রপ্তানিমুখী কৃষির শিল্পায়ন

এমএ আউয়াল ও এম মনির উদ্দিন

বাংলাদেশ আজ কৃষির বিভিন্ন সেক্টরের অগ্রযাত্রায় বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে স্থান করে নিয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশে আবাদি জমি কমেছে ২০ শতাংশ এবং জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ কোটি; তারপরও দেশের খাদ্য উৎপাদন বছরের পর বছর ক্রমাগতহারে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সময়োপযোগী সঠিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আর দেশের খেটেখাওয়া মানুষের পরিশ্রম।

বিস্ময়কর মনে হলেও এটাই বাস্তবতা যে, বাংলাদেশ ফলের উৎপাদনে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। দেশে প্রতি বছর ফলের উৎপাদন আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে চলেছে। দুই দশক আগেও দেশের প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, লিচু, বরই, কলা, জাম, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি পরিচিত ছিল এবং এসবের আবাদও ছিল সীমিত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭২ প্রকারের দেশি বিদেশি ফল উৎপাদিত হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) হিসেবে গত ২০ বছর ধরে বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন ১২.৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ফল চাষের আওতায় জমির পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ হেক্টর এবং মোট ফলের উৎপাদন ১৩০ মেট্রিক টনের কাছে।

দেশে ২০১৯-২০২০ বছরে আমের উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ মেট্রিক টন। এ বছরও আমের উৎপাদন অনেক ভালো এবং আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে ৭ম অবস্থানে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত আমের খুব সামান্য সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে আম উৎপাদনকারী কৃষকরা আমের দাম পাচ্ছেন না। কারণ দেশীয় বাজারের চাহিদার চেয়ে আমের উৎপাদন অনেক বেশি। উল্লেখ্য, ২০১৯-২০২০ বছরে দেশ থেকে আম রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৭৯ মেট্রিক টন।

বাংলার আপেল হিসেবে খ্যাত পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ম এবং বর্তমান এর উৎপাদন প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন। অথচ ১৯৮০-১৯৮১ বছরে এই ফলটির উৎপাদন ছিল মাত্র ৯ হাজার টন। সারা বছরব্যাপী সহজলভ্য এই ফলের উৎপাদন যে গতিতে বেড়েছে সেইভাবে পেয়ারাকে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠেনি এবং ফল হিসেবে রপ্তানি করাও সম্ভব হয়নি।

বিশ্বের মধ্যে উৎপাদনের পরিমাণ বিবেচনায় বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় এবং বর্তমান উৎপাদন ১৮ লাখ মেট্রিক টনের ওপরে। এক সময় ফল হিসেবে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের জনপ্রিয়তা ছিল কিন্তু বর্তমানে বাজারে অনেক প্রকারের সুস্বাদু ফলের সহজপ্রাপ্যতা সেইসাথে মানুষের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে কাঁঠালের সমাদর অনেক কমে গেছে। গ্রামের গাছে গাছে কাঁঠাল পাকার পরে পচে পড়ে যায় অথচ এই বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাত করার কোন শিল্প অদ্যাবদি গড়ে উঠেনি। প্রক্রিয়াজাত কাঁঠালের জুস, চিপস, কৌটাজাত কাঁঠালের দেশের বাইরে চাহিদা আছে এবং রপ্তানি করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

আনারস দেশের অন্যতম একটি সুস্বাদু ফল, যার বর্তমান উৎপাদন ৫ লাখ মেট্রিক টন এবং দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বাইরে রপ্তানি করার ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রক্রিয়াজাতের তেমন উদ্যোগ নেই। যেহেতু আনারস অতি দ্রুত পচনশীল একটি ফল তাই সরাসরি রপ্তানি করার সুযোগ কম, তবে জুস, চিপস এবং কৌটাজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে।

পেঁপে অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই ভূখন্ডে পরিচিত একটি ফল। বর্তমানে সুস্বাদু ও উচ্চফলনশীল জাতের কারণে দেশে পাকা পেঁপের উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন পাকা পেঁপে উৎপাদিত হয়। সরাসরি পাকা পেঁপে এবং প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করার সুযোগ আছে যদিও আমরা সেই পর্যায়ে আজ অবধি যেতে পারিনি।

দেশে বর্তমানে শাকসবজির উৎপাদন ১ কোটি ৭২ লাখ টন এবং বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। অথচ সবজি উৎপাদনের তুলনায় অতি সামান্য পরিমাণ বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। প্রচুর সবজি উৎপাদন করে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না এমনকি প্রক্রিয়াজাতের অভাবে সবজির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতি বছর নষ্ট হয়ে যায়। দেশের মোট আলুর উৎপাদন ১১০ লাখ টন; যা বিশ্বের মধ্যে ৭ম অবস্থানে এবং দেশের চাহিদা ৭০ লাখ টন। অতিরিক্ত ৪০ লাখ টনের অতি সামান্য রপ্তানি হলেও আলুকে ঘিরে প্রক্রিয়াজাত শিল্প আজও গড়ে উঠেনি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ১০ বছর আগে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে আয় ছিল ৪০ কোটি ডলার কিন্তু গত ৪ বছর ধরে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে আয় ক্রমাগত বাড়ছে। দেশে ৫০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের সাথে যুক্ত আছে; যার মধ্যে রপ্তানি করতে পারছে ১০০টির মতো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ২০টি। ইতোমধ্যে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে পড়েছে। ২০১৭-২০১৮ বছরে দেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হয় ৬৭.৩৭ কোটি ডলারের, ২০১৮-২০১৯ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০.৮৯ কোটি ডলার। ২০১৯-২০২০ বছরে বিশ্বে করোনা মহামারীর কারণে রপ্তানি কিছুটা কমে যাওয়ায় এ পরিমাণ হয় ৮৬.২০ কোটি ডলার এবং গত ২০২০-২০২১ বছরে বাংলাদেশ কৃষিপণ্যের রপ্তানি আয়ে বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়- যার পরিমাণ ১০২.৮১ কোটি ডলার।

উপরের তথ্য থেকে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পোন্নত ও উন্নত দেশগুলোর জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসায় তাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। এ সমস্ত দেশে প্রক্রিয়াজাত করা খাদ্যের চাহিদা রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে বিশেষত যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৪ হাজার রেস্তোরাঁ আছে; যেখানে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের চাহিদা আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে আমাদের ১ কোটির ওপর প্রবাসী আছে; যাদের কাছে দেশীয় প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য পৌঁছতে পারি।

দেশের কৃষিতে নতুন শিক্ষিত উদ্যোক্তারা যুক্ত হয়ে নতুন নতুন ফসল ও ফল উৎপাদন করছে; যা রপ্তানি না হওয়ায় দেশীয় বাজারে এসব কৃষিপণ্য কমমূল্যে বিক্রয় করে আর্থিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণের অভাবে দেশে ৩৫ শতাংশের বেশি ফল ও শাকসবজি নষ্ট হয়ে যায়। দেশে মাছের উৎপাদন দেশীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও মৎস্য সেক্টর থেকে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে এবং আগামীতে আরো নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ আছে। প্রাণিসম্পদ সেক্টরে প্রচুর উদ্যোক্তা যুক্ত হয়ে ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন দিনের পর দিন বাড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু প্রক্রিয়াজাতের অভাব সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় রপ্তানির দুয়ার খুলছে না। যদিও এসব পণ্য রপ্তানির কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা তা জানা নাই।

ফলের প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিশেষ করে ফলের জুস, জ্যাম-জেলি, শুষ্ক ফল, ফ্রোজেন ফল, কৌটাজাত ফল, ফলের আচার ইত্যাদিসহ আরো বিভিন্নভাবে ফলের প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে ওঠলে রপ্তানি আয় অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। সবজির ওপর ভিত্তি করে অনেক শিল্প গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবজির কেচাপ, ফ্রোজেন সবজি, ফ্রোজেন ফ্রেন্স ফ্রাই, শুকানো সবজি, সবজির জুস, আচার, সচ, স্টার্চ ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের চাহিদা আছে। দেশের বাইরে প্রক্রিয়াজাত মসলা, মধু, কালোজিরার তেল, তিলের তেল, জৈবসার, গুঁড়োদুধ, প্যাকেটজাত মাংস ইত্যাদি রপ্তানি করে দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বিশ্ব বাজারে দেশীয় প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কোন দেশে কি পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা নিরূপণ করে মিশনগুলো বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সাহায্য করতে পারে। সরকারের প্রণোদনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তার কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদনে অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন এবং কৃষির উৎপাদন ক্রমাগতহারে বেড়েই চলছে। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনেও সরকারকে বিশেষ প্রণোদনাসহ দীর্ঘমেয়াদি অতি অল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দিলে দেশে কৃষির শিল্পায়ন তৈরি হবে; যা বর্তমানে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি। কৃষির শিল্পায়ন হলে দেশের অথনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে। উৎপাদক শ্রেণী তাদের পণ্যের বাজার পাবে এবং ন্যায্য দামও পাবে। নতুন উদ্যোক্তা কৃষির উৎপাদনের সাথে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করবে। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে দেশে আসবে বৈদেশিক মুদ্রা; যা বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করবে।

[লেখক : এমএ আউয়াল, সদস্য পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি); এম মনির উদ্দিন, এগ্রোনমিস্ট]

শুক্রবার, ১৯ নভেম্বর ২০২১ , ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

রপ্তানিমুখী কৃষির শিল্পায়ন

এমএ আউয়াল ও এম মনির উদ্দিন
image

বাংলাদেশ আজ কৃষির বিভিন্ন সেক্টরের অগ্রযাত্রায় বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে স্থান করে নিয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশে আবাদি জমি কমেছে ২০ শতাংশ এবং জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ কোটি; তারপরও দেশের খাদ্য উৎপাদন বছরের পর বছর ক্রমাগতহারে বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটা সম্ভব হয়েছে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের সময়োপযোগী সঠিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আর দেশের খেটেখাওয়া মানুষের পরিশ্রম।

বিস্ময়কর মনে হলেও এটাই বাস্তবতা যে, বাংলাদেশ ফলের উৎপাদনে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। দেশে প্রতি বছর ফলের উৎপাদন আগের বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে চলেছে। দুই দশক আগেও দেশের প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, লিচু, বরই, কলা, জাম, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি পরিচিত ছিল এবং এসবের আবাদও ছিল সীমিত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭২ প্রকারের দেশি বিদেশি ফল উৎপাদিত হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) হিসেবে গত ২০ বছর ধরে বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন ১২.৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে ফল চাষের আওতায় জমির পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ হেক্টর এবং মোট ফলের উৎপাদন ১৩০ মেট্রিক টনের কাছে।

দেশে ২০১৯-২০২০ বছরে আমের উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ মেট্রিক টন। এ বছরও আমের উৎপাদন অনেক ভালো এবং আম উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে ৭ম অবস্থানে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত আমের খুব সামান্য সরাসরি বা প্রক্রিয়াজাত পণ্য হিসেবে বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে আম উৎপাদনকারী কৃষকরা আমের দাম পাচ্ছেন না। কারণ দেশীয় বাজারের চাহিদার চেয়ে আমের উৎপাদন অনেক বেশি। উল্লেখ্য, ২০১৯-২০২০ বছরে দেশ থেকে আম রপ্তানি হয়েছে মাত্র ২৭৯ মেট্রিক টন।

বাংলার আপেল হিসেবে খ্যাত পেয়ারা উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৮ম এবং বর্তমান এর উৎপাদন প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন। অথচ ১৯৮০-১৯৮১ বছরে এই ফলটির উৎপাদন ছিল মাত্র ৯ হাজার টন। সারা বছরব্যাপী সহজলভ্য এই ফলের উৎপাদন যে গতিতে বেড়েছে সেইভাবে পেয়ারাকে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠেনি এবং ফল হিসেবে রপ্তানি করাও সম্ভব হয়নি।

বিশ্বের মধ্যে উৎপাদনের পরিমাণ বিবেচনায় বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় এবং বর্তমান উৎপাদন ১৮ লাখ মেট্রিক টনের ওপরে। এক সময় ফল হিসেবে দেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের জনপ্রিয়তা ছিল কিন্তু বর্তমানে বাজারে অনেক প্রকারের সুস্বাদু ফলের সহজপ্রাপ্যতা সেইসাথে মানুষের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে কাঁঠালের সমাদর অনেক কমে গেছে। গ্রামের গাছে গাছে কাঁঠাল পাকার পরে পচে পড়ে যায় অথচ এই বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত কাঁঠালের প্রক্রিয়াজাত করার কোন শিল্প অদ্যাবদি গড়ে উঠেনি। প্রক্রিয়াজাত কাঁঠালের জুস, চিপস, কৌটাজাত কাঁঠালের দেশের বাইরে চাহিদা আছে এবং রপ্তানি করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।

আনারস দেশের অন্যতম একটি সুস্বাদু ফল, যার বর্তমান উৎপাদন ৫ লাখ মেট্রিক টন এবং দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বাইরে রপ্তানি করার ব্যাপক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রক্রিয়াজাতের তেমন উদ্যোগ নেই। যেহেতু আনারস অতি দ্রুত পচনশীল একটি ফল তাই সরাসরি রপ্তানি করার সুযোগ কম, তবে জুস, চিপস এবং কৌটাজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে।

পেঁপে অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই ভূখন্ডে পরিচিত একটি ফল। বর্তমানে সুস্বাদু ও উচ্চফলনশীল জাতের কারণে দেশে পাকা পেঁপের উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন পাকা পেঁপে উৎপাদিত হয়। সরাসরি পাকা পেঁপে এবং প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে রপ্তানি করার সুযোগ আছে যদিও আমরা সেই পর্যায়ে আজ অবধি যেতে পারিনি।

দেশে বর্তমানে শাকসবজির উৎপাদন ১ কোটি ৭২ লাখ টন এবং বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। অথচ সবজি উৎপাদনের তুলনায় অতি সামান্য পরিমাণ বাইরে রপ্তানি হচ্ছে। প্রচুর সবজি উৎপাদন করে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না এমনকি প্রক্রিয়াজাতের অভাবে সবজির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতি বছর নষ্ট হয়ে যায়। দেশের মোট আলুর উৎপাদন ১১০ লাখ টন; যা বিশ্বের মধ্যে ৭ম অবস্থানে এবং দেশের চাহিদা ৭০ লাখ টন। অতিরিক্ত ৪০ লাখ টনের অতি সামান্য রপ্তানি হলেও আলুকে ঘিরে প্রক্রিয়াজাত শিল্প আজও গড়ে উঠেনি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, ১০ বছর আগে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে আয় ছিল ৪০ কোটি ডলার কিন্তু গত ৪ বছর ধরে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে আয় ক্রমাগত বাড়ছে। দেশে ৫০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের সাথে যুক্ত আছে; যার মধ্যে রপ্তানি করতে পারছে ১০০টির মতো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ২০টি। ইতোমধ্যে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে পড়েছে। ২০১৭-২০১৮ বছরে দেশ থেকে প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি হয় ৬৭.৩৭ কোটি ডলারের, ২০১৮-২০১৯ বছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০.৮৯ কোটি ডলার। ২০১৯-২০২০ বছরে বিশ্বে করোনা মহামারীর কারণে রপ্তানি কিছুটা কমে যাওয়ায় এ পরিমাণ হয় ৮৬.২০ কোটি ডলার এবং গত ২০২০-২০২১ বছরে বাংলাদেশ কৃষিপণ্যের রপ্তানি আয়ে বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়- যার পরিমাণ ১০২.৮১ কোটি ডলার।

উপরের তথ্য থেকে সহজেই বুঝা যায়, বাংলাদেশে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। শিল্পোন্নত ও উন্নত দেশগুলোর জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসায় তাদের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। এ সমস্ত দেশে প্রক্রিয়াজাত করা খাদ্যের চাহিদা রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলোতে বিশেষত যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৪ হাজার রেস্তোরাঁ আছে; যেখানে বাংলাদেশি খাদ্যপণ্যের চাহিদা আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে আমাদের ১ কোটির ওপর প্রবাসী আছে; যাদের কাছে দেশীয় প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য পৌঁছতে পারি।

দেশের কৃষিতে নতুন শিক্ষিত উদ্যোক্তারা যুক্ত হয়ে নতুন নতুন ফসল ও ফল উৎপাদন করছে; যা রপ্তানি না হওয়ায় দেশীয় বাজারে এসব কৃষিপণ্য কমমূল্যে বিক্রয় করে আর্থিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধুমাত্র প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণের অভাবে দেশে ৩৫ শতাংশের বেশি ফল ও শাকসবজি নষ্ট হয়ে যায়। দেশে মাছের উৎপাদন দেশীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও মৎস্য সেক্টর থেকে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসছে এবং আগামীতে আরো নতুন বাজার সৃষ্টির সুযোগ আছে। প্রাণিসম্পদ সেক্টরে প্রচুর উদ্যোক্তা যুক্ত হয়ে ডিম, দুধ ও মাংসের উৎপাদন দিনের পর দিন বাড়িয়ে যাচ্ছে কিন্তু প্রক্রিয়াজাতের অভাব সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় রপ্তানির দুয়ার খুলছে না। যদিও এসব পণ্য রপ্তানির কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা তা জানা নাই।

ফলের প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিশেষ করে ফলের জুস, জ্যাম-জেলি, শুষ্ক ফল, ফ্রোজেন ফল, কৌটাজাত ফল, ফলের আচার ইত্যাদিসহ আরো বিভিন্নভাবে ফলের প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে ওঠলে রপ্তানি আয় অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব। সবজির ওপর ভিত্তি করে অনেক শিল্প গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবজির কেচাপ, ফ্রোজেন সবজি, ফ্রোজেন ফ্রেন্স ফ্রাই, শুকানো সবজি, সবজির জুস, আচার, সচ, স্টার্চ ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের চাহিদা আছে। দেশের বাইরে প্রক্রিয়াজাত মসলা, মধু, কালোজিরার তেল, তিলের তেল, জৈবসার, গুঁড়োদুধ, প্যাকেটজাত মাংস ইত্যাদি রপ্তানি করে দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বিশ্ব বাজারে দেশীয় প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বৈদেশিক মিশনগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। কোন দেশে কি পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা নিরূপণ করে মিশনগুলো বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সাহায্য করতে পারে। সরকারের প্রণোদনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় সহায়তার কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদনে অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন এবং কৃষির উৎপাদন ক্রমাগতহারে বেড়েই চলছে। কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাত শিল্প স্থাপনেও সরকারকে বিশেষ প্রণোদনাসহ দীর্ঘমেয়াদি অতি অল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করে দিলে দেশে কৃষির শিল্পায়ন তৈরি হবে; যা বর্তমানে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য খুবই জরুরি। কৃষির শিল্পায়ন হলে দেশের অথনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসবে। উৎপাদক শ্রেণী তাদের পণ্যের বাজার পাবে এবং ন্যায্য দামও পাবে। নতুন উদ্যোক্তা কৃষির উৎপাদনের সাথে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করবে। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে দেশে আসবে বৈদেশিক মুদ্রা; যা বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আরো বেগবান করবে।

[লেখক : এমএ আউয়াল, সদস্য পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি); এম মনির উদ্দিন, এগ্রোনমিস্ট]