বহিষ্কৃত জাহাঙ্গীর মেয়র পদে থাকতে পারবেন কি?

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি মেয়র পদে থাকতে পারবেন কিনা সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ স্থানীয় সরকার আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত মেয়রকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তার ভাগ্যে কী হবে সে বিষয় উল্লেখ নেই। বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেননি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামও।

স্থানীয় সরকার বিশেজ্ঞদের মতে, সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে দল থেকে বহিষ্কার হলে আর পদে থাকার সুযোগ থাকে না। স্থানীয় সরকার আইনে এ ধরনের কিছু বলা নেই। ফলে এই মুহূর্তে মেয়র পদে থাকতে জাহাঙ্গীর আলমের কোন বাধা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে, তার মেয়র পদে থাকা না থাকারে বিষয়ে আলোচনা দেশ জুড়ে।

এদিকে এতো আলোচনা সমালোচনার মধ্যেও জাহাঙ্গীর আলম গতকাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু আমি কোন পাপ বা অন্যায় করিনি।’

প্রসঙ্গত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের নিয়ে মন্তব্যের অডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার জের ধরে গত শুক্রবার জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই সঙ্গে তার প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হয়। গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

জানা গেছে, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট করতে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করা হয়। তখন শুধু দলীয় প্রতীক ও প্রার্থিতার বিষয়টি যুক্ত করা হয়। মেয়র পদ থেকে অপসারণের বিষয়ে নিয়মের কোন পরিবর্তন হয়নি। করপোরেশন আইনেও এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

তবে, তার বিরুদ্ধে মামলা হলে এবং সেই মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলেই কেবল তিনি মেয়র পদ হারাবেন।

জানাগেছে, স্থানীয় সরকার আইনের ‘মেয়র ও কাউন্সিলরগণের সাময়িক বরখাস্তকরণ’ বিষয়ে বলা হয়েছে- সিটি করপোরেশনের কোন মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবে।

সিটি করপোরেশন আইনের ১২ (১) বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের কোন মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারিবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন আইনের ১২ (২) উপ-ধারা (১) এর অধীনে সিটি করপোরেশনের কোন মেয়রকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশ দেয়া হলে সেই আদেশপ্রাপ্তির তিন দিনের মধ্যে সাময়িকভাবে বরখাস্ত মেয়র ক্রমানুসারে মেয়র প্যানেলের জ্যেষ্ঠ সদস্যের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। মেয়রের বিরুদ্ধে আনা আইনি কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত, অথবা সেই মেয়র অপসারিত হলে, তার পরিবর্তে নতুন মেয়র নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ওই আইনের ১৩ (১) ধারায় মেয়র অথবা কাউন্সিলর পদ থেকে অপসারণযোগ্য হবেন যদি তিনি (ক) যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া সিটি করপোরেশনের পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন, (খ) নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালতে দ-িত হন, (গ) দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করেন অথবা শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, (ঘ) অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন, (ঙ) নির্বাচনের অযোগ্য ছিলেন মর্মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তিন মাসের মধ্যে প্রমাণিত হয়, (চ) বার্ষিক ১২টি মাসিক সভার পরিবর্তে ন্যূনতম ৯টি সভা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া অনুষ্ঠান করতে, বা ক্ষেত্রমত, সভায় উপস্থিত থাকতে ব্যর্থ হন।

আইনের ব্যাখ্যায় ‘অসদাচরণ’ বলতে ক্ষমতার অপব্যবহার, এ আইন অনুযায়ী বিধি-নিষেধ পরিপন্থী কার্যকলাপ, দুর্নীতি, অসদুপায়ে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ, পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি, ইচ্ছাকৃত অপশাসন, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করা বা অসত্য দেয়াকে বলা হয়েছে। অপসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে বিধি অনুযায়ী তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

এছাড়া, সিটি করপোরেশনের কোন মেয়র বা কাউন্সিলরকে পদ থেকে অপসারণ করা হলে, ওই আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করতে পারবেন এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপসারণের আদেশ স্থগিত থাকবে। সব পক্ষকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিতে রাষ্ট্রপতি ওই অপসারণের আদেশ পরিবর্তন, বাতিল বা বহাল রাখতে পারবেন। আপিলের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির আদেশই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

আইনজীবী ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিজ্ঞতা একেবারে নতুন। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে কোন নির্দেশনা পেলে আইন দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় সরকার বিশেজ্ঞদের মতে, সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে দল থেকে বহিষ্কার হলে আর পদে থাকার সুযোগ থাকে না। তবে স্থানীয় সরকার আইনে এ ধরনের কিছু বলা নেই।

মেয়র জাহাঙ্গীরের ‘বহিস্কার’ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছেন, গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মেয়র পদ থাকবে কিনা, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে আইন পর্যালোচনা করে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ জানান, ‘জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে যে গুরুতর দুটি অভিযোগ এসেছে তাতে তারা কখনোই দলের আদর্শের ধারক হতে পারে না। তাদের আওয়ামী লীগ করার কোন নৈতিক অধিকার নেই।’

যত কাছের মানুষ, যার যত প্রিয় মানুষ হোক না কেন, সেটা দেখার বিষয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা ও আওয়ামী লীগ এ দুয়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কারও সঙ্গে কোন আপস করবে না। পাশাপাশি দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোনমতে ছাড় দেয়া হবে না।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ দল থেকে বহিষ্কার করায় জাহাঙ্গীরের মেয়র পদে থাকা নিয়ে কোন সংশয় আছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আইনে এ বিষয়ে পরিষ্কার কোন ব্যাখ্যা নেই।’

তিনি বলেন, ‘এটা তো আমাদের জন্য নতুন একটা অভিজ্ঞতা। আইনের মধ্যে কিন্তু সুষ্পষ্ট কিছু লেখা নাই। আইনের মধ্যে শুধু লেখা আছে সে যদি ফৌজদারি মামলা, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রের ক্ষতি করলে পদ হারাবেন।’

ঝুট ব্যবসায়ী থেকে নগরপিতা

বেশ নাটকীয় উত্থান জাহাঙ্গীর আলমের। কৃষকের ঘরে জন্ম নিলেও দ্রুতই তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। সেই সঙ্গে চলে আসে অগাধ রাজনৈতিক ক্ষমতা, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল মেয়র পদে বিজয়।

জনপ্রতিনিধি হয়েই তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী, আইনের তোয়াক্কা না করেই তিনি কোনরকম টেন্ডার ছাড়াই মহানগরে শত শত কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করেছেন, যাতে দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন অনেকে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য স্থানীয়দের হাজার হাজার বিঘা জমি নষ্ট করলেও সঠিক ক্ষতিপূরণ দেননি তিনি। অনেকের অভিযোগ, তিনি গাজীপুর সিটির ‘একচ্ছত্র অধিপতি’ হতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাহাঙ্গীর মাত্র ৩৮ বছর বয়সে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।

১৯৭৯ সালে গাজীপুর মহানগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কানাইয়া গ্রামে কৃষক মিজানুর রহমানের ঘরে জাহাঙ্গীরের জন্ম। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন স্কুলজীবনেই। গাজীপুরের চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন জেলার ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে। ওই কলেজের ছাত্রদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০০৯ সালে তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শুরু হয় তার উত্থান পর্ব। শিল্পনগরী গাজীপুরের বিভিন্ন মিল কারখানায় নামে-বেনামে শুরু করেন ঝুট ব্যবসা। আধিপত্য বিস্তারের জন্য তৈরি করেন নিজস্ব বাহিনী। অল্প সময়ের ব্যবধানে জাহাঙ্গীর শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। বিঘার পর বিঘা জমি কেনেন উচ্চ মূল্যে। জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, তার টাকার পরিমাণ তিনি নিজেও জানেন না। হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বহু আগেই।

আওয়ামী লীগের প্রধান ও দলের শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জাহাঙ্গীর জাতীয় শোক দিবসে মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই একটি করে গরু দিয়ে কাঙালিভোজের আয়োজন করতেন। এটাকে তার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন নেতাকর্মীরা। দ্রুতই জেলার বর্ষীয়ান সব আওয়ামী লীগ নেতাকে পেছনে ফেলে তিনি চলে আসেন সামনের কাতারে। তবে অল্প সময়ে তার এ উত্থান এবং দলের সিনিয়র নেতাদের অবমূল্যায়ন মেনে নেননি দলীয় নেতাকর্মীরা। ফলে এখানকার রাজনীতি বিভক্তির দিকে গড়ায়।

অভিযোগ আছে, বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের লোকজন নিয়ে তিনি দাতব্য সংস্থা ‘জাহাঙ্গীর আলম ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছেন। আওয়ামী লীগের ব্যানারে সব কিছু করলেও দলীয় সব নেতাকর্মী সেখানে উপেক্ষিত। ওই সংগঠনে যুক্ত লোকজনের সঙ্গেই তার উঠাবসা ছিল। মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডেই এ সংস্থার কমিটি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সমর্থকরা ‘জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীর’ বলে সেøাগান দিতেন। সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও নেয়া হতো না।

মেয়র হওয়ার পরে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে ৩০০ জনকে ট্রাফিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন। তথাকথিত ট্রাফিক সহকারীদের হাতে সিটির যানজট নিরসনের দায়িত্ব তুলে দেয়ায় ট্রাফিক পুলিশের পেশাদারি কর্তৃত্ব খর্ব করেন। যানজট নিরসনের দোহাই দিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য সিটিজুড়ে চক্রাকার বাস সার্ভিস ‘তাকওয়া পরিবহন’ চালু করেন। প্রশিক্ষিত ট্রাফিক পুলিশের বদলে তার ট্রাফিক সহকারীরা গোটা মহানগরীর সড়ক-শৃঙ্খলার রক্ষা করতে না পারলেও ওই বাহিনীর অনাচারের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করার সাহসও পাননি কেউ।

টেন্ডার দেয়া ছাড়াই মেয়র জাহাঙ্গীর মহানগরে ৮০০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করেছেন। তাতে প্রায় ৮ হাজার বিঘা জমি, প্রায় ৩১ হাজার ঘরবাড়ি, মসজিদ-মন্দির, কবরস্থান সরিয়ে তিনি এই রাস্তা করেছেন। অভিযোগ আছে, রাস্তা নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ না করে তিনি তার ইচ্ছামতো এসব করেছেন। ক্ষতিপূরণ হিসেবে মর্জিমাফিক টাকা দিয়েছেন। অনেকে সে টাকাও পায়নি।

রবিবার, ২১ নভেম্বর ২০২১ , ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

বহিষ্কৃত জাহাঙ্গীর মেয়র পদে থাকতে পারবেন কি?

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি মেয়র পদে থাকতে পারবেন কিনা সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ স্থানীয় সরকার আইনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত মেয়রকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তার ভাগ্যে কী হবে সে বিষয় উল্লেখ নেই। বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেননি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামও।

স্থানীয় সরকার বিশেজ্ঞদের মতে, সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে দল থেকে বহিষ্কার হলে আর পদে থাকার সুযোগ থাকে না। স্থানীয় সরকার আইনে এ ধরনের কিছু বলা নেই। ফলে এই মুহূর্তে মেয়র পদে থাকতে জাহাঙ্গীর আলমের কোন বাধা নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে, তার মেয়র পদে থাকা না থাকারে বিষয়ে আলোচনা দেশ জুড়ে।

এদিকে এতো আলোচনা সমালোচনার মধ্যেও জাহাঙ্গীর আলম গতকাল সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে বহিষ্কারাদেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভুল হতে পারে, কিন্তু আমি কোন পাপ বা অন্যায় করিনি।’

প্রসঙ্গত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের নিয়ে মন্তব্যের অডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনার জের ধরে গত শুক্রবার জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই সঙ্গে তার প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হয়। গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।

জানা গেছে, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট করতে ২০১৫ সালে আইন সংশোধন করা হয়। তখন শুধু দলীয় প্রতীক ও প্রার্থিতার বিষয়টি যুক্ত করা হয়। মেয়র পদ থেকে অপসারণের বিষয়ে নিয়মের কোন পরিবর্তন হয়নি। করপোরেশন আইনেও এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

তবে, তার বিরুদ্ধে মামলা হলে এবং সেই মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলেই কেবল তিনি মেয়র পদ হারাবেন।

জানাগেছে, স্থানীয় সরকার আইনের ‘মেয়র ও কাউন্সিলরগণের সাময়িক বরখাস্তকরণ’ বিষয়ে বলা হয়েছে- সিটি করপোরেশনের কোন মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবে।

সিটি করপোরেশন আইনের ১২ (১) বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশনের কোন মেয়র বা কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হলে সরকার লিখিত আদেশের মাধ্যমে মেয়র বা কাউন্সিলরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারিবে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন আইনের ১২ (২) উপ-ধারা (১) এর অধীনে সিটি করপোরেশনের কোন মেয়রকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের আদেশ দেয়া হলে সেই আদেশপ্রাপ্তির তিন দিনের মধ্যে সাময়িকভাবে বরখাস্ত মেয়র ক্রমানুসারে মেয়র প্যানেলের জ্যেষ্ঠ সদস্যের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। মেয়রের বিরুদ্ধে আনা আইনি কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত, অথবা সেই মেয়র অপসারিত হলে, তার পরিবর্তে নতুন মেয়র নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ওই আইনের ১৩ (১) ধারায় মেয়র অথবা কাউন্সিলর পদ থেকে অপসারণযোগ্য হবেন যদি তিনি (ক) যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া সিটি করপোরেশনের পর পর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন, (খ) নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে আদালতে দ-িত হন, (গ) দায়িত্ব পালন করতে অস্বীকার করেন অথবা শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন, (ঘ) অসদাচরণ বা ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন, (ঙ) নির্বাচনের অযোগ্য ছিলেন মর্মে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তিন মাসের মধ্যে প্রমাণিত হয়, (চ) বার্ষিক ১২টি মাসিক সভার পরিবর্তে ন্যূনতম ৯টি সভা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া অনুষ্ঠান করতে, বা ক্ষেত্রমত, সভায় উপস্থিত থাকতে ব্যর্থ হন।

আইনের ব্যাখ্যায় ‘অসদাচরণ’ বলতে ক্ষমতার অপব্যবহার, এ আইন অনুযায়ী বিধি-নিষেধ পরিপন্থী কার্যকলাপ, দুর্নীতি, অসদুপায়ে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ, পক্ষপাতিত্ব, স্বজনপ্রীতি, ইচ্ছাকৃত অপশাসন, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করা বা অসত্য দেয়াকে বলা হয়েছে। অপসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে বিধি অনুযায়ী তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।

এছাড়া, সিটি করপোরেশনের কোন মেয়র বা কাউন্সিলরকে পদ থেকে অপসারণ করা হলে, ওই আদেশের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করতে পারবেন এবং আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপসারণের আদেশ স্থগিত থাকবে। সব পক্ষকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিতে রাষ্ট্রপতি ওই অপসারণের আদেশ পরিবর্তন, বাতিল বা বহাল রাখতে পারবেন। আপিলের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির আদেশই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

আইনজীবী ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এ ধরনের অভিজ্ঞতা একেবারে নতুন। পরবর্তীতে এ ব্যাপারে কোন নির্দেশনা পেলে আইন দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় সরকার বিশেজ্ঞদের মতে, সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে দল থেকে বহিষ্কার হলে আর পদে থাকার সুযোগ থাকে না। তবে স্থানীয় সরকার আইনে এ ধরনের কিছু বলা নেই।

মেয়র জাহাঙ্গীরের ‘বহিস্কার’ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছেন, গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মেয়র পদ থাকবে কিনা, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে আইন পর্যালোচনা করে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ জানান, ‘জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে যে গুরুতর দুটি অভিযোগ এসেছে তাতে তারা কখনোই দলের আদর্শের ধারক হতে পারে না। তাদের আওয়ামী লীগ করার কোন নৈতিক অধিকার নেই।’

যত কাছের মানুষ, যার যত প্রিয় মানুষ হোক না কেন, সেটা দেখার বিষয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা ও আওয়ামী লীগ এ দুয়ের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ কারও সঙ্গে কোন আপস করবে না। পাশাপাশি দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কোনমতে ছাড় দেয়া হবে না।’

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ দল থেকে বহিষ্কার করায় জাহাঙ্গীরের মেয়র পদে থাকা নিয়ে কোন সংশয় আছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আইনে এ বিষয়ে পরিষ্কার কোন ব্যাখ্যা নেই।’

তিনি বলেন, ‘এটা তো আমাদের জন্য নতুন একটা অভিজ্ঞতা। আইনের মধ্যে কিন্তু সুষ্পষ্ট কিছু লেখা নাই। আইনের মধ্যে শুধু লেখা আছে সে যদি ফৌজদারি মামলা, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রের ক্ষতি করলে পদ হারাবেন।’

ঝুট ব্যবসায়ী থেকে নগরপিতা

বেশ নাটকীয় উত্থান জাহাঙ্গীর আলমের। কৃষকের ঘরে জন্ম নিলেও দ্রুতই তিনি বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। সেই সঙ্গে চলে আসে অগাধ রাজনৈতিক ক্ষমতা, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল মেয়র পদে বিজয়।

জনপ্রতিনিধি হয়েই তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী, আইনের তোয়াক্কা না করেই তিনি কোনরকম টেন্ডার ছাড়াই মহানগরে শত শত কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করেছেন, যাতে দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছেন অনেকে। উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য স্থানীয়দের হাজার হাজার বিঘা জমি নষ্ট করলেও সঠিক ক্ষতিপূরণ দেননি তিনি। অনেকের অভিযোগ, তিনি গাজীপুর সিটির ‘একচ্ছত্র অধিপতি’ হতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাহাঙ্গীর মাত্র ৩৮ বছর বয়সে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন।

১৯৭৯ সালে গাজীপুর মহানগরের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কানাইয়া গ্রামে কৃষক মিজানুর রহমানের ঘরে জাহাঙ্গীরের জন্ম। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন স্কুলজীবনেই। গাজীপুরের চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন জেলার ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে। ওই কলেজের ছাত্রদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০০৯ সালে তিনি গাজীপুর সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শুরু হয় তার উত্থান পর্ব। শিল্পনগরী গাজীপুরের বিভিন্ন মিল কারখানায় নামে-বেনামে শুরু করেন ঝুট ব্যবসা। আধিপত্য বিস্তারের জন্য তৈরি করেন নিজস্ব বাহিনী। অল্প সময়ের ব্যবধানে জাহাঙ্গীর শত শত কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। বিঘার পর বিঘা জমি কেনেন উচ্চ মূল্যে। জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, তার টাকার পরিমাণ তিনি নিজেও জানেন না। হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বহু আগেই।

আওয়ামী লীগের প্রধান ও দলের শীর্ষ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জাহাঙ্গীর জাতীয় শোক দিবসে মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই একটি করে গরু দিয়ে কাঙালিভোজের আয়োজন করতেন। এটাকে তার কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন নেতাকর্মীরা। দ্রুতই জেলার বর্ষীয়ান সব আওয়ামী লীগ নেতাকে পেছনে ফেলে তিনি চলে আসেন সামনের কাতারে। তবে অল্প সময়ে তার এ উত্থান এবং দলের সিনিয়র নেতাদের অবমূল্যায়ন মেনে নেননি দলীয় নেতাকর্মীরা। ফলে এখানকার রাজনীতি বিভক্তির দিকে গড়ায়।

অভিযোগ আছে, বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের লোকজন নিয়ে তিনি দাতব্য সংস্থা ‘জাহাঙ্গীর আলম ফাউন্ডেশন’ গড়ে তুলেছেন। আওয়ামী লীগের ব্যানারে সব কিছু করলেও দলীয় সব নেতাকর্মী সেখানে উপেক্ষিত। ওই সংগঠনে যুক্ত লোকজনের সঙ্গেই তার উঠাবসা ছিল। মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডেই এ সংস্থার কমিটি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সমর্থকরা ‘জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীর’ বলে সেøাগান দিতেন। সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও নেয়া হতো না।

মেয়র হওয়ার পরে তিনি নিজস্ব উদ্যোগে ৩০০ জনকে ট্রাফিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন। তথাকথিত ট্রাফিক সহকারীদের হাতে সিটির যানজট নিরসনের দায়িত্ব তুলে দেয়ায় ট্রাফিক পুলিশের পেশাদারি কর্তৃত্ব খর্ব করেন। যানজট নিরসনের দোহাই দিয়ে নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য সিটিজুড়ে চক্রাকার বাস সার্ভিস ‘তাকওয়া পরিবহন’ চালু করেন। প্রশিক্ষিত ট্রাফিক পুলিশের বদলে তার ট্রাফিক সহকারীরা গোটা মহানগরীর সড়ক-শৃঙ্খলার রক্ষা করতে না পারলেও ওই বাহিনীর অনাচারের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করার সাহসও পাননি কেউ।

টেন্ডার দেয়া ছাড়াই মেয়র জাহাঙ্গীর মহানগরে ৮০০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ করেছেন। তাতে প্রায় ৮ হাজার বিঘা জমি, প্রায় ৩১ হাজার ঘরবাড়ি, মসজিদ-মন্দির, কবরস্থান সরিয়ে তিনি এই রাস্তা করেছেন। অভিযোগ আছে, রাস্তা নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ না করে তিনি তার ইচ্ছামতো এসব করেছেন। ক্ষতিপূরণ হিসেবে মর্জিমাফিক টাকা দিয়েছেন। অনেকে সে টাকাও পায়নি।