আবুল হাসান যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায়

পূরবী বসু

সালটা ১৯৬৮। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে অনার্স পড়ি। বছর খানেক আগে আমার বিয়ে হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে বাংলাদেশের দুই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কবির সঙ্গে সামনাসামনি আলাপ হয়েছে আমার। আবুল হাসান ও নির্মলেন্দু গুণ- যাঁরা দু’জন আবার পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

ওদের সঙ্গে যে সন্ধ্যায় প্রথম আমার দেখা হয়, তখন আমি ওদের চিনতাম না বলে জানতে পারিনি তারা কে। রিক্সা করে নিউ মার্কেট থেকে বাসায় ফিরছিলাম জ্যোতির সঙ্গে। বিয়ের পাঁচ দিন পর বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে গিয়ে এক একাডেমিক বছর শেষ করে ন’মাস পর মাত্র ঢাকা ফিরেছে জ্যোতি। আমাদের রিক্সাটি যখন টিএসসির কাছাকছি, রাস্তার সংযোগস্থলের এক কোণ থেকে ‘জ্যোতিদা’ বলে ডাক দিয়ে কেউ রিক্সা থামায়। আধো আলো আধো অন্ধকারে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন তিন যুবক। জ্যোতি তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে আবার রিক্সায় এলে আমরা চলতে শুরু করলাম। আর তখনি জানতে পারলাম সেই তিনজনের মধ্যে দুজন ছিলেন নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসান।

বছর দেড়েক আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর পর, রোকেয়া হলের ঠিকানায় একটি চিঠি পেয়েছিলাম কবি নির্মলেন্দু গুণের কাছ থেকে। তাঁর সম্পাদিত কোনো ছোটকাগজের জন্যে আমার একটি লেখা চেয়ে সেই চিঠি। আমি তখন সবে একটা দুটো শখের রচনা লিখতে শুরু করেছি। লেখক হিসেবে কেউ জানে না আমাকে। বয়স অল্প হলেও বুঝতে অসুবিধে হয়নি লেখার জন্যেই এ চিঠি লেখা নয়। তবু সৌজন্যমূলক একখানা উত্তর তাকে দিয়েছিলাম আমার অপারগতা জানিয়ে। চিঠিতে ঠিকানা লিখেছিলাম কেয়ার অফ সাজ্জাদ কাদির, ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের কোন এক হলের ঠিকানায়। যাই হোক, জ্যোতি বরাবর-ই যেমন ভুলে যায়, সে সন্ধ্যায়-ও ভুলে গেল পথচারী তিন লেখক-কবির সঙ্গে আমায় পরিচয় করিয়ে দিতে। কিন্তু রিক্সা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জানতে চাইল গুণ ও হাসানকে কেমন লাগলো আমার। আর তখন-ই জানতে পেলাম ওখানে ওরা ছিলেন। এর কয়েকদিন পরেই তারা সশরীরে হাজির হয়েছিলেন আমাদের ৫ সেক্রেটারিয়েট রোডের বাসায়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে। তার আগেই শুনেছি এই কবি-জোড় মাঝে মাঝেই আসতেন জ্যোতির কাছে, এখানে বসে কাব্য রচনাও করেছেন তাঁরা। আবুল হাসানের একাধিক কবিতার সূচিকাগৃহেই আমি বাস করছি তখন। এর পর থেকে মঝেমধ্যেই আমাদের বসায় আসতেন তাঁরা। একসঙ্গে সকলে মিলে শ্বশুরের (ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব) দুপুরে ভাত খেয়েছি কতদিন!

আবুল হাসান বরিশালের ছেলে। ওখানে থাকাকালীন তার একটি মেয়ের সঙ্গে ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল। তারপর একসময় কবিতা লিখতে লিখতে আর এক-আধটু সুনাম অর্জন করতে করতে একসময় বিখ্যাত হতে শুরু করেন আবুল হাসান। ফলে বরিশাল ছেড়ে ঢাকায় আসা বনেদী কবি মফস্বলী অভিজ্ঞতার ঘ্রাণ কতদিন বয়ে বেড়াবেন? আস্তে আস্তে পুরনো প্রেমে ভাটা পড়তে শুরু করে নতুন প্রেম, নিজের রচিত কবিতার উষ্ণ সান্নিধ্যে আর ভক্তদের গুণগানে।

কবিবন্ধুদের নিয়ে আড্ডা, পরস্পরকে কবিতা শোনানো ও শোনা, সারা রাত ধরে ঢাকা শহর তছনছ করে এপার ওপার হেঁটে বেড়ানো, শরীফ মিয়ার ক্যন্টিনে পেট পুরে বা আধা পেটে ভাত খাওয়া তরতাজা তরুণ কবি আবুল হাসান। তখন কি আর সুদূর বরিশালে ফেলে আসা সেই কিশোরী প্রেমিকা, পুরাতন প্রেমের কথা মনে থাকে কারো?

একসময় সেই মেয়েটিও ঢাকায় আসে অনার্স পড়তে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের চেয়ে এক বছরের উপরে পড়তেন তিনি। তারা তিন অভিন্নহৃদয় বন্ধু- তিন সহপাঠী, তিনজনেই বায়োকেমিস্ট্রির ভালো ছাত্রী। জাগ্রত সময়ের বেশিরভাগটাই তারা একত্রে কাটাতেন। চলাফেরা, কথাবার্তা, খাওয়াদাওয়া সবকিছু একসঙ্গে করতেন তারা। সবাই বলতো মানিকবেজোড়। রোকেয়া হলে হাসানের সেই পুরাতন প্রেমের রুমটিও ছিল আমার ও আমার ছোড়দির (আমরা দুবোন রুমমেট ছিলাম) রুমের খুব কাছে। ফলে তাকে আগে থেকেই ভালো করে চিনতাম। আবুল হাসানের মুখেই শুনতে পেলাম, ঢাকায় এসে মেয়েটি অনেকবার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেছে। আবুল হাসানের সঙ্গে দেখা করা, চিঠি দেয়া, কথা বলার জন্যে বহুবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কবি হিসেবে সদ্য নাম করা আবুল হাসানের হাতের তালুতে তখন গ্লোবের মতো সমস্ত পৃথিবী দ্রুতবেগে ঘুরছে আর ফুটছে টগবগ করে। ধরাকে সরা জ্ঞান করতে দ্বিধা নেই তার। আর কোথাকার, কবেকার সেই মফস্বলের একদা প্রেমিকা! আবুল হাসানের সময় আছে কোথায় দু’দণ্ড থেমে তার সঙ্গে কথা বলার? কত রকম ব্যস্ততা এখন! কত জরুরি কাজ! কত ভক্ত! থেমে থাকার সময় কোথায়? অন্তত তখন তাই মনে হতো।

কিন্তু এর-ই মধ্যে একদিন বরিশালের কোনো এক পূর্বপরিচিতের মুখে শুনতে পান হাসান যে তার সেই পুরাতন প্রেমের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে খুব শিগগির-ই। মনের মতো যোগ্য পাত্র পাওয়া গেছে। কদিন পরেই ওদের বাড়ি থেকে লোক আসছে মেয়েকে বিয়ের জন্যে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে। এমন সুপাত্র তো সবসময় মেলে না! হৃদয় সরোদের কোনো এক সূক্ষ্ম তারে হঠাৎ এক অচেনা টান, টনটনে ব্যথা টের পেলেন হাসান। বরিশালের আরেক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পেলেন কথাটার সত্যতা। আর সঙ্গে সঙ্গে পুরনো প্রেম এসে ম্যালেরিয়ার মতো সমস্ত দেহমন জাঁকিয়ে বসলো হাসানের। আমাদের বাসায় ছুটে এলেন হসান। সঙ্গে নির্মলেন্দু গুণ। প্রায় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে হাসান জানান বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাস্তায়, রোকেয়া হলে কোথাও মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে বা দুটো কথা বলতে পারছেন না হাসান শত চেষ্টা করেও। কথা বলা দূরে থাক হাসানের দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকাচ্ছে না মেয়েটি। হাসান বলেন, বড় ভুল হয়ে গেছে। অনেক অবহেলা করা হয়েছে মেয়েটিকে। অনেক কষ্ট দিয়েছে তাকে। কিন্তু কখনো তাকে হারাতে চাননি তিনি। তাকে ছাড়া জীবন বরবাদ হয়ে যাবে আজ বুঝতে পারছেন। হাসান বুঝতে পারছেন এই মেয়েটি-ই তার প্রকৃত প্রেম, আসল ঠাঁই।

তার অনুরোধে আমি সঙ্গে সঙ্গে শাড়ি পাল্টে রোকেয়া হলে যেতে বাধ্য হলাম সেই সন্ধ্যায়। আমার আজো মনে পড়ে রোকেয়া হলের পাঁচতলা বিল্ডিংযের পাঁচতলার কোণের ঘরে যেখানে আমি থাকতাম বিয়ের আগে (যেখানে তখনো থাকেন আমার ছোড়দি, যিনি ইকোনোমিক্সে এমএ পড়ছেন, এবং তখনো অবিবাহিত), তার সামনের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছি আমি তার সঙ্গে। হাসানের দেওয়া চিরকুটটা কেবল নয়, তাঁর দূত হয়ে তার কথামতো হাসানের বর্তমান মানসিক দুরবস্থার কথা সবিস্তারে আমি বললাম তাকে। বোঝাতে চেষ্টা করলাম, এতোদিন যে ব্যবহার-ই করে থাকুক না কেন, এখন সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তিনি তার কতখানি। তখনকার দিনে শিক্ষা নিকেতনে সিনিয়র জুনিয়রের সম্পর্কটা খুব সহজ ছিল না। এ ধরনের কথা এক ক্লাস ওপরে পড়া এক আপাকে বলতে কী যে কষ্ট হচ্ছিল আমার! বুদ্ধিমতী, বাস্তববাদী, পরিণত নারী হাসানের প্রেমিকা হাসান বা আমার কথিত সেই সব আক্ষেপের বা অবহেলার কিংবা ভুল ব্যবহারের প্রসঙ্গে একবারও গেলেন না। কোনো অভিযোগ, কোনো যুক্তিতর্কের অবতারণা করলেন না। কাঁদলেন না। কোনো ভাবান্তরই লক্ষ্য করলাম না তার মধ্যে। বুঝলাম, যা ছিল একদা স্থিরভাবেই, দীর্ঘ চেষ্টা ও অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেই প্রেমভরা ঘট নিজেই উল্টে দিয়েছেন তিনি। আজ কাঁত হয়ে এক কোণে পড়ে থাকা সেই ঘট সোজা করে দাঁড় করিয়ে ঝেঁকে এবং নাড়িয়ে দেখেন, ভেতরটা একেবারে ফাঁকা, গভীর শূন্যতা। এক ফোঁটা জল নেই। আমাকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রায় সমবয়সী ছাত্রীর মতো করে নয়, প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ এবং পরিণত বয়স্কা এক অভিভাবকের মতো করে, বাংলা উপন্যাসের নায়িকার মতো করে বললেন, তাঁকে গিয়ে যেন বোঝাই যে, সব প্রেম বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছে না, যেমন সব বিয়েতে প্রেম থাকে না। তিনি বললেন, হাসানকে বরাবরই তিনি ভালোবেসে যাবেন, কিন্তু বৃহত্তর কল্যাণের জন্যে সকলের মঙ্গলের জন্য বাবা-মায়ের স্থির করা এ বিয়ে তিনি করবেন। তবে হাসানের প্রতি শুভকামনা তাঁর বরাবরই থাকবে।

ফেরার পথে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটা আমার কছে কেমন সিনেমার মতো লাগছিল। তা সত্ত্বেও বার বার মনে হচ্ছিল হাসানকে গিয়ে কী বলবো আমি। এরকম শক্ত কাজের দায়িত্ব কেন ঘাড়ে নিলাম ভেবে অনুশোচনা করতে থাকি। হাসানকে সব বলার পর বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসেছিলেন। তারপর কিছু না বলে ঘর ছেড়ে চলে যান।

এর পর কয়েকদিন আমাদের বাসায় আসেন না হাসান। তাঁর কোনো সংবাদও পাই না। পরে দেখা হলে এই ব্যাপারে বেশি কিছু বলেননি বা তার আচার ব্যবহারে তেমন বিরহ বা বিষণœতার ছাপ দেখিনি তেমন। তখন বুঝেছি, দুটো মানুষের মধ্যে প্রতিদিনের সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা বাস্তব সম্পর্ক আর চিন্তায় কিংবা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকে। প্রাক্তন প্রেমিকার সমূহ বিয়ের সংবাদে নিজের কৃতকর্ম, অপরাধবোধ, ইগো, পুরনো কিছু সুখ-স্মৃতির ঝলক কিছুক্ষণের জন্যে আবুল হাসানকে উন্মনা ও কাবু করে রাখলেও তার সাম্প্রতিক কবিখ্যাতি, বর্তমান জীবনের উত্তেজনা, ব্যস্ততা ও মাদকতা পুরনো প্রেমকে মাটি চাপা দেবার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কেননা ওদের দুজনের মধ্যে গত বেশ কয়েক বছর ধরে কোনো দেখাশোনা, কথাবার্তা, ভাববিনিময়, মানঅভিমান চলছিল না। এই অসীম শূন্যে ভালবাসার ধারণা বা স্মৃতি হয়তো বাঁচতে পারে, প্রকৃত ভালোবাসা টেকে না। বরিশালের পুরাতন প্রেমের কথা বা তার জন্যে কোনো দুঃখ, অনুশোচনা, শোক বা আকুলতা আর কখনো আবুল হাসানের মধ্যে প্রকাশিত হতে দেখিনি তাঁর অবশিষ্ট ও সংক্ষিপ্ত জীবন কালে, যতদিন তাকে দেখেছি এর পর।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

আবুল হাসান যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায়

পূরবী বসু
image

সালটা ১৯৬৮। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে অনার্স পড়ি। বছর খানেক আগে আমার বিয়ে হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে বাংলাদেশের দুই প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ কবির সঙ্গে সামনাসামনি আলাপ হয়েছে আমার। আবুল হাসান ও নির্মলেন্দু গুণ- যাঁরা দু’জন আবার পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

ওদের সঙ্গে যে সন্ধ্যায় প্রথম আমার দেখা হয়, তখন আমি ওদের চিনতাম না বলে জানতে পারিনি তারা কে। রিক্সা করে নিউ মার্কেট থেকে বাসায় ফিরছিলাম জ্যোতির সঙ্গে। বিয়ের পাঁচ দিন পর বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে গিয়ে এক একাডেমিক বছর শেষ করে ন’মাস পর মাত্র ঢাকা ফিরেছে জ্যোতি। আমাদের রিক্সাটি যখন টিএসসির কাছাকছি, রাস্তার সংযোগস্থলের এক কোণ থেকে ‘জ্যোতিদা’ বলে ডাক দিয়ে কেউ রিক্সা থামায়। আধো আলো আধো অন্ধকারে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন তিন যুবক। জ্যোতি তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে আবার রিক্সায় এলে আমরা চলতে শুরু করলাম। আর তখনি জানতে পারলাম সেই তিনজনের মধ্যে দুজন ছিলেন নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসান।

বছর দেড়েক আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর পর, রোকেয়া হলের ঠিকানায় একটি চিঠি পেয়েছিলাম কবি নির্মলেন্দু গুণের কাছ থেকে। তাঁর সম্পাদিত কোনো ছোটকাগজের জন্যে আমার একটি লেখা চেয়ে সেই চিঠি। আমি তখন সবে একটা দুটো শখের রচনা লিখতে শুরু করেছি। লেখক হিসেবে কেউ জানে না আমাকে। বয়স অল্প হলেও বুঝতে অসুবিধে হয়নি লেখার জন্যেই এ চিঠি লেখা নয়। তবু সৌজন্যমূলক একখানা উত্তর তাকে দিয়েছিলাম আমার অপারগতা জানিয়ে। চিঠিতে ঠিকানা লিখেছিলাম কেয়ার অফ সাজ্জাদ কাদির, ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের কোন এক হলের ঠিকানায়। যাই হোক, জ্যোতি বরাবর-ই যেমন ভুলে যায়, সে সন্ধ্যায়-ও ভুলে গেল পথচারী তিন লেখক-কবির সঙ্গে আমায় পরিচয় করিয়ে দিতে। কিন্তু রিক্সা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জানতে চাইল গুণ ও হাসানকে কেমন লাগলো আমার। আর তখন-ই জানতে পেলাম ওখানে ওরা ছিলেন। এর কয়েকদিন পরেই তারা সশরীরে হাজির হয়েছিলেন আমাদের ৫ সেক্রেটারিয়েট রোডের বাসায়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে। তার আগেই শুনেছি এই কবি-জোড় মাঝে মাঝেই আসতেন জ্যোতির কাছে, এখানে বসে কাব্য রচনাও করেছেন তাঁরা। আবুল হাসানের একাধিক কবিতার সূচিকাগৃহেই আমি বাস করছি তখন। এর পর থেকে মঝেমধ্যেই আমাদের বসায় আসতেন তাঁরা। একসঙ্গে সকলে মিলে শ্বশুরের (ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব) দুপুরে ভাত খেয়েছি কতদিন!

আবুল হাসান বরিশালের ছেলে। ওখানে থাকাকালীন তার একটি মেয়ের সঙ্গে ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল। তারপর একসময় কবিতা লিখতে লিখতে আর এক-আধটু সুনাম অর্জন করতে করতে একসময় বিখ্যাত হতে শুরু করেন আবুল হাসান। ফলে বরিশাল ছেড়ে ঢাকায় আসা বনেদী কবি মফস্বলী অভিজ্ঞতার ঘ্রাণ কতদিন বয়ে বেড়াবেন? আস্তে আস্তে পুরনো প্রেমে ভাটা পড়তে শুরু করে নতুন প্রেম, নিজের রচিত কবিতার উষ্ণ সান্নিধ্যে আর ভক্তদের গুণগানে।

কবিবন্ধুদের নিয়ে আড্ডা, পরস্পরকে কবিতা শোনানো ও শোনা, সারা রাত ধরে ঢাকা শহর তছনছ করে এপার ওপার হেঁটে বেড়ানো, শরীফ মিয়ার ক্যন্টিনে পেট পুরে বা আধা পেটে ভাত খাওয়া তরতাজা তরুণ কবি আবুল হাসান। তখন কি আর সুদূর বরিশালে ফেলে আসা সেই কিশোরী প্রেমিকা, পুরাতন প্রেমের কথা মনে থাকে কারো?

একসময় সেই মেয়েটিও ঢাকায় আসে অনার্স পড়তে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের চেয়ে এক বছরের উপরে পড়তেন তিনি। তারা তিন অভিন্নহৃদয় বন্ধু- তিন সহপাঠী, তিনজনেই বায়োকেমিস্ট্রির ভালো ছাত্রী। জাগ্রত সময়ের বেশিরভাগটাই তারা একত্রে কাটাতেন। চলাফেরা, কথাবার্তা, খাওয়াদাওয়া সবকিছু একসঙ্গে করতেন তারা। সবাই বলতো মানিকবেজোড়। রোকেয়া হলে হাসানের সেই পুরাতন প্রেমের রুমটিও ছিল আমার ও আমার ছোড়দির (আমরা দুবোন রুমমেট ছিলাম) রুমের খুব কাছে। ফলে তাকে আগে থেকেই ভালো করে চিনতাম। আবুল হাসানের মুখেই শুনতে পেলাম, ঢাকায় এসে মেয়েটি অনেকবার সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেছে। আবুল হাসানের সঙ্গে দেখা করা, চিঠি দেয়া, কথা বলার জন্যে বহুবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কবি হিসেবে সদ্য নাম করা আবুল হাসানের হাতের তালুতে তখন গ্লোবের মতো সমস্ত পৃথিবী দ্রুতবেগে ঘুরছে আর ফুটছে টগবগ করে। ধরাকে সরা জ্ঞান করতে দ্বিধা নেই তার। আর কোথাকার, কবেকার সেই মফস্বলের একদা প্রেমিকা! আবুল হাসানের সময় আছে কোথায় দু’দণ্ড থেমে তার সঙ্গে কথা বলার? কত রকম ব্যস্ততা এখন! কত জরুরি কাজ! কত ভক্ত! থেমে থাকার সময় কোথায়? অন্তত তখন তাই মনে হতো।

কিন্তু এর-ই মধ্যে একদিন বরিশালের কোনো এক পূর্বপরিচিতের মুখে শুনতে পান হাসান যে তার সেই পুরাতন প্রেমের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে খুব শিগগির-ই। মনের মতো যোগ্য পাত্র পাওয়া গেছে। কদিন পরেই ওদের বাড়ি থেকে লোক আসছে মেয়েকে বিয়ের জন্যে বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে। এমন সুপাত্র তো সবসময় মেলে না! হৃদয় সরোদের কোনো এক সূক্ষ্ম তারে হঠাৎ এক অচেনা টান, টনটনে ব্যথা টের পেলেন হাসান। বরিশালের আরেক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পেলেন কথাটার সত্যতা। আর সঙ্গে সঙ্গে পুরনো প্রেম এসে ম্যালেরিয়ার মতো সমস্ত দেহমন জাঁকিয়ে বসলো হাসানের। আমাদের বাসায় ছুটে এলেন হসান। সঙ্গে নির্মলেন্দু গুণ। প্রায় কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে হাসান জানান বিশ্ববিদ্যালয়ে, রাস্তায়, রোকেয়া হলে কোথাও মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে বা দুটো কথা বলতে পারছেন না হাসান শত চেষ্টা করেও। কথা বলা দূরে থাক হাসানের দিকে ভুলেও চোখ তুলে তাকাচ্ছে না মেয়েটি। হাসান বলেন, বড় ভুল হয়ে গেছে। অনেক অবহেলা করা হয়েছে মেয়েটিকে। অনেক কষ্ট দিয়েছে তাকে। কিন্তু কখনো তাকে হারাতে চাননি তিনি। তাকে ছাড়া জীবন বরবাদ হয়ে যাবে আজ বুঝতে পারছেন। হাসান বুঝতে পারছেন এই মেয়েটি-ই তার প্রকৃত প্রেম, আসল ঠাঁই।

তার অনুরোধে আমি সঙ্গে সঙ্গে শাড়ি পাল্টে রোকেয়া হলে যেতে বাধ্য হলাম সেই সন্ধ্যায়। আমার আজো মনে পড়ে রোকেয়া হলের পাঁচতলা বিল্ডিংযের পাঁচতলার কোণের ঘরে যেখানে আমি থাকতাম বিয়ের আগে (যেখানে তখনো থাকেন আমার ছোড়দি, যিনি ইকোনোমিক্সে এমএ পড়ছেন, এবং তখনো অবিবাহিত), তার সামনের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছি আমি তার সঙ্গে। হাসানের দেওয়া চিরকুটটা কেবল নয়, তাঁর দূত হয়ে তার কথামতো হাসানের বর্তমান মানসিক দুরবস্থার কথা সবিস্তারে আমি বললাম তাকে। বোঝাতে চেষ্টা করলাম, এতোদিন যে ব্যবহার-ই করে থাকুক না কেন, এখন সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তিনি তার কতখানি। তখনকার দিনে শিক্ষা নিকেতনে সিনিয়র জুনিয়রের সম্পর্কটা খুব সহজ ছিল না। এ ধরনের কথা এক ক্লাস ওপরে পড়া এক আপাকে বলতে কী যে কষ্ট হচ্ছিল আমার! বুদ্ধিমতী, বাস্তববাদী, পরিণত নারী হাসানের প্রেমিকা হাসান বা আমার কথিত সেই সব আক্ষেপের বা অবহেলার কিংবা ভুল ব্যবহারের প্রসঙ্গে একবারও গেলেন না। কোনো অভিযোগ, কোনো যুক্তিতর্কের অবতারণা করলেন না। কাঁদলেন না। কোনো ভাবান্তরই লক্ষ্য করলাম না তার মধ্যে। বুঝলাম, যা ছিল একদা স্থিরভাবেই, দীর্ঘ চেষ্টা ও অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সেই প্রেমভরা ঘট নিজেই উল্টে দিয়েছেন তিনি। আজ কাঁত হয়ে এক কোণে পড়ে থাকা সেই ঘট সোজা করে দাঁড় করিয়ে ঝেঁকে এবং নাড়িয়ে দেখেন, ভেতরটা একেবারে ফাঁকা, গভীর শূন্যতা। এক ফোঁটা জল নেই। আমাকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রায় সমবয়সী ছাত্রীর মতো করে নয়, প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ এবং পরিণত বয়স্কা এক অভিভাবকের মতো করে, বাংলা উপন্যাসের নায়িকার মতো করে বললেন, তাঁকে গিয়ে যেন বোঝাই যে, সব প্রেম বিয়ে পর্যন্ত পৌঁছে না, যেমন সব বিয়েতে প্রেম থাকে না। তিনি বললেন, হাসানকে বরাবরই তিনি ভালোবেসে যাবেন, কিন্তু বৃহত্তর কল্যাণের জন্যে সকলের মঙ্গলের জন্য বাবা-মায়ের স্থির করা এ বিয়ে তিনি করবেন। তবে হাসানের প্রতি শুভকামনা তাঁর বরাবরই থাকবে।

ফেরার পথে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাটা আমার কছে কেমন সিনেমার মতো লাগছিল। তা সত্ত্বেও বার বার মনে হচ্ছিল হাসানকে গিয়ে কী বলবো আমি। এরকম শক্ত কাজের দায়িত্ব কেন ঘাড়ে নিলাম ভেবে অনুশোচনা করতে থাকি। হাসানকে সব বলার পর বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চুপ হয়ে বসেছিলেন। তারপর কিছু না বলে ঘর ছেড়ে চলে যান।

এর পর কয়েকদিন আমাদের বাসায় আসেন না হাসান। তাঁর কোনো সংবাদও পাই না। পরে দেখা হলে এই ব্যাপারে বেশি কিছু বলেননি বা তার আচার ব্যবহারে তেমন বিরহ বা বিষণœতার ছাপ দেখিনি তেমন। তখন বুঝেছি, দুটো মানুষের মধ্যে প্রতিদিনের সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা বাস্তব সম্পর্ক আর চিন্তায় কিংবা বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকে। প্রাক্তন প্রেমিকার সমূহ বিয়ের সংবাদে নিজের কৃতকর্ম, অপরাধবোধ, ইগো, পুরনো কিছু সুখ-স্মৃতির ঝলক কিছুক্ষণের জন্যে আবুল হাসানকে উন্মনা ও কাবু করে রাখলেও তার সাম্প্রতিক কবিখ্যাতি, বর্তমান জীবনের উত্তেজনা, ব্যস্ততা ও মাদকতা পুরনো প্রেমকে মাটি চাপা দেবার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কেননা ওদের দুজনের মধ্যে গত বেশ কয়েক বছর ধরে কোনো দেখাশোনা, কথাবার্তা, ভাববিনিময়, মানঅভিমান চলছিল না। এই অসীম শূন্যে ভালবাসার ধারণা বা স্মৃতি হয়তো বাঁচতে পারে, প্রকৃত ভালোবাসা টেকে না। বরিশালের পুরাতন প্রেমের কথা বা তার জন্যে কোনো দুঃখ, অনুশোচনা, শোক বা আকুলতা আর কখনো আবুল হাসানের মধ্যে প্রকাশিত হতে দেখিনি তাঁর অবশিষ্ট ও সংক্ষিপ্ত জীবন কালে, যতদিন তাকে দেখেছি এর পর।