ভবদহ : বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত, মৃতের দাফন ও সৎকারের জায়গা নেই

হঠাৎ দু’দিনের বৃষ্টিতে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পানিবন্দী ভবদহ এলাকার মানুষ। তলিয়ে গেছে নতুন নতুন এলাকা। দেখা দিয়েছে খাদ্য, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানির অভাব। এছাড়া মৃতের দাফন-কাফন, সৎকারেরও জায়গা হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পানিবন্দী এলাকায় ত্রাণ সামগ্রীসহ কোন ধরনের সাহায্য পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন রাস্তার ওপর খুপড়িঘর বেঁধে থাকা হাটগাছা গ্রামের ঠাকুর দাস ম-ল। অভিশপ্ত ভবদহে প্রায় চারদশক ধরে জলাবদ্ধতার শিকার মণিরামপুর- কেশবপুর, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা থানার শতাধিক গ্রামের বাসিন্দারা। এ চারটি উপজেলার লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে জীবনযাপন করছেন।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির মশিয়াহাটি আঞ্চলিক কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষক উৎপল বিশ্বাস বলেন, হঠাৎ করে বৃষ্টি হওয়ায় এলাকায় পানি আরও বেড়ে গেছে। মানুষ খাদ্য চিকিৎসা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছেন। এসব ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কেউ কোন খোঁজখবর নিচ্ছেন না। অনেকেই বাড়ি-ঘর ছেড়ে রাস্তা অথবা উঁচুস্থানে খুপড়িঘর বেঁধে কোন রকম জীবনযাপন করছেন। মানুষ মারা গেলে দাফন করার জায়গা মিলছে না। অনেক মৃত্যু ব্যক্তির দাফন করতে দূরের কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আম্রঝুটা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম মঙ্গলবার সকালে আকস্কিক মৃত্যুবরণ করলে তাকে দাফন-কাফন করতে মহাবিপাকে পড়েন তারা। এলাকায় পানিতে তলিয়ে থাকায় নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা সম্ভব হয়নি। তাকে অন্যত্র দাফন করতে হয়েছে। মরহুমের ছোট ছেলে কুলটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর আবদুর রাজ্জাক কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমার বসতবাড়ি এবং কবরস্থান পানিতে প্লাবিত থাকায় মৃত মাকে দাফন-কাফন করতে চরম হিমশিম খেতে হয়েছে।

বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি থাকায় আমার নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে মৃত মায়ের গোসল করিয়েছি। এছাড়া নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে মাজাপানি জমে থাকায় গোষ্ঠির (শরীকদের) সাবেক কবরস্থানে মায়ের দাফন কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, আজ নিজের মাকে নিজস্ব কবরস্থানে না রাখতে পেরে এবং সুষ্ঠু পরিবেশে দাফন না করতে পারায় আমাদের পরিবারের মাঝে একটা ঝড় বয়ে গেলো।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব চৈতন্য পাল বলেন, ভবদহের সমস্যার কারণে মানুষ যে অবস্থায় ছিলো হঠাৎ ক’দিনের বৃষ্টিতে জল বেড়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। এই মুহূর্তে আমডাঙ্গা খাল স্রোতধারা সৃষ্টির জন্য যা করণীয় তাই করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি মশিয়াহাটি হাই স্কুলে এক মিটিং করা হয়।

পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিত বাওয়ালী বলেন, এই মুহূর্তে ভবদহ অঞ্চলের মানুষ বাঁচাতে ভবদহের ২১ ভেন্টের কপাট খুলে দেয়ার বিকল্প কিছুই ভাবছি না। এছাড়া আমডাঙ্গা খালে জলধারা তৈরি করতে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। ওই অঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দায়ী করে রনজিত বাওয়ালী আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ভবদহের সমস্যাকে জিইয়ে রেখে ব্যবসা করছে। এর সাথে এলাকার কিছু নামধারী নেতা ও জনপ্রতিনিধি জড়িত রয়েছেন। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহিদুল ইসলাম বলেন, ২১ ভেন্টের মধ্যে থেকে কয়েকটি ভেন্টের কপাট খুলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া দ্রুত পানি সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১ , ০৬ কার্তিক ১৪২৮ ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভবদহ : বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত, মৃতের দাফন ও সৎকারের জায়গা নেই

প্রতিনিধি, মণিরামপুর (যশোর)

image

মণিরামপুর (যশোর) : মৃতদেহ দাফনের জায়গা না থাকায় অন্যত্র নিয়ে যান স্বজনরা-সংবাদ

হঠাৎ দু’দিনের বৃষ্টিতে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পানিবন্দী ভবদহ এলাকার মানুষ। তলিয়ে গেছে নতুন নতুন এলাকা। দেখা দিয়েছে খাদ্য, বস্ত্র, বিশুদ্ধ পানির অভাব। এছাড়া মৃতের দাফন-কাফন, সৎকারেরও জায়গা হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত পানিবন্দী এলাকায় ত্রাণ সামগ্রীসহ কোন ধরনের সাহায্য পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন রাস্তার ওপর খুপড়িঘর বেঁধে থাকা হাটগাছা গ্রামের ঠাকুর দাস ম-ল। অভিশপ্ত ভবদহে প্রায় চারদশক ধরে জলাবদ্ধতার শিকার মণিরামপুর- কেশবপুর, খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা থানার শতাধিক গ্রামের বাসিন্দারা। এ চারটি উপজেলার লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দী হয়ে জীবনযাপন করছেন।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির মশিয়াহাটি আঞ্চলিক কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষক উৎপল বিশ্বাস বলেন, হঠাৎ করে বৃষ্টি হওয়ায় এলাকায় পানি আরও বেড়ে গেছে। মানুষ খাদ্য চিকিৎসা এবং বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছেন। এসব ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারিভাবে কেউ কোন খোঁজখবর নিচ্ছেন না। অনেকেই বাড়ি-ঘর ছেড়ে রাস্তা অথবা উঁচুস্থানে খুপড়িঘর বেঁধে কোন রকম জীবনযাপন করছেন। মানুষ মারা গেলে দাফন করার জায়গা মিলছে না। অনেক মৃত্যু ব্যক্তির দাফন করতে দূরের কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আম্রঝুটা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম মঙ্গলবার সকালে আকস্কিক মৃত্যুবরণ করলে তাকে দাফন-কাফন করতে মহাবিপাকে পড়েন তারা। এলাকায় পানিতে তলিয়ে থাকায় নিজ পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা সম্ভব হয়নি। তাকে অন্যত্র দাফন করতে হয়েছে। মরহুমের ছোট ছেলে কুলটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর আবদুর রাজ্জাক কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক আবদুল কুদ্দুস বলেন, আমার বসতবাড়ি এবং কবরস্থান পানিতে প্লাবিত থাকায় মৃত মাকে দাফন-কাফন করতে চরম হিমশিম খেতে হয়েছে।

বাড়ির উঠানে হাঁটুপানি থাকায় আমার নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ে মৃত মায়ের গোসল করিয়েছি। এছাড়া নিজেদের পারিবারিক কবরস্থানে মাজাপানি জমে থাকায় গোষ্ঠির (শরীকদের) সাবেক কবরস্থানে মায়ের দাফন কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, আজ নিজের মাকে নিজস্ব কবরস্থানে না রাখতে পেরে এবং সুষ্ঠু পরিবেশে দাফন না করতে পারায় আমাদের পরিবারের মাঝে একটা ঝড় বয়ে গেলো।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব চৈতন্য পাল বলেন, ভবদহের সমস্যার কারণে মানুষ যে অবস্থায় ছিলো হঠাৎ ক’দিনের বৃষ্টিতে জল বেড়ে যাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। এই মুহূর্তে আমডাঙ্গা খাল স্রোতধারা সৃষ্টির জন্য যা করণীয় তাই করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সংগঠনটি। মঙ্গলবার ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি মশিয়াহাটি হাই স্কুলে এক মিটিং করা হয়।

পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রনজিত বাওয়ালী বলেন, এই মুহূর্তে ভবদহ অঞ্চলের মানুষ বাঁচাতে ভবদহের ২১ ভেন্টের কপাট খুলে দেয়ার বিকল্প কিছুই ভাবছি না। এছাড়া আমডাঙ্গা খালে জলধারা তৈরি করতে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। ওই অঞ্চলের স্থায়ী জলাবদ্ধতার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দায়ী করে রনজিত বাওয়ালী আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ভবদহের সমস্যাকে জিইয়ে রেখে ব্যবসা করছে। এর সাথে এলাকার কিছু নামধারী নেতা ও জনপ্রতিনিধি জড়িত রয়েছেন। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহিদুল ইসলাম বলেন, ২১ ভেন্টের মধ্যে থেকে কয়েকটি ভেন্টের কপাট খুলে দেয়া হয়েছে। এছাড়া দ্রুত পানি সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।