সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে

সারাদেশে গণঅনশন ও অবস্থান

বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ ৮ দাবি

কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ আট দাবিতে রাজধানী ঢাকার শাহবাগসহ সারাদেশে গণঅনশন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের আহ্বানে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

ঢাকায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে অবস্থান কর্মসূচি। গণঅবস্থান কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নিন্দ চন্দ্র ভৌমিক। কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), বাংলাদেশ পূজা উদ্?যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাসংঘ, বাংলাদেশ সনাতন কল্যাণ জোট, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজসংস্কার সমিতি, জন্মাষ্টমী উদ্?যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি, বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু লীগ, মাইনরিটি রাইটস ফোরামের বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু ফোরাম ও হিন্দু ছাত্র ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংরক্ষণ সমিতি, ইন্টারন্যাশনাল শ্রী শ্রী হরি গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্যপরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ অংশ নেয়।

কর্মসূচিতে থেকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ঘোষিত আট দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ‘চল চল ঢাকায় চল’ স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হবে বলে দাবি জানানো হয়।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের নেতা হাসানুল হক ইনু। সংহতি জানিয়ে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘যারা এই আক্রমণ চালিয়েছে, তারা ধর্মান্ধ, জঙ্গি, সন্ত্রাসী এবং এই আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত। এটা তাৎক্ষণিক কোন উত্তেজনার ঘটনা নয়। তারা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে দাঙ্গা লাগানো সম্ভব হয়নি।’

ইনু আরও বলেন, ‘সমাজের দিকে যখন আমি তাকিয়েছি, তখন দেখেছি গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় হিন্দু-মুসলিম সদভাব বজায় রাখছেন। এটাই হচ্ছে আশার কথা, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। সাম্প্রদায়িক শক্তি, যারা আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের একটা মাত্রা আছে। তারা পাকিস্তান পন্থায় বিশ্বাস করে, তারা একাত্তরের রাজাকারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সম্পর্কিত এবং বিএনপির সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত। বিএনপি রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মান্ধদের ছাতা ধারাবাহিকভাবে ধরে রেখেছে এবং এর ফলে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, হামলার পর আমি রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, সেখানে তারা বলেছে ‘আমাদের মা (শেখ হাসিনা) আসবে কবে?’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। আপনি তাদের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সংহতি জানান।

কর্মসূচিতে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত বলেন, ‘আমরা বার বার আঘাত প্রাপ্ত হচ্ছি, আন্দোলন করছি, কিন্তু বিচার পাচ্ছি না। সাম্প্রদায়িক হামলার কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। তাই আজকে প্রতিনিয়ত এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।’

গণঅবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘কোরআন অবমাননার জন্য হিন্দুদের ওপর হামলা চালানো হয়নি। বরং তাদের ওপর হামলা চালানোর উদ্দেশ্যেই কোরআনকে তাদের মন্দিরে রেখে আসা হয়। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি পুনরোদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা রাখতে হবে। এবারের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে শুধু প্রতিবাদ করলে হবে না, প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।’

৮ দফা দাবি

১. শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।

২. সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, গৃহহীনদের পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়াও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে অন্যূন ২০ লাখ টাকা প্রদান বিকল্পে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের একজনকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করত হবে।

৩. নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও তাদের পেছনে থাকা চক্রান্তকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৪. সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের রোধে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও অবহেলা করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৫. সামাজিক মাধ্যম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উসকানি দিচ্ছে যারা, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

৬. প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় যেসব জনপ্রতিনিধি এগিয়ে আসেননি তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৭. ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত সংগঠিত সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলি তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশনের সুপারিশসংবলিত রিপোর্ট অবিলম্বে প্রকাশ ও এর সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৮. ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইনের দ্রুত বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

নির্মূল কমিটির সংহতি প্রকাশ

গণঅনশন, অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। এ সময় নির্মূল কমিটির নেতারা দেশব্যাপী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারী ও প্ররোচকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবিলম্বে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ ও ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবিতে মিছিল সহকারে সমাবেশস্থলে সংহতি প্রকাশ করেন। উক্ত কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মুক্তিযোদ্ধা লেখক ক্যাপ্টেন (অব.) আলমগীর সাত্তার বীরপ্রতীক, নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ, নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারক আলভী, নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযোদ্ধা মকবুল ই এলাহী চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম খান রিজভী, লেখক আলী আকবর টাবী, আসিফ মুনীর তন্ময়, ডা. মামুন আল মাহতাব, জান্নাত-ই ফেরদৌসী লাকি, এ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীন, সহকারী অধ্যাপক তপন পালিত, সংস্কৃতিকর্মী পিন্টু সাহা, সমাজকর্মী শেখ আলী শাহনেওয়াজ পরাগ, সাইফ উদ্দিন রুবেল, শিমন বাস্কে, অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বাবু, ডা. মাসুদ আলমসহ সংগঠনের ঢাকা মহানগরের নেতারা।

নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়েছে। ইউএনও, ওসিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা হামলার সময় কি করেছেন? স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই বা কি করেছেন? দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য দোষীদের চিহ্নিত করে যত দ্রুত সম্ভব বিচারের আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।’

রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১ , ০৮ কার্তিক ১৪২৮ ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে

সারাদেশে গণঅনশন ও অবস্থান

বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ ৮ দাবি

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

image

বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গতকাল শাহবাগে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ডাকে বিক্ষোভ ও গণঅনশন -সংবাদ

কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ আট দাবিতে রাজধানী ঢাকার শাহবাগসহ সারাদেশে গণঅনশন, অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের আহ্বানে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

ঢাকায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে অবস্থান কর্মসূচি। গণঅবস্থান কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নিন্দ চন্দ্র ভৌমিক। কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), বাংলাদেশ পূজা উদ্?যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাসংঘ, বাংলাদেশ সনাতন কল্যাণ জোট, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজসংস্কার সমিতি, জন্মাষ্টমী উদ্?যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি, বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু লীগ, মাইনরিটি রাইটস ফোরামের বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু ফোরাম ও হিন্দু ছাত্র ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংরক্ষণ সমিতি, ইন্টারন্যাশনাল শ্রী শ্রী হরি গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্যপরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ অংশ নেয়।

কর্মসূচিতে থেকে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ঘোষিত আট দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ‘চল চল ঢাকায় চল’ স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হবে বলে দাবি জানানো হয়।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের নেতা হাসানুল হক ইনু। সংহতি জানিয়ে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘যারা এই আক্রমণ চালিয়েছে, তারা ধর্মান্ধ, জঙ্গি, সন্ত্রাসী এবং এই আক্রমণ ছিল পরিকল্পিত। এটা তাৎক্ষণিক কোন উত্তেজনার ঘটনা নয়। তারা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে দাঙ্গা লাগানো সম্ভব হয়নি।’

ইনু আরও বলেন, ‘সমাজের দিকে যখন আমি তাকিয়েছি, তখন দেখেছি গ্রামে, পাড়ায়, মহল্লায় হিন্দু-মুসলিম সদভাব বজায় রাখছেন। এটাই হচ্ছে আশার কথা, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। সাম্প্রদায়িক শক্তি, যারা আক্রমণ পরিচালনা করে তাদের একটা মাত্রা আছে। তারা পাকিস্তান পন্থায় বিশ্বাস করে, তারা একাত্তরের রাজাকারদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, জামায়াতে ইসলামির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও সম্পর্কিত এবং বিএনপির সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত। বিএনপি রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মান্ধদের ছাতা ধারাবাহিকভাবে ধরে রেখেছে এবং এর ফলে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, হামলার পর আমি রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, সেখানে তারা বলেছে ‘আমাদের মা (শেখ হাসিনা) আসবে কবে?’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। আপনি তাদের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সংহতি জানান।

কর্মসূচিতে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত বলেন, ‘আমরা বার বার আঘাত প্রাপ্ত হচ্ছি, আন্দোলন করছি, কিন্তু বিচার পাচ্ছি না। সাম্প্রদায়িক হামলার কোন ঘটনারই সুষ্ঠু বিচার হয়নি। তাই আজকে প্রতিনিয়ত এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।’

গণঅবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘কোরআন অবমাননার জন্য হিন্দুদের ওপর হামলা চালানো হয়নি। বরং তাদের ওপর হামলা চালানোর উদ্দেশ্যেই কোরআনকে তাদের মন্দিরে রেখে আসা হয়। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি পুনরোদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা রাখতে হবে। এবারের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে শুধু প্রতিবাদ করলে হবে না, প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।’

৮ দফা দাবি

১. শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।

২. সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, গৃহহীনদের পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান ছাড়াও আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে অন্যূন ২০ লাখ টাকা প্রদান বিকল্পে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের একজনকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করত হবে।

৩. নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও তাদের পেছনে থাকা চক্রান্তকারীদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইনের আওতায় এনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুততম সময়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৪. সাম্প্রদায়িক হামলাকারীদের রোধে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে যারা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও অবহেলা করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধেও দ্রুত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৫. সামাজিক মাধ্যম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উসকানি দিচ্ছে যারা, তাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

৬. প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় যেসব জনপ্রতিনিধি এগিয়ে আসেননি তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

৭. ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত সংগঠিত সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলি তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশনের সুপারিশসংবলিত রিপোর্ট অবিলম্বে প্রকাশ ও এর সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৮. ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইনের দ্রুত বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

নির্মূল কমিটির সংহতি প্রকাশ

গণঅনশন, অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। এ সময় নির্মূল কমিটির নেতারা দেশব্যাপী সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারী ও প্ররোচকদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অবিলম্বে ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ ও ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠনের দাবিতে মিছিল সহকারে সমাবেশস্থলে সংহতি প্রকাশ করেন। উক্ত কর্মসূচিতে সংহতি জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মুক্তিযোদ্ধা লেখক ক্যাপ্টেন (অব.) আলমগীর সাত্তার বীরপ্রতীক, নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ, নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারক আলভী, নির্মূল কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল, কেন্দ্রীয় নেতা মুক্তিযোদ্ধা মকবুল ই এলাহী চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম খান রিজভী, লেখক আলী আকবর টাবী, আসিফ মুনীর তন্ময়, ডা. মামুন আল মাহতাব, জান্নাত-ই ফেরদৌসী লাকি, এ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভীন, সহকারী অধ্যাপক তপন পালিত, সংস্কৃতিকর্মী পিন্টু সাহা, সমাজকর্মী শেখ আলী শাহনেওয়াজ পরাগ, সাইফ উদ্দিন রুবেল, শিমন বাস্কে, অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বাবু, ডা. মাসুদ আলমসহ সংগঠনের ঢাকা মহানগরের নেতারা।

নির্মূল কমিটির সহ-সভাপতি শিক্ষাবিদ মমতাজ লতিফ দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেখানে পুলিশ উপস্থিত হয়েছে। ইউএনও, ওসিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা হামলার সময় কি করেছেন? স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই বা কি করেছেন? দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য দোষীদের চিহ্নিত করে যত দ্রুত সম্ভব বিচারের আওতায় আনতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।’