সড়কে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন প্রাণ হারায়

বিশৃঙ্খলা চলছে পরিবহন সেক্টরে

আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। পঞ্চমবারের মতো দেশব্যাপী এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’। কিন্তু সারাদেশে বিশৃঙ্খলভাবে চলছে সড়ক পরিবহন সেক্টর। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বেসরকারি হিসেবে গত ৬ বছরে ৩১ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ হাজার ৮৫৬ জন নিহত ও ৯১ হাজার ৩৫৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সংস্থা। বিশৃঙ্খল এই গণপরিবহন ব্যবস্থা শৃঙ্খলা আনতে একাধিক কমিটি ও উপকমিটি হলেও কোন কাজ হচ্ছে না।

২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে ‘সড়ক পরিবহন আইন’ পাস হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া ওই বছর ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও যানজট নিরসনের জন্য ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা’ পদ্ধতি প্রবর্তনের কার্যক্রম সমন্বয় করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রকে আহবায়ক করে ১০ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

গত ৩ বছরে ১৮ বার মিটিং হলেও পরীক্ষামূলক বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালু করতে পারেনি সরকার। এছাড়া সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না। তাই গণপরিবহন সেক্টরে সরকার প্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিবহন সেক্টরের বড় বড় মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মোয়াজ্জেম হোসেন সংবাদকে বলেন, ‘পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক তৈরি করা না গেলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে না। ঢাকার শহরে বিদ্যমান বাস কোম্পানি দিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব্য নয়। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা এই সেক্টরকে জিম্মি করে রেখেছে।’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক রয়েছে উল্লেখ তিনি বলেন, ‘ওই সব দেশে এক রুটে চলাচল করে একটি কোম্পানির বাস। এজন্য এত বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা যায়। আবার বাসগুলোতে যাত্রীদের খুব বেশি ভিড়ও হয় না। অথচ ঢাকার বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের প্রচ- চাপ থাকে সব সময়ই। যাত্রীদের মধ্যেও বাসে উঠার জন্য প্রতিযোগিতা লেগে যায়। অনেক যাত্রী নিয়মিতই দাঁড়িয়ে এমনকি দরজায় ঝুলেও যাতায়াত করেন।’

তাই মেট্রোরেলের চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব্য বাস রুটের মাধ্যমে। কিন্তু বাস রুটগুলো সংস্কারের জন্য সরকারের কোন বিনিয়োগ নেই। হাজার হাজার কোটি বিনিয়োগ করে মেট্রোরেল গড়ে তোলার চেয়ে রাজধানীর বিদ্যমান বাস ব্যবস্থা সংস্কার অনেক বেশি লাভজনক হতো বলে জানান তিনি।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে

৬৪ জন প্রাণ হারায়

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। ১৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হচ্ছে। তবে সরকারি হিসেবে, বিগত ২০১৫ সালে ৬৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৬৪২ জন নিহত, ২১৮৫৫ জন আহত হয়েছে। ২০১৬ সালে ৪৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬০৫৫ জন নিহত, ১৫৯১৪ জন আহত হয়েছে।

২০১৭ সালে ৪৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯৭ জন নিহত, ১৬১৯৩ জন আহত হয়েছে। ২০১৮ সালে ৫৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২২১ জন নিহত, ১৫৪৬৬ জন আহত হয়েছে। ২০১৯ সালে ৫৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৮৫৫ জন নিহত, ১৩৩৩০ জন আহত হয়েছে। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণে বছরব্যাপী লকডাউনে পরিবহন বন্ধ থাকা অবস্থায় ৪৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৬৮৬ জন নিহত ও ৮৬০০ জন আহত হয়েছে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

বিশৃঙ্খল ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহন সেক্টর

ঢাকা মহানগরীতে যানজটের কারণে কমে গেছে বাস রুট। ঢাকা মেট্রোপলিটন পরিবহন কমিটির অনুমোদিত ৩৮৬টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ১২৮টি রুট। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে এ সব রুটে ১ হাজার ৬৪৬টি বাস-মিনিবাস রুট পারমিট ছাড়াই চলাচল করছে।

বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৭ হাজার ৯১টি। এর মধ্যে রুট পারমিট রয়েছে ৩ হাজার ৪২৭টি পরিবহনের। অন্য রুটের পারমিটধারী পরিবহনের সংখ্যা ২ হাজার ১৮টি। এ সব বাস-মিনিবাস আবার সরকারি নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত আসনযুক্ত করে চলাচল করছে বলে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)’র সূত্র জানায়।

এভাবেই রাজধানীর গণপরিবহন সার্ভিসে চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। শৃঙ্খলা আনার জন্য বাস রুট রেশনালাইজেশনের সমন্বয় কমিটিসহ ডজনখানিক কমিটি-উপকমিটি গঠিত হলেও কাজ হচ্ছে না। সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের গন্ডি থেকে বের হতে পারছে না এ সব কমিটি। তাই সরকার একাধিক সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

৬৯ শতাংশ যাত্রী বাস-মিনিবাসের ওপর নির্ভরশীল

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)’র এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, মেট্রোরেল গড়ে তোলার চেয়ে রাজধানীর বিদ্যমান বাস ব্যবস্থা সংস্কার অনেক বেশি লাভজনক। এতে অনেক কম বিনিয়োগে অধিক যাত্রী সেবা নিশ্চিত করা যাবে। ঢাকার পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলায় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ শীর্ষক এ সমীক্ষাটি পরিচালনা করে স্পেনের অ্যাডভান্স লজিস্টিকস গ্রুপ।

এতে বলা হয়, বর্তমানে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোয় দৈনিক ৩ কোটি ট্রিপ (যাতায়াত) হয়। এর ৬৯ শতাংশ বাস-মিনিবাসের ওপর নির্ভরশীল। আগামী ২০ বছরে এ ট্রিপ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৫ কোটিতে। এ ট্রিপের ৭৫-৮০ শতাংশ বাসের ওপর নির্ভরশীল হবে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় মাত্র ৪৫ শতাংশ যাত্রী বাসে পরিবহন করা যাবে। এক্ষেত্রে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ও পরিকল্পিত বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

সমীক্ষার তথ্যমতে, বর্ধিত চাহিদা মেটাতে বাস খাতে আগামী ১০-১৫ বছরে মাত্র ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এর পরিবর্তে মেট্রোরেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে এর মাধ্যমেও বাসের সব যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে না।

এর আগে ২০০৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক এ ধরনের সুপারিশ করেছিল, যা বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে এক রুটের বিদ্যমান বাসগুলোকে একটি কোম্পানিতে পরিণত করতে হবে, যা ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চ্যাইজি’ নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, প্রতিটি রুটের মালিকদের সমন্বয়ে একটি করে বৃহৎ কোম্পানি গঠন করতে হবে। ১০ মিনিট পর পর একটি গন্তব্য থেকে বাস ছেড়ে যাবে। আর পরিবহন শ্রমিকদের বেতন থাকবে নির্দিষ্ট। বাসে ভেতর কোন ধরনের ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে না। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে উঠবে যাত্রীরা। মাসশেষে সব ধরনের ব্যয় শেষে লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ করে দিতে হবে।

শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১ , ০৬ কার্তিক ১৪২৮ ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সড়কে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন প্রাণ হারায়

বিশৃঙ্খলা চলছে পরিবহন সেক্টরে

ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

আজ জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। পঞ্চমবারের মতো দেশব্যাপী এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘গতিসীমা মেনে চলি, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করি’। কিন্তু সারাদেশে বিশৃঙ্খলভাবে চলছে সড়ক পরিবহন সেক্টর। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বেসরকারি হিসেবে গত ৬ বছরে ৩১ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ হাজার ৮৫৬ জন নিহত ও ৯১ হাজার ৩৫৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সংস্থা। বিশৃঙ্খল এই গণপরিবহন ব্যবস্থা শৃঙ্খলা আনতে একাধিক কমিটি ও উপকমিটি হলেও কোন কাজ হচ্ছে না।

২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে ‘সড়ক পরিবহন আইন’ পাস হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া ওই বছর ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও যানজট নিরসনের জন্য ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা’ পদ্ধতি প্রবর্তনের কার্যক্রম সমন্বয় করতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রকে আহবায়ক করে ১০ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

গত ৩ বছরে ১৮ বার মিটিং হলেও পরীক্ষামূলক বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালু করতে পারেনি সরকার। এছাড়া সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয় না। তাই গণপরিবহন সেক্টরে সরকার প্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিবহন সেক্টরের বড় বড় মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মোয়াজ্জেম হোসেন সংবাদকে বলেন, ‘পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক তৈরি করা না গেলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে না। ঢাকার শহরে বিদ্যমান বাস কোম্পানি দিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব্য নয়। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা এই সেক্টরকে জিম্মি করে রেখেছে।’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক রয়েছে উল্লেখ তিনি বলেন, ‘ওই সব দেশে এক রুটে চলাচল করে একটি কোম্পানির বাস। এজন্য এত বেশি সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা যায়। আবার বাসগুলোতে যাত্রীদের খুব বেশি ভিড়ও হয় না। অথচ ঢাকার বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের প্রচ- চাপ থাকে সব সময়ই। যাত্রীদের মধ্যেও বাসে উঠার জন্য প্রতিযোগিতা লেগে যায়। অনেক যাত্রী নিয়মিতই দাঁড়িয়ে এমনকি দরজায় ঝুলেও যাতায়াত করেন।’

তাই মেট্রোরেলের চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব্য বাস রুটের মাধ্যমে। কিন্তু বাস রুটগুলো সংস্কারের জন্য সরকারের কোন বিনিয়োগ নেই। হাজার হাজার কোটি বিনিয়োগ করে মেট্রোরেল গড়ে তোলার চেয়ে রাজধানীর বিদ্যমান বাস ব্যবস্থা সংস্কার অনেক বেশি লাভজনক হতো বলে জানান তিনি।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে

৬৪ জন প্রাণ হারায়

সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। ১৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হচ্ছে। তবে সরকারি হিসেবে, বিগত ২০১৫ সালে ৬৫৮১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮৬৪২ জন নিহত, ২১৮৫৫ জন আহত হয়েছে। ২০১৬ সালে ৪৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬০৫৫ জন নিহত, ১৫৯১৪ জন আহত হয়েছে।

২০১৭ সালে ৪৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯৭ জন নিহত, ১৬১৯৩ জন আহত হয়েছে। ২০১৮ সালে ৫৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২২১ জন নিহত, ১৫৪৬৬ জন আহত হয়েছে। ২০১৯ সালে ৫৫১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৮৫৫ জন নিহত, ১৩৩৩০ জন আহত হয়েছে। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণে বছরব্যাপী লকডাউনে পরিবহন বন্ধ থাকা অবস্থায় ৪৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৬৮৬ জন নিহত ও ৮৬০০ জন আহত হয়েছে বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।

বিশৃঙ্খল ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহন সেক্টর

ঢাকা মহানগরীতে যানজটের কারণে কমে গেছে বাস রুট। ঢাকা মেট্রোপলিটন পরিবহন কমিটির অনুমোদিত ৩৮৬টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ১২৮টি রুট। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসেবে এ সব রুটে ১ হাজার ৬৪৬টি বাস-মিনিবাস রুট পারমিট ছাড়াই চলাচল করছে।

বর্তমানে ঢাকায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৭ হাজার ৯১টি। এর মধ্যে রুট পারমিট রয়েছে ৩ হাজার ৪২৭টি পরিবহনের। অন্য রুটের পারমিটধারী পরিবহনের সংখ্যা ২ হাজার ১৮টি। এ সব বাস-মিনিবাস আবার সরকারি নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত আসনযুক্ত করে চলাচল করছে বলে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)’র সূত্র জানায়।

এভাবেই রাজধানীর গণপরিবহন সার্ভিসে চলছে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। শৃঙ্খলা আনার জন্য বাস রুট রেশনালাইজেশনের সমন্বয় কমিটিসহ ডজনখানিক কমিটি-উপকমিটি গঠিত হলেও কাজ হচ্ছে না। সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের গন্ডি থেকে বের হতে পারছে না এ সব কমিটি। তাই সরকার একাধিক সিদ্ধান্ত নিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

৬৯ শতাংশ যাত্রী বাস-মিনিবাসের ওপর নির্ভরশীল

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)’র এক সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, মেট্রোরেল গড়ে তোলার চেয়ে রাজধানীর বিদ্যমান বাস ব্যবস্থা সংস্কার অনেক বেশি লাভজনক। এতে অনেক কম বিনিয়োগে অধিক যাত্রী সেবা নিশ্চিত করা যাবে। ঢাকার পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলায় বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ শীর্ষক এ সমীক্ষাটি পরিচালনা করে স্পেনের অ্যাডভান্স লজিস্টিকস গ্রুপ।

এতে বলা হয়, বর্তমানে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোয় দৈনিক ৩ কোটি ট্রিপ (যাতায়াত) হয়। এর ৬৯ শতাংশ বাস-মিনিবাসের ওপর নির্ভরশীল। আগামী ২০ বছরে এ ট্রিপ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ৫ কোটিতে। এ ট্রিপের ৭৫-৮০ শতাংশ বাসের ওপর নির্ভরশীল হবে। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় মাত্র ৪৫ শতাংশ যাত্রী বাসে পরিবহন করা যাবে। এক্ষেত্রে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি ও পরিকল্পিত বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

সমীক্ষার তথ্যমতে, বর্ধিত চাহিদা মেটাতে বাস খাতে আগামী ১০-১৫ বছরে মাত্র ৫০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। এর পরিবর্তে মেট্রোরেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে এর মাধ্যমেও বাসের সব যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে না।

এর আগে ২০০৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাংক এ ধরনের সুপারিশ করেছিল, যা বাস্তবায়ন হয়নি। এক্ষেত্রে এক রুটের বিদ্যমান বাসগুলোকে একটি কোম্পানিতে পরিণত করতে হবে, যা ‘বাস রুট ফ্র্যাঞ্চ্যাইজি’ নামে পরিচিত। এতে বলা হয়, প্রতিটি রুটের মালিকদের সমন্বয়ে একটি করে বৃহৎ কোম্পানি গঠন করতে হবে। ১০ মিনিট পর পর একটি গন্তব্য থেকে বাস ছেড়ে যাবে। আর পরিবহন শ্রমিকদের বেতন থাকবে নির্দিষ্ট। বাসে ভেতর কোন ধরনের ভাড়া আদায়ের ব্যবস্থা থাকবে না। কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে বাসে উঠবে যাত্রীরা। মাসশেষে সব ধরনের ব্যয় শেষে লভ্যাংশ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে ভাগ করে দিতে হবে।