আইসিটি শিক্ষা আবশ্যক, ২২ হাজার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই

৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে একাদশ শ্রেণী। প্রতিটি শ্রেণীতেই ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ (আইসিটি) শিক্ষা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের এই বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হচ্ছে। ‘আইসিটি’ আবশ্যক হলেও এই বিষয়ের শিক্ষক নেই দেশের অর্ধেকের বেশি স্কুল-কলেজে। শিক্ষক নিয়োগের জোরালো উদ্যোগও নেই সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও সংস্থার। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ বাস্তবায়নের আলোকেই শিক্ষার্থীদের আইসিটি বিষয় পড়তে হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে পুরোনো ৩১৭টি সরকারি হাইস্কুলের কোনটিতেই ‘আইসিটি’ বিষয়ের শিক্ষক নেই, পদ নেই। জাতীয়করণ হওয়া ২৮৯টি হাইস্কুল এবং দুটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত নতুন ১৫টিসহ দেশে ছয় শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কোন স্কুলেই আইসিটি শিক্ষক নেই।

সরকারের গত মেয়াদে জাতীয়করণ হওয়া ২৭৪টি কলেজসহ বর্তমানে দেশে মোট সরকারি কলেজের সংখ্যা ৬৩৫টি। এগুলোর জন্য সম্প্রতি ১৬৮ জন আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। সব এমপিওভুক্ত স্কুলেও আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নেই। নানা জটিলতার কারণে এমপিওভুক্ত অনেক স্কুলে আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে মাউশির কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী সংবাদকে বলেন, ‘পিএসসি সরকারি কলেজের জন্য ৩৮তম বিসিএস থেকে ১৬৮ জন আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। এখন থেকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষক নিয়োগ অব্যাহত থাকবে। কারণ সব সরকারি কলেজেই আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।’

বেসরকারি স্কুল-কলেজে আইসিটি শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে মাউশি পরিচালক বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ এখন মাউশি দেয় না। সরাসরি প্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য পদের চাহিদাপত্র নিয়ে এনটিআরসিএ (জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) এই নিয়োগ দিয়ে থাকে।’

শিক্ষানীতির উল্টো কাজ হচ্ছে

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’এ ‘৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ’ শ্রেণী পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের আলোকে ২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে, ২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে সপ্তম শ্রেণীতে ও ২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে, ২০১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম শ্রেণীতে ও ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামক নতুন বিষয়কে বাধ্যতামূলক করা হয়।

জানতে চাইলে ‘শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও ‘জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির’ (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর শেখ ইকরামুল কবির সংবাদকে বলেন, ‘শিক্ষানীতিতে পরিষ্কার বলা আছে, আগে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, সব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে, এরপর মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম বসাতে হবে। কিন্তু করা হচ্ছে এর উল্টোটা।’

তিনি বলেন, ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনে আগে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ এখানে কেনাকাটা আছে।’

২২ হাজার প্রতিষ্ঠানে নেই আইসিটি শিক্ষক

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৩০ হাজার ৫৪০টি এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া প্রাইভেট, ট্রাস্ট ও সংস্থা পরিচালিত এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে আরও দশ হাজারের মতো।

প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বর্তমানে বিদ্যালয় পর্যায়ে ১৩ হাজার ৯২৬ জন এবং কলেজ পর্যায়ে চার হাজার ছয়জন আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন। এ হিসেবে ন্যূনতম একজন করে ধরা হলেও প্রায় ২২ হাজার প্রতিষ্ঠানে ‘আইসিটি’ শিক্ষক নেই।

জানতে চাইলে রাজধানীর ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভূইয়া সংবাদকে বলেন, ‘আইসিটি শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরনের টুলস (শিক্ষা উপকরণ) ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারেন, অনেক গভীরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝাতে পারেন। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক, যারা আইসিটি বিষয়ের ওপর এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তারা সেভাবে গভীরে গিয়ে পাঠদান করতে পারছেন না। তারা সাধারণ বিষয়গুলোর ওপর পাঠদান করছেন।’

নবম-দশম শ্রেণীতে আইসিটি বিষয়ে ‘বেসিক প্রোগ্রামিং’ রয়েছে জানিয়ে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবু সাঈদ ভূইয়া আরও বলেন, ‘এগুলোতে পড়াতে হলে ডিপ নলেজ থাকা দরকার, কম্পিউটার সায়েন্সের ওপর নলেজ থাকা দরকার, ম্যাথমেটিক্যাল নলেজ দরকার, সেই প্রশিক্ষণ সাধারণ শিক্ষকদের নেই। তাদের পক্ষে আইসিটি বিষয়ের গভীরে গিয়ে পাঠদান সম্ভব নয়।’

ধর্মীয় বিষয়ের শিক্ষকরা আইসিটি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু তারা নিজেরাই নবম-দশম শ্রেণীর আইসিটি বিষয়ের ল্যাংগুয়েজ, প্রোগ্রামিং, কোডিং-এগুলো বুঝতে পারেন না।’

সরকার ২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬ষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করেছে। নয় বছরেও সরকারি হাইস্কুলে আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় সব স্কুলেই দুটি, পাঁচটি আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় ল্যাবের সুবিধা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। বেশির ভাগ স্কুলেই ল্যাবগুলো ‘শো-পিস’ হিসেবে শোভা পাচ্ছে।

ঢাকার অপর একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, মাউশি, এনসিটিবিসহ অন্যান্য সরকারি অফিস থেকে বিভিন্ন কাজ দেয়া হয়। ওইসব কাজ স্কুলের ল্যাব থেকে করা হয়।

১০/১২ জন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থায়ী শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা খ-কালীন কম্পিউটার অপারেটর দিয়ে আইসিটি বিষয়ে পাঠদান চলছে।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ৯৪ হাজার

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স’র নির্বাহী কমিটির ১১তম সভা গত ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী গত ৪ আগস্ট প্রকাশ হয়। ওই ১২তম সভার আয়োজন উপলক্ষে ১১তম সভার নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি জানাতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।

এই বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেনের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮-২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩ হাজার ২৮৫টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ৬৬৬টি। কিন্তু মামলা ও ক্রয় পদ্ধতি জটিলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত মোট ৬০ হাজার ৭৭৫টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৪২ হাজার ১১৭টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষকের কোন পদ নেই। সবমিলিয়ে সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯৪ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছে সরকার।

২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন শিক্ষাক্রমে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়টিকে আধুনিকায়ন করে ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি’ নামে সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে ২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এবং আইসিটি অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট ছয় লাখ ৮৬ হাজার ২৪ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়াও শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন (২য় পর্যায়) প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৫১ হাজার ২০ জন শিক্ষককে আইসিটি বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।

শনিবার, ২০ নভেম্বর ২০২১ , ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

৬ষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত

আইসিটি শিক্ষা আবশ্যক, ২২ হাজার প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই

৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে একাদশ শ্রেণী। প্রতিটি শ্রেণীতেই ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ (আইসিটি) শিক্ষা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদের এই বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হচ্ছে। ‘আইসিটি’ আবশ্যক হলেও এই বিষয়ের শিক্ষক নেই দেশের অর্ধেকের বেশি স্কুল-কলেজে। শিক্ষক নিয়োগের জোরালো উদ্যোগও নেই সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও সংস্থার। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ বাস্তবায়নের আলোকেই শিক্ষার্থীদের আইসিটি বিষয় পড়তে হচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশে পুরোনো ৩১৭টি সরকারি হাইস্কুলের কোনটিতেই ‘আইসিটি’ বিষয়ের শিক্ষক নেই, পদ নেই। জাতীয়করণ হওয়া ২৮৯টি হাইস্কুল এবং দুটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠিত নতুন ১৫টিসহ দেশে ছয় শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কোন স্কুলেই আইসিটি শিক্ষক নেই।

সরকারের গত মেয়াদে জাতীয়করণ হওয়া ২৭৪টি কলেজসহ বর্তমানে দেশে মোট সরকারি কলেজের সংখ্যা ৬৩৫টি। এগুলোর জন্য সম্প্রতি ১৬৮ জন আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। সব এমপিওভুক্ত স্কুলেও আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নেই। নানা জটিলতার কারণে এমপিওভুক্ত অনেক স্কুলে আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে মাউশির কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক অধ্যাপক শাহেদুল খবির চৌধুরী সংবাদকে বলেন, ‘পিএসসি সরকারি কলেজের জন্য ৩৮তম বিসিএস থেকে ১৬৮ জন আইসিটি শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। এখন থেকে পর্যায়ক্রমে শিক্ষক নিয়োগ অব্যাহত থাকবে। কারণ সব সরকারি কলেজেই আইসিটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।’

বেসরকারি স্কুল-কলেজে আইসিটি শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে মাউশি পরিচালক বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ এখন মাউশি দেয় না। সরাসরি প্রতিষ্ঠান থেকে শূন্য পদের চাহিদাপত্র নিয়ে এনটিআরসিএ (জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) এই নিয়োগ দিয়ে থাকে।’

শিক্ষানীতির উল্টো কাজ হচ্ছে

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’এ ‘৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ’ শ্রেণী পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের আলোকে ২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে, ২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে সপ্তম শ্রেণীতে ও ২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে অষ্টম শ্রেণীতে, ২০১৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম শ্রেণীতে ও ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নামক নতুন বিষয়কে বাধ্যতামূলক করা হয়।

জানতে চাইলে ‘শিক্ষানীতি-২০১০’ প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব ও ‘জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির’ (নায়েম) সাবেক মহাপরিচালক প্রফেসর শেখ ইকরামুল কবির সংবাদকে বলেন, ‘শিক্ষানীতিতে পরিষ্কার বলা আছে, আগে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে, সব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে, এরপর মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম বসাতে হবে। কিন্তু করা হচ্ছে এর উল্টোটা।’

তিনি বলেন, ‘মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনে আগে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ এখানে কেনাকাটা আছে।’

২২ হাজার প্রতিষ্ঠানে নেই আইসিটি শিক্ষক

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৩০ হাজার ৫৪০টি এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া প্রাইভেট, ট্রাস্ট ও সংস্থা পরিচালিত এবং বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে আরও দশ হাজারের মতো।

প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বর্তমানে বিদ্যালয় পর্যায়ে ১৩ হাজার ৯২৬ জন এবং কলেজ পর্যায়ে চার হাজার ছয়জন আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন। এ হিসেবে ন্যূনতম একজন করে ধরা হলেও প্রায় ২২ হাজার প্রতিষ্ঠানে ‘আইসিটি’ শিক্ষক নেই।

জানতে চাইলে রাজধানীর ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভূইয়া সংবাদকে বলেন, ‘আইসিটি শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরনের টুলস (শিক্ষা উপকরণ) ব্যবহার করে পাঠদান করতে পারেন, অনেক গভীরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বুঝাতে পারেন। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক, যারা আইসিটি বিষয়ের ওপর এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তারা সেভাবে গভীরে গিয়ে পাঠদান করতে পারছেন না। তারা সাধারণ বিষয়গুলোর ওপর পাঠদান করছেন।’

নবম-দশম শ্রেণীতে আইসিটি বিষয়ে ‘বেসিক প্রোগ্রামিং’ রয়েছে জানিয়ে সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবু সাঈদ ভূইয়া আরও বলেন, ‘এগুলোতে পড়াতে হলে ডিপ নলেজ থাকা দরকার, কম্পিউটার সায়েন্সের ওপর নলেজ থাকা দরকার, ম্যাথমেটিক্যাল নলেজ দরকার, সেই প্রশিক্ষণ সাধারণ শিক্ষকদের নেই। তাদের পক্ষে আইসিটি বিষয়ের গভীরে গিয়ে পাঠদান সম্ভব নয়।’

ধর্মীয় বিষয়ের শিক্ষকরা আইসিটি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিন্তু তারা নিজেরাই নবম-দশম শ্রেণীর আইসিটি বিষয়ের ল্যাংগুয়েজ, প্রোগ্রামিং, কোডিং-এগুলো বুঝতে পারেন না।’

সরকার ২০১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে ৬ষ্ঠ থেকে একাদশ শ্রেণী পর্যন্ত আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করেছে। নয় বছরেও সরকারি হাইস্কুলে আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় সব স্কুলেই দুটি, পাঁচটি আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকায় ল্যাবের সুবিধা পাচ্ছে না শিক্ষার্থীরা। বেশির ভাগ স্কুলেই ল্যাবগুলো ‘শো-পিস’ হিসেবে শোভা পাচ্ছে।

ঢাকার অপর একটি সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংবাদকে জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, মাউশি, এনসিটিবিসহ অন্যান্য সরকারি অফিস থেকে বিভিন্ন কাজ দেয়া হয়। ওইসব কাজ স্কুলের ল্যাব থেকে করা হয়।

১০/১২ জন প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থায়ী শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা খ-কালীন কম্পিউটার অপারেটর দিয়ে আইসিটি বিষয়ে পাঠদান চলছে।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ৯৪ হাজার

‘ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স’র নির্বাহী কমিটির ১১তম সভা গত ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী গত ৪ আগস্ট প্রকাশ হয়। ওই ১২তম সভার আয়োজন উপলক্ষে ১১তম সভার নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি জানাতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জন্য একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ।

এই বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেনের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮-২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩ হাজার ২৮৫টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ হাজার ৬৬৬টি। কিন্তু মামলা ও ক্রয় পদ্ধতি জটিলতার কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত মোট ৬০ হাজার ৭৭৫টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। আরও ৪২ হাজার ১১৭টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষকের কোন পদ নেই। সবমিলিয়ে সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৯৪ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছে সরকার।

২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন শিক্ষাক্রমে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়টিকে আধুনিকায়ন করে ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি’ নামে সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করে ২০২২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এবং আইসিটি অধিদপ্তরের মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট ছয় লাখ ৮৬ হাজার ২৪ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়াও শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন (২য় পর্যায়) প্রকল্পের মাধ্যমে আরও ৫১ হাজার ২০ জন শিক্ষককে আইসিটি বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।