পাঁচ দিনেও গ্রেপ্তার হয়নি মূল ইন্ধনদাতারা

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড় করিমপুর মাঝিপাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা আগুন দেয়াসহ তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশ ঘটনার ৫ দিন অতিবাহিত হবার পরেও মূল নায়ক ও মূল ইন্ধনদাতাদের এখনও চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সেই সঙ্গে লুন্ঠিত মালামাল ও নগদ অর্থ উদ্ধার হয়নি।

যদিও পুলিশ বলেছে, তারা এখন পর্যন্ত ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ৩৭ জনকে আদালতের আদেশে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে ৫ দিন পর অনেক পরিবার তাদের বাড়িতে চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবান্না শুরু করেছে। তবে প্রশাসন থেকে তিন বেলা রান্না করা খাবার সরবরাহ অব্যাহত আছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নির্মাণ কাজ চলছে।

সরজমিন পীরগঞ্জ উপজেলার কসবা মাঝিপাড়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা অনেককেই চিনতে পেরেছেন, তাদের নাম জানেন, কিন্তু তাদের কথা বললে তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংখ্যালঘু এক সদস্য বলেছেন, ১৭ অক্টোবর রাতে হামলার আগে বটেরহাট ওয়াক্তিয়া মসজিদ থেকে মাইকযোগে বার বার প্রচারণা চালানো হয় পবিত্র কোরআন শরিফের অবমাননা হয়েছে বাসা থেকে বেরিয়ে আসুন। তাদের মধ্যে দুজন এই মাইকযোগে প্রচারণা চালিয়ে হামলার ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। তাদের এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঘটনার রাতে কয়েকজনের নাম বললেও এখন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তারা কারও নাম বলতে চাইছেন না। অনেকেই বলেছেন এখন কিছুদিন পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে সব সময় পুলিশ থাকবে না তাদের নিরাপত্তা কে দেবে?। এমনকি হামলাকারীদের মধ্যে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা জামিনে ছাড়া পেলে তাদের নিরাপত্তা দেবার কাউকে পাওয়া যাবে না।

ফেইসবুকে লাইভ করা এবং ভিডিও চিত্রগুলো কোথায়? ১৭ অক্টোবর দুপুর থেকে মূলত পরেশ চন্দ্র ওরফে পরিতোষ ফেইসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেবার পর প্রথমে আল-আমিন ও উজ্জল নামে পরেশের দুই বন্ধু তাদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শেয়ার করে ছড়িয়ে দেয়। ফলে বিকেলের আগেই পুরো বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়। এছাড়াও আরও ৮/৯টি মোবাইল ফোন থেকে পরেশের দেয়া স্টাটাস শেয়ার করা হয় বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পরেশ ফেইসবুকে স্টাটাস দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তার দেয়া জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে উজ্জল ও আল-আমিনকে দিনাজপুর জেলার কাহারোল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারাও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। বাকি পরেশের স্টাটাস শেয়ারকারীদেরও পুলিশ খুঁজে বের করে তাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে।

এদিকে সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি নির্মাণ কাজ শুরু না করলেও তারা নিজেরাই খাবার রান্নাবান্না শুরু করেছেন। ভবেশ চন্দ্রের স্ত্রী কনক বালা জানিয়েছেন, রোববার তাণ্ডবের ঘটনার পর শুক্রবার সকালে প্রথম নিজেদের চুলা জ্বালিয়ে ভাত আর সব্জি রান্না করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীরা তার ৪টি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরের আসবাবপত্রসহ অনেক মালামাল লুট করা হয়েছে, আগুনেও পুড়েছে। ৩টি গরু ও ৪টি ছাগল লুট করা হলেও ৩টি ছাগল ফিরে পেয়েছেন একটি গরুও পেয়েছেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারিভাবে নগদ দেড় লাখ টাকা পেয়েছেন। দুই বান্ডিল টিনসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন। একই কথা জানালেন মনোবালাসহ আরও কয়েক জন।

শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১ , ০৭ কার্তিক ১৪২৮ ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

পীরগঞ্জে তাণ্ডব

পাঁচ দিনেও গ্রেপ্তার হয়নি মূল ইন্ধনদাতারা

লিয়াকত আলী বাদল ও সরওয়ার হোসেন, পীরগঞ্জ (রংপুর) থেকে

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বড় করিমপুর মাঝিপাড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে হামলা আগুন দেয়াসহ তাণ্ডবের ঘটনায় পুলিশ ঘটনার ৫ দিন অতিবাহিত হবার পরেও মূল নায়ক ও মূল ইন্ধনদাতাদের এখনও চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সেই সঙ্গে লুন্ঠিত মালামাল ও নগদ অর্থ উদ্ধার হয়নি।

যদিও পুলিশ বলেছে, তারা এখন পর্যন্ত ৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ৩৭ জনকে আদালতের আদেশে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এদিকে ৫ দিন পর অনেক পরিবার তাদের বাড়িতে চুলা জ্বালিয়ে রান্নাবান্না শুরু করেছে। তবে প্রশাসন থেকে তিন বেলা রান্না করা খাবার সরবরাহ অব্যাহত আছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বাড়িঘর নির্মাণ কাজ চলছে।

সরজমিন পীরগঞ্জ উপজেলার কসবা মাঝিপাড়া এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তারা অনেককেই চিনতে পেরেছেন, তাদের নাম জানেন, কিন্তু তাদের কথা বললে তাদের নিরাপত্তা কে দেবে? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংখ্যালঘু এক সদস্য বলেছেন, ১৭ অক্টোবর রাতে হামলার আগে বটেরহাট ওয়াক্তিয়া মসজিদ থেকে মাইকযোগে বার বার প্রচারণা চালানো হয় পবিত্র কোরআন শরিফের অবমাননা হয়েছে বাসা থেকে বেরিয়ে আসুন। তাদের মধ্যে দুজন এই মাইকযোগে প্রচারণা চালিয়ে হামলার ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। তাদের এখনও গ্রেপ্তার করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঘটনার রাতে কয়েকজনের নাম বললেও এখন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তারা কারও নাম বলতে চাইছেন না। অনেকেই বলেছেন এখন কিছুদিন পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে সব সময় পুলিশ থাকবে না তাদের নিরাপত্তা কে দেবে?। এমনকি হামলাকারীদের মধ্যে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা জামিনে ছাড়া পেলে তাদের নিরাপত্তা দেবার কাউকে পাওয়া যাবে না।

ফেইসবুকে লাইভ করা এবং ভিডিও চিত্রগুলো কোথায়? ১৭ অক্টোবর দুপুর থেকে মূলত পরেশ চন্দ্র ওরফে পরিতোষ ফেইসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেবার পর প্রথমে আল-আমিন ও উজ্জল নামে পরেশের দুই বন্ধু তাদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শেয়ার করে ছড়িয়ে দেয়। ফলে বিকেলের আগেই পুরো বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়। এছাড়াও আরও ৮/৯টি মোবাইল ফোন থেকে পরেশের দেয়া স্টাটাস শেয়ার করা হয় বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া পরেশ ফেইসবুকে স্টাটাস দেয়ার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তার দেয়া জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে উজ্জল ও আল-আমিনকে দিনাজপুর জেলার কাহারোল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারাও আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। বাকি পরেশের স্টাটাস শেয়ারকারীদেরও পুলিশ খুঁজে বের করে তাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে।

এদিকে সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি নির্মাণ কাজ শুরু না করলেও তারা নিজেরাই খাবার রান্নাবান্না শুরু করেছেন। ভবেশ চন্দ্রের স্ত্রী কনক বালা জানিয়েছেন, রোববার তাণ্ডবের ঘটনার পর শুক্রবার সকালে প্রথম নিজেদের চুলা জ্বালিয়ে ভাত আর সব্জি রান্না করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সন্ত্রাসীরা তার ৪টি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে ঘরের আসবাবপত্রসহ অনেক মালামাল লুট করা হয়েছে, আগুনেও পুড়েছে। ৩টি গরু ও ৪টি ছাগল লুট করা হলেও ৩টি ছাগল ফিরে পেয়েছেন একটি গরুও পেয়েছেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সরকারিভাবে নগদ দেড় লাখ টাকা পেয়েছেন। দুই বান্ডিল টিনসহ অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী পেয়েছেন। একই কথা জানালেন মনোবালাসহ আরও কয়েক জন।