বঙ্গভ্যাক্স : মানবদেহে টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ অনুমোদন

বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ‘বঙ্গভ্যাক্স’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) এই ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের এই অনুমোদন দেয়।

গতকাল বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমিনের সই করা চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিএমআরসি’র সূত্রে জানা গেছে, টিকাটি গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বানরের ওপর পরীক্ষা করা হয়। সেখানে প্রাপ্ত ফলাফল তারা বিএমআরসিতে জমা দেয় এবং মানবদেহে প্রয়োগের জন্য আবেদন করে। পরবর্তীতে মানবদেহে টিকার কার্যকারিতার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন দেয়। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ কমিটি মানবদেহে প্রয়োগের বিষয়ে যে নৈতিক অনুমোদন দিয়েছে তাকে ‘ফেজ ওয়ান ট্রায়াল’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়াকে নৈতিক অনুমোদনও হয়ে থাকে। পরবর্তিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদন দেবে।

গ্লোব বায়োটেকের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি অপারেশনের ব্যবস্থাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সংবাদকে বলেন, ‘আমরা বিএমআরসি’র অনুমোদন পেয়েছি ইথিক্যাল ট্রায়ালের জন্য। এখন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য আমরা শীঘ্রই আবেদন করব। অনুমোদন পাওয়ার পরে প্রটোকল অনুযায়ী আমরা হিউম্যান ট্রায়ালে যাব।’

মানবদেহে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের বিএসএমএমইউ সঙ্গে সমঝোতা আছে উল্লেখ করে গ্লোব বায়োটেকের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ সংবাদকে বলেন, বিএসএমএমইউ যেখানে ট্রায়াল করতে বলবে আমরা সেখানেই করবো। বিষয়টি নিয়ে আমরা দুই এক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিব।

স্বেচ্ছাসেবকদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম পর্বে মানবদেহে প্রয়োগের জন্য ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক ও দ্বিতীয় পর্বের জন্য ৩০০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তত আছে। তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যর খোঁজ খবর রাখছি।’

‘সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনমাসের মধ্যেই আমরা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারব। আমাদের মাসে তিন কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে।’ বলেও জানান তিনি।

বলা হচ্ছে, বঙ্গভ্যাক্স টিকাটি প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ এমআরএনএ (মেসেঞ্জার রাইবোনিউক্লিক এসিড) দিয়ে তৈরি, তাই এটি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও কার্যকর। টিকাটি এক ডোজের। ইঁদুরের দেহে টিকাটি পরীক্ষা করে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা পায় প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে শতভাগ নিরাপদ বলেও প্রমাণিত হয়। পরে বিএমআরসির নির্দেশনা অনুসারে বানরের দেহে পরীক্ষা চালানো হয়। প্রাথমিক ফলাফলে টিকাটি বানরের দেহে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর এন্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পরবর্তীতে বানরের দেহে চ্যালেঞ্জ ট্রায়ালে দেখা যায় করোনার যতগুলো ভেরিয়েন্ট এসেছে তার সব কটিতেই টিকাটি শতভাগ কার্যকর।

চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি বঙ্গভ্যাক্সের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নীতিগত পরীক্ষার জন্য বিএমআরসির কাছে প্রটোকল জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিএমআরসির চাহিদা অনুযায়ী সংশোধিত প্রটোকল জমা পড়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি। গত ২২ জুন বিএমআরসি মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেয়, যদিও এর আগে বানর বা শিম্পাঞ্জির দেহে পরীক্ষা করার শর্ত দেয়া হয়। গত ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি বানরের দেহে পরীক্ষা শুরু করে, যা শেষ হয় ২১শে অক্টোবর।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড ২০২০ সালের ২ জুলাই দেশে প্রথমবারের মতো কোভিড-১৯ রোগের টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এর প্রায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় ১৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি তিনটি টিকাকে (ডি সিক্স ওয়ান ফোর জি ভেরিয়েন্ট এমআরএনএ ভ্যাক্সিন, ডিএনএ প্লাজমিড ভ্যাক্সিনস এবং অ্যাডনোভাইরাস টাইপ-৫ ভেক্টর ভ্যাক্সিন) সম্ভাব্য টিকাপ্রার্থীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বলা হয়, গ্লোব বায়োটেকই বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যাদের সর্বোচ্চ তিনটি ভ্যাক্সিনের নাম তালিকায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, গ্লোব বায়োটেক ২০১৫ সালে ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস, রক্তস্বল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ, অটোইমিউন ডিজিজসহ অন্য দুরারোগ্য রোগ নিরাময়ের জন্য বায়োলজিক্স, নভেল ড্রাগ এবং বায়োসিমিলার উৎপাদনের লক্ষ্যে অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।

বুধবার, ২৪ নভেম্বর ২০২১ , ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৮ রবিউস সানি ১৪৪৩

বঙ্গভ্যাক্স : মানবদেহে টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ অনুমোদন

বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের ‘বঙ্গভ্যাক্স’ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) এই ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের এই অনুমোদন দেয়।

গতকাল বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের (বিএমআরসি) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমিনের সই করা চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিএমআরসি’র সূত্রে জানা গেছে, টিকাটি গত আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বানরের ওপর পরীক্ষা করা হয়। সেখানে প্রাপ্ত ফলাফল তারা বিএমআরসিতে জমা দেয় এবং মানবদেহে প্রয়োগের জন্য আবেদন করে। পরবর্তীতে মানবদেহে টিকার কার্যকারিতার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন দেয়। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞ কমিটি মানবদেহে প্রয়োগের বিষয়ে যে নৈতিক অনুমোদন দিয়েছে তাকে ‘ফেজ ওয়ান ট্রায়াল’ বলা হয়। এই প্রক্রিয়াকে নৈতিক অনুমোদনও হয়ে থাকে। পরবর্তিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর অনুমোদন দেবে।

গ্লোব বায়োটেকের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি অপারেশনের ব্যবস্থাপক ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন সংবাদকে বলেন, ‘আমরা বিএমআরসি’র অনুমোদন পেয়েছি ইথিক্যাল ট্রায়ালের জন্য। এখন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হিউম্যান ট্রায়ালের জন্য আমরা শীঘ্রই আবেদন করব। অনুমোদন পাওয়ার পরে প্রটোকল অনুযায়ী আমরা হিউম্যান ট্রায়ালে যাব।’

মানবদেহে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের বিএসএমএমইউ সঙ্গে সমঝোতা আছে উল্লেখ করে গ্লোব বায়োটেকের চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ সংবাদকে বলেন, বিএসএমএমইউ যেখানে ট্রায়াল করতে বলবে আমরা সেখানেই করবো। বিষয়টি নিয়ে আমরা দুই এক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিব।

স্বেচ্ছাসেবকদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথম পর্বে মানবদেহে প্রয়োগের জন্য ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক ও দ্বিতীয় পর্বের জন্য ৩০০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তত আছে। তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যর খোঁজ খবর রাখছি।’

‘সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনমাসের মধ্যেই আমরা বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারব। আমাদের মাসে তিন কোটি ডোজ টিকা উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে।’ বলেও জানান তিনি।

বলা হচ্ছে, বঙ্গভ্যাক্স টিকাটি প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ এমআরএনএ (মেসেঞ্জার রাইবোনিউক্লিক এসিড) দিয়ে তৈরি, তাই এটি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও কার্যকর। টিকাটি এক ডোজের। ইঁদুরের দেহে টিকাটি পরীক্ষা করে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা পায় প্রতিষ্ঠানটি। সেখানে শতভাগ নিরাপদ বলেও প্রমাণিত হয়। পরে বিএমআরসির নির্দেশনা অনুসারে বানরের দেহে পরীক্ষা চালানো হয়। প্রাথমিক ফলাফলে টিকাটি বানরের দেহে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর এন্টিবডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পরবর্তীতে বানরের দেহে চ্যালেঞ্জ ট্রায়ালে দেখা যায় করোনার যতগুলো ভেরিয়েন্ট এসেছে তার সব কটিতেই টিকাটি শতভাগ কার্যকর।

চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি বঙ্গভ্যাক্সের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নীতিগত পরীক্ষার জন্য বিএমআরসির কাছে প্রটোকল জমা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বিএমআরসির চাহিদা অনুযায়ী সংশোধিত প্রটোকল জমা পড়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি। গত ২২ জুন বিএমআরসি মানবদেহে বঙ্গভ্যাক্সের পরীক্ষা চালানোর অনুমতি দেয়, যদিও এর আগে বানর বা শিম্পাঞ্জির দেহে পরীক্ষা করার শর্ত দেয়া হয়। গত ১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি বানরের দেহে পরীক্ষা শুরু করে, যা শেষ হয় ২১শে অক্টোবর।

বাংলাদেশে কোভিড-১৯ শনাক্ত হওয়ার পর গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড ২০২০ সালের ২ জুলাই দেশে প্রথমবারের মতো কোভিড-১৯ রোগের টিকা আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এর প্রায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় ১৫ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি তিনটি টিকাকে (ডি সিক্স ওয়ান ফোর জি ভেরিয়েন্ট এমআরএনএ ভ্যাক্সিন, ডিএনএ প্লাজমিড ভ্যাক্সিনস এবং অ্যাডনোভাইরাস টাইপ-৫ ভেক্টর ভ্যাক্সিন) সম্ভাব্য টিকাপ্রার্থীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বলা হয়, গ্লোব বায়োটেকই বিশ্বের একমাত্র প্রতিষ্ঠান যাদের সর্বোচ্চ তিনটি ভ্যাক্সিনের নাম তালিকায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, গ্লোব বায়োটেক ২০১৫ সালে ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস, রক্তস্বল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ, অটোইমিউন ডিজিজসহ অন্য দুরারোগ্য রোগ নিরাময়ের জন্য বায়োলজিক্স, নভেল ড্রাগ এবং বায়োসিমিলার উৎপাদনের লক্ষ্যে অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।