‘সত্তার কাছে চিরকুট’

কাব্যভাবনায় নতুন পালক

রিসতিয়াক আহমেদ

সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ মূলত নিজেকেই খুঁজছে। এটিই তার প্রথম প্রশ্ন। আর এই প্রশ্ন করতে করতেই তিনি আবিষ্কার করেন স্রষ্টাকে। স্রষ্টাকে খোঁজা মূলত নিজেকেই খোঁজা।

কবি-অনুবাদক হাইকেল হাশমী এই নিজ সত্তার সাথে যে কথোপকথন, তাকে কবিতার আশ্রয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘সত্তার কাছে চিরকুট’। এবং কবিতার ভেতর একটি নতুন ঢঙ এনেছেন যাকে বলা যেতে পারে ‘কবিতাপত্র’ বা ‘পত্রকবিতা’। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঁধনহারা’ পত্রউপন্যাসের মতোই এটি পত্র আঙ্গিকে লেখা। তবে গদ্যছন্দে এবং কাব্যধর্মে লেখা আমাদের সকল আশ্রয় আমাদের সত্তা। আমাদের সকল আশা-নিরাশা, মান-অভিমান, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গের একমাত্র নির্ভার স্থল আমাদের সত্তা। এবং গভীর উপলব্ধিতে দেখা যাবে এই যে আমাদের চাওয়া পাওয়া, এটি মূলত আমাদের নিজেদের ভেতরকেই বাহ্যিকরূপে দেখতে চাওয়ার বাসনা। প্রেমিকার কাছে যে আমাদের আকাক্সক্ষা, এটি মূলত নিজের ভেতরেরই একটি রূপকে বাহ্যিকরূপে দেখতে চাওয়া। কবি হাইকেল হাশমী ‘সত্তার কাছে চিরকুট’ কাব্যগ্রন্থে এই সত্তার বিভিন্ন রূপকে তুলে আনতে চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ এই সত্তা কখনো প্রেমিকার রূপ নিয়েছে আবার কখনোবা বন্ধুর রূপ নিয়েছে। আবার কখনোবা নিজেকেই নিজে দিয়েছেন উপদেশ। যেমন-

‘আবাগের শরীরে যায় বিঁধে

তারপর অবিরাম রক্তক্ষরণ

সেই জ্বালা সইতে পারবে না

স্বপ্ন থেকে দূরে থাকো’

বা-

‘শুকনো চোখে ভীষণ জ্বালা

তখন একটু কেঁদে নিলে

মনটা হালকা হয়ে যায়’

কিংবা প্রেমের বেদনায় কাতর হয়ে বলেন-

‘কিন্তু তবুও কাহলিল জিবরানের মতো বলতে হয়

যাকে তুমি ভালবাসো তাকে মুক্ত করে দাও’

এই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে গিয়ে পাঠকের আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির কথা মনে পড়বে। যেখানে আনা ডায়রির নামা দিয়েছিল ‘কিটি’। এবং কিটি ছিল তার একমাত্র বন্ধু যাকে সে সবকিছু বলতে পারতো এবং বোঝাতে পারতো। সেখানেও দেখা যায় আনা মূলত নিজের সত্তাকেই একটি ডায়রিতে বাহ্যিকরূপ দিতে চেয়েছিল। একটা আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেছিল। বলা যেতে পারে সেখানে ভেতরের অব্যক্ত বাসনার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ‘সত্তার কাছে চিরকুট’ কাব্যগ্রন্থেও দেখা যাবে কবি হাইকেল হাশমীর অবচেতন মনের বিস্ফোরণ। যেমন-

‘তুমি আমার মধ্যে উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত,

সারাক্ষণ নীরবে কথা বলো আমার সাথে

কিন্তু নেই কোনো শব্দ’

আবার-

‘কবি গালিব তো বলে গেছে:

মৃত্যুর দিন তো আছে নির্ধারিত

তবে চোখ থেকে ঘুম কেন বিতাড়িত।’

কবি যখন সমাজের কীটগুলোকে খুঁজে বের করতে পারেন। কিন্তু ধ্বংস করতে পারেন না; তখন নিজের সত্তার কাছে বলতে বাধ্য হন-

“মনে আছে ‘সিজার’-এর শেষ উক্তি-

‘এ তু ব্রুটাস’

‘তুমিও হে ব্রুটাস’!”

পুরো কাব্যগ্রন্থটিতে দেখা যাচ্ছে কবির যাপনের নানাদিক একটি সরল অথচ গভীর অনুসন্ধিৎসার মতো করে ফুটে উঠেছে। সংসারের ছোট ছোট উপকরণের ভেতর দিয়ে যে এক বৃহত্তর কিছুর ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এবং তার জন্য যে কবিতাই সর্বোত্তম মাধ্যম, তা হাইকেল হাশমী প্রমাণ করে দিলেন। তবে বারবারই মূলত উঠে এসেছে কবির ভেতরের ক্রন্দন। এক ধরনের হাহাকার। যেমন-

‘যার উপর তোমার নিয়ন্ত্রণ আছে

আবার তাকে করো অবহেলা’

এবং-

‘তখন শব্দ সব উড়ে উড়ে

সাদা কাগজের মতো

সারি সারি বসে যায় আশ্রয়ের আশায়,

কিন্তু তারা তো চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে যায়

কবিতার বন্দিশালায়’

কবির হৃদয় যে এই সংসার ছেড়ে এক বৃহত্তর সংসারের অধিবাসী, সেই দার্শনিক চিন্তাগুলো কবি হাইকেল হাশমীর কাব্যপ্রতিভায় প্রকাশ পেয়েছে। এবং তা যে তিনি একটি ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন তার জন্য তাঁকে অভিবাদন।

কবিতার বাইরে কথাসাহিত্যেও হাইকেল হাশমীর সৃজনপ্রতিভা লক্ষ্যণীয়। বাংলা ছোটগল্পেও তিনি সমানভাবে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বহুভাষাবিদ। বাংলা হিন্দি উর্দু ইংরেজিতে তাঁর রয়েছে সমান স্বতঃস্ফূর্ততা। এক ভাষা থেকে অন্যভাষায় রূপান্তর তাঁর লেখক জীবনের আর একটি অধ্যায়। ইতোপূর্বে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতে তিনি উতরে গেছেন সন্দেহ নেই।

“সত্তার কাছে চিরকুট” গ্রন্থটির কাব্যভাবনা সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। এমন স্বকীয়তা তাঁর কবি প্রতিভার বিশিষ্ট লক্ষণ। আমরা তাঁর পরবর্তী নতুন কোনো কাব্য ভাবনার প্রতীক্ষায়।

সত্তার কাছে চিরকুট। হাইকেল হাশমী। প্রকাশক : অভিযান, ঢাকা। প্রকাশকাল : বইমেলা, ২০২১। প্রচ্ছদ : সৈয়দ ইকবাল। মূল্য : ২২০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘সত্তার কাছে চিরকুট’

কাব্যভাবনায় নতুন পালক

রিসতিয়াক আহমেদ
image

সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ মূলত নিজেকেই খুঁজছে। এটিই তার প্রথম প্রশ্ন। আর এই প্রশ্ন করতে করতেই তিনি আবিষ্কার করেন স্রষ্টাকে। স্রষ্টাকে খোঁজা মূলত নিজেকেই খোঁজা।

কবি-অনুবাদক হাইকেল হাশমী এই নিজ সত্তার সাথে যে কথোপকথন, তাকে কবিতার আশ্রয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘সত্তার কাছে চিরকুট’। এবং কবিতার ভেতর একটি নতুন ঢঙ এনেছেন যাকে বলা যেতে পারে ‘কবিতাপত্র’ বা ‘পত্রকবিতা’। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঁধনহারা’ পত্রউপন্যাসের মতোই এটি পত্র আঙ্গিকে লেখা। তবে গদ্যছন্দে এবং কাব্যধর্মে লেখা আমাদের সকল আশ্রয় আমাদের সত্তা। আমাদের সকল আশা-নিরাশা, মান-অভিমান, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গের একমাত্র নির্ভার স্থল আমাদের সত্তা। এবং গভীর উপলব্ধিতে দেখা যাবে এই যে আমাদের চাওয়া পাওয়া, এটি মূলত আমাদের নিজেদের ভেতরকেই বাহ্যিকরূপে দেখতে চাওয়ার বাসনা। প্রেমিকার কাছে যে আমাদের আকাক্সক্ষা, এটি মূলত নিজের ভেতরেরই একটি রূপকে বাহ্যিকরূপে দেখতে চাওয়া। কবি হাইকেল হাশমী ‘সত্তার কাছে চিরকুট’ কাব্যগ্রন্থে এই সত্তার বিভিন্ন রূপকে তুলে আনতে চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ এই সত্তা কখনো প্রেমিকার রূপ নিয়েছে আবার কখনোবা বন্ধুর রূপ নিয়েছে। আবার কখনোবা নিজেকেই নিজে দিয়েছেন উপদেশ। যেমন-

‘আবাগের শরীরে যায় বিঁধে

তারপর অবিরাম রক্তক্ষরণ

সেই জ্বালা সইতে পারবে না

স্বপ্ন থেকে দূরে থাকো’

বা-

‘শুকনো চোখে ভীষণ জ্বালা

তখন একটু কেঁদে নিলে

মনটা হালকা হয়ে যায়’

কিংবা প্রেমের বেদনায় কাতর হয়ে বলেন-

‘কিন্তু তবুও কাহলিল জিবরানের মতো বলতে হয়

যাকে তুমি ভালবাসো তাকে মুক্ত করে দাও’

এই কাব্যগ্রন্থ পাঠ করতে গিয়ে পাঠকের আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির কথা মনে পড়বে। যেখানে আনা ডায়রির নামা দিয়েছিল ‘কিটি’। এবং কিটি ছিল তার একমাত্র বন্ধু যাকে সে সবকিছু বলতে পারতো এবং বোঝাতে পারতো। সেখানেও দেখা যায় আনা মূলত নিজের সত্তাকেই একটি ডায়রিতে বাহ্যিকরূপ দিতে চেয়েছিল। একটা আশ্রয় খোঁজার চেষ্টা করেছিল। বলা যেতে পারে সেখানে ভেতরের অব্যক্ত বাসনার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ‘সত্তার কাছে চিরকুট’ কাব্যগ্রন্থেও দেখা যাবে কবি হাইকেল হাশমীর অবচেতন মনের বিস্ফোরণ। যেমন-

‘তুমি আমার মধ্যে উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত,

সারাক্ষণ নীরবে কথা বলো আমার সাথে

কিন্তু নেই কোনো শব্দ’

আবার-

‘কবি গালিব তো বলে গেছে:

মৃত্যুর দিন তো আছে নির্ধারিত

তবে চোখ থেকে ঘুম কেন বিতাড়িত।’

কবি যখন সমাজের কীটগুলোকে খুঁজে বের করতে পারেন। কিন্তু ধ্বংস করতে পারেন না; তখন নিজের সত্তার কাছে বলতে বাধ্য হন-

“মনে আছে ‘সিজার’-এর শেষ উক্তি-

‘এ তু ব্রুটাস’

‘তুমিও হে ব্রুটাস’!”

পুরো কাব্যগ্রন্থটিতে দেখা যাচ্ছে কবির যাপনের নানাদিক একটি সরল অথচ গভীর অনুসন্ধিৎসার মতো করে ফুটে উঠেছে। সংসারের ছোট ছোট উপকরণের ভেতর দিয়ে যে এক বৃহত্তর কিছুর ব্যাখ্যা করা যেতে পারে এবং তার জন্য যে কবিতাই সর্বোত্তম মাধ্যম, তা হাইকেল হাশমী প্রমাণ করে দিলেন। তবে বারবারই মূলত উঠে এসেছে কবির ভেতরের ক্রন্দন। এক ধরনের হাহাকার। যেমন-

‘যার উপর তোমার নিয়ন্ত্রণ আছে

আবার তাকে করো অবহেলা’

এবং-

‘তখন শব্দ সব উড়ে উড়ে

সাদা কাগজের মতো

সারি সারি বসে যায় আশ্রয়ের আশায়,

কিন্তু তারা তো চিরকালের জন্য বন্দি হয়ে যায়

কবিতার বন্দিশালায়’

কবির হৃদয় যে এই সংসার ছেড়ে এক বৃহত্তর সংসারের অধিবাসী, সেই দার্শনিক চিন্তাগুলো কবি হাইকেল হাশমীর কাব্যপ্রতিভায় প্রকাশ পেয়েছে। এবং তা যে তিনি একটি ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন করেছেন তার জন্য তাঁকে অভিবাদন।

কবিতার বাইরে কথাসাহিত্যেও হাইকেল হাশমীর সৃজনপ্রতিভা লক্ষ্যণীয়। বাংলা ছোটগল্পেও তিনি সমানভাবে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বহুভাষাবিদ। বাংলা হিন্দি উর্দু ইংরেজিতে তাঁর রয়েছে সমান স্বতঃস্ফূর্ততা। এক ভাষা থেকে অন্যভাষায় রূপান্তর তাঁর লেখক জীবনের আর একটি অধ্যায়। ইতোপূর্বে প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতে তিনি উতরে গেছেন সন্দেহ নেই।

“সত্তার কাছে চিরকুট” গ্রন্থটির কাব্যভাবনা সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব। এমন স্বকীয়তা তাঁর কবি প্রতিভার বিশিষ্ট লক্ষণ। আমরা তাঁর পরবর্তী নতুন কোনো কাব্য ভাবনার প্রতীক্ষায়।

সত্তার কাছে চিরকুট। হাইকেল হাশমী। প্রকাশক : অভিযান, ঢাকা। প্রকাশকাল : বইমেলা, ২০২১। প্রচ্ছদ : সৈয়দ ইকবাল। মূল্য : ২২০ টাকা।