আবু রায়হানের স্মৃতি বিস্মৃতি

চপল বাশার

‘আমার চশমাটা কোথায় গেল? টেবিলের ওপরেই তো রেখেছিলাম, এখন দেখি কোথাও নেই। তুমি দেখেছো চশমাটা?’, আবু রায়হান জিজ্ঞেস করলেন স্ত্রী মাসুমাকে।

মাসুমা টেবিলের কাগজপত্র, বই গুছিয়ে রাখছিলেন। একটু হেসে বললেন, ‘টেবিলে তো নেই। আছে কোথাও খুঁজে দেখো, হারায় নি।’

কাজের বুয়া তাহমিনা কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো, ‘মামা, চশমা জায়গা মতোই আছে, ভালা কইর‌্যা খুঁইজ্যা দ্যাহেন।’

‘আর কতো খুঁজবো, তুই একটু দেখ না।’

আবু রায়হানের পুত্রবধূ নাইমা ডাইনিং রুম থেকে ঘরে এসে শ্বশুরের পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলো,’ কী হয়েছে বাবা?’

‘কী আবার হবে, টেবিলে চশমাটা রেখেছিলাম, এখন উধাও।’

‘চশমাতো আপনার মাথার ওপরে বাবা, হাত দিয়ে দেখেন।’

আবু রায়হান মাথায় হাত দিলেন, তাই তো, চশমা মাথার ওপরে উঠিয়ে রেখেছেন তিনি নিজেই।

সবাই হেসে উঠলো। আবু রায়হান বিব্রত বোধ করলেন, চশমাটা চোখে দিয়ে নিজেও হেসে ফেললেন।

‘ও কিছু না বাবা, এমন হতেই পারে’, শ্বশুরকে আশ্বস্ত করে পুত্রবধূ।

‘বুড়ো হয়ে গেছি, ভুলে যাই,’ আবু রায়হান অসহায় ভাবে বলেন।

‘তুমি মোটেও বুড়ো হওনি। তোমার চেয়ে বাইডেনের বয়স কতো বেশি, ৭৮ বছর বয়সেও ইলেকশন করে আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছে, দেশ চালাচ্ছে। আসলে তোমার মনের জোর কমে গেছে, নিজেকে বুড়ো ভাবো আর ওলট-পালট করো,’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন মাসুমা। স্বামীর বয়স হয়েছে, বুড়ো হয়েছেন, এটা মেনে নিতে কষ্ট হয় মাসুমার। আবু রায়হানের বয়স বাহাত্তর পেরিয়ে তেয়াত্তর চলছে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক আগে।

॥ দুই ॥

সকালে ডাইনিং টেবিলে নাশতা খেতে বসে আবু রায়হান ছেলের খোঁজ করলেন ‘মাহমুদ কোথায়? ও খাবে না?’

‘ও অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে বাবা। ক্লাস শেষ হলে খাবে। আপনি খান’, নাশতার প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে নাইমা।

আবু রায়হানের একমাত্র সন্তান আবু মাহমুদ একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির অধ্যাপক। করোনাকালের লকডাউনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। তবে অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করতে পারে, শিক্ষকরা বাড়িতে বসেই ক্লাস নিচ্ছেন।

‘কবে যে করোনার উপদ্রব যাবে। কোথাও যেতে পারি না, কাউকে বাসায় ডাকতে পারি না।’ অসহায়ভাবে বলেন মাসুমা।

‘করোনা অবশ্যই যাবে, যেতেই হবে। টিকা বের হয়েছে। আরও ভালো, আরও উন্নত টিকা ওষুধ তৈরি হবে। মানুষ আর করোনায় মরবে না- বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রাখতে হবে।’ আবু রায়হান বাস্তববাদী, আশাবাদী মানুষ, সেভাবেই কথাটা বললেন।

‘বাবা, আপনি আর মা তো টিকা নিয়েছেন দুই ডোজ। করোনা থেকে আপনারা অনেক নিরাপদ এখন। তবুও সাবধান থাকতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

‘আমাদের দু’জনের টিকা তো হলো। কিন্তু তোমার আর মাহমুদের কী হবে? তোমরা কবে টিকা নেবে?’

‘আমরা নাম রেজিস্ট্রেশন করেছি। এখনও এসএমএস পাইনি, পেলেই টিকা নিয়ে নেব।’

‘ঠিক আছে। তোমাদের দু’জনকেই তো মাঝে মাঝে বাইরে যেতে হয়। খুব সাবধান থাকবে। মাস্ক পড়ে থাকবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে, ভিড়ের মধ্যে যাবে না- সবই তোমরা জানো। তবু তোমাদের নিয়ে আমার খুব ভয় লাগে।’

‘আমাদের নিয়ে ভাববেন না বাবা, আমরা দু’জনেই যতদূর সম্ভব সাবধান থাকি।’

শ্বশুর আর পুত্রবধূর কথোপকথন এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন মাসুমা। এবার তিনি মুখ খুললেন।

‘সবই তো বুঝলাম, সুমনকে বাসায় আনবে কবে? ওকি নানা বাড়িতেই থেকে যাবে?’ একটু রাগ দেখিয়েই বললেন মাসুমা।

‘মা, সুমন নানাবাড়ি গেছে এক সপ্তাহ হয়নি। থাকুক না আর কটা দিন। ওর সঙ্গে তো আপনি রোজই ফোনে-হোয়াটস অ্যাপে কথা বলেন, ওকে দেখতেও পান।’

‘তুমি এতো অস্থির হও কেন, ছেলেটা নানা-নানীর সঙ্গে থাকুক না কদিন’, নাইমাকে সমর্থন করে বললেন আবু রায়হান।

‘সুমন না থাকলে বাসাটা কেমন ফাঁকা হয়ে থাকে, ভালো লাগে না।’

মাহমুদ ও নাইমার একমাত্র সন্তান সুমন। ছেলেটির বয়স পাঁচ বছর। ওকে নিয়ে দাদা-দাদীর সময় কাটে, ছেলেটি রাতেও ওদের সঙ্গে ঘুমায়।

॥ তিন ॥

একদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আবু রায়হান হৈ চৈ শুরু করলেন।

‘বইটা কোথায় গেল, খেতে যাওয়ার আগে এখানে এই টেবিলের ওপর রেখে গেলাম, এখন নাই। কোথায় গেল, কে নিয়ে গেল?’

‘কোথায় যাবে তোমার বই, কেউ নেয়নি। খুঁজে দেখ ভালো করে কোথায় রেখেছো।’ একটু রাগ হয়েই বলেন মাসুমা।

‘না, আমি টেবিলেই রেখেছিলাম, তুমি কোথাও নিয়ে রেখেছো।’

দু’জনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। নাইমা হৈ চৈ শুনে ছুটে এলো পাশের ঘর থেকে।

‘কী হয়েছে বাবা- কী হয়েছে মা? কিছু হারিয়েছে?

‘তোমার বাবা বই কোথায় রেখেছে ভুলে গেছে, এখন আমাকে দোষ দিচ্ছে।’

‘কী বই বাবা? কোন বই খুঁজছেন?’

‘ঐ যে মূলধারা ৭১, মঈদুল হাসানের লেখা।’

‘একবার তো পড়েছেন। আবার পড়ছেন?’

‘হ্যাঁ, আবার পড়ছি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক কথা আছে। সব সত্যি কথা। আমরা দেশের ভিতরে যুদ্ধ করছিলাম, আর মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সব চক্রান্ত ষড়যন্ত্র সামাল দিয়ে কীভাবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন- সব লেখা আছে বইতে- সব সত্যি কথা।’

‘আমিও পড়েছি বইটা। কত অজানা কথা জানতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারি।’

নাইমা কথা বলতে বলতে এদিক-ওদিক দেখছিলো। কোথায় থাকতে পারে বইটা। তার নজর গেল বিছানার দিকে। বালিশ সরিয়ে দেখলো তার নিচেই রয়েছে হারানো বই ‘মূলধারা ৭১’।

‘এই তো বাবা আপনার বই। খেতে যাওয়ার আগে বিছানায় শুয়ে পড়ছিলেন। বালিশের তলায় গুঁজে রেখেছেন।’

আবু রায়হান অবাক চোখে চেয়ে রইলেন। এ কেমন করে হয়। তার মনে হচ্ছে বইটা টেবিলের ওপর রেখেছিলেন, পাওয়া গেল বালিশের নিচে। হচ্ছেটা কী?

সেদিন রাতেই খাবার টেবিলে আর এক কা- করলেন আবু রায়হান। খাওয়া শেষ হলে টেবিলে বসেই রাতের ওষুধ খান। কী যেন ভাবছিলেন। ভাবতে ভাবতে নিজের ওষুধের বাক্সটা না নিয়ে স্ত্রী মাসুমার বাক্সটা টেনে নিলেন। সেখান থেকে একটি ট্যাবলেট নিয়ে গিলে ফেললেন।

নাইমার চোখে পড়লো ব্যাপারটা। সে চেঁচিয়ে বললো, ‘বাবা করছেন কী? মা’র ওষুধ খাচ্ছেন কেন?’

মাহমুদ ভয় পেয়ে বলে, ‘বাবা কী ওষুধ খেয়েছো দেখি’।

বিব্রত আবু রায়হান ওষুধের স্ট্রিপটা মাহমুদের হাতে তুলে দিলেন।

‘না, ঠিক আছে। এটা তো ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, তবে এটা মা’র জন্য, তোমার নয়। তোমার জন্য অন্য ওষুধ আছে। তুমি আজ আর প্রেসারের ওষুধ খেও না।’

‘আমি যে তোর মায়ের ওষুধ খেয়ে ফেললাম, ক্ষতি হবে নাতো?’

‘নাহ, তবে মা’র ওষুধটা কড়া ওষুধ। মার ব্লাড প্রেসার তোমার চেয়ে অনেক বেশি। সকালে তোমার প্রেসারটা মেপে দেখবো। ঠিক আছে, না বেশি কমে গেছে।’

‘আচ্ছা তোর বাবার কী হয়েছে বলতো? সব ভুলে যায়। আজ আমার ওষুধ খেয়ে ফেললো। আমরা সামনে না থাকলে হয়তো সব ওষুধ খেয়ে ফেলতো।’

‘তোমাদের দু’জনের ওষুধ এক জায়গায় থাকে কেন? আলাদা করে দূরে রাখবে, তাহলে ভুল হবে না।’

‘বাবা, আপনি এখন থেকে নিজে ওষুধ খাবেন না, আমি খাইয়ে দেব,’ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে দেয় নাইমা।

॥ চার ॥

মাহমুদ ও নাইমা একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ওদের

বেডরুমে বসে গল্প করছিলো। রাত বারোটা বেজে গেছে, বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছেন অনেক আগে। হঠাৎ শুনলো বাবা চিৎকার করছেন, ‘মিলিটারি আসছে, মিলিটারি আসছে- ট্যাংক যাচ্ছে-মাহমুদ শিগগির আয়- আমার স্টেনগানটা কোথায়, দে আমাকে।’

মাহমুদ ও নাইমা দৌড়ে যায় বাবার ঘরে। দেখে বাবা বিছানায় শুয়েই চেঁচাচ্ছেন, চোখ বন্ধ। মাসুমা উঠে বসেছেন, আবু রায়হানকে ধাক্কা দিয়ে বলছেন, ‘কী হয়েছে, এমন করছো কেন?’

মাহমুদও উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘বাবা, বাবা- কী হয়েছে? চোখ খোলো, উঠে বসো।’

আবু রায়হান চোখ খুললেন, উঠে বসলেন বিছানায়, ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলেন।

‘বাবা আপনি দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন, ভয় পেয়েছেন, একটু পানি খান’, নাইমা পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। পুরো এক গ্লাস পানি খেয়ে স্থির হয়ে বসলেন আবু রায়হান।

‘দুঃস্বপ্ন নয়, আমি পরিষ্কার শুনতে পেলাম খান সেনাদের ট্যাংক যাচ্ছে ঘড়ঘড় করে- একটার পর একটা। ওদের বুটের শব্দও পেলাম- এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আচ্ছা মাহমুদ, আমার স্টেনগানটা কোথায়? ওটাই তো খুঁজছিলাম।’

‘বাবা তুমি যেটা ট্যাংকের শব্দ বলছো, ওটা ট্রাকের শব্দ। অনেকগুলো মাল বোঝাই ট্রাক আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে গেছে এইমাত্র। আর বুটের শব্দ যেটা বলছো, ঐ যে শোনো, এই বিল্ডিং-এর কোনো ফ্ল্যাটে কেউ কাজ করছে- ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঘুমের ঘোরে এসবই তোমার কাছে ট্যাংকের শব্দ, বুটের শব্দ মনে হয়েছে’।

‘আচ্ছা মাহমুদ, আমার স্টেনগানটা কোথায় বলতে পারো? মুক্তিযুদ্ধের সময় ওটা ছিল আমার সঙ্গী। ওটা দিয়ে যুদ্ধ করেছি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে।’

‘বাবা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্টেনগানটা তুমি জমা দিয়েছো বাংলাদেশ সরকারের কাছে। অস্ত্রটা আমি দেখিনি, আমার তো তখন জন্মই হয়নি। তবে অস্ত্র হাতে তোমার ছবি তো আমাদের ঘরেই আছে।’

‘হ্যাঁ, তাই তো। যুদ্ধের পর ঢাকা স্টেডিয়ামে এক অনুষ্ঠানে অন্য সবার সঙ্গে আমার প্রিয় স্টেনগানটা জমা দিয়েছি বঙ্গবন্ধুর কাছে। উনি তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।’

‘বাবা, আপনি মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলতে পারেন নি। তাইতো স্বপ্নে এত কিছু দেখেন। আপনার ঘুমও ভালো হয় না। এখন শুয়ে পড়–ন।’ নাইমা একটা টাওয়েল দিয়ে আবু রায়হানের মুখ ও ঘাঁড় মুছে দেয়।

‘মুক্তিযুদ্ধের কথা আমি কী করে ভুলবো, কেন ভুলবো? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়েই তো বেঁচে আছি।’

‘ঠিক আছে, এখন শুয়ে পড়ো, আর একটা ট্যাবলেট দেব ঘুমের?’ জানতে চায় মাহমুদ।

‘না, লাগবে না। এবার আমি ঘুমিয়ে যাবো। তোমরা যাও শুয়ে পড়ো।’

॥ পাঁচ ॥

বেডরুমে ফিরে এসে মাহমুদ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থাকে চুপচাপ। তারপর নাইমাকে বলে, ‘বাবাকে একজন ডাক্তার দেখাতেই হবে মনে হচ্ছে। স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে, ঘুমও ভালো হয় না।’

‘একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখালেই ভালো হয়। ঘুম ভালো হয় না, তাছাড়া মানসিকভাবে একটু অস্থির মনে হয়। আচ্ছা, বাবার বন্ধু সামাদ সাহেবের ছেলে ডাক্তার নাজমুল আশরাফ তো সাইকিয়াট্রিস্ট। তার সঙ্গে কথা বলো না।’

‘ভালো কথা মনে করেছো। বাবার বন্ধু আবদুস সামাদও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন? বাবার সঙ্গেই যুদ্ধে ছিলেন। মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। তাঁর ছেলে নাজমুল আমার বন্ধু। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কাজ করে। নিজের চেম্বারও আছে। কাল সকালেই ওর সঙ্গে কথা বলবো।’

পরদিন সকালেই টেলিফোনে ডাক্তার নাজমুলের সঙ্গে কথা হলো মাহমুদের। মাহমুদ তাকে সব খুলে বলে। জানতে চায় বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে না চেম্বারে।

‘চাচাকে নিয়ে আসতে হবে না। আমি নিজেই তোমাদের বাসায় যাবো, পরশু শুক্রবার সকালে। চাচাকে দেখে আসবো। তোমাদের সঙ্গেও দেখা হবে।’

শুক্রবার সকাল ঠিক দশটায় নাজমুল এলো মাহমুদদের বাসায়। আবু রায়হান তাকে দেখে খুব খুশি হলেন।

নাজমুল আবু রায়হানের পা ছুঁয়ে সালাম করে জিজ্ঞাসা করে, ‘কেমন আছেন চাচা? অনেকদিন আসতে পারিনি।’

‘মোটামুটি ভালোই আছি। তবে স্মৃতিশক্তি বোধহয় কমে যাচ্ছে- শুধু ভুলে যাই- ঘুমটাও ভালো হয় না।

‘চিন্তার কিছু নেই, আমি দেখছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ড্রইং রুমে বসে নাজমুল মনোযোগ দিয়ে আবু রায়হানের সমস্যার কথা শোনে। স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করে, পালস দেখে। আগের প্রেসক্রিপসন দেখে বলে, ‘ভালোই আছেন চাচা, তবে আপনার ঘুমের ওষুধটা বদলে দিচ্ছি, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আধঘণ্টা আগে ওষুধটা খেয়ে নেবেন। ভালো ঘুম হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

চা খেতে খেতে নাজমুল গল্প শুরু করে আবু রায়হানের সঙ্গে। ‘আচ্ছা চাচা, মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবাসহ আপনারা পাঁচজন ছিলেন একটা গ্রুপে। সবার নাম মনে আছে?’

‘মনে থাকবে না মানে? ওরা তো আমার হৃদয়ের মধ্যে আছে। তোমার বাবা সামাদ চলে গেছে তিন বছর আগে। কবীর ছিলো ব্যবসায়ী, নবাবপুরে দোকান ছিলো- সেও মারা গেছে দু’বছর আগে, হার্ট এ্যাটাক করে। মুনীর ছিলো বাংলার অধ্যাপক। কলেজে পড়াতো। অবসর নেয়ার পর স্ত্রীসহ কানাডা চলে যায় মেয়ের কাছে। সেখানেই মারা গেছে। মামুন থাকে চট্টগ্রামে দেশের বাড়িতে। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। সবাই আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেছে- তিন জন পরপারে। মামুন দেশে থাকলেও দু’বছর দেখা হয়নি।’

‘চাচা আপনারা তো গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলেন ভারতে, তাই না? কোথায় কোন মাসে?’

‘হ্যাঁ, আসামের তেজপুরে। আমরা পাঁচ বন্ধু একাত্তরের এপ্রিলে গেলাম ত্রিপুরায়। সেখানে দু’মাসের বেশি অপেক্ষা করতে হলো। তারপর সুযোগ পেলাম ট্রেনিংয়ে যাওয়ার। আমরা পাঁচজন একসঙ্গেই গেলাম তেজপুরে। ট্রেনিংয়ের পর আমাদের অস্ত্র আর গুলি দিয়ে দেশের ভিতরে পাঠানো হলো।’

‘আপনারা সব সময়ে একসঙ্গেই ছিলেন? আপনাদের কী কী অস্ত্র দেয়া হয়েছিলো?’

‘হ্যাঁ, আমরা পাঁচজনই যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক সঙ্গেই ছিলাম। আমাকে দেয়া হয়েছিলো একটা স্টেনগান, আর অন্য চারজনকে একটা করে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। আমাদের কিছু গ্রেনেডও দিয়েছিলো। আমরা পাঁচজন দুই নম্বর সেক্টরে একটি গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করেছি, যুদ্ধ করেছি হানাদারদের বিরুদ্ধে। আমাদের কাজের এলাকা ছিলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা।’

‘আপনারা ঢাকায় ফিরলেন কবে?’

‘১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে নিয়াজী সারেন্ডার করলো রেসকোর্স ময়দানে। আমরা পরদিন খুব সকালেই ডেমরা হয়ে ঢাকায় ঢুকলাম- সোজা চলে গেলাম শহীদ মিনারে। দেখলাম শহীদ মিনারের পিলারগুলো নেই, ভেঙ্গে ফেলেছে পাকিস্তানিরা। সেখানে হাজার হাজার লোক। অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো অনেকদিন পরে।’

‘দেয়ালে আপনাদের পাঁচজনের যে ছবিটা টাঙ্গানো আছে, সেটা তখনই তোলা হয়?’

‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। শহীদ মিনারেই দেখা হয়ে গেল দৈনিক সংবাদ-এর ফটোগ্রাফার রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে। আমার খুব আপনজন। আমাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের পাঁচজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে বললেন অস্ত্র উঁচু করে ধরতে। তিনি ছবি তুললেন। পরে ছবির কপি আমাকে দিয়েছিলেন। সেটাই বাঁধিয়ে রেখেছি।’

আবু রায়হান দেয়ালের ছবিটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। নাজমুলকে বললেন, ‘দ্যাখো, পাঁচজনের ঠিক মাঝখানে আমি, হাতে স্টেনগান। অন্যদের হাতে রাইফেল। আমার ডানপাশে তোমার বাবা সামাদ আর কবীর। বামপাশে মুনীর আর মামুন।’

এবার নাজমুল হেসে বলে, ‘চাচা, আপনার দেখছি পঞ্চাশ বছর আগের সব কথা মনে আছে। কিছুই ভুলে যাননি। আপনার স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে, আপনি সম্পূর্ণ ভালো আছেন।’

॥ ছয় ॥

সকাল সাতটায় মোবাইল ফোনটা দু’বার বেজে উঠতেই আবু রায়হানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন অপরিচিত নম্বর। এত সকালে কে ফোন করলো? ফোনটা কানে চেপে ধরে বললেন, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’

‘চাচা, আমি চট্টগ্রাম থেকে বলছি, আপনার বন্ধু আবদুল্লাহ আল মামুনের ছেলে মাসুদ।’

‘কী খবর মাসুদ? তোমরা ভালো আছো তো?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ আবু রায়হানের।

‘চাচা, বাবা আর নেই,’ মাসুদ কাঁদতে কাঁদতে বলে।

‘কী বলছো মাসুদ। কখন, কীভাবে।’

‘আজ ভোর ছ’টায়। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চারদিন আগে করোনা পজিটিভ ধরা পরতেই হাসপাতালে নিয়ে আসি। অবস্থা খারাপ দেখে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু লাভ হলো না। আজ ভোরে চলে গেলেন।’

‘মামুন অসুস্থ, আমাকে একটু জানালে না।’

‘আপনার নম্বরটা বাবার ফোনেই সেভ করা আছে। ফোনটাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আজ ভোরে দেখলাম আইসিইউ বেডে বাবার হাতেই ফোনটা- ফোনের স্ক্রীনে আপনার নাম ও নম্বর। অচেতন হওয়ার আগে আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন বোধহয়।’

শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন আবু রায়হান। ‘একি হলো, একি হলো। মামুনও চলে গেল’ তিনি বলতে থাকলেন বারবার। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মাসুদ কী বলছে কিছুই তার কানে গেল না।

তখন মাসুমারও ঘুম ভেঙে গেছে, বিছানায় উঠে বসেছেন। মাহমুদ ও নাইমাও ছুটে এসেছে বাবার কান্না শুনে।

আবু রায়হানের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মাহমুদ কথা বললো মাসুদের সঙ্গে। সব জানতে পারলো। মাসুদ বললো ঐদিন বিকেলেই মুক্তিযোদ্ধা মামুনকে দাফন করা হবে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে।

॥ সাত ॥

পরদিন ভোরে হঠাৎ মাসুমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলেন বিছানায় আবু রায়হান নেই। বাথরুমের দরজা খোলা, সেখানেও নেই। মাসুমা চিন্তিত হলেন, এমন তো কখনো হয় না। আবু রায়হান তো সব সময়ে ঘুম থেকে দেরিতে ওঠেন।

ঘর থেকে বেরিয়ে মাসুমা ড্রইংরুমে গেলেন। দেখলেন দেয়ালে টাঙ্গানো পাঁচ বন্ধুর গ্রুপ ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আবু রায়হান। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ছবিটার দিকে। হাতে টিস্যু পেপার, বারবার চোখ মুছছেন। তিনি কাঁদছেন নীরবে। মাসুমার চোখেও পানি, স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, তার হাতটা ধরলেন।

মাহমুদ আর নাইমাও এসে বাবা-মা’র পেছনে দাঁড়িয়েছে। ভেজা চোখে আবু রায়হান সবাইকে দেখলেন। নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘সবাই চলে গেছে- আমাকে একা ফেলে রেখে সবাই চলে গেল। আমি একা পড়ে রইলাম- আমি একা।’

মাহমুদ বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘না বাবা, তুমি একা নও- আমরা তো আছি।’

‘হ্যাঁ বাবা, আমরা তো আছি- আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।’ শান্তকণ্ঠে বলে নাইমা

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

আবু রায়হানের স্মৃতি বিস্মৃতি

চপল বাশার
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

‘আমার চশমাটা কোথায় গেল? টেবিলের ওপরেই তো রেখেছিলাম, এখন দেখি কোথাও নেই। তুমি দেখেছো চশমাটা?’, আবু রায়হান জিজ্ঞেস করলেন স্ত্রী মাসুমাকে।

মাসুমা টেবিলের কাগজপত্র, বই গুছিয়ে রাখছিলেন। একটু হেসে বললেন, ‘টেবিলে তো নেই। আছে কোথাও খুঁজে দেখো, হারায় নি।’

কাজের বুয়া তাহমিনা কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। সে বললো, ‘মামা, চশমা জায়গা মতোই আছে, ভালা কইর‌্যা খুঁইজ্যা দ্যাহেন।’

‘আর কতো খুঁজবো, তুই একটু দেখ না।’

আবু রায়হানের পুত্রবধূ নাইমা ডাইনিং রুম থেকে ঘরে এসে শ্বশুরের পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলো,’ কী হয়েছে বাবা?’

‘কী আবার হবে, টেবিলে চশমাটা রেখেছিলাম, এখন উধাও।’

‘চশমাতো আপনার মাথার ওপরে বাবা, হাত দিয়ে দেখেন।’

আবু রায়হান মাথায় হাত দিলেন, তাই তো, চশমা মাথার ওপরে উঠিয়ে রেখেছেন তিনি নিজেই।

সবাই হেসে উঠলো। আবু রায়হান বিব্রত বোধ করলেন, চশমাটা চোখে দিয়ে নিজেও হেসে ফেললেন।

‘ও কিছু না বাবা, এমন হতেই পারে’, শ্বশুরকে আশ্বস্ত করে পুত্রবধূ।

‘বুড়ো হয়ে গেছি, ভুলে যাই,’ আবু রায়হান অসহায় ভাবে বলেন।

‘তুমি মোটেও বুড়ো হওনি। তোমার চেয়ে বাইডেনের বয়স কতো বেশি, ৭৮ বছর বয়সেও ইলেকশন করে আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছে, দেশ চালাচ্ছে। আসলে তোমার মনের জোর কমে গেছে, নিজেকে বুড়ো ভাবো আর ওলট-পালট করো,’ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন মাসুমা। স্বামীর বয়স হয়েছে, বুড়ো হয়েছেন, এটা মেনে নিতে কষ্ট হয় মাসুমার। আবু রায়হানের বয়স বাহাত্তর পেরিয়ে তেয়াত্তর চলছে। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন অনেক আগে।

॥ দুই ॥

সকালে ডাইনিং টেবিলে নাশতা খেতে বসে আবু রায়হান ছেলের খোঁজ করলেন ‘মাহমুদ কোথায়? ও খাবে না?’

‘ও অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে বাবা। ক্লাস শেষ হলে খাবে। আপনি খান’, নাশতার প্লেট এগিয়ে দিয়ে বলে নাইমা।

আবু রায়হানের একমাত্র সন্তান আবু মাহমুদ একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজির অধ্যাপক। করোনাকালের লকডাউনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সব বন্ধ। তবে অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাস করতে পারে, শিক্ষকরা বাড়িতে বসেই ক্লাস নিচ্ছেন।

‘কবে যে করোনার উপদ্রব যাবে। কোথাও যেতে পারি না, কাউকে বাসায় ডাকতে পারি না।’ অসহায়ভাবে বলেন মাসুমা।

‘করোনা অবশ্যই যাবে, যেতেই হবে। টিকা বের হয়েছে। আরও ভালো, আরও উন্নত টিকা ওষুধ তৈরি হবে। মানুষ আর করোনায় মরবে না- বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রাখতে হবে।’ আবু রায়হান বাস্তববাদী, আশাবাদী মানুষ, সেভাবেই কথাটা বললেন।

‘বাবা, আপনি আর মা তো টিকা নিয়েছেন দুই ডোজ। করোনা থেকে আপনারা অনেক নিরাপদ এখন। তবুও সাবধান থাকতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’

‘আমাদের দু’জনের টিকা তো হলো। কিন্তু তোমার আর মাহমুদের কী হবে? তোমরা কবে টিকা নেবে?’

‘আমরা নাম রেজিস্ট্রেশন করেছি। এখনও এসএমএস পাইনি, পেলেই টিকা নিয়ে নেব।’

‘ঠিক আছে। তোমাদের দু’জনকেই তো মাঝে মাঝে বাইরে যেতে হয়। খুব সাবধান থাকবে। মাস্ক পড়ে থাকবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবে, ভিড়ের মধ্যে যাবে না- সবই তোমরা জানো। তবু তোমাদের নিয়ে আমার খুব ভয় লাগে।’

‘আমাদের নিয়ে ভাববেন না বাবা, আমরা দু’জনেই যতদূর সম্ভব সাবধান থাকি।’

শ্বশুর আর পুত্রবধূর কথোপকথন এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন মাসুমা। এবার তিনি মুখ খুললেন।

‘সবই তো বুঝলাম, সুমনকে বাসায় আনবে কবে? ওকি নানা বাড়িতেই থেকে যাবে?’ একটু রাগ দেখিয়েই বললেন মাসুমা।

‘মা, সুমন নানাবাড়ি গেছে এক সপ্তাহ হয়নি। থাকুক না আর কটা দিন। ওর সঙ্গে তো আপনি রোজই ফোনে-হোয়াটস অ্যাপে কথা বলেন, ওকে দেখতেও পান।’

‘তুমি এতো অস্থির হও কেন, ছেলেটা নানা-নানীর সঙ্গে থাকুক না কদিন’, নাইমাকে সমর্থন করে বললেন আবু রায়হান।

‘সুমন না থাকলে বাসাটা কেমন ফাঁকা হয়ে থাকে, ভালো লাগে না।’

মাহমুদ ও নাইমার একমাত্র সন্তান সুমন। ছেলেটির বয়স পাঁচ বছর। ওকে নিয়ে দাদা-দাদীর সময় কাটে, ছেলেটি রাতেও ওদের সঙ্গে ঘুমায়।

॥ তিন ॥

একদিন দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর আবু রায়হান হৈ চৈ শুরু করলেন।

‘বইটা কোথায় গেল, খেতে যাওয়ার আগে এখানে এই টেবিলের ওপর রেখে গেলাম, এখন নাই। কোথায় গেল, কে নিয়ে গেল?’

‘কোথায় যাবে তোমার বই, কেউ নেয়নি। খুঁজে দেখ ভালো করে কোথায় রেখেছো।’ একটু রাগ হয়েই বলেন মাসুমা।

‘না, আমি টেবিলেই রেখেছিলাম, তুমি কোথাও নিয়ে রেখেছো।’

দু’জনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। নাইমা হৈ চৈ শুনে ছুটে এলো পাশের ঘর থেকে।

‘কী হয়েছে বাবা- কী হয়েছে মা? কিছু হারিয়েছে?

‘তোমার বাবা বই কোথায় রেখেছে ভুলে গেছে, এখন আমাকে দোষ দিচ্ছে।’

‘কী বই বাবা? কোন বই খুঁজছেন?’

‘ঐ যে মূলধারা ৭১, মঈদুল হাসানের লেখা।’

‘একবার তো পড়েছেন। আবার পড়ছেন?’

‘হ্যাঁ, আবার পড়ছি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক কথা আছে। সব সত্যি কথা। আমরা দেশের ভিতরে যুদ্ধ করছিলাম, আর মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সব চক্রান্ত ষড়যন্ত্র সামাল দিয়ে কীভাবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন- সব লেখা আছে বইতে- সব সত্যি কথা।’

‘আমিও পড়েছি বইটা। কত অজানা কথা জানতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারি।’

নাইমা কথা বলতে বলতে এদিক-ওদিক দেখছিলো। কোথায় থাকতে পারে বইটা। তার নজর গেল বিছানার দিকে। বালিশ সরিয়ে দেখলো তার নিচেই রয়েছে হারানো বই ‘মূলধারা ৭১’।

‘এই তো বাবা আপনার বই। খেতে যাওয়ার আগে বিছানায় শুয়ে পড়ছিলেন। বালিশের তলায় গুঁজে রেখেছেন।’

আবু রায়হান অবাক চোখে চেয়ে রইলেন। এ কেমন করে হয়। তার মনে হচ্ছে বইটা টেবিলের ওপর রেখেছিলেন, পাওয়া গেল বালিশের নিচে। হচ্ছেটা কী?

সেদিন রাতেই খাবার টেবিলে আর এক কা- করলেন আবু রায়হান। খাওয়া শেষ হলে টেবিলে বসেই রাতের ওষুধ খান। কী যেন ভাবছিলেন। ভাবতে ভাবতে নিজের ওষুধের বাক্সটা না নিয়ে স্ত্রী মাসুমার বাক্সটা টেনে নিলেন। সেখান থেকে একটি ট্যাবলেট নিয়ে গিলে ফেললেন।

নাইমার চোখে পড়লো ব্যাপারটা। সে চেঁচিয়ে বললো, ‘বাবা করছেন কী? মা’র ওষুধ খাচ্ছেন কেন?’

মাহমুদ ভয় পেয়ে বলে, ‘বাবা কী ওষুধ খেয়েছো দেখি’।

বিব্রত আবু রায়হান ওষুধের স্ট্রিপটা মাহমুদের হাতে তুলে দিলেন।

‘না, ঠিক আছে। এটা তো ব্লাড প্রেসারের ওষুধ, তবে এটা মা’র জন্য, তোমার নয়। তোমার জন্য অন্য ওষুধ আছে। তুমি আজ আর প্রেসারের ওষুধ খেও না।’

‘আমি যে তোর মায়ের ওষুধ খেয়ে ফেললাম, ক্ষতি হবে নাতো?’

‘নাহ, তবে মা’র ওষুধটা কড়া ওষুধ। মার ব্লাড প্রেসার তোমার চেয়ে অনেক বেশি। সকালে তোমার প্রেসারটা মেপে দেখবো। ঠিক আছে, না বেশি কমে গেছে।’

‘আচ্ছা তোর বাবার কী হয়েছে বলতো? সব ভুলে যায়। আজ আমার ওষুধ খেয়ে ফেললো। আমরা সামনে না থাকলে হয়তো সব ওষুধ খেয়ে ফেলতো।’

‘তোমাদের দু’জনের ওষুধ এক জায়গায় থাকে কেন? আলাদা করে দূরে রাখবে, তাহলে ভুল হবে না।’

‘বাবা, আপনি এখন থেকে নিজে ওষুধ খাবেন না, আমি খাইয়ে দেব,’ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে দেয় নাইমা।

॥ চার ॥

মাহমুদ ও নাইমা একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ওদের

বেডরুমে বসে গল্প করছিলো। রাত বারোটা বেজে গেছে, বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছেন অনেক আগে। হঠাৎ শুনলো বাবা চিৎকার করছেন, ‘মিলিটারি আসছে, মিলিটারি আসছে- ট্যাংক যাচ্ছে-মাহমুদ শিগগির আয়- আমার স্টেনগানটা কোথায়, দে আমাকে।’

মাহমুদ ও নাইমা দৌড়ে যায় বাবার ঘরে। দেখে বাবা বিছানায় শুয়েই চেঁচাচ্ছেন, চোখ বন্ধ। মাসুমা উঠে বসেছেন, আবু রায়হানকে ধাক্কা দিয়ে বলছেন, ‘কী হয়েছে, এমন করছো কেন?’

মাহমুদও উদ্বিগ্ন হয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘বাবা, বাবা- কী হয়েছে? চোখ খোলো, উঠে বসো।’

আবু রায়হান চোখ খুললেন, উঠে বসলেন বিছানায়, ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলেন।

‘বাবা আপনি দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন, ভয় পেয়েছেন, একটু পানি খান’, নাইমা পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। পুরো এক গ্লাস পানি খেয়ে স্থির হয়ে বসলেন আবু রায়হান।

‘দুঃস্বপ্ন নয়, আমি পরিষ্কার শুনতে পেলাম খান সেনাদের ট্যাংক যাচ্ছে ঘড়ঘড় করে- একটার পর একটা। ওদের বুটের শব্দও পেলাম- এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আচ্ছা মাহমুদ, আমার স্টেনগানটা কোথায়? ওটাই তো খুঁজছিলাম।’

‘বাবা তুমি যেটা ট্যাংকের শব্দ বলছো, ওটা ট্রাকের শব্দ। অনেকগুলো মাল বোঝাই ট্রাক আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে গেছে এইমাত্র। আর বুটের শব্দ যেটা বলছো, ঐ যে শোনো, এই বিল্ডিং-এর কোনো ফ্ল্যাটে কেউ কাজ করছে- ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঘুমের ঘোরে এসবই তোমার কাছে ট্যাংকের শব্দ, বুটের শব্দ মনে হয়েছে’।

‘আচ্ছা মাহমুদ, আমার স্টেনগানটা কোথায় বলতে পারো? মুক্তিযুদ্ধের সময় ওটা ছিল আমার সঙ্গী। ওটা দিয়ে যুদ্ধ করেছি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে।’

‘বাবা, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্টেনগানটা তুমি জমা দিয়েছো বাংলাদেশ সরকারের কাছে। অস্ত্রটা আমি দেখিনি, আমার তো তখন জন্মই হয়নি। তবে অস্ত্র হাতে তোমার ছবি তো আমাদের ঘরেই আছে।’

‘হ্যাঁ, তাই তো। যুদ্ধের পর ঢাকা স্টেডিয়ামে এক অনুষ্ঠানে অন্য সবার সঙ্গে আমার প্রিয় স্টেনগানটা জমা দিয়েছি বঙ্গবন্ধুর কাছে। উনি তখন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।’

‘বাবা, আপনি মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলতে পারেন নি। তাইতো স্বপ্নে এত কিছু দেখেন। আপনার ঘুমও ভালো হয় না। এখন শুয়ে পড়–ন।’ নাইমা একটা টাওয়েল দিয়ে আবু রায়হানের মুখ ও ঘাঁড় মুছে দেয়।

‘মুক্তিযুদ্ধের কথা আমি কী করে ভুলবো, কেন ভুলবো? মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়েই তো বেঁচে আছি।’

‘ঠিক আছে, এখন শুয়ে পড়ো, আর একটা ট্যাবলেট দেব ঘুমের?’ জানতে চায় মাহমুদ।

‘না, লাগবে না। এবার আমি ঘুমিয়ে যাবো। তোমরা যাও শুয়ে পড়ো।’

॥ পাঁচ ॥

বেডরুমে ফিরে এসে মাহমুদ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থাকে চুপচাপ। তারপর নাইমাকে বলে, ‘বাবাকে একজন ডাক্তার দেখাতেই হবে মনে হচ্ছে। স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে, ঘুমও ভালো হয় না।’

‘একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখালেই ভালো হয়। ঘুম ভালো হয় না, তাছাড়া মানসিকভাবে একটু অস্থির মনে হয়। আচ্ছা, বাবার বন্ধু সামাদ সাহেবের ছেলে ডাক্তার নাজমুল আশরাফ তো সাইকিয়াট্রিস্ট। তার সঙ্গে কথা বলো না।’

‘ভালো কথা মনে করেছো। বাবার বন্ধু আবদুস সামাদও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন? বাবার সঙ্গেই যুদ্ধে ছিলেন। মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। তাঁর ছেলে নাজমুল আমার বন্ধু। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কাজ করে। নিজের চেম্বারও আছে। কাল সকালেই ওর সঙ্গে কথা বলবো।’

পরদিন সকালেই টেলিফোনে ডাক্তার নাজমুলের সঙ্গে কথা হলো মাহমুদের। মাহমুদ তাকে সব খুলে বলে। জানতে চায় বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে না চেম্বারে।

‘চাচাকে নিয়ে আসতে হবে না। আমি নিজেই তোমাদের বাসায় যাবো, পরশু শুক্রবার সকালে। চাচাকে দেখে আসবো। তোমাদের সঙ্গেও দেখা হবে।’

শুক্রবার সকাল ঠিক দশটায় নাজমুল এলো মাহমুদদের বাসায়। আবু রায়হান তাকে দেখে খুব খুশি হলেন।

নাজমুল আবু রায়হানের পা ছুঁয়ে সালাম করে জিজ্ঞাসা করে, ‘কেমন আছেন চাচা? অনেকদিন আসতে পারিনি।’

‘মোটামুটি ভালোই আছি। তবে স্মৃতিশক্তি বোধহয় কমে যাচ্ছে- শুধু ভুলে যাই- ঘুমটাও ভালো হয় না।

‘চিন্তার কিছু নেই, আমি দেখছি। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ড্রইং রুমে বসে নাজমুল মনোযোগ দিয়ে আবু রায়হানের সমস্যার কথা শোনে। স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করে, পালস দেখে। আগের প্রেসক্রিপসন দেখে বলে, ‘ভালোই আছেন চাচা, তবে আপনার ঘুমের ওষুধটা বদলে দিচ্ছি, রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আধঘণ্টা আগে ওষুধটা খেয়ে নেবেন। ভালো ঘুম হবে। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

চা খেতে খেতে নাজমুল গল্প শুরু করে আবু রায়হানের সঙ্গে। ‘আচ্ছা চাচা, মুক্তিযুদ্ধে আমার বাবাসহ আপনারা পাঁচজন ছিলেন একটা গ্রুপে। সবার নাম মনে আছে?’

‘মনে থাকবে না মানে? ওরা তো আমার হৃদয়ের মধ্যে আছে। তোমার বাবা সামাদ চলে গেছে তিন বছর আগে। কবীর ছিলো ব্যবসায়ী, নবাবপুরে দোকান ছিলো- সেও মারা গেছে দু’বছর আগে, হার্ট এ্যাটাক করে। মুনীর ছিলো বাংলার অধ্যাপক। কলেজে পড়াতো। অবসর নেয়ার পর স্ত্রীসহ কানাডা চলে যায় মেয়ের কাছে। সেখানেই মারা গেছে। মামুন থাকে চট্টগ্রামে দেশের বাড়িতে। মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। সবাই আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেছে- তিন জন পরপারে। মামুন দেশে থাকলেও দু’বছর দেখা হয়নি।’

‘চাচা আপনারা তো গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়েছিলেন ভারতে, তাই না? কোথায় কোন মাসে?’

‘হ্যাঁ, আসামের তেজপুরে। আমরা পাঁচ বন্ধু একাত্তরের এপ্রিলে গেলাম ত্রিপুরায়। সেখানে দু’মাসের বেশি অপেক্ষা করতে হলো। তারপর সুযোগ পেলাম ট্রেনিংয়ে যাওয়ার। আমরা পাঁচজন একসঙ্গেই গেলাম তেজপুরে। ট্রেনিংয়ের পর আমাদের অস্ত্র আর গুলি দিয়ে দেশের ভিতরে পাঠানো হলো।’

‘আপনারা সব সময়ে একসঙ্গেই ছিলেন? আপনাদের কী কী অস্ত্র দেয়া হয়েছিলো?’

‘হ্যাঁ, আমরা পাঁচজনই যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক সঙ্গেই ছিলাম। আমাকে দেয়া হয়েছিলো একটা স্টেনগান, আর অন্য চারজনকে একটা করে থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল। আমাদের কিছু গ্রেনেডও দিয়েছিলো। আমরা পাঁচজন দুই নম্বর সেক্টরে একটি গেরিলা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করেছি, যুদ্ধ করেছি হানাদারদের বিরুদ্ধে। আমাদের কাজের এলাকা ছিলো নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানা।’

‘আপনারা ঢাকায় ফিরলেন কবে?’

‘১৬ই ডিসেম্বর বিকেলে নিয়াজী সারেন্ডার করলো রেসকোর্স ময়দানে। আমরা পরদিন খুব সকালেই ডেমরা হয়ে ঢাকায় ঢুকলাম- সোজা চলে গেলাম শহীদ মিনারে। দেখলাম শহীদ মিনারের পিলারগুলো নেই, ভেঙ্গে ফেলেছে পাকিস্তানিরা। সেখানে হাজার হাজার লোক। অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো অনেকদিন পরে।’

‘দেয়ালে আপনাদের পাঁচজনের যে ছবিটা টাঙ্গানো আছে, সেটা তখনই তোলা হয়?’

‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। শহীদ মিনারেই দেখা হয়ে গেল দৈনিক সংবাদ-এর ফটোগ্রাফার রশীদ ভাইয়ের সঙ্গে। আমার খুব আপনজন। আমাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের পাঁচজনকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে বললেন অস্ত্র উঁচু করে ধরতে। তিনি ছবি তুললেন। পরে ছবির কপি আমাকে দিয়েছিলেন। সেটাই বাঁধিয়ে রেখেছি।’

আবু রায়হান দেয়ালের ছবিটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। নাজমুলকে বললেন, ‘দ্যাখো, পাঁচজনের ঠিক মাঝখানে আমি, হাতে স্টেনগান। অন্যদের হাতে রাইফেল। আমার ডানপাশে তোমার বাবা সামাদ আর কবীর। বামপাশে মুনীর আর মামুন।’

এবার নাজমুল হেসে বলে, ‘চাচা, আপনার দেখছি পঞ্চাশ বছর আগের সব কথা মনে আছে। কিছুই ভুলে যাননি। আপনার স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে, আপনি সম্পূর্ণ ভালো আছেন।’

॥ ছয় ॥

সকাল সাতটায় মোবাইল ফোনটা দু’বার বেজে উঠতেই আবু রায়হানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন অপরিচিত নম্বর। এত সকালে কে ফোন করলো? ফোনটা কানে চেপে ধরে বললেন, ‘হ্যালো, কে বলছেন?’

‘চাচা, আমি চট্টগ্রাম থেকে বলছি, আপনার বন্ধু আবদুল্লাহ আল মামুনের ছেলে মাসুদ।’

‘কী খবর মাসুদ? তোমরা ভালো আছো তো?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠ আবু রায়হানের।

‘চাচা, বাবা আর নেই,’ মাসুদ কাঁদতে কাঁদতে বলে।

‘কী বলছো মাসুদ। কখন, কীভাবে।’

‘আজ ভোর ছ’টায়। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চারদিন আগে করোনা পজিটিভ ধরা পরতেই হাসপাতালে নিয়ে আসি। অবস্থা খারাপ দেখে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। কিন্তু লাভ হলো না। আজ ভোরে চলে গেলেন।’

‘মামুন অসুস্থ, আমাকে একটু জানালে না।’

‘আপনার নম্বরটা বাবার ফোনেই সেভ করা আছে। ফোনটাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আজ ভোরে দেখলাম আইসিইউ বেডে বাবার হাতেই ফোনটা- ফোনের স্ক্রীনে আপনার নাম ও নম্বর। অচেতন হওয়ার আগে আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন বোধহয়।’

শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন আবু রায়হান। ‘একি হলো, একি হলো। মামুনও চলে গেল’ তিনি বলতে থাকলেন বারবার। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মাসুদ কী বলছে কিছুই তার কানে গেল না।

তখন মাসুমারও ঘুম ভেঙে গেছে, বিছানায় উঠে বসেছেন। মাহমুদ ও নাইমাও ছুটে এসেছে বাবার কান্না শুনে।

আবু রায়হানের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে মাহমুদ কথা বললো মাসুদের সঙ্গে। সব জানতে পারলো। মাসুদ বললো ঐদিন বিকেলেই মুক্তিযোদ্ধা মামুনকে দাফন করা হবে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে।

॥ সাত ॥

পরদিন ভোরে হঠাৎ মাসুমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলেন বিছানায় আবু রায়হান নেই। বাথরুমের দরজা খোলা, সেখানেও নেই। মাসুমা চিন্তিত হলেন, এমন তো কখনো হয় না। আবু রায়হান তো সব সময়ে ঘুম থেকে দেরিতে ওঠেন।

ঘর থেকে বেরিয়ে মাসুমা ড্রইংরুমে গেলেন। দেখলেন দেয়ালে টাঙ্গানো পাঁচ বন্ধুর গ্রুপ ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আবু রায়হান। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ছবিটার দিকে। হাতে টিস্যু পেপার, বারবার চোখ মুছছেন। তিনি কাঁদছেন নীরবে। মাসুমার চোখেও পানি, স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, তার হাতটা ধরলেন।

মাহমুদ আর নাইমাও এসে বাবা-মা’র পেছনে দাঁড়িয়েছে। ভেজা চোখে আবু রায়হান সবাইকে দেখলেন। নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘সবাই চলে গেছে- আমাকে একা ফেলে রেখে সবাই চলে গেল। আমি একা পড়ে রইলাম- আমি একা।’

মাহমুদ বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘না বাবা, তুমি একা নও- আমরা তো আছি।’

‘হ্যাঁ বাবা, আমরা তো আছি- আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।’ শান্তকণ্ঠে বলে নাইমা