খুলে দেয়া হচ্ছে পায়রা সেতু

বহুল প্রতীক্ষিত পায়রা সেতু খুলে দেয়া হচ্ছে। আগামীকাল ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতু উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এই সেতুতে যানবাহ চলাচল শুরু হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ ইসমাত মাহমুদা স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পায়রা নদীর ওপর পায়রা সেতু উদ্বোধনে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধনে অংশ নেবেন। উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণার পর পায়রা সেতু এলাকায় সাজসাজ রব পড়েছে। পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী এলাকার পায়রা নদীর ওপর নির্মিত পায়রা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য আরেকটি পদ্মা সেতুর মতো হবে। দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ ও সওজ। চীনা প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ডব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটি নির্মাণ করছে।

সরকার ২০১২ সালের মে মাসে সেতু নির্মাণের প্রকল্পে অনুমোদন দেয়। শুরুতে সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১৩ দশমিক ২৮ কোটি টাকা । তবে পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন করে প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় চূড়ান্ত করা হয়। সর্বশেষ এই সেতুটি নির্মাণে চুক্তি মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক হাজার ১৭০ কোটি টাকা। তবে সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ১১৮ কোটি। এতে সাশ্রয় হচ্ছে ৫২ কোটি টাকা।

এক সময় সড়ক পথে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা যেতে ১০টি নদী ফেরিতে পারাপার হতে হতো। তবে এখনও দুটি নদীতে ফেরি পারাপার হতে হয়। একটি পদ্মা, অন্যটি পায়রা। নদী পারাপারে দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে। পটুয়াখালীর পায়রা সেতুটির অবকাঠামোর শেষ হয়েছে। এই সেতুটি উন্মুক্ত হলে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগে আরেক ধাপ এগোবে দক্ষিণাঞ্চল।

পায়রা সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকাকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে পায়রা-লেবুখালী সেতু। এ ধারাবাহিকতায় ২৪ অক্টোবর সেতুটি যানচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। সেতু উদ্বোধনের আগে শেষ মুহূর্তে চলছে নানা আয়োজন।

এ সেতুর কিছু বিশেষত্ব আছে। এটি দেশের সব থেকে বড় স্প্যান বিশিষ্ট সেতু, যার দৈর্ঘ্য ২০০ মিটার করে। এতে পদ্মা সেতুর থেকেও বেশি বড় স্প্যান সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পদ্মায় ১২০ মিটার পাইল করা হলেও এই সেতুতে ১৩০ মিটার পালই করা হয়েছে।

দেশে এই প্রথম কোন সেতুতে হেলথ মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে বজ্রপাত ও ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ওভার লোডেড যানবাহন চলাচলে সেতুর ভাইব্রেশন সিস্টেমে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে সে বিষয়ে এই সিস্টেম ওয়ার্নিং দেবে। এটি দেশের দ্বিতীয় সেতু যা এক্সট্রা জোট ক্যাবল সিস্টেমে তৈরি করা হয়েছে। ফলে নদীর মাঝে একটি এবং দুপাড়ে দুটি পিলারের ওপর মূল সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে। বড় আকারের তিনটি পিলারের সঙ্গে দুপাশে মোট ১২টি করে ক্যাবল সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে করে মোট ৩৬টি ক্যাবল ব্যবহার কর হয়েছে। যেহেতু নদীর মধ্যে একটি মাত্র পিলার স্থাপন করা হয়েছে, সেহেতু নদীর গতিপথ বা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না।

এছাড়ও পায়রা সেতুর জন্য আলাদা সাব স্টেশনের মাধ্যমে সেতুতে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে বাতি জ্বলবে। থাকছে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থাও।

পায়রা-লেবুখালী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুল হালিম বলেন, ২৪ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। পায়রা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হলে বরিশাল হয়ে পায়রা সমুদ্র বন্দর ও পর্যটন নগরী কুয়াকাটার জন্য সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর ঢাকা হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক ফেরিমুক্ত সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকনমিক ডেভেলপমেন্ট ও ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট যৌথ অর্থায়নে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ডব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটি নির্মাণে কাজ করছে।

শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১ , ০৭ কার্তিক ১৪২৮ ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

খুলে দেয়া হচ্ছে পায়রা সেতু

স্বপন ব্যানার্জী, পটুয়াখালী

image

বহুল প্রতীক্ষিত পায়রা সেতু খুলে দেয়া হচ্ছে। আগামীকাল ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেতু উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এই সেতুতে যানবাহ চলাচল শুরু হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১ ইসমাত মাহমুদা স্বাক্ষরিত চিঠিতে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে পায়রা নদীর ওপর পায়রা সেতু উদ্বোধনে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। ২৪ অক্টোবর সকাল ১০টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধনে অংশ নেবেন। উদ্বোধনের তারিখ ঘোষণার পর পায়রা সেতু এলাকায় সাজসাজ রব পড়েছে। পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার লেবুখালী এলাকার পায়রা নদীর ওপর নির্মিত পায়রা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য আরেকটি পদ্মা সেতুর মতো হবে। দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ ও সওজ। চীনা প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ডব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটি নির্মাণ করছে।

সরকার ২০১২ সালের মে মাসে সেতু নির্মাণের প্রকল্পে অনুমোদন দেয়। শুরুতে সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১৩ দশমিক ২৮ কোটি টাকা । তবে পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন করে প্রকৃত নির্মাণ ব্যয় চূড়ান্ত করা হয়। সর্বশেষ এই সেতুটি নির্মাণে চুক্তি মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক হাজার ১৭০ কোটি টাকা। তবে সেতুটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ১১৮ কোটি। এতে সাশ্রয় হচ্ছে ৫২ কোটি টাকা।

এক সময় সড়ক পথে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা যেতে ১০টি নদী ফেরিতে পারাপার হতে হতো। তবে এখনও দুটি নদীতে ফেরি পারাপার হতে হয়। একটি পদ্মা, অন্যটি পায়রা। নদী পারাপারে দীর্ঘ সময় লাগার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। পদ্মা সেতুর কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে। পটুয়াখালীর পায়রা সেতুটির অবকাঠামোর শেষ হয়েছে। এই সেতুটি উন্মুক্ত হলে নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগে আরেক ধাপ এগোবে দক্ষিণাঞ্চল।

পায়রা সেতু প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকাকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে পায়রা-লেবুখালী সেতু। এ ধারাবাহিকতায় ২৪ অক্টোবর সেতুটি যানচলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। সেতু উদ্বোধনের আগে শেষ মুহূর্তে চলছে নানা আয়োজন।

এ সেতুর কিছু বিশেষত্ব আছে। এটি দেশের সব থেকে বড় স্প্যান বিশিষ্ট সেতু, যার দৈর্ঘ্য ২০০ মিটার করে। এতে পদ্মা সেতুর থেকেও বেশি বড় স্প্যান সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পদ্মায় ১২০ মিটার পাইল করা হলেও এই সেতুতে ১৩০ মিটার পালই করা হয়েছে।

দেশে এই প্রথম কোন সেতুতে হেলথ মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে বজ্রপাত ও ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ওভার লোডেড যানবাহন চলাচলে সেতুর ভাইব্রেশন সিস্টেমে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে সে বিষয়ে এই সিস্টেম ওয়ার্নিং দেবে। এটি দেশের দ্বিতীয় সেতু যা এক্সট্রা জোট ক্যাবল সিস্টেমে তৈরি করা হয়েছে। ফলে নদীর মাঝে একটি এবং দুপাড়ে দুটি পিলারের ওপর মূল সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে। বড় আকারের তিনটি পিলারের সঙ্গে দুপাশে মোট ১২টি করে ক্যাবল সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে করে মোট ৩৬টি ক্যাবল ব্যবহার কর হয়েছে। যেহেতু নদীর মধ্যে একটি মাত্র পিলার স্থাপন করা হয়েছে, সেহেতু নদীর গতিপথ বা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না।

এছাড়ও পায়রা সেতুর জন্য আলাদা সাব স্টেশনের মাধ্যমে সেতুতে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে বাতি জ্বলবে। থাকছে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থাও।

পায়রা-লেবুখালী সেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আবদুল হালিম বলেন, ২৪ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। পায়রা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হলে বরিশাল হয়ে পায়রা সমুদ্র বন্দর ও পর্যটন নগরী কুয়াকাটার জন্য সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর ঢাকা হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক ফেরিমুক্ত সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ১৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকনমিক ডেভেলপমেন্ট ও ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট যৌথ অর্থায়নে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লংজিয়ান রোড অ্যান্ডব্রিজ কনস্ট্রাকশন সেতুটি নির্মাণে কাজ করছে।