সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন তুষার ইমরান

দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের মহারথী বলা হয় তুষার ইমরানকে। অবশেষে ক্রিকেটটাকে বিদায় বলে দিয়েছেন তিনি। ১৪ বছর ধরে জাতীয় দলে উপেক্ষিত থাকলেও সদর্পে বেড়িয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। গতকাল বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) জাতীয় লীগের ম্যাচ চলাকালীন আনুষ্ঠানিকভাবে সবধরনের ক্রিকেট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে তুষার শনিবার ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন অবসরের। এরপর রোববার তাকে বিকেএসপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানায় ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। এ সময় বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন ফাহিম, জাতীয় নির্বাচক আবদুর রাজ্জাক ও কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল। বিদায়ী সংবর্ধনা শেষে তুষারের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যেই তার কোন বন্ধু যেন ফোন দিয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। মন খারাপ না করার উপদেশ দিচ্ছেন, সান্ত¡না দিচ্ছেন। এ পাশ থেকে তুষার বলছেন, ‘না আমি ঠিক আছি।’ সতীর্থদের মধ্যে রাজ্জাক এসেছিলেন সময় বের করে। মাশারাফি মুর্তজা-সাকিব আল হাসানকে জানিয়েছিলেন, তার ইতি টানার কথা। দুজনেই তাকে পরবর্তী জীবনের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। খালেদ মাহমুদ সুজন জাতীয় দলের সঙ্গে বায়োবাবলে থাকায় আসতে পারেননি আর কোয়াব সভাপতি নাঈমুর রহমান দুর্জয় সময় বের করতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। বন্ধুকে তুষার যতই বলছেন ঠিক আছেন, কিন্তু তার চেহারা বলছে ভিন্ন কথা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন, এখনও খেলার পোশাক পরেই ঘুরছেন, এই সময়ে আপনার ভাবনায় কি ঘুরপাক খাচ্ছে? এমন প্রশ্নে তুষার বলেন, ‘এটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কষ্ট লাগছে। এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।’

বর্তমানে ইনজুরিতে আছেন জাতীয় ক্রিকেট লীগে খুলনা বিভাগের হয়ে খেলা তুষার। সে কারণে খেলা হয়নি পঞ্চম রাউন্ডে। আজ শেষ রাউন্ডেও একই কারণে নেই। সেক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার ১২ হাজার রান পূর্ণ হচ্ছে না। ১১ হাজার ৯৭২ রান নিয়েই বিদায় বলতে হচ্ছে তাকে। দেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে তারই শুধু রয়েছে ১০ হাজারের বেশি রান ও ৩২টি সেঞ্চুরি। কিন্তু ১২ হাজার রান নিয়ে বিদায় নিতে পারতেন না তুষার? কি বলছেন তিনি? ‘অনেকেই বলেছে আরেকটি বছর খেললে বেশি ভালো হতো। অনেক আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিলাম ১২ হাজার রান হলে ক্রিকেট ছেড়ে দেব। এবং এটাও বলেছিলাম যদি রান না করতে পারি তাহলে নিজে থেকেই সরে দাঁড়াবো। প্রথম তিনটি ম্যাচে সুযোগ পাই, এতে ৫টি ইনিংস খেলেছি। তখন ৭৮ রান বাকি ছিল (১২ হাজার থেকে)। যেটা আমার চরিত্রের সঙ্গে যায় না। যতদিন ক্রিকেট খেলেছি, রান করেই খেলেছি। এখন ইনজুরিতে আছি, এ জন্য আর হচ্ছে না। তিন ম্যাচে ৫টি ইনিংসে মাত্র ৭৮ রান করতে পারিনি, আমার মনে হয়েছে সময় এসেছে চলে যাওয়ার। এ জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সম্মানের সঙ্গে যেতে পেরে আমি খুশি। কেউ যাতে কোনো প্রশ্ন না তুলতে পারে।’ জাতীয় দলের হয়ে ৫টি টেস্ট ও ৪১টি ওয়ানডে খেলেছেন তুষার। ৫ টেস্টে ৮৯ রান ও ৪১ ওয়ানডে ৫৭৪ রান করেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। এ ছাড়া ১৮২টি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৪২.৭৫ গড়ে ১১ হাজার ৯৭২ রান করেন। সেঞ্চুরি ৩২টি ও হাফসেঞ্চুরি ৬৩টি। এ ছাড়া ১৭৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে ৪ হাজার ৪৩৯ ও ৮টি স্বীকৃত টি-২০ ম্যাচে ১০৩ রান করেন। ২০০২ সালের জুলাইয়ে ক্যান্ডিতে তার টেস্ট অভিষেক হয়। একই দলের বিপক্ষে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে খেলেন সবশেষ টেস্ট। আর ওয়ানডেতে অভিষেক হয় ২০০১ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, আর সবশেষ খেলেন ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কুইন্সটনে।

চলমান এনসিএলে খেলতে নামার আগে ১২ হাজার রান থেকে মাত্র ৭৮ রান দূরে ছিলেন। কিন্তু তিন ম্যাচে ৫ ইনিংসে মাত্র আসে ৫০ রান। তখনই অভিজ্ঞ তুষার বুঝে যান, সবকিছুরই একটা শেষ থাকে, তারই হয়তো এটাই শেষের সঙ্কেত। ২২ গজে যার ব্যাটে ছুটতো রানের ফোয়ারা, তিনি কেন ৫ ইনিংসে ৭৮ রান করতে পারবেন না? এই এক ভাবনা থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন ক্রিকেট থেকে। ২২ গজকে তুষার বিদায় বললেও ২২ গজ কিন্তু তাকে ছাড়ছে না। এখন থেকে নিয়মিত তাকে দেখা যাবে কোচের ভূমিকায়।

সোমবার, ২২ নভেম্বর ২০২১ , ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন তুষার ইমরান

image

দেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের মহারথী বলা হয় তুষার ইমরানকে। অবশেষে ক্রিকেটটাকে বিদায় বলে দিয়েছেন তিনি। ১৪ বছর ধরে জাতীয় দলে উপেক্ষিত থাকলেও সদর্পে বেড়িয়েছেন ঘরোয়া ক্রিকেটে। গতকাল বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) জাতীয় লীগের ম্যাচ চলাকালীন আনুষ্ঠানিকভাবে সবধরনের ক্রিকেট থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার ঘোষণা। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে তুষার শনিবার ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন অবসরের। এরপর রোববার তাকে বিকেএসপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানায় ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব)। এ সময় বিকেএসপির ক্রিকেট উপদেষ্টা নাজমুল আবেদীন ফাহিম, জাতীয় নির্বাচক আবদুর রাজ্জাক ও কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল। বিদায়ী সংবর্ধনা শেষে তুষারের সঙ্গে কথা হয়। এর মধ্যেই তার কোন বন্ধু যেন ফোন দিয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। মন খারাপ না করার উপদেশ দিচ্ছেন, সান্ত¡না দিচ্ছেন। এ পাশ থেকে তুষার বলছেন, ‘না আমি ঠিক আছি।’ সতীর্থদের মধ্যে রাজ্জাক এসেছিলেন সময় বের করে। মাশারাফি মুর্তজা-সাকিব আল হাসানকে জানিয়েছিলেন, তার ইতি টানার কথা। দুজনেই তাকে পরবর্তী জীবনের জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। খালেদ মাহমুদ সুজন জাতীয় দলের সঙ্গে বায়োবাবলে থাকায় আসতে পারেননি আর কোয়াব সভাপতি নাঈমুর রহমান দুর্জয় সময় বের করতে পারেননি শেষ পর্যন্ত। বন্ধুকে তুষার যতই বলছেন ঠিক আছেন, কিন্তু তার চেহারা বলছে ভিন্ন কথা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন, এখনও খেলার পোশাক পরেই ঘুরছেন, এই সময়ে আপনার ভাবনায় কি ঘুরপাক খাচ্ছে? এমন প্রশ্নে তুষার বলেন, ‘এটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কষ্ট লাগছে। এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।’

বর্তমানে ইনজুরিতে আছেন জাতীয় ক্রিকেট লীগে খুলনা বিভাগের হয়ে খেলা তুষার। সে কারণে খেলা হয়নি পঞ্চম রাউন্ডে। আজ শেষ রাউন্ডেও একই কারণে নেই। সেক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার ১২ হাজার রান পূর্ণ হচ্ছে না। ১১ হাজার ৯৭২ রান নিয়েই বিদায় বলতে হচ্ছে তাকে। দেশের একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে তারই শুধু রয়েছে ১০ হাজারের বেশি রান ও ৩২টি সেঞ্চুরি। কিন্তু ১২ হাজার রান নিয়ে বিদায় নিতে পারতেন না তুষার? কি বলছেন তিনি? ‘অনেকেই বলেছে আরেকটি বছর খেললে বেশি ভালো হতো। অনেক আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিলাম ১২ হাজার রান হলে ক্রিকেট ছেড়ে দেব। এবং এটাও বলেছিলাম যদি রান না করতে পারি তাহলে নিজে থেকেই সরে দাঁড়াবো। প্রথম তিনটি ম্যাচে সুযোগ পাই, এতে ৫টি ইনিংস খেলেছি। তখন ৭৮ রান বাকি ছিল (১২ হাজার থেকে)। যেটা আমার চরিত্রের সঙ্গে যায় না। যতদিন ক্রিকেট খেলেছি, রান করেই খেলেছি। এখন ইনজুরিতে আছি, এ জন্য আর হচ্ছে না। তিন ম্যাচে ৫টি ইনিংসে মাত্র ৭৮ রান করতে পারিনি, আমার মনে হয়েছে সময় এসেছে চলে যাওয়ার। এ জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সম্মানের সঙ্গে যেতে পেরে আমি খুশি। কেউ যাতে কোনো প্রশ্ন না তুলতে পারে।’ জাতীয় দলের হয়ে ৫টি টেস্ট ও ৪১টি ওয়ানডে খেলেছেন তুষার। ৫ টেস্টে ৮৯ রান ও ৪১ ওয়ানডে ৫৭৪ রান করেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। এ ছাড়া ১৮২টি প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৪২.৭৫ গড়ে ১১ হাজার ৯৭২ রান করেন। সেঞ্চুরি ৩২টি ও হাফসেঞ্চুরি ৬৩টি। এ ছাড়া ১৭৩টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচে ৪ হাজার ৪৩৯ ও ৮টি স্বীকৃত টি-২০ ম্যাচে ১০৩ রান করেন। ২০০২ সালের জুলাইয়ে ক্যান্ডিতে তার টেস্ট অভিষেক হয়। একই দলের বিপক্ষে ২০০৭ সালের জুলাইয়ে খেলেন সবশেষ টেস্ট। আর ওয়ানডেতে অভিষেক হয় ২০০১ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, আর সবশেষ খেলেন ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কুইন্সটনে।

চলমান এনসিএলে খেলতে নামার আগে ১২ হাজার রান থেকে মাত্র ৭৮ রান দূরে ছিলেন। কিন্তু তিন ম্যাচে ৫ ইনিংসে মাত্র আসে ৫০ রান। তখনই অভিজ্ঞ তুষার বুঝে যান, সবকিছুরই একটা শেষ থাকে, তারই হয়তো এটাই শেষের সঙ্কেত। ২২ গজে যার ব্যাটে ছুটতো রানের ফোয়ারা, তিনি কেন ৫ ইনিংসে ৭৮ রান করতে পারবেন না? এই এক ভাবনা থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন ক্রিকেট থেকে। ২২ গজকে তুষার বিদায় বললেও ২২ গজ কিন্তু তাকে ছাড়ছে না। এখন থেকে নিয়মিত তাকে দেখা যাবে কোচের ভূমিকায়।