সম্প্রীতির মায়াকান্না

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

দেশজুড়ে সম্প্রীতির মায়াকান্না শুরু হয়ে গেছে। বছরে দু-তিনবার এরূপ ঘটনা ঘটে। কেউ পুড়ে মরে সহিংস তা-বে আর কেউ কেউ এটাকে ইস্যু করে নেতা হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। এই সুুযোগে টকশো, মানববন্ধন, সমাবেশের মাধ্যমে সেলেব্রিটি হয়ে উঠেছেন অনেকেই। বিষয়টা অনেকটা এ রকম, কারও ঘরে আগুন লাগলো আর সেই আগুনে আলু পুড়ে কেউ কেউ খেল। যারা আলু পুড়ে খেল তারা সহানুভূতি দিয়ে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করল। আর যার ঘর পুড়ল সে দুর্ভাগা সহানুভূতি পেল। কিন্তু এই সহানুভূতি কি তার হৃদয়ের ক্ষতটা মুছতে পারবে? কি করলে চিরতরে তা-ব সহিংসতা বন্ধ করা যায়Ñতার ব্যবস্থা কি এ ধরনের টক শো, সমাবেশ বা মানববন্ধন করতে পারছে? গ্রাম জনপদ ধর্মীয় আগুনে পোড়ার নৃশংসতা কি সমাবেশ, টক শো, মানববন্ধনসহ নানা এ ধরনের প্রতিবাদ ব্যবস্থায় রোধ করতে পারছে?

যে এলাকায় ঘরবাড়ি পোড়ালো সেখানকার বাসিন্দারাও কিন্তু সম্প্রীতির ডাকে শামিল। তারা শান্তির জন্য সমাবেশ করছে, তাহলে ঘরবাড়ি পুড়ার আগে কেন ব্যবস্থা নেয়নি ওখানকার মানুষ। ধর্মান্ধতায় মানুষ কেন এতটা নিয়ন্ত্রণ বিহীন হয়ে গেল? এর উত্তরটা কেউ কি খুঁজেছেন, না শুধু সম্প্রতির মায়াকান্নায় নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন? ধর্মান্ধতাদের সহিংস ঘটনার পর সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠার উদেশ্যে যে বক্তব্য দেয় হয় তার মাঝে সাম্প্রদায়িকতাই লুকায়িত থাকে। যেমন, কিছু বক্তা বক্তব্য রাখছেন, ‘ইসলাম ধর্মে কোন সন্ত্রাসীদের স্থান নেই, এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হেফাজত রাখার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের। ইসলাম বলেছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে’। এ ধরনের বক্তব্যের সার কথা কি, এদেশে ইসলাম ধর্ম যারা পালন করেন তাদের অধিকার বেশিতাই তাদের উচিত হিন্দুদের দেখে রাখা। এ ধরনের বক্তাদের কথায় বোঝা যায় এদেশে বসবাসরত অন্য ধর্মপালনকারীরা করুণার পাত্র। যেহেতু ইসলাম ধর্ম পালনকারীরা জনসংখ্যানুপাতে অধিক তাই কি তাদের দয়ায় অন্য ধর্ম পালনকারীদের এদেশে বেঁচে থাকতে হবে।

দেশের সংবিধান কি বলে, তার আলোকে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে? বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে প্রতিটি মানুষের সমাধিকারের কথা বলা আছে। তাহলে কেন কম সংখ্যার ধর্ম পালনকারীদের অধিক সংখ্যার ধর্ম পালনকারীর দয়ায় বাঁচতে হবে, এবং এদেশে বাস করতে হবে? আরেকটি বিষয় খুবই লক্ষণীয় তা হলো, সংবিধানে কিছু বৈপরীত্য রয়েছে। যেমন সংবিধানে বলা আছে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা আবার এই সংবিধানেই বলা আছে, দেশের রাষ্ট্র ধর্ম হলো ইসলাম। প্রশ্ন হলো বিশেষ একটি ধর্মকে রাষ্ট্র ধর্ম করার পর সব নাগরিক কি করে সমান অধিকার পায়? সম্প্রতির আন্দোলনকারীরা বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন। সংবিধানে আছে অন্যান্য ধর্মের নাগরিকরাও নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন। যদি সাংবিধানিকভাবে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা থাকে, তাহলে কেন রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করা হচ্ছে না। দয়া বা করুণার বিনিময়ে কোন মানুষের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা পায় না। আজকে যারা সম্প্রীতির জন্য সমাবেশ, মানববন্ধন করছেন তারা কি সংবিধানের বিষয়টি ভেবে দেখছেন।

আরেকটি বিষয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তারাও সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরু তকমা দিয়ে থাকেন এদেশে বসাবাসকারীদের এ থেকে কি বোঝা যায়? সব নাগরিকের আইনি অধিকার সমান হলে মানুষ কি করে সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু হয়। সবাই তো সমান। হিন্দু-মুসলমান কোলাকুলি করলেই কি সম্প্রীতি বজায় থাকবে, না সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রকে ধর্ম নিরপেক্ষ করতে হবে? একটি বক্তব্যে একটু অবাক হলাম, বক্তব্যটা হলো এ রকম, ‘বাংলাদেশে কত হিন্দু বাস করে তার দ্বিগুণ-চারগুণ মুসলমানের বাস ভারতে, আজকে যদি বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করা হয়, তাহলে ভারতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হবে তাই হিন্দুদের ওপর কোন অত্যাচার করা যাবে না। বিষয়টি একটু ভেবে দেখবেন’। এই বক্তব্যের সার কথাতেও সাম্প্রদায়িকতার রেশ পাওয়া যায়। কারণ বক্তা নিজেও সাম্প্রদায়িকতা বা নিজ ধর্ম ভিত্তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। কারণ বক্তব্যে নিহিত আছে ভারতের মুসলমানদের রক্ষার স্বার্থে এদেশের হিন্দুদের ওপর কোন নির্যাতন করা যাবে না। তাহলে তো এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতে মুসলমান না থাকলে এদেশের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করা যেত।

বাংলাদেশের নাগরিক যারা হিন্দু ধর্ম পালন করেন সাংবিধানিকভাবে তারা এদেশের নাগরিক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মালিক এদেশের সব ধর্মের সব বর্ণের নাগরিকরা। তাই যাদের সংখ্যালঘু হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে তারা কারও দয়ার পাত্র না। তাদের অধিকার নিশ্চিত করাটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি নাগরিক সমান। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র তার নাগরিকের সঙ্গে কি আচরণ করবে তা ওই রাষ্ট্রের বিষয়। তারা সাংবিধানিকভাবে কি করল তাদের নাগরিকদের নিয়ে এই বিষয়টা ওই রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে বুঝবে, এবং ত্রুটি হলে ওই রাষ্ট্রের জনগণ তার প্রতিবাদ করবে। সুতরাং বাইরের কোন দেশের নাগরিকের কি হলো সেই বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মের সঙ্গে মিলানোটা কি ঠিক হবে?

ধর্ম নিয়ে কথা উঠলে অনেকেই ভারতকে উদাহরণ হিসাবে টেনে নিয়ে আসেন। প্রশ্ন হলো ভারত তো সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র যদি তুলনা করতে চান তাহলে কেন বাংলাদেশকে সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বানানো হচ্ছে না। তা নিয়ে কখনও কি কোন প্রশ্ন তুলেছেন বা আন্দোলন করেছেন। এই কথাগুলোও একটু ভাববেন। দ্বিতীয়ত ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অমিল বা ত্রুটিগুলো নিয়ে কথা বলছেন কি কখনও? পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা বিষয়ে মিলিয়ে যারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন তারা শুধু ভারতের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক বিষয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবস্থাগুলো একটু মিলিয়ে দেখবেন?

মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের কতটা মিল আছে তা নিরুপণ করা উচিত। মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকের অভাব এদেশে নেই, অসংখ্য মানুষ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দাবিদার। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যা করে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, আজও সেই ধারাটি অব্যহত। সাম্প্রদায়িকতার বিষনাল সাংবিধানিকভাবে রুখতে হবে। কোন ধর্ম কোন ধর্মকে দয়া দেখালে তাতে সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। যারা এ রকম ভাবনা নিয়ে বসে আছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। সংবিধানের বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া সমাধিকারের কথাটি ভাবা যায় না। কারণ আইনি অধিকার সমান না হলে সমাধিকার কখনও প্রতিষ্ঠা পাবে না। তাই মায়া কান্না সম্প্রীতির জন্য না করে সংবিধানটিকে ’৭২-এর সংবিধানের ফিরে নেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত এবং সেই লক্ষ্যে আন্দোলন করা দরকার। ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে পারলে অবশ্য সমাধিকার ফিরে আসবে এবং সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে উঠবে।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]

শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১ , ০৭ কার্তিক ১৪২৮ ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সম্প্রীতির মায়াকান্না

শাহ মো. জিয়াউদ্দিন

দেশজুড়ে সম্প্রীতির মায়াকান্না শুরু হয়ে গেছে। বছরে দু-তিনবার এরূপ ঘটনা ঘটে। কেউ পুড়ে মরে সহিংস তা-বে আর কেউ কেউ এটাকে ইস্যু করে নেতা হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। এই সুুযোগে টকশো, মানববন্ধন, সমাবেশের মাধ্যমে সেলেব্রিটি হয়ে উঠেছেন অনেকেই। বিষয়টা অনেকটা এ রকম, কারও ঘরে আগুন লাগলো আর সেই আগুনে আলু পুড়ে কেউ কেউ খেল। যারা আলু পুড়ে খেল তারা সহানুভূতি দিয়ে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করল। আর যার ঘর পুড়ল সে দুর্ভাগা সহানুভূতি পেল। কিন্তু এই সহানুভূতি কি তার হৃদয়ের ক্ষতটা মুছতে পারবে? কি করলে চিরতরে তা-ব সহিংসতা বন্ধ করা যায়Ñতার ব্যবস্থা কি এ ধরনের টক শো, সমাবেশ বা মানববন্ধন করতে পারছে? গ্রাম জনপদ ধর্মীয় আগুনে পোড়ার নৃশংসতা কি সমাবেশ, টক শো, মানববন্ধনসহ নানা এ ধরনের প্রতিবাদ ব্যবস্থায় রোধ করতে পারছে?

যে এলাকায় ঘরবাড়ি পোড়ালো সেখানকার বাসিন্দারাও কিন্তু সম্প্রীতির ডাকে শামিল। তারা শান্তির জন্য সমাবেশ করছে, তাহলে ঘরবাড়ি পুড়ার আগে কেন ব্যবস্থা নেয়নি ওখানকার মানুষ। ধর্মান্ধতায় মানুষ কেন এতটা নিয়ন্ত্রণ বিহীন হয়ে গেল? এর উত্তরটা কেউ কি খুঁজেছেন, না শুধু সম্প্রতির মায়াকান্নায় নিজেকে ব্যস্ত রাখছেন? ধর্মান্ধতাদের সহিংস ঘটনার পর সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠার উদেশ্যে যে বক্তব্য দেয় হয় তার মাঝে সাম্প্রদায়িকতাই লুকায়িত থাকে। যেমন, কিছু বক্তা বক্তব্য রাখছেন, ‘ইসলাম ধর্মে কোন সন্ত্রাসীদের স্থান নেই, এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হেফাজত রাখার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের। ইসলাম বলেছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে’। এ ধরনের বক্তব্যের সার কথা কি, এদেশে ইসলাম ধর্ম যারা পালন করেন তাদের অধিকার বেশিতাই তাদের উচিত হিন্দুদের দেখে রাখা। এ ধরনের বক্তাদের কথায় বোঝা যায় এদেশে বসবাসরত অন্য ধর্মপালনকারীরা করুণার পাত্র। যেহেতু ইসলাম ধর্ম পালনকারীরা জনসংখ্যানুপাতে অধিক তাই কি তাদের দয়ায় অন্য ধর্ম পালনকারীদের এদেশে বেঁচে থাকতে হবে।

দেশের সংবিধান কি বলে, তার আলোকে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে? বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে প্রতিটি মানুষের সমাধিকারের কথা বলা আছে। তাহলে কেন কম সংখ্যার ধর্ম পালনকারীদের অধিক সংখ্যার ধর্ম পালনকারীর দয়ায় বাঁচতে হবে, এবং এদেশে বাস করতে হবে? আরেকটি বিষয় খুবই লক্ষণীয় তা হলো, সংবিধানে কিছু বৈপরীত্য রয়েছে। যেমন সংবিধানে বলা আছে দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা আবার এই সংবিধানেই বলা আছে, দেশের রাষ্ট্র ধর্ম হলো ইসলাম। প্রশ্ন হলো বিশেষ একটি ধর্মকে রাষ্ট্র ধর্ম করার পর সব নাগরিক কি করে সমান অধিকার পায়? সম্প্রতির আন্দোলনকারীরা বিষয়টি একটু ভেবে দেখুন। সংবিধানে আছে অন্যান্য ধর্মের নাগরিকরাও নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন। যদি সাংবিধানিকভাবে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা থাকে, তাহলে কেন রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র করা হচ্ছে না। দয়া বা করুণার বিনিময়ে কোন মানুষের আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠা পায় না। আজকে যারা সম্প্রীতির জন্য সমাবেশ, মানববন্ধন করছেন তারা কি সংবিধানের বিষয়টি ভেবে দেখছেন।

আরেকটি বিষয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তারাও সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরু তকমা দিয়ে থাকেন এদেশে বসাবাসকারীদের এ থেকে কি বোঝা যায়? সব নাগরিকের আইনি অধিকার সমান হলে মানুষ কি করে সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু হয়। সবাই তো সমান। হিন্দু-মুসলমান কোলাকুলি করলেই কি সম্প্রীতি বজায় থাকবে, না সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রকে ধর্ম নিরপেক্ষ করতে হবে? একটি বক্তব্যে একটু অবাক হলাম, বক্তব্যটা হলো এ রকম, ‘বাংলাদেশে কত হিন্দু বাস করে তার দ্বিগুণ-চারগুণ মুসলমানের বাস ভারতে, আজকে যদি বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করা হয়, তাহলে ভারতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হবে তাই হিন্দুদের ওপর কোন অত্যাচার করা যাবে না। বিষয়টি একটু ভেবে দেখবেন’। এই বক্তব্যের সার কথাতেও সাম্প্রদায়িকতার রেশ পাওয়া যায়। কারণ বক্তা নিজেও সাম্প্রদায়িকতা বা নিজ ধর্ম ভিত্তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। কারণ বক্তব্যে নিহিত আছে ভারতের মুসলমানদের রক্ষার স্বার্থে এদেশের হিন্দুদের ওপর কোন নির্যাতন করা যাবে না। তাহলে তো এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভারতে মুসলমান না থাকলে এদেশের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করা যেত।

বাংলাদেশের নাগরিক যারা হিন্দু ধর্ম পালন করেন সাংবিধানিকভাবে তারা এদেশের নাগরিক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মালিক এদেশের সব ধর্মের সব বর্ণের নাগরিকরা। তাই যাদের সংখ্যালঘু হিসাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে তারা কারও দয়ার পাত্র না। তাদের অধিকার নিশ্চিত করাটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি নাগরিক সমান। পৃথিবীর কোন রাষ্ট্র তার নাগরিকের সঙ্গে কি আচরণ করবে তা ওই রাষ্ট্রের বিষয়। তারা সাংবিধানিকভাবে কি করল তাদের নাগরিকদের নিয়ে এই বিষয়টা ওই রাষ্ট্র সাংবিধানিকভাবে বুঝবে, এবং ত্রুটি হলে ওই রাষ্ট্রের জনগণ তার প্রতিবাদ করবে। সুতরাং বাইরের কোন দেশের নাগরিকের কি হলো সেই বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মের সঙ্গে মিলানোটা কি ঠিক হবে?

ধর্ম নিয়ে কথা উঠলে অনেকেই ভারতকে উদাহরণ হিসাবে টেনে নিয়ে আসেন। প্রশ্ন হলো ভারত তো সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র যদি তুলনা করতে চান তাহলে কেন বাংলাদেশকে সাংবিধানিকভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র বানানো হচ্ছে না। তা নিয়ে কখনও কি কোন প্রশ্ন তুলেছেন বা আন্দোলন করেছেন। এই কথাগুলোও একটু ভাববেন। দ্বিতীয়ত ভারতীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সঙ্গে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অমিল বা ত্রুটিগুলো নিয়ে কথা বলছেন কি কখনও? পৃথিবীর অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নানা বিষয়ে মিলিয়ে যারা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেন তারা শুধু ভারতের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক বিষয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবস্থাগুলো একটু মিলিয়ে দেখবেন?

মহান মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের কতটা মিল আছে তা নিরুপণ করা উচিত। মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকের অভাব এদেশে নেই, অসংখ্য মানুষ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দাবিদার। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ১৯৭৫ সালে জাতির জনককে হত্যা করে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়, আজও সেই ধারাটি অব্যহত। সাম্প্রদায়িকতার বিষনাল সাংবিধানিকভাবে রুখতে হবে। কোন ধর্ম কোন ধর্মকে দয়া দেখালে তাতে সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। যারা এ রকম ভাবনা নিয়ে বসে আছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করেন। সংবিধানের বাস্তব প্রয়োগ ছাড়া সমাধিকারের কথাটি ভাবা যায় না। কারণ আইনি অধিকার সমান না হলে সমাধিকার কখনও প্রতিষ্ঠা পাবে না। তাই মায়া কান্না সম্প্রীতির জন্য না করে সংবিধানটিকে ’৭২-এর সংবিধানের ফিরে নেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত এবং সেই লক্ষ্যে আন্দোলন করা দরকার। ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে পারলে অবশ্য সমাধিকার ফিরে আসবে এবং সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে উঠবে।

[লেখক : উন্নয়নকর্মী]