বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তা যে কোন ধর্মের উপাসনালয় হোক না কেন ওই উপাসনালয়টি বন্ধ করে দেয়া।

দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে ধর্মীয় উপাসনালয়টি কক্ষ না রাখা। যদি কোন সরকারি কর্মী উপাসনা করবেন তাহলে তিনি দপ্তরে বাইরে উপাসনালয়ে গিয়ে উপাসনা করে আসবেন।

গ্রাম বা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপাসনার জন্য রুম নির্দিষ্ট না করা।

পড়–য়াদের ইউনিফর্ম একই রকম করা। কোনভাবেই পড়ুয়াদের মাঝে ইউনিফর্ম দিয়ে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি না করা।

ধর্মীয় শিক্ষার নামে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মনিটরিং আওতায় আনা, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার নামে কি মৌলবাদ শেখানো হচ্ছে তা নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। যদি ধর্মীয় বিদ্বেষ বা মৌলবাদ শেখানো হয় তা বন্ধ করে দেয়া।

ধর্মীয় জলসা বা সভার নামে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

কি কি বললে তা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এবং কোন কোন বিষয়গুলো স্পর্শকাতর তার সংগা নির্দিষ্ট করা। কোন বিষয় নিয়ে কথা বললে ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত হানা হয় তাও নির্দিষ্ট করা, কারণ এহসান গ্রুপ শরিয়াহ্র নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালালো অথচ এই এহসান গ্ররুপের শরিয়াহ্্ নিয়ে কথা বললে তা ওই সময় হয়ে যেত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, এই অনুভূতি শব্দটি দিয়ে এহসান গ্রুপ মানুষকে নিঃস্ব করল। তাই ধর্মীয় অনুভূতি বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত।

রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকা-ের জন্য ধর্মীয় উপাসনায় ব্যবহার করতে বা ওখানে প্রবেশ করে রাজনীতির প্রচার বন্ধ করা।

এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি কোন দিন আসবে না। শিকড় কেটে কা- পরিচর্যায় করলে গাছ বাচে না। সুতরাং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে বর্তমানে বিদ্যমান ধর্ম চর্চার বিষয়টি আগে তৃণমূলে সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১ , ০৩ কার্তিক ১৪২৮ ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

দেশে আবার স্লোগান উঠলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখুন। বছরে দুই তিন বার এ ধরনের স্লোগান শুনা যায়। কুমিল্লার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবার সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তা নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে বিষটা ছড়াতে পারেনি।

প্রশ্ন হলো, কুমিল্লার যে ঘটনাটি ঘটেছে তা কি কোন সুস্থ জ্ঞান সম্পন্ন মানুষেরা ঘটাতে পারে? আবার যার মস্তিস্ক অসুস্থ তার পক্ষে এরকম ঘটনা ঘটনো সম্ভব না? কারণ সে বিষয়টি বুঝবেই না। তাহলো ঘটলো কেন? দেশের দুইটি ধর্ম পালকারী মানুষ গুলো মাঝে পারস্পারিক সম্পর্কটা যে বৈরী তা কুমিল্লার ঘটনা থেকে বোঝা যায়। কুমিল্লার ঘটনাটি উনুনে ঘি ঢালার মতো। বিবাদমান মনোভাবে একটু বারুদের ছোঁয়া। এই ঘটনা থেকে দেখা যায় যে, দেশে সব ধর্মের অনুশীলন বাড়ছে কিন্তু কমে যাচ্ছে নৈতিক মূল্যবোধ। সারা দেশে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধর্মপালনকারীদের জন্য তৈরি করে দেয়া হচ্ছে উপাসনালয়, এর ফলে কিন্তু সামাজিক বা ধর্মীয় সম্প্রীতি সদ্ভাব তৈরি হচ্ছে না। এটা সহজেই অনুমেয় হয়ে যায় যে, ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে ধর্মীয় বিদ্ধেষ তৈরি করা হয়। সারা দেশে গত তিন যুগ ধরে জনসাধারণের মাঝে ধর্ম চর্চা জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয়গুলোতে বিশৃঙ্খলা রোধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাহাড়া দিতে হয়। অথচ আজ থেকে তিন যুগ আগে ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে পুলিশ পাহাড়ার প্রয়োজন হতো না। ধর্মীয় উপাসানলয়গুলোতে দুর্বৃত্ত তো দুরের কথা চোর ছেচ্ছর পর্যন্ত ঢুকতে ভয় পেতো। সরকারি ভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় তৈরি করায় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিটা কি তাহলে সংহিস হয়ে উঠলো? বার বার প্রমাণ হচ্ছে যে, ধর্ম চর্চা মানুষকে মননশীল করছে না বরং উগ্রতার দিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

কুমিল্লার ঘটনার পর দেখা গেল, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা সবাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে তাদের কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কার্যক্রম বন্ধসহ ইন্টারনেট ব্যবস্থার গতিটা বেশ কম ছিল, যদিও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বলেছে এটা কারিগরি ত্রুটি, যদি এটা কারিগরি ত্রুটিও হয় তা শাপে বর ছিল। সর্বোপরি বিষয়টা এমন যে, গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো অবস্থা। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের অনুশীলন এমন একপর্যায়ে পৌঁছে যে, আফগানিস্তানের মতো তালেবান গজিয়ে উঠলে তা রুখতে কষ্ট সাধ্য হয়ে যাবে সরকারের। দেশের প্রতিটি পাড়া মহল্লা, অফিস, আদালত গড়ে উঠছে ধর্মপালানের স্থান। দেশের প্রতিটি বিল্ডিং (দশতলা হলে) রাখা হচ্ছে নামাজের জায়গা। সরকারি ব্যয়ে বিশাল বিশাল ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ে উঠছে? প্রশ্ন হলো এগুলোতে মূলত কি চর্চা হয়? তা কি সরকারিভাবে মনিটরিং হয় কখনো? দেশের গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি করে ঘরা নামাজের কাজে ব্যবহার করা হয়। অথচ দেখা যায় বিদ্যালয় থেকে ঢিল ছোড়া দূরে রয়েছে মসজিদ। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে পড়ুয়ারা ইসলাম ধর্ম পালনকারী পরিবার থেকে এসেছে তাদের শিক্ষকরা বাধ্য করান নামাজের ঘরে যেতে। অপর দিকে বিভিন্ন ধর্মের পরিবার থেকে আসা কমসংখ্যক শিক্ষার্থীরা নামাজের সময় গাছের তলা বা বিদ্যালয়ের মাঠে ঘুরাঘুরি করে সময় কাটায়।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সব ধর্মের শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় উপাসনার বিষয়টি সমান না। যদি সব ধর্মপালনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি করে কক্ষ ধর্মীয় উপাসনার জন্য বরাদ্দ করা হয়, তাহলে বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে একটু ভেবে দেখুন। নিয়মানুসারে তো সব শিক্ষাথীদের বিদ্যালয়ে সমান অধিকার রয়েছে। সবার জন্য বিদ্যালয়ে উপাসনার বিষয়টি যদি সমান না হয় তাহলে অন্য ধর্মপালনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি অন্যায্যতা করা হচ্ছে না , আর এই অন্যায্যতার পরিবেশে অন্য ধর্মের পড়–য়ারা এক ধরনের হীনমন্যতায় বেড়ে উঠছে। তাই দেখা যায় যে , বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী যারা ধর্ম চর্চার সুযোগ পায় তারা কম সংখ্যার ধর্ম পালনকারী শিক্ষার্থীদের বি ক্লাস বা দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ মনে করে। তাছাড়া আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় তাহলে মেয়ে পড়ুয়াদের স্কুল ইউনিফর্মের ক্ষেত্রে। ইসলাম ধর্ম পালনকারী পরিবার থেকে আসা পড়ুয়া মেয়েদের স্কল ইউনিফর্মে হিজাবের ব্যবস্থা রাখা হয়। অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে তা থাকে না। বিদ্যালয়ে মানসিক বিভাজনের এটি একটি বিষয়। বিদ্যালয়ের পড়–য়াদের ইউনিফর্মে কেন ধরনের ভিন্নতা তৈরি করা হয়? সব মেয়ে শিক্ষার্থীর ইউনিফর্ম এক হলে সমস্যাটি কোথায়? শিক্ষাঙ্গনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ভাবে ধর্মীয় চিহ্নটি এরকম করে কারো শরীরে এঁকে দেয়াটা কি ঠিক?।

এভাবেই একটি মানসিক বিদ্বেষ নিয়ে দেশের কিশোর-কিশোরীরা বেড়ে উঠে। এর ফলে পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে পরিবর্তে একে অপরকে ঘৃণা করতে শেখে। পারস্পরিক হৃদতায় না বেড়ে উঠে মানুষ বেড়ে উঠছে বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে। আর তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক শত্রুতার সম্পর্ক। ফলে সুযোগসন্ধানীরা এ ধরনের সৃষ্ট ঘৃণানলে ঘি ঢালে এতেই সৃষ্ট হয় ধর্মীয় হাঙ্গামা। সৃষ্ট হাঙ্গমাটা হয়ে যায় রাজনৈতিক পুঁজি একে কেন্দ্র করে শুরু হয় রাজনৈতিক বাক্যালাপ, যে বাক্যালাপ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই মনে হয় এক ধরনের রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির জন্য হাঙ্গামাটি তৈরি করা হয়। প্রতিটি ঘটনার পর সম্প্রীতি সম্প্রীতি বজায় রাখার স্লোগান উঠে। কাজের কাজ কতটা হয় তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই কার্যকরি কিছু পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

সরকারের উচিত দেশের সব ধর্মের ধর্মীয় উপাসনাগুলোতে ধর্ম চর্চা হয় না কি অন্য ধর্ম সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তা মনিটরিং করা। যদি বিদ্বেষ ছড়ানো হয় তা যে কোন ধর্মের উপাসনালয় হোক না কেন ওই উপাসনালয়টি বন্ধ করে দেয়া।

দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে ধর্মীয় উপাসনালয়টি কক্ষ না রাখা। যদি কোন সরকারি কর্মী উপাসনা করবেন তাহলে তিনি দপ্তরে বাইরে উপাসনালয়ে গিয়ে উপাসনা করে আসবেন।

গ্রাম বা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপাসনার জন্য রুম নির্দিষ্ট না করা।

পড়–য়াদের ইউনিফর্ম একই রকম করা। কোনভাবেই পড়ুয়াদের মাঝে ইউনিফর্ম দিয়ে ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি না করা।

ধর্মীয় শিক্ষার নামে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মনিটরিং আওতায় আনা, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার নামে কি মৌলবাদ শেখানো হচ্ছে তা নিবিঢ়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা। যদি ধর্মীয় বিদ্বেষ বা মৌলবাদ শেখানো হয় তা বন্ধ করে দেয়া।

ধর্মীয় জলসা বা সভার নামে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

কি কি বললে তা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এবং কোন কোন বিষয়গুলো স্পর্শকাতর তার সংগা নির্দিষ্ট করা। কোন বিষয় নিয়ে কথা বললে ধর্মীয় অনুভূতি আঘাত হানা হয় তাও নির্দিষ্ট করা, কারণ এহসান গ্রুপ শরিয়াহ্র নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা নিয়ে পালালো অথচ এই এহসান গ্ররুপের শরিয়াহ্্ নিয়ে কথা বললে তা ওই সময় হয়ে যেত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, এই অনুভূতি শব্দটি দিয়ে এহসান গ্রুপ মানুষকে নিঃস্ব করল। তাই ধর্মীয় অনুভূতি বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত।

রাজনৈতিক নেতাদের রাজনৈতিক কর্মকা-ের জন্য ধর্মীয় উপাসনায় ব্যবহার করতে বা ওখানে প্রবেশ করে রাজনীতির প্রচার বন্ধ করা।

এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে সমাজে ধর্মীয় সম্প্রীতি কোন দিন আসবে না। শিকড় কেটে কা- পরিচর্যায় করলে গাছ বাচে না। সুতরাং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে বর্তমানে বিদ্যমান ধর্ম চর্চার বিষয়টি আগে তৃণমূলে সংস্কারের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]