নিবন্ধনহীন ও অদক্ষ চালক দিয়ে চলছে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি

সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির অদক্ষ চালকের বেপরোয়া গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। রাজধানীতে গত ৪ বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)’র গাড়ি চাপায় ৬ জন নিহত হয়েছে। গতকাল গুলিস্তান এলাকায় ময়লার গাড়ির চাপায় নিহত হয় নটরডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসান।

ওই গাড়ির চালক রাসেল ছিল একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী (ক্লিনার)। ২৬ বছর বয়সের ওই চালকের স্থায়ী কোন নিয়োগপত্র ছিল না। ডিএসসিসি’র ক্লিনার হিসেবে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে (মাস্টাররোলে) কাজ করতেন তিনি। তিন বছর আগে মাস্টাররোলে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। তখন থেকে তিনি ময়লার গাড়ি চালাতেন। পরবর্তীতে তার চাকরি চলে গেলেও তিনি সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালানো বন্ধ করেনি বলে ডিএসসিসি জানায়।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘ঘটনাটির জন্য আমরা খুবই মর্মাহত। যতদূর জানি ওই চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। গত তিন বছর ধরে সে গাড়িটি চালায়। তবে সে ক্লিনার কিনা সেটি ফাইল দেখে বলতে হবে।’

ডিএসসিসি’র সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫১৩টি গাড়ি আছে। এর মধ্যে অর্ধেক গাড়ির নিবন্ধন নেই। সংস্থাটির নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা মাত্র ১৫০ জন। তবে বেশিরভাগ গাড়ি চালানো হয় অদক্ষ চালক দিয়ে। যাদের বেশিরভাগ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া। চালক সংকটের কারণে অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়সের পরিচ্ছন্ন কর্মী দিয়ে এ সব ময়লার গাড়ি চালানো হয়। তাই বিভিন্ন সময় এই সব চালকের সড়কে বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

তবে এ পর্যন্ত কতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে এর কোন পরিসংখ্যান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। রাজধানীর রাস্তায় সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়িগুলো দানবের মতো চলাচল করছে। ময়লাবাহী গাড়িগুলোর স্টিয়ারিংয়ে থাকা চালকের কাছে মানুষকে মানুষই মনে হয় না। অন্য যানবাহনকেও যানবাহনই মনে করেন না তারা। যেন ট্যাংকার নিয়ে দাপিয়ে বেড়ান নগরীতে। চালকদের এরূপ বেপরোয়া ও উগ্র মনোভাবের ফলে সংস্থার গাড়িগুলো প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।

এ বিষয়ে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় পারভেজ নামের এক দোকানদার সংবাদকে বলেন, ‘সিটি করোপরেশনের গাড়ি আসলে বুঝা যায় দানবের গাড়ি যাচ্ছে। এমনভাবে গাড়ি চালায় যাতে সে রাস্তার রাজা। কোন গাড়িকে পরোয়া করে না।’ বুধবার বেপরোয়া গতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় নিহতের সংখ্যা কোন সংস্থার কাছে নেই। তবে কয়েক বছরে রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ি চাপা ও ধাক্কায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। রাজধানীতে প্রায়ই সংস্থার গাড়ি চাপায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় মোস্তফা (৪০) নামের এক রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত রিকশা আরোহী হরেন্দ্র দাস (৭০) আহত হয়েছেন।

ওইদিন ঘটনার পরপরই স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা ময়লাবাহী গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ১৭ জানুয়ারি গে-ারিয়ার দয়াগঞ্জ মোড়ে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) টেলিফোন বিভাগের স্টাফ খালিদ (৫০) নিহত হয়েছেন।

২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর মিরপুরে ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় আবদুল খালেক হাওলাদার (৬৭) নামে একজন ভ্রাম্যমাণ পান বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। ২০১৮ সালের ২৪ নভেম্বর বংশালে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নূরজাহান বেগম (২১) এক গৃহবধূ নিহত হন। এ ঘটনায় তার স্বামী মো. আসিফ উল্লাহ আহত হয়েছেন। ২০২১ সালের ২ মে রাজধানীর শাহজাহানপুর টিটিপাড়ায় ময়লার ট্রাক চাপায় স্বপন আহমেদ দিপু (৩৩) নামে এক ব্যাংক কর্মচারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ট্রাক চালাক নূরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে।

জানা গেছে, নিবন্ধিত চালক ছাড়া ডিএসসিসির বাকি গাড়িগুলো চলে অদক্ষ ও অনিবন্ধিত চালক দিয়ে। কখনও কখনও আবার ক্লিনারদেরও দেখা যায় চালকের ভূমিকায়। ফলে সংস্থার গাড়িগুলো দিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ডিএসসিসির ময়লার গাড়ি বেপরোয়া গতিতে চালানোর অভিযোগ বহু পুরনো। বারবার দুর্ঘটনা ঘটালেও প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়নি সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার সংবাদকে বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী সব যানবাহনের রেজিট্রেশন থাকতে হবে। সরকারি হোক বা বেসরকারি হোক। সিটি করপোরেশনের ময়লা গাড়ি যদি নিবন্ধন না থাকে অথবা চালকের লাইসেন্স না থাকে তাহলে অবশ্যই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হবে। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে আমরা ব্যবস্থা নিবো বলে জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

নিবন্ধনহীন ও অদক্ষ চালক দিয়ে চলছে সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি

বেপরোয়া গতি, চার বছরে ৬ জন চাপা পড়ে নিহত

সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির অদক্ষ চালকের বেপরোয়া গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। রাজধানীতে গত ৪ বছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি)’র গাড়ি চাপায় ৬ জন নিহত হয়েছে। গতকাল গুলিস্তান এলাকায় ময়লার গাড়ির চাপায় নিহত হয় নটরডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসান।

ওই গাড়ির চালক রাসেল ছিল একজন পরিচ্ছন্ন কর্মী (ক্লিনার)। ২৬ বছর বয়সের ওই চালকের স্থায়ী কোন নিয়োগপত্র ছিল না। ডিএসসিসি’র ক্লিনার হিসেবে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে (মাস্টাররোলে) কাজ করতেন তিনি। তিন বছর আগে মাস্টাররোলে পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে তিনি নিয়োগ পান। তখন থেকে তিনি ময়লার গাড়ি চালাতেন। পরবর্তীতে তার চাকরি চলে গেলেও তিনি সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি চালানো বন্ধ করেনি বলে ডিএসসিসি জানায়।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) বিপুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘ঘটনাটির জন্য আমরা খুবই মর্মাহত। যতদূর জানি ওই চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। গত তিন বছর ধরে সে গাড়িটি চালায়। তবে সে ক্লিনার কিনা সেটি ফাইল দেখে বলতে হবে।’

ডিএসসিসি’র সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫১৩টি গাড়ি আছে। এর মধ্যে অর্ধেক গাড়ির নিবন্ধন নেই। সংস্থাটির নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা মাত্র ১৫০ জন। তবে বেশিরভাগ গাড়ি চালানো হয় অদক্ষ চালক দিয়ে। যাদের বেশিরভাগ দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া। চালক সংকটের কারণে অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়সের পরিচ্ছন্ন কর্মী দিয়ে এ সব ময়লার গাড়ি চালানো হয়। তাই বিভিন্ন সময় এই সব চালকের সড়কে বেপরোয়া গতির কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

তবে এ পর্যন্ত কতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে এর কোন পরিসংখ্যান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। রাজধানীর রাস্তায় সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়িগুলো দানবের মতো চলাচল করছে। ময়লাবাহী গাড়িগুলোর স্টিয়ারিংয়ে থাকা চালকের কাছে মানুষকে মানুষই মনে হয় না। অন্য যানবাহনকেও যানবাহনই মনে করেন না তারা। যেন ট্যাংকার নিয়ে দাপিয়ে বেড়ান নগরীতে। চালকদের এরূপ বেপরোয়া ও উগ্র মনোভাবের ফলে সংস্থার গাড়িগুলো প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।

এ বিষয়ে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় পারভেজ নামের এক দোকানদার সংবাদকে বলেন, ‘সিটি করোপরেশনের গাড়ি আসলে বুঝা যায় দানবের গাড়ি যাচ্ছে। এমনভাবে গাড়ি চালায় যাতে সে রাস্তার রাজা। কোন গাড়িকে পরোয়া করে না।’ বুধবার বেপরোয়া গতির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় নিহতের সংখ্যা কোন সংস্থার কাছে নেই। তবে কয়েক বছরে রাজধানীতে সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ি চাপা ও ধাক্কায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। রাজধানীতে প্রায়ই সংস্থার গাড়ি চাপায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় মোস্তফা (৪০) নামের এক রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আহত রিকশা আরোহী হরেন্দ্র দাস (৭০) আহত হয়েছেন।

ওইদিন ঘটনার পরপরই স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা ময়লাবাহী গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে ১৭ জানুয়ারি গে-ারিয়ার দয়াগঞ্জ মোড়ে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) টেলিফোন বিভাগের স্টাফ খালিদ (৫০) নিহত হয়েছেন।

২০১৯ সালের ৭ ডিসেম্বর মিরপুরে ময়লাবাহী গাড়ির ধাক্কায় আবদুল খালেক হাওলাদার (৬৭) নামে একজন ভ্রাম্যমাণ পান বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। ২০১৮ সালের ২৪ নভেম্বর বংশালে ডিএসসিসি’র ময়লার গাড়ির ধাক্কায় নূরজাহান বেগম (২১) এক গৃহবধূ নিহত হন। এ ঘটনায় তার স্বামী মো. আসিফ উল্লাহ আহত হয়েছেন। ২০২১ সালের ২ মে রাজধানীর শাহজাহানপুর টিটিপাড়ায় ময়লার ট্রাক চাপায় স্বপন আহমেদ দিপু (৩৩) নামে এক ব্যাংক কর্মচারী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ট্রাক চালাক নূরুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে।

জানা গেছে, নিবন্ধিত চালক ছাড়া ডিএসসিসির বাকি গাড়িগুলো চলে অদক্ষ ও অনিবন্ধিত চালক দিয়ে। কখনও কখনও আবার ক্লিনারদেরও দেখা যায় চালকের ভূমিকায়। ফলে সংস্থার গাড়িগুলো দিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। ডিএসসিসির ময়লার গাড়ি বেপরোয়া গতিতে চালানোর অভিযোগ বহু পুরনো। বারবার দুর্ঘটনা ঘটালেও প্রতিকারে ব্যবস্থা নেয়নি সংস্থাটি।

এ বিষয়ে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার সংবাদকে বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী সব যানবাহনের রেজিট্রেশন থাকতে হবে। সরকারি হোক বা বেসরকারি হোক। সিটি করপোরেশনের ময়লা গাড়ি যদি নিবন্ধন না থাকে অথবা চালকের লাইসেন্স না থাকে তাহলে অবশ্যই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হবে। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে আমরা ব্যবস্থা নিবো বলে জানান তিনি।