নিঃসঙ্গ নাগরিক এক রবিউল হুসাইন

মুনীরুজ্জামান

‘তিনি বলতেন

মানুষ প্রধানত দুই ধরনের-

একদল ক্ষণজন্মা

আরেক দল কেনজন্মা

আমি ওই কেনজন্মা দলের’

(বেলাল চৌধুরী বরাবর)

পেশায় ছিলেন স্থপতি কিন্তু পরিচিতির ব্যাপকতা কবি হিসেবে। কেউ কেউ বলতেন কবি-স্থপতি রবিউল হুসাইন। ব্যাপক ছিল তাঁর কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র। জাতীয় কবিতা পরিষদ, পদাবলী নামের কবিতার সংগঠন, স্থপতি ইনস্টিটিউট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। এ সবই ছিল রবিউল হুসাইনের আসল কাজ। মনের কাজ। কবিতা-সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শ্বাসপ্রশ্বাসের। বেঁচে থাকার অবলম্বন। শহীদুল্লাহ অ্যসোসিয়েটস-এ স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন গ্রাসাচ্ছদনের। পোশাকে পরিচ্ছদে কারো কারো মনে হতে পারে ইম্প্রেসিভ; কিন্তু বলা যাবে না; হাসিটি জুড়ে থাকত অবয়বজুড়ে, আর কিছু চোখে পড়ত না, না তাঁর পোশাক বা অন্যকিছু। যে হাসি ছিল কবি স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর পরিচিতি।

কবিতায় নিজেকে বলেছেন ‘কেনজন্মা’ দলের, দেখা হলে বলতেন তিনি অভাগা, অপয়া। কেন বলতেন জানি না, জিজ্ঞাসা করলে সেই হাসিটি দেখা যেত তার মুখে, যার ঔজ্জ্বল্য কোনোদিন ম্লান হতে দেখিনি। কেউ দেখেনি।

মাত্র ছিয়াত্তর বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। তাঁর যে প্রচণ্ড উদ্যম এবং প্রাণশক্তি ছিল তাতে ছিয়াত্তর বছর বয়স তো মাত্রই বটে। তাঁর চেয়ে অনেক কম বয়সে অনেককে বুড়িয়ে যেতে দেখেছি। কিন্তু মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগেও দেখা রবিউল হুসাইনকে তো বৃদ্ধ বলে একেবারেই মনে হয়নি। তবুও তিনি চলে গেলেন। সমস্ত কাজ অসমাপ্ত রেখে। কবি এবং স্থপতি ছিলেন বলে কিনা জানি না, তাঁর অদম্য সৃষ্টিশীলতা এবং জীবনীশক্তি তাঁকে কখনও বুড়িয়ে যেতে দেননি।

অফুরন্ত প্রাণ শক্তির এই মানুষটির মৃত্যু আমাদের কাছে আকস্মিক মনে হলেও আসলে তিনি কাউকে বুঝতে দেননি তাঁর জীবন ক্ষয়ের কথা। মৃত্যুর সপ্তাহ তিনেক আগেও দেখা হয়েছিল। দেখা হলেই ইদানীং জিজ্ঞাসা করতেন, আজকে ‘ঠক নাই’। টিভি টক শো সম্পর্কে তাঁর স্বভাবসুলভ হিউমার-এর ভাষা ছিল ‘ঠক শো’। মৃত্যুর পর তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তখনও তিনি অসুস্থ। মারাত্মক অসুস্থ, কিন্তু এই মানুষটি একটুও বুঝতে দেননি যে তিনি গুরুতর অসুস্থ। ঘণ্টাখানেক আড্ডা মারলেন টেবিলে বসে, আরো দু’একজন বন্ধু থাকলে ভালো হতো বললে। কিন্তু নিজে যে ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছেন একবারও সেটা বুঝতে দিলেন না। মৃত্যুর কোনো শঙ্কা দেখতে পাইনি তার মধ্যে।

নিজেকে সবার মধ্যে বিলিয়ে দিয়েও ব্যক্তি রবিউল হুসাইন ছিলেন একক নিঃসঙ্গ একজন। মাঝে মাঝে তাঁর কবিতায় তিনি ধরা দিতেন:

‘নিশ্চিত হওয়ার কী প্রয়োজন এখন

যেখানে অনিশ্চয়তার এত আয়োজন

বরং এই বিপদসঙ্কুলতায় দুলে দুলে

ভেসে ভেসে উৎপাটিত হই সমূলে

কোথাও স্থিরতা নেই নেই কোনো নিজস্বতা’

(একান্ত ব্যক্তিগত)

অনিশ্চয়তার এত আয়োজনের মধ্যে নিশ্চিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন যেমন তাঁর অনুভবে ছিল না; তেমনি ভেসে ভেসে সমূলে উৎপাটিত হওয়াটাও তার ছিল না অনাকাক্সিক্ষত। যেন প্রত্যাশিত ছিল তাঁর কাছে সমূলে উৎপাটিত হয়ে ভেসে যাওয়ার জীবন।

জীবনকে ভালবাসতেন। মানুষকে ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন কবিতা। এত ভালবাসতেন যে তাঁর স্থপতি পরিচয় ছাপিয়ে কবি পরিচয় আমাদের কাছে অনেক বেশি দৃশ্যমান, অনেক বেশি স্থায়ী। অনেক বেশি কাছের।

‘ভালোবাসা দুই রকমের-

মনোমিলনের আর মনোমালিন্যের

...

ভালোবাসা মানে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ

আর শ্রদ্ধাজাগানিয়ার পরম্পরা

গাছে যেমন ফুল ফোটে, মনুষ্যবৃক্ষ তেম্নি

ভালোবাসা আর কবিতায়

কবিতা সবসময় সত্যিকথা বলে

ফুলেল সেই ভালোবাসায়

(কবিতা সবসময় সত্যি কথা বলে)

কী অগাধ বিশ্বাস কবিতার প্রতি। মানুষ নয়, জন নয়, সমাজ নয়, রাষ্ট্র নয়, রাজনীতি নয়, প্রেমিকা নয়, প্রেমিকও নয়, কবিতাই সব সময় সত্যি কথা বলে এই বোধহয় ছিল তাঁর জীবনবোধ। সব কবিই জীবনবোধে শক্তিমান। কিন্তু কবিতার প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে জীবনকে বোধ যারা করেন বা করে গেছেন রবিউল হুসাইন যে তাদের মধ্যে একজন সেটা মানতেই হবে।

এত যার ভালবাসা জীবনের প্রতি, মানুষের প্রতি, মানুষের মধ্যে থাকতে যিনি বিশাল ব্যাপক কর্মকাণ্ডে সবসময় নিজেকে জড়িয়ে রাখতেন সেই মানুষটি যখন কবিতায় লেখেন ‘আমি ওই কেনজন্মার দলে’, তখন আমাদের কী বোধ হয় না নিঃসঙ্গ এক নাগরিক ছিলেন কবি স্থপতি রবিউল হুসাইন! গভীর এক নিঃসঙ্গতাই হয়তো ছিল তার শক্তি।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

নিঃসঙ্গ নাগরিক এক রবিউল হুসাইন

মুনীরুজ্জামান
image

রবিউল হুসাইন / জন্ম : ৩১ জানুয়ারি ১৯৪৩; মৃত্যু : ২৬ নভেম্বর ২০১৯

‘তিনি বলতেন

মানুষ প্রধানত দুই ধরনের-

একদল ক্ষণজন্মা

আরেক দল কেনজন্মা

আমি ওই কেনজন্মা দলের’

(বেলাল চৌধুরী বরাবর)

পেশায় ছিলেন স্থপতি কিন্তু পরিচিতির ব্যাপকতা কবি হিসেবে। কেউ কেউ বলতেন কবি-স্থপতি রবিউল হুসাইন। ব্যাপক ছিল তাঁর কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্র। জাতীয় কবিতা পরিষদ, পদাবলী নামের কবিতার সংগঠন, স্থপতি ইনস্টিটিউট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। এ সবই ছিল রবিউল হুসাইনের আসল কাজ। মনের কাজ। কবিতা-সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল শ্বাসপ্রশ্বাসের। বেঁচে থাকার অবলম্বন। শহীদুল্লাহ অ্যসোসিয়েটস-এ স্থপতি হিসেবে কাজ করেছেন গ্রাসাচ্ছদনের। পোশাকে পরিচ্ছদে কারো কারো মনে হতে পারে ইম্প্রেসিভ; কিন্তু বলা যাবে না; হাসিটি জুড়ে থাকত অবয়বজুড়ে, আর কিছু চোখে পড়ত না, না তাঁর পোশাক বা অন্যকিছু। যে হাসি ছিল কবি স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর পরিচিতি।

কবিতায় নিজেকে বলেছেন ‘কেনজন্মা’ দলের, দেখা হলে বলতেন তিনি অভাগা, অপয়া। কেন বলতেন জানি না, জিজ্ঞাসা করলে সেই হাসিটি দেখা যেত তার মুখে, যার ঔজ্জ্বল্য কোনোদিন ম্লান হতে দেখিনি। কেউ দেখেনি।

মাত্র ছিয়াত্তর বছর বয়সে তিনি চলে গেলেন। তাঁর যে প্রচণ্ড উদ্যম এবং প্রাণশক্তি ছিল তাতে ছিয়াত্তর বছর বয়স তো মাত্রই বটে। তাঁর চেয়ে অনেক কম বয়সে অনেককে বুড়িয়ে যেতে দেখেছি। কিন্তু মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগেও দেখা রবিউল হুসাইনকে তো বৃদ্ধ বলে একেবারেই মনে হয়নি। তবুও তিনি চলে গেলেন। সমস্ত কাজ অসমাপ্ত রেখে। কবি এবং স্থপতি ছিলেন বলে কিনা জানি না, তাঁর অদম্য সৃষ্টিশীলতা এবং জীবনীশক্তি তাঁকে কখনও বুড়িয়ে যেতে দেননি।

অফুরন্ত প্রাণ শক্তির এই মানুষটির মৃত্যু আমাদের কাছে আকস্মিক মনে হলেও আসলে তিনি কাউকে বুঝতে দেননি তাঁর জীবন ক্ষয়ের কথা। মৃত্যুর সপ্তাহ তিনেক আগেও দেখা হয়েছিল। দেখা হলেই ইদানীং জিজ্ঞাসা করতেন, আজকে ‘ঠক নাই’। টিভি টক শো সম্পর্কে তাঁর স্বভাবসুলভ হিউমার-এর ভাষা ছিল ‘ঠক শো’। মৃত্যুর পর তাঁর চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তখনও তিনি অসুস্থ। মারাত্মক অসুস্থ, কিন্তু এই মানুষটি একটুও বুঝতে দেননি যে তিনি গুরুতর অসুস্থ। ঘণ্টাখানেক আড্ডা মারলেন টেবিলে বসে, আরো দু’একজন বন্ধু থাকলে ভালো হতো বললে। কিন্তু নিজে যে ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছেন একবারও সেটা বুঝতে দিলেন না। মৃত্যুর কোনো শঙ্কা দেখতে পাইনি তার মধ্যে।

নিজেকে সবার মধ্যে বিলিয়ে দিয়েও ব্যক্তি রবিউল হুসাইন ছিলেন একক নিঃসঙ্গ একজন। মাঝে মাঝে তাঁর কবিতায় তিনি ধরা দিতেন:

‘নিশ্চিত হওয়ার কী প্রয়োজন এখন

যেখানে অনিশ্চয়তার এত আয়োজন

বরং এই বিপদসঙ্কুলতায় দুলে দুলে

ভেসে ভেসে উৎপাটিত হই সমূলে

কোথাও স্থিরতা নেই নেই কোনো নিজস্বতা’

(একান্ত ব্যক্তিগত)

অনিশ্চয়তার এত আয়োজনের মধ্যে নিশ্চিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন যেমন তাঁর অনুভবে ছিল না; তেমনি ভেসে ভেসে সমূলে উৎপাটিত হওয়াটাও তার ছিল না অনাকাক্সিক্ষত। যেন প্রত্যাশিত ছিল তাঁর কাছে সমূলে উৎপাটিত হয়ে ভেসে যাওয়ার জীবন।

জীবনকে ভালবাসতেন। মানুষকে ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন কবিতা। এত ভালবাসতেন যে তাঁর স্থপতি পরিচয় ছাপিয়ে কবি পরিচয় আমাদের কাছে অনেক বেশি দৃশ্যমান, অনেক বেশি স্থায়ী। অনেক বেশি কাছের।

‘ভালোবাসা দুই রকমের-

মনোমিলনের আর মনোমালিন্যের

...

ভালোবাসা মানে পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ

আর শ্রদ্ধাজাগানিয়ার পরম্পরা

গাছে যেমন ফুল ফোটে, মনুষ্যবৃক্ষ তেম্নি

ভালোবাসা আর কবিতায়

কবিতা সবসময় সত্যিকথা বলে

ফুলেল সেই ভালোবাসায়

(কবিতা সবসময় সত্যি কথা বলে)

কী অগাধ বিশ্বাস কবিতার প্রতি। মানুষ নয়, জন নয়, সমাজ নয়, রাষ্ট্র নয়, রাজনীতি নয়, প্রেমিকা নয়, প্রেমিকও নয়, কবিতাই সব সময় সত্যি কথা বলে এই বোধহয় ছিল তাঁর জীবনবোধ। সব কবিই জীবনবোধে শক্তিমান। কিন্তু কবিতার প্রতি ভালবাসার মধ্য দিয়ে জীবনকে বোধ যারা করেন বা করে গেছেন রবিউল হুসাইন যে তাদের মধ্যে একজন সেটা মানতেই হবে।

এত যার ভালবাসা জীবনের প্রতি, মানুষের প্রতি, মানুষের মধ্যে থাকতে যিনি বিশাল ব্যাপক কর্মকাণ্ডে সবসময় নিজেকে জড়িয়ে রাখতেন সেই মানুষটি যখন কবিতায় লেখেন ‘আমি ওই কেনজন্মার দলে’, তখন আমাদের কী বোধ হয় না নিঃসঙ্গ এক নাগরিক ছিলেন কবি স্থপতি রবিউল হুসাইন! গভীর এক নিঃসঙ্গতাই হয়তো ছিল তার শক্তি।