মূল ঘাতকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, আতঙ্ক কাটেনি জনমনে

হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে কুমিল্লার আলোচিত কাউন্সিলর সোহেল ও তার সহযোগীর ঘাতকরা। এ ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী শাহআলমসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১০ জনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে নিহত সোহেলের ছোট ভাই সৈয়দ মো. রুমন বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন। পুলিশ ও র‌্যাব ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের গ্রেপ্তারে মাঠে তৎপর থাকলেও ঘাতকরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয় এলাকাবাসীর মাঝে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গতকালও নগরীর ওই ওয়ার্ডে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। এদিকে বুধবার সকালে মামলার এজাহারনামীয় আসামি সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১। এদিকে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে আজ বেলা ১১টার কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সামনে মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর নেতৃত্বে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে কাউন্সিলরসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর থেকে পুরো এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরেজমিনে বুধবার বিকেলে সুজানগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার দিন রাতে উত্তেজিত জনতা যেসব বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে সেসব স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান করছে। পার্শ্ববর্তী এলাকায় তালাবদ্ধ ছিল দোকানপাটও। এলাকাজুড়ে সুনসান নীরবতা। কিন্তু কাউন্সিলরের কার্যালয় এবং বাড়িতে ছিল লোকজনের ভিড়। এসব মানুষ বাড়িতে গিয়ে কাউন্সিলরের জন্য কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন এবং ঘাতকদের ফাঁসিসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেল ও তার সহযোগীকে হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার গভীর রাতে কোতোয়ালি মডেল থানায় শাহআলমকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০ জনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ায় পূর্বশত্রুতাবশত চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী নবগ্রাম এলাকার জানু মিয়ার ছেলে শাহআলমের (২৮) নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারনামীয় অপরাপর আসামিরা হচ্ছে- নবগ্রামের শাহআলমের ছেলে সোহেল ওরফে জেল সোহেল (২৮), সুজানগর এলাকার রফিক মিয়ার ছেলে মো. সাব্বির হোসেন (২৮), পূর্ব পাড়া বৌ-বাজারের মৃত কানু মিয়ার ছেলে সুমন (৩২), সংরাইশ এলাকার চোরা কাকন ওরফে কাকন মিয়ার ছেলে সাজন (৩২), তেলীকোনা এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে আশিকুর রহমান রকি (৩২), সুজানগর পূর্বপাড়ার মৃত জানু মিয়ার ছেলে আলম (৩৫), নূর আলীর ছেলে জিসান মিয়া (২৮), সংরাইশ এলাকার মঞ্জিল মিয়ার ছেলে মাসুম (৩৯), নবগ্রামের মৃত সামছুল হকের ছেলে সায়মন (৩০) ও সুজানগর বৌ-বাজার এলাকার কানাই মিয়ার ছেলে রনি (৩২)।

র‌্যাব-১১, সিপিসি-২ কুমিল্লা ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, মামলার ৪নং আসামি সুমন বুধবার সকালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যায়। এ সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত সুমন নগরীর সুজানগর পূর্বপাড়া বউবাজার এলাকার মৃত কানু মিয়ার ছেলে। এদিকে কাউন্সিলরের কার্যালয়ে গুলিতে আহত অন্যরা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আনওয়ারুল আজিম জানান, গ্রেপ্তারের পর আসামি সুমন বর্তমানে পুলিশের পাহারায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। মঙ্গলবার রাতে উদ্ধার হওয়া ৪৮টি বোমা ওইদিন গভীর রাতে গোমতী নদীর পাড়ে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা থেকে আসা বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। স্থানীয়দের ধারণা, ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পেশাদার কিলার ও সন্ত্রাসীরা সুজানগর, পাথুরিয়াপাড়া এলাকায় প্রবেশ করে। মামলার এজাহারে ২১ জনের কথা উল্লেখ করা হলেও এদের সংখ্যা আর বেশি হতে পারে। যার ফলে প্রকাশ্য দিবালোকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে জনবহুল একটি এলাকায় ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিঘেœ তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলের উত্তর পাশ দিয়ে ভারত সীমান্তবর্তী বিবির বাজার স্থল বন্দরের প্রশস্থ রাস্তা বয়ে গেছে। স্থানীয়রা অনেকে বলছেন, মিশন শেষ করে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘেœ ভারত অভিমুখে চলে যায়। ঘটনার ৩ দিন অতিবাহিত হলেও নেপথ্যের কারণসহ মূল ঘাতকরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বুধবার দুপুরে কাউন্সিলর সোহেল ও হরিপদ সাহার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সান্ত্বনা দেন এবং যে কোন মূল্যে ঘাতকদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। সিআইডি কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার খান মোহাম্মদ রেজওয়ান জানান, তিনি সকালের দিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতদের পরিবারসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানসহ হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

বৃহস্পতিবার, ২৫ নভেম্বর ২০২১ , ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

কুমিল্লা হত্যাকাণ্ডের তিনদিন পরও

মূল ঘাতকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, আতঙ্ক কাটেনি জনমনে

হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে কুমিল্লার আলোচিত কাউন্সিলর সোহেল ও তার সহযোগীর ঘাতকরা। এ ঘটনায় মাদক ব্যবসায়ী শাহআলমসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা ১০ জনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে নিহত সোহেলের ছোট ভাই সৈয়দ মো. রুমন বাদী হয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন। পুলিশ ও র‌্যাব ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের গ্রেপ্তারে মাঠে তৎপর থাকলেও ঘাতকরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে স্থানীয় এলাকাবাসীর মাঝে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গতকালও নগরীর ওই ওয়ার্ডে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। এদিকে বুধবার সকালে মামলার এজাহারনামীয় আসামি সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-১১। এদিকে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে আজ বেলা ১১টার কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সামনে মেয়র মনিরুল হক সাক্কুর নেতৃত্বে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

জানা যায়, গত সোমবার বিকেলে কাউন্সিলরসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর থেকে পুরো এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সরেজমিনে বুধবার বিকেলে সুজানগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘটনার দিন রাতে উত্তেজিত জনতা যেসব বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে সেসব স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান করছে। পার্শ্ববর্তী এলাকায় তালাবদ্ধ ছিল দোকানপাটও। এলাকাজুড়ে সুনসান নীরবতা। কিন্তু কাউন্সিলরের কার্যালয় এবং বাড়িতে ছিল লোকজনের ভিড়। এসব মানুষ বাড়িতে গিয়ে কাউন্সিলরের জন্য কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন এবং ঘাতকদের ফাঁসিসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।

কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেল ও তার সহযোগীকে হত্যার ঘটনায় মঙ্গলবার গভীর রাতে কোতোয়ালি মডেল থানায় শাহআলমকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০ জনসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ায় পূর্বশত্রুতাবশত চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী নবগ্রাম এলাকার জানু মিয়ার ছেলে শাহআলমের (২৮) নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে কাউন্সিলর সৈয়দ মো. সোহেল ও তার সহযোগী হরিপদ সাহাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় এজাহারনামীয় অপরাপর আসামিরা হচ্ছে- নবগ্রামের শাহআলমের ছেলে সোহেল ওরফে জেল সোহেল (২৮), সুজানগর এলাকার রফিক মিয়ার ছেলে মো. সাব্বির হোসেন (২৮), পূর্ব পাড়া বৌ-বাজারের মৃত কানু মিয়ার ছেলে সুমন (৩২), সংরাইশ এলাকার চোরা কাকন ওরফে কাকন মিয়ার ছেলে সাজন (৩২), তেলীকোনা এলাকার আনোয়ার হোসেনের ছেলে আশিকুর রহমান রকি (৩২), সুজানগর পূর্বপাড়ার মৃত জানু মিয়ার ছেলে আলম (৩৫), নূর আলীর ছেলে জিসান মিয়া (২৮), সংরাইশ এলাকার মঞ্জিল মিয়ার ছেলে মাসুম (৩৯), নবগ্রামের মৃত সামছুল হকের ছেলে সায়মন (৩০) ও সুজানগর বৌ-বাজার এলাকার কানাই মিয়ার ছেলে রনি (৩২)।

র‌্যাব-১১, সিপিসি-২ কুমিল্লা ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, মামলার ৪নং আসামি সুমন বুধবার সকালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যায়। এ সময় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত সুমন নগরীর সুজানগর পূর্বপাড়া বউবাজার এলাকার মৃত কানু মিয়ার ছেলে। এদিকে কাউন্সিলরের কার্যালয়ে গুলিতে আহত অন্যরা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আনওয়ারুল আজিম জানান, গ্রেপ্তারের পর আসামি সুমন বর্তমানে পুলিশের পাহারায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। মঙ্গলবার রাতে উদ্ধার হওয়া ৪৮টি বোমা ওইদিন গভীর রাতে গোমতী নদীর পাড়ে নিয়ে নিষ্ক্রিয় করে ঢাকা থেকে আসা বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। স্থানীয়দের ধারণা, ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পেশাদার কিলার ও সন্ত্রাসীরা সুজানগর, পাথুরিয়াপাড়া এলাকায় প্রবেশ করে। মামলার এজাহারে ২১ জনের কথা উল্লেখ করা হলেও এদের সংখ্যা আর বেশি হতে পারে। যার ফলে প্রকাশ্য দিবালোকে সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে জনবহুল একটি এলাকায় ভয়াবহ এ ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিঘেœ তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘটনাস্থলের উত্তর পাশ দিয়ে ভারত সীমান্তবর্তী বিবির বাজার স্থল বন্দরের প্রশস্থ রাস্তা বয়ে গেছে। স্থানীয়রা অনেকে বলছেন, মিশন শেষ করে সন্ত্রাসীরা নির্বিঘেœ ভারত অভিমুখে চলে যায়। ঘটনার ৩ দিন অতিবাহিত হলেও নেপথ্যের কারণসহ মূল ঘাতকরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।

কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ বুধবার দুপুরে কাউন্সিলর সোহেল ও হরিপদ সাহার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সান্ত্বনা দেন এবং যে কোন মূল্যে ঘাতকদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন। সিআইডি কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার খান মোহাম্মদ রেজওয়ান জানান, তিনি সকালের দিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতদের পরিবারসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানসহ হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।