সাম্প্রতিক বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের প্রতিক্রিয়া

গৌতম রায়

সদ্যসমাপ্ত শারদোৎসবের সময়কালে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক গণমাধ্যমসহ সমাজবৃত্তের বিভিন্ন পর্যায়ে এখন জোরদার আলোচনা চলছে। সবাই এ নারকীয় ঘটনার নিন্দা করছে। সম্প্রীতির কথা বলছে কিন্তু এ সবার ভিতরেও একটা অংশ, তারা নেহাত কম নন, ঘটনাপ্রবাহের নিন্দার ভিতরেও অত্যন্ত কৌশলে, সূক্ষ্মভাবে একটা জিনিস ছড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রীতির কথা বলেও একটা না বলা অব্যক্ত কথা রেখে দিচ্ছে। সেই কৌশলে ছড়ানো বিষয়টি হলো; মুসলমান বিদ্বেষ। সেই না বলা কথাটি হলো- মুসলমান সমাজ সম্পর্কে ঘৃণা। তার পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে একটা সাম্প্রদায়িক উস্কানি। এসবের সঙ্গেই চলছে, সম্প্রীতির নাম করে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের অধিকারের কথা বলে অকৃপণভাবে নানা বিদ্বেষমূলক, প্ররোচনামূলক ছবি, ভিডিও, অডিওর সম্প্রচার, যার ফলশ্রুতিতে এপার বাংলায় যেকোনো মুহূর্তে শুরু হয়ে যেতে পারে ভাতৃঘাতী দাঙ্গা। এপারের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জানমাল হয়ে পড়তে পারে দারুণ অনিশ্চিত।

সারা বছর বাংলাদেশের মানুষ বাঁচলেন, কী মরলেন, তা নিয়ে যে সমস্ত মানুষের এতোটুকু মাথাব্যথা নেই, হঠাৎ এ শারদোৎসবের সময়ে কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের ঘটনাবলী সামনে আসার পর, এরা বাংলাদেশ ঘিরে প্রচণ্ড মুখর হয়ে উঠলেন হঠাৎ। গোটা বছরজুড়ে এসব মানুষদের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহের পরিমাণ একদম শূন্য। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কেমন আছেন এই মহামারী কালে, অন্যসব দেশের মতোই ছাঁটাই, কাজ চলে যাওয়া, বেতন কমে যাওয়ার জেরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ, যাদের ভেতরে একটা বড়সংখ্যক সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন, তাদের ঘিরে তো পশ্চিমবঙ্গের একজন মানুষকেও একটা কথা বলতে শোনা গেল না। তাহলে কেন উপর্যুপরি এত উৎসাহ এই শারদোৎসবের ঘটনাক্রম ঘিরে। বছর দুয়েক আগে তো ব্রাহ্মণবেড়িয়াতেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, হানাদার পাকিস্তানের দোসরদের বাংলাদেশের সহযোগীরা বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়েছিল। প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল বাংলার মানুষ। কই তখন তো পশ্চিমবঙ্গের একটা বড়ো অংশের মানুষ বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার আড়ালে এ রাজনৈতিক হামলা ঘিরে এতো সরব হননি। ইসকন থেকে আরএসএসের হাজারো শাখা সংগঠন সামাজিক গণমাধ্যমসহ সর্বত্র এতো তৎপর হয়নি। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন উপনির্বাচনই কি সব থেকে বড় বালাই?

পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী তো ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন; বাংলাদেশের ঘটনাবলীর নিরিখে আসন্ন উপনির্বাচনে তার দল বিজেপি জিতছে। বাংলাদেশের ঘটনাবলী ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার এ মুখে কুলুপ দেওয়া অবস্থানই বা কিসের ইঙ্গিত বহন করছে?

এ বছরের (২০২১) কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের সময়ে ভোট রাজনীতিতে বিজেপির যে জায়গা ছিল এখন আর তা নেই। নিজের দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ধরে রাখতেই বিজেপির এখন হিমশিম খাওয়ার দশা। কেন্দ্রে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিরাজ করা একটা রাজনৈতিক দলের এহেন দুরবস্থার দৃষ্টান্ত ভারতীয় রাজনীতিতে আর নেই। আর ভোট রাজনীতিতে কার্যত বিরোধিতাহীন মমতার অপ্রতিরোধ্য দাপট, বিশেষ করে জনতোষণের রাজনীতির ফলে গরিব মানুষদের ভিতরে তার জনপ্রিয়তা, ভোট রাজনীতিতে বিজেপির যাবতীয় সম্ভাবনাকে কার্যত শূন্য করে দিয়েছে। এ অবস্থায় আসন্ন উপনির্বাচন এবং বিজেপির পাখির চোখ, ’২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির কাছে একমাত্র মৃতসঞ্জীবনী সুধা হলো- বিভাজনের রাজনীতি। ধর্ম আর জাতপাতভিত্তিক বিভাজন। সেই বিভাজন প্রক্রিয়াকে সফল করতেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ জামায়াত-আরএসএস-বিজেপির কোনো যৌথ পরিকল্পনার অঙ্গ নয় তো? বিজেপির আইসি সেলের ছকে দেওয়া কর্মসূচি রূপায়ণে বুঝে হোক, না বুঝে হোক, পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষ, তাদের ভিতরে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক মানুষও আছেন, এমনকি কোনো না কোনোভাবে বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষও আছেন, জড়িত নন না তো?

ভারতের জাতীয় স্তরে এবং রাজ্যভিত্তিক আরএসএস কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে জেতাতে সবরকমের কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে। আরএসএসের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির যতই দূরত্ব গত কয়েক বছরে তৈরি হোক না কেন, কেন্দ্রের ক্ষমতা ধরে রাখতে সঙ্ঘ নেতৃত্ব এবং মোদি, নিজেরা নিজেদের ভিতরে ঠিক আপস করে নেবেন। তাই আগামী লোকসভা ভোটে জেতার লক্ষ্যে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের কাছে মেরুকরণ এখন কার্যত বিশল্যকরণীর ভূমিকা পালন করছে। আর সেই বহু আকাক্সিক্ষত বিশল্যকরণী হিসেবে হিন্দুত্ববাদীদের কাছে বাংলাদেশের ঘটনাক্রম এখন সব থেকে হাতে গরম মাধ্যম।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সম্প্রতি যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমার বাইরে আর অন্য কোনোভাবে দেখতে রাজি নয় ভারতের হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবির। পাকিস্তান আমল থেকেই যে ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন দেশভাগের ভিত্তি, ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’কে কবরে পাঠাবার তোরজোড় করছিল, যা ’৫৪-তে অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের গোহারা হেরে যাওয়ার ভিতর দিয়ে সম্পন্ন হয়, বিজয়বৈজয়ন্তী ওড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের, এ ঐতিহাসিক সত্যটাই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের হিন্দু মৌলবাদী শক্তি বুঝতে চায় না। স্বীকার করতে তো চায়-ই না। তাই পাকিস্তান আমলেই হোক, মুক্তিযুদ্ধের কালেই হোক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবদ্দশাতেই হোক বা তিনি শাহাদাত বরণের পরের সময়েই হোক অথবা সাম্প্রতিক কালে- বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সে দেশের সংখ্যাগুরু মৌলবাদীদের যাবতীয় আক্রমণ যে সাম্প্রদায়িক ঝোঁকের থেকেও অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক- সেটাই ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা স্বীকার করে না। আর পরবর্তীতে তাদের গোয়েবলসীয় প্রচার এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে, এপার বাংলার প্রগতিশীল মানুষ, এমনকি বামপন্থী রাজনীতি করেন এমন মানুষজনেরাও বিষয়টিকে নিছক সাম্প্রদায়িকই ভাবছেন। গোটা বিষয়াবলীর পেছনের গভীর রাজনীতিটা বেশিরভাগ মানুষ বুঝছেন না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমকে পশ্চিমবঙ্গে তিনটে পর্যায়ে তুলে ধরা হচ্ছে। বামপন্থীরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদে মুখর। মিছিল করেছেন তারা। বিক্ষোভও দেখিয়েছেন। দলগতভাবে বামপন্থীরা সঠিক অবস্থান নিলেও দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটা বড় অংশের বামকর্মী- সমর্থকরা কার্যত বিজেপির আইটি সেল বাংলাদেশের ঘটনাকে যেভাবে সাম্প্রদায়িক লেবাস দিয়ে প্রচার করেছে, তার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সেখানকার অন্যতম বামপন্থী দল ওয়ার্কাস পার্টির অত্যন্ত সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একটা বড় অংশের শিক্ষিত, প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত সিপিআই (এম) সমর্থক ও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের সমালোচনা করে চলেছে। সিপিআই (এম) নেতৃত্ব অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং সংযত অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও সিপিআইসহ (এম) প্রায় সব বামপন্থী দলগুলোর ভূমিস্তরে নিয়োজিত কর্মী সমর্থকরা মৌলবাদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না জেনেই এমন কিছু অবস্থান পশ্চিমবঙ্গে নিচ্ছেন; যা বাংলাদেশে উত্তেজনা প্রশমন তো দূরের কথা, পশ্চিমবঙ্গে এখানকার হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের কার্যসিদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যত অনুঘটকের ভূমিকা নিয়ে ফেলছে। এ অংশের বাম সমর্থকরাই কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিগত নির্বাচনের পর একদম জামায়াত- বিএনপির সুরে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের জয় এবং শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক মানসিকতার সমালোচনা করে গিয়েছিল।

দুর্গাপ্রতিমার ওপর হামলার যেসব ছবি এপার বাংলার মানুষ ফেসবুক ইত্যাদিতে দিয়েছেন, তাদের ভেতরে বিজেপির আইটি সেলের লোকদের পাশাপাশি বামপন্থী মানসিকতার মানুষ, নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা লোকজনের সংখ্যাও কোনো অবস্থাতেই কম ছিল না। ওই ধরনের ছবি কোনোরকম যাচাই না করে ফেসবুক ইত্যাদিতে দেদার পোস্ট করে গেলে এপার বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীরা যে উৎসাহিত হবে, যে কোনো মুহূর্তে গণহত্যায় মেতে উঠবে, এ দেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘি্নত হবে- এসব কোনো যুক্তির এ ধার ধারছে না এসব মানুষ।

যে কোনো সমস্যা তৈরি হলেই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে কায়েমি স্বার্থ ডক্টরড ছবি, ভিডিও তৈরি করে। বাংলাদেশ সরকার ও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ছবি, ভিডিও তৈরি হচ্ছে, প্রচার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। সেই অবস্থায় এ ধরনের ছবি যারা প্রগতিশীলতা, সত্যের দায়ের কথা বলে এপার বাংলায় ছড়াচ্ছেন, তারা কাদের উদ্দেশ্যপূরণ করছেন? স্বার্থসিদ্ধি করছেন, তা বুঝতে কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষ, যারা নিজেদের প্রগতিশীল পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, বামপন্থী বলে নিজেদের দাবি করেন, এমনকি সক্রিয়ভাবে বাম শিবিরে মিটিং মিছিল ইত্যাদিতেও অংশ নেন, তারা ২০১৪ সালে দিল্লিতে এককভাবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছুপারুস্তম হিন্দুত্ববাদী পরিচয়টিকে বেশ প্রকট করে তুলেছেন। প্রগতিশীলতার মোড়বে মুসলমান বিরোধিতা, মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াবার ক্ষেত্রে তারা একটা বড় ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন। ভাবতে একটু অবাকই লাগে এ কারণে যে, এসব সমর্থকদের ওপর কী বামপন্থী দলগুলোর এতটুকু নিয়ন্ত্রণ নেই? এহেন ছদ্মপ্রগতিশীলদের আচরণে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংখ্যালঘু মুসলমানদের জীবনে চরম আতঙ্ক নেমে আসছে। এরপর ও কি ওই রকম প্ররোচনামূলক ছবি, কথা থেকে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের বিরত রাখবার কোনো দায় সার্বিকভাবে বামপন্থী রাজনীতিকদের নেই? সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার পথ ধরে একটা বড় অংশের বাম সমর্থকরা আজ হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রচ্ছন্নভাবে পছন্দ করে। সেই অংশকে বোঝাবার এতটুকু চেষ্টা কি বামপন্থীরা আন্তরিকভাবে করছেন? সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বামদের মিছিলে যারা থাকছেন, তাদেরই একটা বড় অংশ সুযোগ পেলেই মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। দিনের শেষে সুযোগ করে দিচ্ছেন ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকদের আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকদের। এসব কর্মী-সমর্থকদের ভিতরে প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারে কী করছেন সর্বোচ্চ স্তরের বামপন্থী নেতৃত্ব?

বাংলাদেশ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি শব্দও আজ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। ভুলে গেলে চলবে না যে, আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার পানির নায্য হিস্যা বাংলাদেশ কে না দিয়ে সেখানে ভারত বিরোধিতার একটা নতুন মানসিকতাকে উসকে দেওয়ার প্রধান কুশীলব হলেন এই মমতাই। যারা তিস্তার পানি ঘিরে ভারত বিরোধিতার নাম করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক দক্ষতা ঘিরে নেতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, আজ শারদোৎসব ঘিরে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার নাম করে রাজনৈতিক হামলার অন্যতম প্রধান পান্ডা তারাই। সংখ্যালঘু হিন্দুরা মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করেন বঙ্গবন্ধুকে। বিশ্বাস করেন তার কন্যা শেখ হাসিনাকে। বিশ্বাস করেন অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। তাই এরা হানাদার পাক জন্তুদের দেশীয় জারজ সন্তানদের আক্রমণের বিষয়বস্তু। এ ধর্মান্ধ হাইওয়ানদের শক্তি সঞ্চয়ে কি তিস্তার পানি ঘিরে মমতার আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে অস্বীকারপূর্বক অবস্থানের কোনো দায় নেই?

ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি রাজনৈতিক উদ্দেশেই বিশেষ অনুভূতিশীল। সেই অনুভূতির তাগিদ থেকেই তারা শেখ হাসিনা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। উদ্দেশ্য, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষকে এখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা। অতীতে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বরণের পর থেকে জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়ার আমলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপরে আক্রমণ করে গিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি আর বাংলাদেশের ধর্মান্ধ সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি কিন্তু চিরদিনই অভিন্ন শক্তি। এ অভিন্ন শক্তির শয়তানদের বিরুদ্ধে একে একে পদক্ষেপ নিয়েছেন শেখ হাসিনা। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছেন। আইনানুগ তাদের শাস্তি হয়েছে। শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল হয়েছে (ভারতে এ আইনটি এখনো বলবৎ)। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। অনেকাংশেই শাস্তি হয়েছে। বাহাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ফিরে যাওয়ার প্রয়াস শুরু হয়েছে। তাই গোটা উপমহাদেশের সবধর্মের সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির এই সম্মিলিত মরণ কামড় শেখ হাসিনাকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে। এ ধারাতেই বাংলাদেশ, শেখ হাসিনা ঘিরে অপপ্রচার চলছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]

শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১ , ০৭ কার্তিক ১৪২৮ ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সাম্প্রতিক বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের প্রতিক্রিয়া

গৌতম রায়

সদ্যসমাপ্ত শারদোৎসবের সময়কালে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক গণমাধ্যমসহ সমাজবৃত্তের বিভিন্ন পর্যায়ে এখন জোরদার আলোচনা চলছে। সবাই এ নারকীয় ঘটনার নিন্দা করছে। সম্প্রীতির কথা বলছে কিন্তু এ সবার ভিতরেও একটা অংশ, তারা নেহাত কম নন, ঘটনাপ্রবাহের নিন্দার ভিতরেও অত্যন্ত কৌশলে, সূক্ষ্মভাবে একটা জিনিস ছড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রীতির কথা বলেও একটা না বলা অব্যক্ত কথা রেখে দিচ্ছে। সেই কৌশলে ছড়ানো বিষয়টি হলো; মুসলমান বিদ্বেষ। সেই না বলা কথাটি হলো- মুসলমান সমাজ সম্পর্কে ঘৃণা। তার পাশাপাশি বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে একটা সাম্প্রদায়িক উস্কানি। এসবের সঙ্গেই চলছে, সম্প্রীতির নাম করে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের অধিকারের কথা বলে অকৃপণভাবে নানা বিদ্বেষমূলক, প্ররোচনামূলক ছবি, ভিডিও, অডিওর সম্প্রচার, যার ফলশ্রুতিতে এপার বাংলায় যেকোনো মুহূর্তে শুরু হয়ে যেতে পারে ভাতৃঘাতী দাঙ্গা। এপারের সংখ্যালঘু মুসলমানদের জানমাল হয়ে পড়তে পারে দারুণ অনিশ্চিত।

সারা বছর বাংলাদেশের মানুষ বাঁচলেন, কী মরলেন, তা নিয়ে যে সমস্ত মানুষের এতোটুকু মাথাব্যথা নেই, হঠাৎ এ শারদোৎসবের সময়ে কুমিল্লা ইত্যাদি অঞ্চলের ঘটনাবলী সামনে আসার পর, এরা বাংলাদেশ ঘিরে প্রচণ্ড মুখর হয়ে উঠলেন হঠাৎ। গোটা বছরজুড়ে এসব মানুষদের বাংলাদেশ নিয়ে আগ্রহের পরিমাণ একদম শূন্য। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কেমন আছেন এই মহামারী কালে, অন্যসব দেশের মতোই ছাঁটাই, কাজ চলে যাওয়া, বেতন কমে যাওয়ার জেরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষ, যাদের ভেতরে একটা বড়সংখ্যক সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন, তাদের ঘিরে তো পশ্চিমবঙ্গের একজন মানুষকেও একটা কথা বলতে শোনা গেল না। তাহলে কেন উপর্যুপরি এত উৎসাহ এই শারদোৎসবের ঘটনাক্রম ঘিরে। বছর দুয়েক আগে তো ব্রাহ্মণবেড়িয়াতেও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, হানাদার পাকিস্তানের দোসরদের বাংলাদেশের সহযোগীরা বর্বরোচিত আক্রমণ চালিয়েছিল। প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল বাংলার মানুষ। কই তখন তো পশ্চিমবঙ্গের একটা বড়ো অংশের মানুষ বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার আড়ালে এ রাজনৈতিক হামলা ঘিরে এতো সরব হননি। ইসকন থেকে আরএসএসের হাজারো শাখা সংগঠন সামাজিক গণমাধ্যমসহ সর্বত্র এতো তৎপর হয়নি। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন উপনির্বাচনই কি সব থেকে বড় বালাই?

পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী তো ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন; বাংলাদেশের ঘটনাবলীর নিরিখে আসন্ন উপনির্বাচনে তার দল বিজেপি জিতছে। বাংলাদেশের ঘটনাবলী ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার এ মুখে কুলুপ দেওয়া অবস্থানই বা কিসের ইঙ্গিত বহন করছে?

এ বছরের (২০২১) কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোটের সময়ে ভোট রাজনীতিতে বিজেপির যে জায়গা ছিল এখন আর তা নেই। নিজের দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ধরে রাখতেই বিজেপির এখন হিমশিম খাওয়ার দশা। কেন্দ্রে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিরাজ করা একটা রাজনৈতিক দলের এহেন দুরবস্থার দৃষ্টান্ত ভারতীয় রাজনীতিতে আর নেই। আর ভোট রাজনীতিতে কার্যত বিরোধিতাহীন মমতার অপ্রতিরোধ্য দাপট, বিশেষ করে জনতোষণের রাজনীতির ফলে গরিব মানুষদের ভিতরে তার জনপ্রিয়তা, ভোট রাজনীতিতে বিজেপির যাবতীয় সম্ভাবনাকে কার্যত শূন্য করে দিয়েছে। এ অবস্থায় আসন্ন উপনির্বাচন এবং বিজেপির পাখির চোখ, ’২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজেপির কাছে একমাত্র মৃতসঞ্জীবনী সুধা হলো- বিভাজনের রাজনীতি। ধর্ম আর জাতপাতভিত্তিক বিভাজন। সেই বিভাজন প্রক্রিয়াকে সফল করতেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ জামায়াত-আরএসএস-বিজেপির কোনো যৌথ পরিকল্পনার অঙ্গ নয় তো? বিজেপির আইসি সেলের ছকে দেওয়া কর্মসূচি রূপায়ণে বুঝে হোক, না বুঝে হোক, পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষ, তাদের ভিতরে প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক মানুষও আছেন, এমনকি কোনো না কোনোভাবে বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষও আছেন, জড়িত নন না তো?

ভারতের জাতীয় স্তরে এবং রাজ্যভিত্তিক আরএসএস কিন্তু তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিকে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে জেতাতে সবরকমের কাজকর্ম শুরু করে দিয়েছে। আরএসএসের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির যতই দূরত্ব গত কয়েক বছরে তৈরি হোক না কেন, কেন্দ্রের ক্ষমতা ধরে রাখতে সঙ্ঘ নেতৃত্ব এবং মোদি, নিজেরা নিজেদের ভিতরে ঠিক আপস করে নেবেন। তাই আগামী লোকসভা ভোটে জেতার লক্ষ্যে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের কাছে মেরুকরণ এখন কার্যত বিশল্যকরণীর ভূমিকা পালন করছে। আর সেই বহু আকাক্সিক্ষত বিশল্যকরণী হিসেবে হিন্দুত্ববাদীদের কাছে বাংলাদেশের ঘটনাক্রম এখন সব থেকে হাতে গরম মাধ্যম।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সম্প্রতি যে দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে তাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ তকমার বাইরে আর অন্য কোনোভাবে দেখতে রাজি নয় ভারতের হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবির। পাকিস্তান আমল থেকেই যে ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন দেশভাগের ভিত্তি, ‘মুসলিম জাতীয়তাবাদ’কে কবরে পাঠাবার তোরজোড় করছিল, যা ’৫৪-তে অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের গোহারা হেরে যাওয়ার ভিতর দিয়ে সম্পন্ন হয়, বিজয়বৈজয়ন্তী ওড়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের, এ ঐতিহাসিক সত্যটাই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের হিন্দু মৌলবাদী শক্তি বুঝতে চায় না। স্বীকার করতে তো চায়-ই না। তাই পাকিস্তান আমলেই হোক, মুক্তিযুদ্ধের কালেই হোক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবদ্দশাতেই হোক বা তিনি শাহাদাত বরণের পরের সময়েই হোক অথবা সাম্প্রতিক কালে- বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সে দেশের সংখ্যাগুরু মৌলবাদীদের যাবতীয় আক্রমণ যে সাম্প্রদায়িক ঝোঁকের থেকেও অনেক বেশি রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক- সেটাই ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা স্বীকার করে না। আর পরবর্তীতে তাদের গোয়েবলসীয় প্রচার এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে, এপার বাংলার প্রগতিশীল মানুষ, এমনকি বামপন্থী রাজনীতি করেন এমন মানুষজনেরাও বিষয়টিকে নিছক সাম্প্রদায়িকই ভাবছেন। গোটা বিষয়াবলীর পেছনের গভীর রাজনীতিটা বেশিরভাগ মানুষ বুঝছেন না।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাক্রমকে পশ্চিমবঙ্গে তিনটে পর্যায়ে তুলে ধরা হচ্ছে। বামপন্থীরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদে মুখর। মিছিল করেছেন তারা। বিক্ষোভও দেখিয়েছেন। দলগতভাবে বামপন্থীরা সঠিক অবস্থান নিলেও দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটা বড় অংশের বামকর্মী- সমর্থকরা কার্যত বিজেপির আইটি সেল বাংলাদেশের ঘটনাকে যেভাবে সাম্প্রদায়িক লেবাস দিয়ে প্রচার করেছে, তার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সেখানকার অন্যতম বামপন্থী দল ওয়ার্কাস পার্টির অত্যন্ত সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও একটা বড় অংশের শিক্ষিত, প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত সিপিআই (এম) সমর্থক ও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের সমালোচনা করে চলেছে। সিপিআই (এম) নেতৃত্ব অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং সংযত অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও সিপিআইসহ (এম) প্রায় সব বামপন্থী দলগুলোর ভূমিস্তরে নিয়োজিত কর্মী সমর্থকরা মৌলবাদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রশাসনিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য না জেনেই এমন কিছু অবস্থান পশ্চিমবঙ্গে নিচ্ছেন; যা বাংলাদেশে উত্তেজনা প্রশমন তো দূরের কথা, পশ্চিমবঙ্গে এখানকার হিন্দু সাম্প্রদায়িকদের কার্যসিদ্ধির ক্ষেত্রে কার্যত অনুঘটকের ভূমিকা নিয়ে ফেলছে। এ অংশের বাম সমর্থকরাই কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিগত নির্বাচনের পর একদম জামায়াত- বিএনপির সুরে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া, আওয়ামী লীগের জয় এবং শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক মানসিকতার সমালোচনা করে গিয়েছিল।

দুর্গাপ্রতিমার ওপর হামলার যেসব ছবি এপার বাংলার মানুষ ফেসবুক ইত্যাদিতে দিয়েছেন, তাদের ভেতরে বিজেপির আইটি সেলের লোকদের পাশাপাশি বামপন্থী মানসিকতার মানুষ, নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা লোকজনের সংখ্যাও কোনো অবস্থাতেই কম ছিল না। ওই ধরনের ছবি কোনোরকম যাচাই না করে ফেসবুক ইত্যাদিতে দেদার পোস্ট করে গেলে এপার বাংলায় হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদীরা যে উৎসাহিত হবে, যে কোনো মুহূর্তে গণহত্যায় মেতে উঠবে, এ দেশের সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের জানমালের নিরাপত্তা বিঘি্নত হবে- এসব কোনো যুক্তির এ ধার ধারছে না এসব মানুষ।

যে কোনো সমস্যা তৈরি হলেই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে কায়েমি স্বার্থ ডক্টরড ছবি, ভিডিও তৈরি করে। বাংলাদেশ সরকার ও সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ছবি, ভিডিও তৈরি হচ্ছে, প্রচার হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। সেই অবস্থায় এ ধরনের ছবি যারা প্রগতিশীলতা, সত্যের দায়ের কথা বলে এপার বাংলায় ছড়াচ্ছেন, তারা কাদের উদ্দেশ্যপূরণ করছেন? স্বার্থসিদ্ধি করছেন, তা বুঝতে কি কোনো অসুবিধা হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের মানুষ, যারা নিজেদের প্রগতিশীল পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, বামপন্থী বলে নিজেদের দাবি করেন, এমনকি সক্রিয়ভাবে বাম শিবিরে মিটিং মিছিল ইত্যাদিতেও অংশ নেন, তারা ২০১৪ সালে দিল্লিতে এককভাবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছুপারুস্তম হিন্দুত্ববাদী পরিচয়টিকে বেশ প্রকট করে তুলেছেন। প্রগতিশীলতার মোড়বে মুসলমান বিরোধিতা, মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াবার ক্ষেত্রে তারা একটা বড় ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন। ভাবতে একটু অবাকই লাগে এ কারণে যে, এসব সমর্থকদের ওপর কী বামপন্থী দলগুলোর এতটুকু নিয়ন্ত্রণ নেই? এহেন ছদ্মপ্রগতিশীলদের আচরণে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংখ্যালঘু মুসলমানদের জীবনে চরম আতঙ্ক নেমে আসছে। এরপর ও কি ওই রকম প্ররোচনামূলক ছবি, কথা থেকে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের বিরত রাখবার কোনো দায় সার্বিকভাবে বামপন্থী রাজনীতিকদের নেই? সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার পথ ধরে একটা বড় অংশের বাম সমর্থকরা আজ হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রচ্ছন্নভাবে পছন্দ করে। সেই অংশকে বোঝাবার এতটুকু চেষ্টা কি বামপন্থীরা আন্তরিকভাবে করছেন? সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বামদের মিছিলে যারা থাকছেন, তাদেরই একটা বড় অংশ সুযোগ পেলেই মুসলমানদের সম্পর্কে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। ঘৃণা ছড়াচ্ছেন। দিনের শেষে সুযোগ করে দিচ্ছেন ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িকদের আর প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকদের। এসব কর্মী-সমর্থকদের ভিতরে প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তারে কী করছেন সর্বোচ্চ স্তরের বামপন্থী নেতৃত্ব?

বাংলাদেশ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি শব্দও আজ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। ভুলে গেলে চলবে না যে, আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার পানির নায্য হিস্যা বাংলাদেশ কে না দিয়ে সেখানে ভারত বিরোধিতার একটা নতুন মানসিকতাকে উসকে দেওয়ার প্রধান কুশীলব হলেন এই মমতাই। যারা তিস্তার পানি ঘিরে ভারত বিরোধিতার নাম করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক, কূটনৈতিক দক্ষতা ঘিরে নেতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, আজ শারদোৎসব ঘিরে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার নাম করে রাজনৈতিক হামলার অন্যতম প্রধান পান্ডা তারাই। সংখ্যালঘু হিন্দুরা মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করেন বঙ্গবন্ধুকে। বিশ্বাস করেন তার কন্যা শেখ হাসিনাকে। বিশ্বাস করেন অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। তাই এরা হানাদার পাক জন্তুদের দেশীয় জারজ সন্তানদের আক্রমণের বিষয়বস্তু। এ ধর্মান্ধ হাইওয়ানদের শক্তি সঞ্চয়ে কি তিস্তার পানি ঘিরে মমতার আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিকে অস্বীকারপূর্বক অবস্থানের কোনো দায় নেই?

ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকরা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রতি রাজনৈতিক উদ্দেশেই বিশেষ অনুভূতিশীল। সেই অনুভূতির তাগিদ থেকেই তারা শেখ হাসিনা সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। উদ্দেশ্য, পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষকে এখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা। অতীতে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বরণের পর থেকে জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়ার আমলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপরে আক্রমণ করে গিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি আর বাংলাদেশের ধর্মান্ধ সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তি কিন্তু চিরদিনই অভিন্ন শক্তি। এ অভিন্ন শক্তির শয়তানদের বিরুদ্ধে একে একে পদক্ষেপ নিয়েছেন শেখ হাসিনা। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছেন। আইনানুগ তাদের শাস্তি হয়েছে। শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল হয়েছে (ভারতে এ আইনটি এখনো বলবৎ)। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। অনেকাংশেই শাস্তি হয়েছে। বাহাত্তরের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে ফিরে যাওয়ার প্রয়াস শুরু হয়েছে। তাই গোটা উপমহাদেশের সবধর্মের সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তির এই সম্মিলিত মরণ কামড় শেখ হাসিনাকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকে। এ ধারাতেই বাংলাদেশ, শেখ হাসিনা ঘিরে অপপ্রচার চলছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে।

[লেখক : ভারতীয় ইতিহাসবিদ]