প্রমথ চৌধুরীর লেখালেখি সম্পাদকতা

সরকার মাসুদ

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শেষদিকে অর্থাৎ ১৯২৭-২৮-২৯ সাল নাগাদ বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারাটি বেশ বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে উঠেছিল। প্রমথ চৌধুরী সেই সময় মধ্যবয়স পেরিয়ে গেছেন কিন্তু তখনো সৃষ্টিশীল লেখাপড়ায় লিপ্ত। তাঁর সমকালীন অপরাপর লেখকরা তিরিশের দশক শেষ হতে না হতেই ফুরিয়ে গেছেন; কিন্তু তিনি লেখক হিসেবে আমৃত্যু সবল ও সচল ছিলেন।

নতুন লেখকরা যে তাদের সাহিত্যকর্মে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করে চলেছেনÑ এ বিষয়টি তাঁর সৃজনশীল উদার মনের অনুমোদন পেয়েছিল, তার প্রধান কারণ তিনি নিজেও মননশীল এবং বুদ্ধিবৃত্ত। পুরনো আমলের সাহিত্যটা প্রধানত বোধপ্রসূত, কিন্তু নতুন দুই আমলের সাহিত্যিকদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে গেছেন প্রমথ চৌধুরী।

প্রবীণ সাহিত্যে বৈচিত্র্য কম ছিল, সুবিধা ছিল বেশি। সেখানে ভাবসারল্যও ছিল বেশি। প্রমথ চৌধুরী তো বৈচিত্র্যের পক্ষে। সুতরাং সেখানে জটিলতা কমবেশি থাকলেও বুদ্ধিসৃষ্ট কল্পনা-জৌলুসের সুবিধা তিনি অস্বীকার করবেন কীভাবে? বুদ্ধির মেজাজ অবশ্য একেক লেখকের ক্ষেত্রে একেক রকম। আবার একই লেখকের ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রচনায় ভিন্ন ভিন্ন মেজাজ-মর্জি লক্ষণীয়। সেজন্য আমরা দেখি, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে চেতনা বা মূল্যবোধের প্রাধান্য; প্রবন্ধে প্রাধান্য পেয়েছে বুদ্ধিমত্তা। একই জিনিস রবীন্দ্রনাথেও উপস্থিত, আলাদা ভঙ্গিতে।

প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যকীর্তি আমার মতে, প্রধানত তিনটি। এক. তিনি বুদ্ধি প্রধান সাহিত্যের স্রষ্টা এবং পৃষ্ঠপোষক। দুই. সাহিত্যে মৌলিক ভাষারীতির প্রবর্তক। তিন. তিনি বিখ্যাত সাহিত্যপত্র ‘সবুজপত্র’-এর যোগ্য সম্পাদক, যে পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি লেখক বলয়, যাঁরা সৃজনশীল নতুন সাহিত্যে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সেই অনুসারে কাজও করেছিলেন।

আধুনিক সাহিত্যে বুদ্ধিবৃত্তির একটা বিরাট ভূমিকা আছে। অগ্রসর সাহিত্য। অতএব এই যুগোপযোগী চেতনাকে সঙ্গে করেই ফলিয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ ফসল। কল্পনাবৃত্তির সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সঠিক সংযোগ না থাকলে সেই সাহিত্য আজ অপাঙ্ক্তেয়। তার ভালো-মন্দের ব্যাপারটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। বুদ্ধিবৃত্তির এই প্রসারকে আমরা সাহিত্যের যুগধর্ম হিসেবেও অভিহিত করতে পারি। প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর সতীর্থদের কালে যুগধর্মের ওই প্রভাব অনিবার্য এক পরিবর্তন রূপে দেখা দিয়েছিল; কেবল সাহিত্যে নয়, শিল্পকলার অন্যান্য ক্ষেত্রেও। মৌখিক ভাষার ক্রমপ্রসারমাণ প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সাহিত্যের সীমা বিস্তৃত হয়েছে অনেক দূর পর্যন্ত। সর্বজনীনতার উপাদান থাকার ফলে সেই ভাষা আর শুধু দপ্তর বা সমাজের উঁচু শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তা অর্জন করেছিল গণমুখী চরিত্র। ‘বঙ্গসাহিত্যের নবযুগ’ রচনায় প্রমথ বাবু নিজেই এ বিষয়ে বলেছেনÑ ‘প্রথমেই চোখে পড়ে যে, এই নবসাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করছে। অতীতে অন্য দেশের ন্যায় এ দেশের সাহিত্য জগৎ যখন দু’চারজন লোকের দখলে ছিল, যখন লেখা দূরে থাক পড়বার অধিকারও সকলের ছিল না, তখন সাহিত্য রাজ্যে রাজা সামন্ত প্রভৃতি বিরাজ করতেন এবং তারা কাব্যদর্শন ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে, মন্দির অট্টালিকা, স্তূপ, স্তম্ভ, গুহা প্রভৃতি আকারে বহু চিরস্থায়ী কীর্তি রেখে গেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের দ্বারা কোনোরূপ প্রকা- কা- করে তোলা অসম্ভব এই জ্ঞানটুকু জন্মালে আমাদের কারও আর সাহিত্যে রাজা হবার লোভ থাকবে না এবং শব্দের কীর্তিস্তম্ভ গড়বার বৃথা চেষ্টায় কোনোরূপ দুঃখ করবার আবশ্যকতা নেই। বস্তুজগতের মতো সাহিত্য জগতেরও প্রাচীন কীর্তিগুলো দূর থেকে দেখতে ভালো, কিন্তু নিত্যব্যবহার্য নয়।’

প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কাব্য, গ্রন্থ সমালোচনাÑ প্রমথ চৌধুরীর সব ধরনের লেখার পেছনে ছিল বুদ্ধিবৃত্তির গভীর প্রণোদনা। সমসাময়িক অন্যান্য বাঙালি লেখকদের থেকে তিনি এখানেই স্পষ্টত আলাদা। একমাত্র ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ। প্রমথের গদ্যে ফ্রান্সের গদ্যসাহিত্যের গভীর প্রভাব লক্ষ্যযোগ্য বিষয়। বাংলা ভাষার প্রাচীন যুগের কবিদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। প্রাচীন কালের কবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর রচনার বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরটি লক্ষ্য করার মতো বিষয়। শৈশবে-কৈশোরে, প্রমথ চৌধুরী দির্ঘদিন কৃষ্ণনগরে বাস করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ওই অঞ্চলের ভাষার ছায়া পড়েছিল তাঁর মধ্যে। কৃষ্ণনগরের ভাষা এবং ভারতচন্দ্রের কবিতার ধরন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেলটিকে ঋদ্ধ করার কাজে সহায় হয়েছিল। তবে আমার ধারণা, এক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছেন ফরাসি সাহিত্য থেকে। ফ্রান্সের বিভিন্ন গদ্য লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড় সংযোগ ছিল বলেই প্রমথ সুরুচিস্নিগ্ধ, মার্জিত, পরিশীলিত এক গদ্যভাষার জনক হতে পেরেছিলেন। ফরাসি গদ্যের স্বচ্ছতা, প্রাঞ্জলতা আর বুদ্ধিদীপ্ততার ভেতর দিয়েই তিনি তাঁর নিজের গদ্যভঙ্গির পথ খুঁজে পেয়েছেন। ক্রমশ হয়ে উঠেছিলেন টেকনিক সচেতন। তাঁর প্রবন্ধের মধ্যে গল্পের সুর এবং গল্পের ভেতর প্রবন্ধের মেজাজ একটা বিশেষ লক্ষণীয় ব্যাপার। ভাষার লঘুচালের ভেতর যমক ও শ্লেষের সার্থক ব্যবহার দেখাতে পেরেছেন তিনি, বিশেষ করে প্রবন্ধে। এভাবে এবং আরও নানাবিধ উপায়ে প্রমথ গদ্যের যে বুদ্ধিশাণিত স্টাইলটি রপ্ত করেছিলেন তা অভূতপূর্ব, অনাস্বাদিতপূর্ব।

প্রমথ চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার সম্পাদনা। আর এটা আমার মতে, তাঁর প্রধানতম কীর্তি; প্রধানত এ জন্য যে, ভাষার যে আটপৌরে রীতিকে তিনি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, করেও ছিলেনÑ তা সম্ভব হতে পেরেছিল ওই পত্রিকার প্রকাশনার মাধ্যমে। আজকের দিনে সাড়ে পনেরো আনা সাহিত্যের কাগজ যেভাবে সম্পাদিত হয়; যেভাবে সংঘটিত হয় তাদের কর্মকা-, ‘সবুজপত্র’ তো ঠিক সেরকম পত্রিকা ছিল না। তার একটা ‘মিশন’ ছিল। সম্পাদকের দৃষ্টি ছিল দূরবিসারী। এ-ধরনের কাজের জন্য মনোবলের প্রয়োজন হয়। দরকার হয় জনবলেরও। সম-আদর্শে বিশ্বাসী মানুষদের একত্রিত করার সাংগঠনিক ক্ষমতা তো লাগেই। সৌভাগ্যবশত ‘বীরবল’-এর (প্রমথ চৌধুরীর ছন্দনাম) এগুলো সবই ছিল এবং সে কারণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনাটি সংঘটিত করা সম্ভব হয়েছিল তাঁর পক্ষে। তাঁর আগে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী এ জাতীয় কাজ করেছেন। সমমনা গুণীজনদের একত্রিত করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘সাহিত্য পরিষৎ’। বঙ্গিমচন্দ্রের মধ্যেও ছিল এই গুণটি। ‘বঙ্গদর্শন’ কাগজটি চালানোর জন্য তাঁকে তৈরি করতে হয়েছিল একটি সাহিত্য সংঘ। তারও আগে উইলিয়াম কেরির ভেতর এ ধরনের সাংগঠনিক প্রতিভা দেখা গিয়েছিল; যার অনিবার্য ফল হিসেবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা গদ্য রচনার সূত্রপাত হয়।

সাহিত্যে মৌলিক ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিতর্ক আছে। অনেকেই এ সম্পর্কিত প্রথম কৃতিত্ব প্রমথ চৌধুরীকে দিতে নারাজ। তাঁদের মতে, এ কৃতীর প্রথম প্রাপক ‘আলালের ঘরে দুলার’ ও ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-এর লেখকদ্বয়, যথাক্রমে প্যারিচাঁদ মিত্র এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ। আমার ধারণা তাদের এই দাবি অযৌক্তিক। আঞ্চলিক ভাষা ও মৌখিক ভাষা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ও ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। এ বই দুটিতে প্রযুক্ত ভাষাকে মৌলিক ভাষা বলা সমীচীন নয়। সাহিত্যের মৌলিক ভাষা সাহিত্যের লৈখিক ভাষার মতোই গোটা দেশের পটভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হবেÑ এটাই কাক্সিক্ষত। আঞ্চলিক ভাষা সে ধরনের প্রতিষ্ঠা দাবি করতে পারে না। সাহিত্যে ব্যবহৃত মৌখিক ভাষা সাহিত্যের প্রচল লৈখিক ভাষার মতোই কম-বেশি লেখকের স্বনির্মিত। সেজন্য মৌখিক ভাষাও খানিকটা কৃত্রিম। আঞ্চলিক ভাষা কৃত্রিম নয় বটে, কিন্তু এর প্রধান অসুবিধা হলোÑ এ ভাষা সর্বজনবোধ্য নয়। দুটি উদাহরণ দেবÑ আলাউদ্দীন আল আজাদের ‘কর্ণফুলি’ এবং অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’। মৌখিক ভাষা বিশেষ কোনো অঞ্চলের ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু সেই ভাষা যেন শিল্পীর কলমের গুণে ওই আঞ্চলিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, এটাই কাম্য। ‘মহিষ কুড়ার উপকথা’ উপন্যাসে সেই ব্যাপারটিকেই সম্ভব করে তুলতে পেরেছেন লেখক। ‘কর্ণফুলি’ উপন্যাসে আজাদ তা করতে পারেননি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে ভালো পরিচয় নেইÑ এমন পাঠক এই বই পড়ে শেষ করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

স্মরণ রাখা উচিত যে, যে মৌখিক ভাষাকে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন তার উৎসভূমি কৃষ্ণনগর ছিল বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র। নিতান্ত অল্প বয়সে কৃষ্ণনগরে বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর। ফলে সেই স্থানের ভাষা এবং শিল্প-সংস্কৃতির অনেক কিছুই তিনি আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর মানস গঠনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করেছে। এক. কৃষ্ণনগরের স্থানীয় ভাষার সান্নিধ্যে আসা, খ. ভারতচন্দ্রের বুদ্ধিচিহ্নিত কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা, গ. ফরাসি গদ্য লেখকদের বৈচিত্র্যময় রচনা আস্বাদন। সাহিত্যে মৌলিক ভাষারীতির প্রবর্তক কে, এই বিতর্কে না জড়িয়েও একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে, প্রমথ চৌধুরীই এ স্টাইলকে সাহিতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। প্রধানত ‘সবুজপত্র’ সাময়িকী সম্পাদনার ভেতর দিয়ে, সেই কাজটি তিনি এগিয়ে নিতে পেরেছিলেন। বস্তুত ওই কাগজটির অস্তিত্ব না থাকলে সাহিত্যের নতুন রীতিটি সর্বজনগ্রাহী হয়ে উঠতে পারতো কিনা, পারলেও কত বেশি সময় নিতো সেটা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ভারতচন্দ্রের বৈশিষ্ট্যময় কাব্য এবং ফরাসি গদ্যের বুদ্ধিদীপ্ত প্রাঞ্জলতার প্রভাবে প্রমথ চৌধুরীর সৃজনপ্রতিভা বিকাশ লাভ করেছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো। তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম আধুনিক যুগ-চেতনার ও ভারের বিশিষ্ট এক রূপ তুলে ধরে। মৌখিক ভাষার সবচেয়ে বড় গুণ তার নিত্যব্যবহার্যতা। তার প্রয়োগ সাহিত্যে এনে দেবে গতি এবং ভিন্নরকম সৌকর্যÑ এ ব্যাপারটি তিনি অনুধাবন করেছিলেন বহু আগে। উত্তরকালের আধুনিক সাহিত্যিকদের ওপর তার প্রভাব-রহস্যের চাবিটি লুক্কায়িত আছে এখানেই।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

প্রমথ চৌধুরীর লেখালেখি সম্পাদকতা

সরকার মাসুদ
image

প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬)

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশকের শেষদিকে অর্থাৎ ১৯২৭-২৮-২৯ সাল নাগাদ বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারাটি বেশ বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে উঠেছিল। প্রমথ চৌধুরী সেই সময় মধ্যবয়স পেরিয়ে গেছেন কিন্তু তখনো সৃষ্টিশীল লেখাপড়ায় লিপ্ত। তাঁর সমকালীন অপরাপর লেখকরা তিরিশের দশক শেষ হতে না হতেই ফুরিয়ে গেছেন; কিন্তু তিনি লেখক হিসেবে আমৃত্যু সবল ও সচল ছিলেন।

নতুন লেখকরা যে তাদের সাহিত্যকর্মে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করে চলেছেনÑ এ বিষয়টি তাঁর সৃজনশীল উদার মনের অনুমোদন পেয়েছিল, তার প্রধান কারণ তিনি নিজেও মননশীল এবং বুদ্ধিবৃত্ত। পুরনো আমলের সাহিত্যটা প্রধানত বোধপ্রসূত, কিন্তু নতুন দুই আমলের সাহিত্যিকদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে গেছেন প্রমথ চৌধুরী।

প্রবীণ সাহিত্যে বৈচিত্র্য কম ছিল, সুবিধা ছিল বেশি। সেখানে ভাবসারল্যও ছিল বেশি। প্রমথ চৌধুরী তো বৈচিত্র্যের পক্ষে। সুতরাং সেখানে জটিলতা কমবেশি থাকলেও বুদ্ধিসৃষ্ট কল্পনা-জৌলুসের সুবিধা তিনি অস্বীকার করবেন কীভাবে? বুদ্ধির মেজাজ অবশ্য একেক লেখকের ক্ষেত্রে একেক রকম। আবার একই লেখকের ভিন্ন ভিন্ন ধরনের রচনায় ভিন্ন ভিন্ন মেজাজ-মর্জি লক্ষণীয়। সেজন্য আমরা দেখি, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে চেতনা বা মূল্যবোধের প্রাধান্য; প্রবন্ধে প্রাধান্য পেয়েছে বুদ্ধিমত্তা। একই জিনিস রবীন্দ্রনাথেও উপস্থিত, আলাদা ভঙ্গিতে।

প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যকীর্তি আমার মতে, প্রধানত তিনটি। এক. তিনি বুদ্ধি প্রধান সাহিত্যের স্রষ্টা এবং পৃষ্ঠপোষক। দুই. সাহিত্যে মৌলিক ভাষারীতির প্রবর্তক। তিন. তিনি বিখ্যাত সাহিত্যপত্র ‘সবুজপত্র’-এর যোগ্য সম্পাদক, যে পত্রিকাটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি লেখক বলয়, যাঁরা সৃজনশীল নতুন সাহিত্যে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সেই অনুসারে কাজও করেছিলেন।

আধুনিক সাহিত্যে বুদ্ধিবৃত্তির একটা বিরাট ভূমিকা আছে। অগ্রসর সাহিত্য। অতএব এই যুগোপযোগী চেতনাকে সঙ্গে করেই ফলিয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ ফসল। কল্পনাবৃত্তির সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার সঠিক সংযোগ না থাকলে সেই সাহিত্য আজ অপাঙ্ক্তেয়। তার ভালো-মন্দের ব্যাপারটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। বুদ্ধিবৃত্তির এই প্রসারকে আমরা সাহিত্যের যুগধর্ম হিসেবেও অভিহিত করতে পারি। প্রমথ চৌধুরী ও তাঁর সতীর্থদের কালে যুগধর্মের ওই প্রভাব অনিবার্য এক পরিবর্তন রূপে দেখা দিয়েছিল; কেবল সাহিত্যে নয়, শিল্পকলার অন্যান্য ক্ষেত্রেও। মৌখিক ভাষার ক্রমপ্রসারমাণ প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সাহিত্যের সীমা বিস্তৃত হয়েছে অনেক দূর পর্যন্ত। সর্বজনীনতার উপাদান থাকার ফলে সেই ভাষা আর শুধু দপ্তর বা সমাজের উঁচু শ্রেণিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তা অর্জন করেছিল গণমুখী চরিত্র। ‘বঙ্গসাহিত্যের নবযুগ’ রচনায় প্রমথ বাবু নিজেই এ বিষয়ে বলেছেনÑ ‘প্রথমেই চোখে পড়ে যে, এই নবসাহিত্য রাজধর্ম ত্যাগ করে গণধর্ম অবলম্বন করছে। অতীতে অন্য দেশের ন্যায় এ দেশের সাহিত্য জগৎ যখন দু’চারজন লোকের দখলে ছিল, যখন লেখা দূরে থাক পড়বার অধিকারও সকলের ছিল না, তখন সাহিত্য রাজ্যে রাজা সামন্ত প্রভৃতি বিরাজ করতেন এবং তারা কাব্যদর্শন ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে, মন্দির অট্টালিকা, স্তূপ, স্তম্ভ, গুহা প্রভৃতি আকারে বহু চিরস্থায়ী কীর্তি রেখে গেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে আমাদের দ্বারা কোনোরূপ প্রকা- কা- করে তোলা অসম্ভব এই জ্ঞানটুকু জন্মালে আমাদের কারও আর সাহিত্যে রাজা হবার লোভ থাকবে না এবং শব্দের কীর্তিস্তম্ভ গড়বার বৃথা চেষ্টায় কোনোরূপ দুঃখ করবার আবশ্যকতা নেই। বস্তুজগতের মতো সাহিত্য জগতেরও প্রাচীন কীর্তিগুলো দূর থেকে দেখতে ভালো, কিন্তু নিত্যব্যবহার্য নয়।’

প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কাব্য, গ্রন্থ সমালোচনাÑ প্রমথ চৌধুরীর সব ধরনের লেখার পেছনে ছিল বুদ্ধিবৃত্তির গভীর প্রণোদনা। সমসাময়িক অন্যান্য বাঙালি লেখকদের থেকে তিনি এখানেই স্পষ্টত আলাদা। একমাত্র ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ। প্রমথের গদ্যে ফ্রান্সের গদ্যসাহিত্যের গভীর প্রভাব লক্ষ্যযোগ্য বিষয়। বাংলা ভাষার প্রাচীন যুগের কবিদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর। প্রাচীন কালের কবি হওয়া সত্ত্বেও তাঁর রচনার বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরটি লক্ষ্য করার মতো বিষয়। শৈশবে-কৈশোরে, প্রমথ চৌধুরী দির্ঘদিন কৃষ্ণনগরে বাস করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই ওই অঞ্চলের ভাষার ছায়া পড়েছিল তাঁর মধ্যে। কৃষ্ণনগরের ভাষা এবং ভারতচন্দ্রের কবিতার ধরন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক লেভেলটিকে ঋদ্ধ করার কাজে সহায় হয়েছিল। তবে আমার ধারণা, এক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বেশি সাহায্য পেয়েছেন ফরাসি সাহিত্য থেকে। ফ্রান্সের বিভিন্ন গদ্য লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড় সংযোগ ছিল বলেই প্রমথ সুরুচিস্নিগ্ধ, মার্জিত, পরিশীলিত এক গদ্যভাষার জনক হতে পেরেছিলেন। ফরাসি গদ্যের স্বচ্ছতা, প্রাঞ্জলতা আর বুদ্ধিদীপ্ততার ভেতর দিয়েই তিনি তাঁর নিজের গদ্যভঙ্গির পথ খুঁজে পেয়েছেন। ক্রমশ হয়ে উঠেছিলেন টেকনিক সচেতন। তাঁর প্রবন্ধের মধ্যে গল্পের সুর এবং গল্পের ভেতর প্রবন্ধের মেজাজ একটা বিশেষ লক্ষণীয় ব্যাপার। ভাষার লঘুচালের ভেতর যমক ও শ্লেষের সার্থক ব্যবহার দেখাতে পেরেছেন তিনি, বিশেষ করে প্রবন্ধে। এভাবে এবং আরও নানাবিধ উপায়ে প্রমথ গদ্যের যে বুদ্ধিশাণিত স্টাইলটি রপ্ত করেছিলেন তা অভূতপূর্ব, অনাস্বাদিতপূর্ব।

প্রমথ চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি ‘সবুজপত্র’ পত্রিকার সম্পাদনা। আর এটা আমার মতে, তাঁর প্রধানতম কীর্তি; প্রধানত এ জন্য যে, ভাষার যে আটপৌরে রীতিকে তিনি সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, করেও ছিলেনÑ তা সম্ভব হতে পেরেছিল ওই পত্রিকার প্রকাশনার মাধ্যমে। আজকের দিনে সাড়ে পনেরো আনা সাহিত্যের কাগজ যেভাবে সম্পাদিত হয়; যেভাবে সংঘটিত হয় তাদের কর্মকা-, ‘সবুজপত্র’ তো ঠিক সেরকম পত্রিকা ছিল না। তার একটা ‘মিশন’ ছিল। সম্পাদকের দৃষ্টি ছিল দূরবিসারী। এ-ধরনের কাজের জন্য মনোবলের প্রয়োজন হয়। দরকার হয় জনবলেরও। সম-আদর্শে বিশ্বাসী মানুষদের একত্রিত করার সাংগঠনিক ক্ষমতা তো লাগেই। সৌভাগ্যবশত ‘বীরবল’-এর (প্রমথ চৌধুরীর ছন্দনাম) এগুলো সবই ছিল এবং সে কারণেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনাটি সংঘটিত করা সম্ভব হয়েছিল তাঁর পক্ষে। তাঁর আগে রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী এ জাতীয় কাজ করেছেন। সমমনা গুণীজনদের একত্রিত করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘সাহিত্য পরিষৎ’। বঙ্গিমচন্দ্রের মধ্যেও ছিল এই গুণটি। ‘বঙ্গদর্শন’ কাগজটি চালানোর জন্য তাঁকে তৈরি করতে হয়েছিল একটি সাহিত্য সংঘ। তারও আগে উইলিয়াম কেরির ভেতর এ ধরনের সাংগঠনিক প্রতিভা দেখা গিয়েছিল; যার অনিবার্য ফল হিসেবে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা গদ্য রচনার সূত্রপাত হয়।

সাহিত্যে মৌলিক ভাষা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বিতর্ক আছে। অনেকেই এ সম্পর্কিত প্রথম কৃতিত্ব প্রমথ চৌধুরীকে দিতে নারাজ। তাঁদের মতে, এ কৃতীর প্রথম প্রাপক ‘আলালের ঘরে দুলার’ ও ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-এর লেখকদ্বয়, যথাক্রমে প্যারিচাঁদ মিত্র এবং কালীপ্রসন্ন সিংহ। আমার ধারণা তাদের এই দাবি অযৌক্তিক। আঞ্চলিক ভাষা ও মৌখিক ভাষা দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। ‘আলালের ঘরের দুলাল’ ও ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। এ বই দুটিতে প্রযুক্ত ভাষাকে মৌলিক ভাষা বলা সমীচীন নয়। সাহিত্যের মৌলিক ভাষা সাহিত্যের লৈখিক ভাষার মতোই গোটা দেশের পটভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হবেÑ এটাই কাক্সিক্ষত। আঞ্চলিক ভাষা সে ধরনের প্রতিষ্ঠা দাবি করতে পারে না। সাহিত্যে ব্যবহৃত মৌখিক ভাষা সাহিত্যের প্রচল লৈখিক ভাষার মতোই কম-বেশি লেখকের স্বনির্মিত। সেজন্য মৌখিক ভাষাও খানিকটা কৃত্রিম। আঞ্চলিক ভাষা কৃত্রিম নয় বটে, কিন্তু এর প্রধান অসুবিধা হলোÑ এ ভাষা সর্বজনবোধ্য নয়। দুটি উদাহরণ দেবÑ আলাউদ্দীন আল আজাদের ‘কর্ণফুলি’ এবং অমিয়ভূষণ মজুমদারের ‘মহিষকুড়ার উপকথা’। মৌখিক ভাষা বিশেষ কোনো অঞ্চলের ভাষার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই কিন্তু সেই ভাষা যেন শিল্পীর কলমের গুণে ওই আঞ্চলিকতাকে ছাড়িয়ে যায়, এটাই কাম্য। ‘মহিষ কুড়ার উপকথা’ উপন্যাসে সেই ব্যাপারটিকেই সম্ভব করে তুলতে পেরেছেন লেখক। ‘কর্ণফুলি’ উপন্যাসে আজাদ তা করতে পারেননি। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে ভালো পরিচয় নেইÑ এমন পাঠক এই বই পড়ে শেষ করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

স্মরণ রাখা উচিত যে, যে মৌখিক ভাষাকে প্রমথ চৌধুরী সাহিত্যিক মর্যাদা দিয়েছেন তার উৎসভূমি কৃষ্ণনগর ছিল বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্র। নিতান্ত অল্প বয়সে কৃষ্ণনগরে বসবাসের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তাঁর। ফলে সেই স্থানের ভাষা এবং শিল্প-সংস্কৃতির অনেক কিছুই তিনি আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর মানস গঠনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করেছে। এক. কৃষ্ণনগরের স্থানীয় ভাষার সান্নিধ্যে আসা, খ. ভারতচন্দ্রের বুদ্ধিচিহ্নিত কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা, গ. ফরাসি গদ্য লেখকদের বৈচিত্র্যময় রচনা আস্বাদন। সাহিত্যে মৌলিক ভাষারীতির প্রবর্তক কে, এই বিতর্কে না জড়িয়েও একটা কথা নিশ্চিতভাবে বলা চলে, প্রমথ চৌধুরীই এ স্টাইলকে সাহিতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। প্রধানত ‘সবুজপত্র’ সাময়িকী সম্পাদনার ভেতর দিয়ে, সেই কাজটি তিনি এগিয়ে নিতে পেরেছিলেন। বস্তুত ওই কাগজটির অস্তিত্ব না থাকলে সাহিত্যের নতুন রীতিটি সর্বজনগ্রাহী হয়ে উঠতে পারতো কিনা, পারলেও কত বেশি সময় নিতো সেটা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। ভারতচন্দ্রের বৈশিষ্ট্যময় কাব্য এবং ফরাসি গদ্যের বুদ্ধিদীপ্ত প্রাঞ্জলতার প্রভাবে প্রমথ চৌধুরীর সৃজনপ্রতিভা বিকাশ লাভ করেছিল পূর্ণিমার চাঁদের মতো। তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম আধুনিক যুগ-চেতনার ও ভারের বিশিষ্ট এক রূপ তুলে ধরে। মৌখিক ভাষার সবচেয়ে বড় গুণ তার নিত্যব্যবহার্যতা। তার প্রয়োগ সাহিত্যে এনে দেবে গতি এবং ভিন্নরকম সৌকর্যÑ এ ব্যাপারটি তিনি অনুধাবন করেছিলেন বহু আগে। উত্তরকালের আধুনিক সাহিত্যিকদের ওপর তার প্রভাব-রহস্যের চাবিটি লুক্কায়িত আছে এখানেই।