বিশ্ববিদ্যালয় সিটিং অ্যালাউন্স নৈতিকতা বহির্ভূত : ইউজিসি

বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সভার নামে ‘সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণকে নৈতিকতা বহির্ভূত’ আখ্যায়িত করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা অবৈধ হারে সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ করছে, যা মোটেও কাম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সভা আহ্বান একটি রুটিন কাজ এবং দায়িত্বের অংশমাত্র। অফিস চলাকালীন এসব কাজের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স (সম্মানী) গ্রহণ মোটেই সমীচীন নয়’।

ইউজিসি আয়োজিত দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিবিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গতকাল এ কথা জানান ড. কাজী শহীদুল্লাহ।

ইউজিসি সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন, কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম ও প্রফেসর ড. আবু তাহের বক্তব্য দেন। সেমিনার মুখ্য আলোচক ছিলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। অনুষ্ঠানে ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। সেমিনারে ইউজিসির পরিচালকসহ ২৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অংশ নেন।

ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়েই ট্রাস্টি বোর্ড, সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন সভার নামে ন্যূনতম পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ নিচ্ছেন। এই টাকার লোভে অনেক বিশ^বিদ্যালয় প্রয়োজন ছাড়াও প্রতিমাসে তিন-চারবার সভা আহ্বান করছেন। অথচ ২০১০ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আইনে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়কে ‘অলাভজনক’ অভিহিত করা হয়েছে।

দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিধ মিটিংয়ে ‘সিটিং অ্যালাউন্সের’ পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘অফিস চলাকালীন এসব মিটিংয়ের সিটিং অ্যালাউন্সসহ অন্যান্য খরচ বিশ্ববদ্যিালয়ে ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। এসব রুটিন কাজের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স প্রদান করা ঠিক নয়।’

তিনি সমাজে দুর্নীতি প্রতিরোধে পাঠ্যক্রমে সততা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন।

পরিবার ও স্কুল পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানিয়ে ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের সম্মানিত করার পরিবর্তে ঘৃণা করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

ইউজিসি সদস্য প্রফেসর দিল আফরোজা বেগম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে করা কমিশনের তদন্ত দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তার অধীনে গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ১৩টি তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এ রকম চলতে থাকলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি না কমে বরং বাড়তে থাকবে বলে মনে করেন ড. দিল আফরোজ বেগম।

প্রফেসর আবু তাহের বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে অটোমেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্নীতি অনেকাংশে কমায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্টোটাই ঘটেছে।’

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘সঙ্গবদ্ধ দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়ছে।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অডিট ও তদন্ত সেলকে আরও জোরদার করার পরামর্শ দেন।

সেমিনারে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদককে শক্তিশালী করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, এডুকেশন মোটিভেশন, ট্যাক্স রিটার্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।

বুধবার, ২০ অক্টোবর ২০২১ , ০৪ কার্তিক ১৪২৮ ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিশ্ববিদ্যালয় সিটিং অ্যালাউন্স নৈতিকতা বহির্ভূত : ইউজিসি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সভার নামে ‘সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণকে নৈতিকতা বহির্ভূত’ আখ্যায়িত করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেছেন, ‘বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা অবৈধ হারে সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ করছে, যা মোটেও কাম্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সভা আহ্বান একটি রুটিন কাজ এবং দায়িত্বের অংশমাত্র। অফিস চলাকালীন এসব কাজের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স (সম্মানী) গ্রহণ মোটেই সমীচীন নয়’।

ইউজিসি আয়োজিত দুর্নীতি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধিবিষয়ক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গতকাল এ কথা জানান ড. কাজী শহীদুল্লাহ।

ইউজিসি সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন, কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. দিল আফরোজা বেগম ও প্রফেসর ড. আবু তাহের বক্তব্য দেন। সেমিনার মুখ্য আলোচক ছিলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। অনুষ্ঠানে ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ চন্দ্র ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। সেমিনারে ইউজিসির পরিচালকসহ ২৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অংশ নেন।

ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়েই ট্রাস্টি বোর্ড, সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন সভার নামে ন্যূনতম পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ‘সিটিং অ্যালাউন্স’ নিচ্ছেন। এই টাকার লোভে অনেক বিশ^বিদ্যালয় প্রয়োজন ছাড়াও প্রতিমাসে তিন-চারবার সভা আহ্বান করছেন। অথচ ২০১০ সালে প্রণীত বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় আইনে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়কে ‘অলাভজনক’ অভিহিত করা হয়েছে।

দিনের পর দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিধ মিটিংয়ে ‘সিটিং অ্যালাউন্সের’ পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘অফিস চলাকালীন এসব মিটিংয়ের সিটিং অ্যালাউন্সসহ অন্যান্য খরচ বিশ্ববদ্যিালয়ে ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। এসব রুটিন কাজের জন্য সিটিং অ্যালাউন্স প্রদান করা ঠিক নয়।’

তিনি সমাজে দুর্নীতি প্রতিরোধে পাঠ্যক্রমে সততা, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন।

পরিবার ও স্কুল পর্যায় থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানিয়ে ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের সম্মানিত করার পরিবর্তে ঘৃণা করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

ইউজিসি সদস্য প্রফেসর দিল আফরোজা বেগম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন ব্যক্তিদের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তিনি দুর্নীতির অভিযোগে করা কমিশনের তদন্ত দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তার অধীনে গত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ১৩টি তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এ রকম চলতে থাকলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি না কমে বরং বাড়তে থাকবে বলে মনে করেন ড. দিল আফরোজ বেগম।

প্রফেসর আবু তাহের বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে অটোমেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস পাবে। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্নীতি অনেকাংশে কমায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উল্টোটাই ঘটেছে।’

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘সঙ্গবদ্ধ দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং সমাজে বৈষম্য বাড়ছে।’ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দুর্নীতি বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অডিট ও তদন্ত সেলকে আরও জোরদার করার পরামর্শ দেন।

সেমিনারে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদককে শক্তিশালী করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, এডুকেশন মোটিভেশন, ট্যাক্স রিটার্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়।