আমার বন্ধু আবুল হাসান

মহাদেব সাহা

এই যে আমরা যারা বেঁচে আছি, ব্যস্ত আছি নানা কাজে, আছে নানা ভাব, বহু চিন্তা, একেকটি দিনরাত্রি নিমেষে মিলিয়ে যায় আমাদের প্রায় অজান্তেই এই অতি তৎপর, অভ্যস্ত বিষয়মগ্ন জীবনের মধ্যে খুব কি মনে পড়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া কোনো বন্ধু, প্রিয়জনের মুখ? এমনি এমনি, অকারণ, হঠাৎ? কত কিছুই তো মিশে যায়, মিলিয়ে যায়, কিন্তু দু’একটি মুখ মিশে গেলেও মিলিয়ে যায় না একেবারে, মলিন হয় না কখনোই, চোখের এই দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গিয়ে তারা স্থাপিত হয় হৃদয়ে, চোখে না দেখেও তাদের দেখা যায়, অন্তত তখন, যখন অনেক জীবিত মানুষও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, এমনি বহুজন তো এভাবে আমাদের কাছে মৃত্যুই হয়ে যায়; আর কেউ কেউ মৃত্যুর অনতিক্রম্য দূরত্বে থেকেও আমাদের নিকটবর্তী হয়ে ওঠে। এমন তো হয়ই, কোনো কোনো নিষ্ফল মুহূর্তে জীবন মনে হয় দুঃসহ, অর্থহীন কোথাও কোনো আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যায় না, সব কিছু মনে হয় নিরর্থক, সেই সব দিশেহারা সময়ে যখন নিজেকে খুব কাতর, অসহায় মনে হয় তখন হঠাৎ কি মনে পড়ে না হারিয়ে যাওয়া এমনি কোনো প্রিয় মুখ? হঠাৎ করেই কি সজল হয়ে ওঠে না দু’টি চোখ? আমার এরকম হয়।

আবুল হাসান আমার প্রিয়তম বন্ধুদের একজন। ষাটের দশকের মধ্যভাগে আমরা যারা কবিতা লেখা শুরু করি, কবিতার জন্য বাজি রাখি জীবন কবি হওয়ার এক দুর্মর নেশা পেয়ে বসে আমাদের সেই তরুণ কবিকুলের মধ্যে হাসানই ছিল সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর। অপচয়ী, কবিতার প্রতি নিবেদিত, কবিতার জন্য নিজেকে ক্ষয় করার জন্য প্রস্তুত। সত্তরের দশকে তার অকালমৃত্যু আমাদের এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আবুল হাসান কবিতারই শহীদ, নিজেকে সে কবিতার জন্যেই তিলে তিলে পুড়িয়েছে, তার দগ্ধ জীবন থেকে উৎসারিত হয়েছে তাজা, অভিনব, বেদনাভারাতুর সব কবিতা। মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থে হাসান তার এই সোনালি শস্যরাশি ভরে দিয়ে গেছে, তার মৃত্যুর পর অবশ্য তার অপ্রকাশিত কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তবু তার এই তিনখানা কাব্যগ্রন্থকেই আমরা তার প্রধান কাব্য স্বাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করি। আর সার্থকভাবেই হাসান তিনটি কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়েই বাংলা কবিতায় তার একটি যোগ্য

স্থান অধিকার করে গেছে, নিজেকে অপরিহার্য ও প্রমাণ করেছে তার মতো করে।

আবুল হাসানের মৃত্যুর বিশ বছর পর আজো যখন আমাদের কবি জীবনের কথা ভাবি তখন হাসানের কথাই সবার আগে মনে হয়, ঢাকায় কবিবন্ধুদের মধ্যে হাসানের সঙ্গেই আমার সবার আগে পরিচয়, হয়তো পাকেচক্রেই, আমার স্থায়ীভাবে ঢাকা আসার আগেই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে আমার, যদ্দুর মনে পড়ে নিউমার্কেটে কোনো বইয়ের দোকানের সামনে কে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলোÑ মলয়, তাজুল কিংবা অন্য কেউ, তা আজ আর স্পষ্টভাবে মনে পড়ে না। কিন্তু পরবর্তীকালে আমাদের কার জীবনের ধারা কোনদিকে প্রবাহিত হবে তা আমাদের কারোরই তো জানা ছিল না কখনো তবু সেই অজানা পথে পা বাড়ানোর মুহূর্তে অনেকটা দ্বৈবচক্রেই যেন আমাদের একে অপরের সঙ্গে এভাবে পরিচয় ঘটে কারো সঙ্গে আগে, কারো সঙ্গে পরে, কবির জীবনে এর কোনোটাই তুচ্ছ নয়, কেননা তার গোটা জীবনই তো পূর্বনির্ধারিত। আজ বুঝতে পারি অসহায়ত্বের দিক থেকে আমরা উভয়েই ছিলাম উভয়ের সঙ্গী। একসময়ের কবিতা কাতর জীবন নিয়ে আমরা এই শহরের বুকে ঘুরে বেড়িয়েছি সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত। আমাদের, সেই এলোমেলো, খাপছাড়া, নিঃসঙ্গ ভ্রমণের স্মৃতি আমরা কখনো মধ্যরাত্রির আকাশের কাছে গচ্ছিত রেখেছি, কখনো তার সাক্ষী রেখেছি বুড়িগঙ্গার নির্জন তীরকে, কখনো সেসব বলেছি কমলাপুর স্টেশনের লোকাল ট্রেনের কাছে, কী সুখের, কী দুঃখেরই না ছিল সে দিনগুলো। তবু সেই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, এত সুন্দর জীবন আর আমাদের কখনোই আসবে না। কতদিন আমরা দুজনে এই শহরের কত প্রিয় জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি, আমরা দুজনেই পছন্দ করতাম নির্জনতা, পছন্দ করতাম নদী, রেলস্টেশন, গাছ, ফাঁকা বাড়ি, নির্জন রেস্তোরাঁ; প্রেসক্লাবের পশ্চিম পাশের বাংলো প্যাটার্নের চামেলী হাউস, সেই নির্জন বাড়িটি ছিল আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দ। কেমন যেন রহস্যময় মনে হতো ভেতরটা; রমনা পার্কে, লেকের ধারে কত মৌন বিকেল কাটিয়েছি আমরা, শহরের এই ব্যবস্থা, কোলাহল, উত্তেজনা ফেলে আমরা কতদিন ফাঁকা স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, পার্কে বসে থেকেছি প্রায় সবকিছু ভুলে শুধু কবিতার জন্য।

হাসানের বোহেমিয়ানিজম ছিল অন্তর্গত, তার রক্তের মধ্যে, এজন্য তার বাইরের কোনো আবরণের প্রয়োজন হয়নি। কিছুটা লাজুক স্বভাবের হাসান নিজের অনেক দুঃখই লুকিয়ে রাখতো নিজের মধ্যে, হাসানের মধ্যে সব সময়ই একজন দুঃখী মানুষ বাস করতো। বাইরে থেকে বোঝা যেতো না, এমনকি নিজের কঠিন রোগকেও এভাবেই নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে সে। আজ বুঝতে পারি, একমাত্র কবির পক্ষেই সম্ভব এই দুঃখবরণ।

মৃত্যুর এত বছর পরও হাসানের কবিতা সমান উজ্জ্বল বরং যতই দিন যাচ্ছে ততই তার কবিতা আরও উজ্জ্বল ও প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছে। হাসান নিজেকে যথার্থই চিহ্নিত করেছিলÑ ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে।’ আমি বেশ ভেবে দেখেছি আবুল হাসানের কবিতায় এক বনভূমির স্নিগ্ধ ছায়া অনুভব করা যায়, বৃষ্টির গন্ধ পাওয়া যায়, নদী ও জলের ঘূর্ণি বারবার সেখানে ফিরে আসে; এই শহরের তাকে মনে হয় হারিয়ে যাওয়া এক সরল রাখাল, যার চোখে ঠিকরে পড়ে ভোরের আবছা আলো, বুকে জমে শিশিরের আর্দ্রতা, মা ও মৃত্যুভূমির জন্যে তার অন্তহীন দুঃখ, ভালোবাসার জন্যে এক তীব্র ব্যাকুলতা; অভিমানী ও উদাসীন আবুল হাসান এভাবেই নগরনিসর্গে স্থাপন করে গ্রামের সজল প্রকৃতি, তার শস্যশোভা ও জীবন। আবুল হাসান তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতাতেই উপলব্ধি করেছিলোÑ ‘আমাদের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের অপরিসীম ঘৃণা ও বিদ্বেষ’।

আবুল হাসানকে নিয়ে এই রচনা এই স্মৃতিচারণ অনেকটাই অসম্পূর্ণ, আমরা একেকজন তাকে একেকভাবে দেখেছি, যে যার মতো করে যে যার সঙ্গে মিলিয়ে তারপরও প্রকৃত অর্থেই তার জীবনের বহু অকথিত অধ্যায় এখনো রয়ে গেছে, হয়তো তা বিধৃত আছে তারই লেখা কোনো পত্রে, কোনো আত্মকথায়, আমি আবুল হাসানের এমনি একটি দুর্লভ চিঠি দেখেছি তারই এক অকৃত্রিম বন্ধু মাহফুজুল হক খানের কাছে, দীর্ঘ, আরক্ত ও আবেগময় সেই চিঠি, হাসান যেখানে নিজেকে উন্মোচিত করেছে প্রায় শিশুর মতো, তার অসহায়ত্ব, তার যন্ত্রণা, তার একাকিত্ব, তার আশ্রয়হীনতা, জীবনের অনিশ্চয়তাবোধ চিঠিটির ছত্রে ছত্রে পরিস্ফুট হয়ে আছে। চিঠিটি না পড়লে বোঝা যাবে না যন্ত্রণাকাতর হাসান কীভাবে নিজের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল, কীভাবে সে হয়ে পড়ছিল ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত। তাই নিজেকে সে সমর্পণ করেছে তার বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য বন্ধুর কাছে। মাহফুজ সম্ভবত নিজেকে ঢেকে রাখতে চায় বলেই চিঠিখানি প্রকাশ করেনি, চিঠিটি যদিও অন্য এক বন্ধুকে লেখা, তবু এক বন্ধুর কাছে লেখা চিঠি তো আরেক বন্ধু পড়তেই পারে। তাই আমি আমার এই লেখাকে নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর ও অসম্পূর্ণ মনে করি। আর আমরা যে জীবন ফেলে এসেছি কিংবা যে জীবন আমরা গচ্ছিত রেখেছি নদী, আকাশ আর বৃক্ষের কাছে, সেই ফেলে আসা জীবনের সমগ্রতাকে কখনোই হয়তো আর তুলে ধরা যাবে না, কোন স্মৃতিকথাতেই না, অন্তত আমি তাই মনে করি। সেসব খণ্ড-বিখ- স্মৃতির সারাৎসার যা কিছু তা তো আমাদের এই কবিতা, আমাদের এই কবিতা।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

আমার বন্ধু আবুল হাসান

মহাদেব সাহা
image

আবুল হাসান/ জন্ম : ৪ আগস্ট ১৯৪৭; মৃত্যু : ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫ প্রতিকৃতি : মাসুক হেলাল

এই যে আমরা যারা বেঁচে আছি, ব্যস্ত আছি নানা কাজে, আছে নানা ভাব, বহু চিন্তা, একেকটি দিনরাত্রি নিমেষে মিলিয়ে যায় আমাদের প্রায় অজান্তেই এই অতি তৎপর, অভ্যস্ত বিষয়মগ্ন জীবনের মধ্যে খুব কি মনে পড়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া কোনো বন্ধু, প্রিয়জনের মুখ? এমনি এমনি, অকারণ, হঠাৎ? কত কিছুই তো মিশে যায়, মিলিয়ে যায়, কিন্তু দু’একটি মুখ মিশে গেলেও মিলিয়ে যায় না একেবারে, মলিন হয় না কখনোই, চোখের এই দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গিয়ে তারা স্থাপিত হয় হৃদয়ে, চোখে না দেখেও তাদের দেখা যায়, অন্তত তখন, যখন অনেক জীবিত মানুষও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, এমনি বহুজন তো এভাবে আমাদের কাছে মৃত্যুই হয়ে যায়; আর কেউ কেউ মৃত্যুর অনতিক্রম্য দূরত্বে থেকেও আমাদের নিকটবর্তী হয়ে ওঠে। এমন তো হয়ই, কোনো কোনো নিষ্ফল মুহূর্তে জীবন মনে হয় দুঃসহ, অর্থহীন কোথাও কোনো আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যায় না, সব কিছু মনে হয় নিরর্থক, সেই সব দিশেহারা সময়ে যখন নিজেকে খুব কাতর, অসহায় মনে হয় তখন হঠাৎ কি মনে পড়ে না হারিয়ে যাওয়া এমনি কোনো প্রিয় মুখ? হঠাৎ করেই কি সজল হয়ে ওঠে না দু’টি চোখ? আমার এরকম হয়।

আবুল হাসান আমার প্রিয়তম বন্ধুদের একজন। ষাটের দশকের মধ্যভাগে আমরা যারা কবিতা লেখা শুরু করি, কবিতার জন্য বাজি রাখি জীবন কবি হওয়ার এক দুর্মর নেশা পেয়ে বসে আমাদের সেই তরুণ কবিকুলের মধ্যে হাসানই ছিল সবচেয়ে বেশি স্পর্শকাতর। অপচয়ী, কবিতার প্রতি নিবেদিত, কবিতার জন্য নিজেকে ক্ষয় করার জন্য প্রস্তুত। সত্তরের দশকে তার অকালমৃত্যু আমাদের এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আবুল হাসান কবিতারই শহীদ, নিজেকে সে কবিতার জন্যেই তিলে তিলে পুড়িয়েছে, তার দগ্ধ জীবন থেকে উৎসারিত হয়েছে তাজা, অভিনব, বেদনাভারাতুর সব কবিতা। মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থে হাসান তার এই সোনালি শস্যরাশি ভরে দিয়ে গেছে, তার মৃত্যুর পর অবশ্য তার অপ্রকাশিত কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তবু তার এই তিনখানা কাব্যগ্রন্থকেই আমরা তার প্রধান কাব্য স্বাক্ষর হিসেবে চিহ্নিত করি। আর সার্থকভাবেই হাসান তিনটি কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়েই বাংলা কবিতায় তার একটি যোগ্য

স্থান অধিকার করে গেছে, নিজেকে অপরিহার্য ও প্রমাণ করেছে তার মতো করে।

আবুল হাসানের মৃত্যুর বিশ বছর পর আজো যখন আমাদের কবি জীবনের কথা ভাবি তখন হাসানের কথাই সবার আগে মনে হয়, ঢাকায় কবিবন্ধুদের মধ্যে হাসানের সঙ্গেই আমার সবার আগে পরিচয়, হয়তো পাকেচক্রেই, আমার স্থায়ীভাবে ঢাকা আসার আগেই তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে আমার, যদ্দুর মনে পড়ে নিউমার্কেটে কোনো বইয়ের দোকানের সামনে কে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলোÑ মলয়, তাজুল কিংবা অন্য কেউ, তা আজ আর স্পষ্টভাবে মনে পড়ে না। কিন্তু পরবর্তীকালে আমাদের কার জীবনের ধারা কোনদিকে প্রবাহিত হবে তা আমাদের কারোরই তো জানা ছিল না কখনো তবু সেই অজানা পথে পা বাড়ানোর মুহূর্তে অনেকটা দ্বৈবচক্রেই যেন আমাদের একে অপরের সঙ্গে এভাবে পরিচয় ঘটে কারো সঙ্গে আগে, কারো সঙ্গে পরে, কবির জীবনে এর কোনোটাই তুচ্ছ নয়, কেননা তার গোটা জীবনই তো পূর্বনির্ধারিত। আজ বুঝতে পারি অসহায়ত্বের দিক থেকে আমরা উভয়েই ছিলাম উভয়ের সঙ্গী। একসময়ের কবিতা কাতর জীবন নিয়ে আমরা এই শহরের বুকে ঘুরে বেড়িয়েছি সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত। আমাদের, সেই এলোমেলো, খাপছাড়া, নিঃসঙ্গ ভ্রমণের স্মৃতি আমরা কখনো মধ্যরাত্রির আকাশের কাছে গচ্ছিত রেখেছি, কখনো তার সাক্ষী রেখেছি বুড়িগঙ্গার নির্জন তীরকে, কখনো সেসব বলেছি কমলাপুর স্টেশনের লোকাল ট্রেনের কাছে, কী সুখের, কী দুঃখেরই না ছিল সে দিনগুলো। তবু সেই আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, এত সুন্দর জীবন আর আমাদের কখনোই আসবে না। কতদিন আমরা দুজনে এই শহরের কত প্রিয় জায়গা ঘুরে বেড়িয়েছি, আমরা দুজনেই পছন্দ করতাম নির্জনতা, পছন্দ করতাম নদী, রেলস্টেশন, গাছ, ফাঁকা বাড়ি, নির্জন রেস্তোরাঁ; প্রেসক্লাবের পশ্চিম পাশের বাংলো প্যাটার্নের চামেলী হাউস, সেই নির্জন বাড়িটি ছিল আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দ। কেমন যেন রহস্যময় মনে হতো ভেতরটা; রমনা পার্কে, লেকের ধারে কত মৌন বিকেল কাটিয়েছি আমরা, শহরের এই ব্যবস্থা, কোলাহল, উত্তেজনা ফেলে আমরা কতদিন ফাঁকা স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, পার্কে বসে থেকেছি প্রায় সবকিছু ভুলে শুধু কবিতার জন্য।

হাসানের বোহেমিয়ানিজম ছিল অন্তর্গত, তার রক্তের মধ্যে, এজন্য তার বাইরের কোনো আবরণের প্রয়োজন হয়নি। কিছুটা লাজুক স্বভাবের হাসান নিজের অনেক দুঃখই লুকিয়ে রাখতো নিজের মধ্যে, হাসানের মধ্যে সব সময়ই একজন দুঃখী মানুষ বাস করতো। বাইরে থেকে বোঝা যেতো না, এমনকি নিজের কঠিন রোগকেও এভাবেই নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে সে। আজ বুঝতে পারি, একমাত্র কবির পক্ষেই সম্ভব এই দুঃখবরণ।

মৃত্যুর এত বছর পরও হাসানের কবিতা সমান উজ্জ্বল বরং যতই দিন যাচ্ছে ততই তার কবিতা আরও উজ্জ্বল ও প্রস্ফুটিত হয়ে উঠছে। হাসান নিজেকে যথার্থই চিহ্নিত করেছিলÑ ‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে।’ আমি বেশ ভেবে দেখেছি আবুল হাসানের কবিতায় এক বনভূমির স্নিগ্ধ ছায়া অনুভব করা যায়, বৃষ্টির গন্ধ পাওয়া যায়, নদী ও জলের ঘূর্ণি বারবার সেখানে ফিরে আসে; এই শহরের তাকে মনে হয় হারিয়ে যাওয়া এক সরল রাখাল, যার চোখে ঠিকরে পড়ে ভোরের আবছা আলো, বুকে জমে শিশিরের আর্দ্রতা, মা ও মৃত্যুভূমির জন্যে তার অন্তহীন দুঃখ, ভালোবাসার জন্যে এক তীব্র ব্যাকুলতা; অভিমানী ও উদাসীন আবুল হাসান এভাবেই নগরনিসর্গে স্থাপন করে গ্রামের সজল প্রকৃতি, তার শস্যশোভা ও জীবন। আবুল হাসান তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতাতেই উপলব্ধি করেছিলোÑ ‘আমাদের পরস্পরের প্রতি পরস্পরের অপরিসীম ঘৃণা ও বিদ্বেষ’।

আবুল হাসানকে নিয়ে এই রচনা এই স্মৃতিচারণ অনেকটাই অসম্পূর্ণ, আমরা একেকজন তাকে একেকভাবে দেখেছি, যে যার মতো করে যে যার সঙ্গে মিলিয়ে তারপরও প্রকৃত অর্থেই তার জীবনের বহু অকথিত অধ্যায় এখনো রয়ে গেছে, হয়তো তা বিধৃত আছে তারই লেখা কোনো পত্রে, কোনো আত্মকথায়, আমি আবুল হাসানের এমনি একটি দুর্লভ চিঠি দেখেছি তারই এক অকৃত্রিম বন্ধু মাহফুজুল হক খানের কাছে, দীর্ঘ, আরক্ত ও আবেগময় সেই চিঠি, হাসান যেখানে নিজেকে উন্মোচিত করেছে প্রায় শিশুর মতো, তার অসহায়ত্ব, তার যন্ত্রণা, তার একাকিত্ব, তার আশ্রয়হীনতা, জীবনের অনিশ্চয়তাবোধ চিঠিটির ছত্রে ছত্রে পরিস্ফুট হয়ে আছে। চিঠিটি না পড়লে বোঝা যাবে না যন্ত্রণাকাতর হাসান কীভাবে নিজের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল, কীভাবে সে হয়ে পড়ছিল ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত। তাই নিজেকে সে সমর্পণ করেছে তার বিশ্বস্ত নির্ভরযোগ্য বন্ধুর কাছে। মাহফুজ সম্ভবত নিজেকে ঢেকে রাখতে চায় বলেই চিঠিখানি প্রকাশ করেনি, চিঠিটি যদিও অন্য এক বন্ধুকে লেখা, তবু এক বন্ধুর কাছে লেখা চিঠি তো আরেক বন্ধু পড়তেই পারে। তাই আমি আমার এই লেখাকে নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর ও অসম্পূর্ণ মনে করি। আর আমরা যে জীবন ফেলে এসেছি কিংবা যে জীবন আমরা গচ্ছিত রেখেছি নদী, আকাশ আর বৃক্ষের কাছে, সেই ফেলে আসা জীবনের সমগ্রতাকে কখনোই হয়তো আর তুলে ধরা যাবে না, কোন স্মৃতিকথাতেই না, অন্তত আমি তাই মনে করি। সেসব খণ্ড-বিখ- স্মৃতির সারাৎসার যা কিছু তা তো আমাদের এই কবিতা, আমাদের এই কবিতা।