গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার পাঁচ বছরে মাত্র ৯ ভাগ গ্রাহক পেয়েছেন

‘যতটুকু ব্যবহার ততটুকু বিল অনেকটাই অকার্যকর

গ্যাসের অপচয় রোধ করতে আবাসিক খাতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি কম। ২০১৬ সালে এ লক্ষ্যে ‘পাইলট প্রকল্প’ হাতে নেয়া হলেও প্রায় ৯১ ভাগ গ্রাহক এখনো প্রি-পেইড মিটার পাননি।

তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, বাসা-বাড়িতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত তিন লাখ ৫৮ হাজার ৪৩২ জন গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনা হয়েছে। অবশিষ্ট গ্রাহকদের ২০২৪ সালের মধ্যে প্রি-পেইড মিটার দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যথা সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কি-না, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

‘যতটুকু ব্যবহার ততটুকু বিল’- এই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত মিটারবিহীন অন্তত ৩৬ লাখ গ্রাহক। তারা মাসে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বিল তাদের দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রতিমাসে একজন গ্রাহক গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি বিল দিচ্ছেন অর্থাৎ মাসে মোট গ্রাহকদেয় ১০৮ কোটি টাকা, বছরে এক হাজার ২৯৬ কোটি টাকা বেশি বিল আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত এই টাকা জমা হচ্ছে গ্যাস বিতরণে নিয়োজিত ৬টি কোম্পানির কোষাগারে।

এদিকে গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার স্থাপন অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটির সভাপতি ওয়াসিকা আয়শা খান সংবাদকে বলেন, গ্যাসের অপচয় রোধ করতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা খুবই জরুরি। দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। তারা নিজস্ব অর্থায়নে এই কাজ করতে পারে। কমিটির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে দ্রুত এ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এক সময় বলা হতো আবাসিক খাতে মিটার না থাকায় অনেক বেশি গ্যাস পুড়ছে, তাই দাম বাড়ানো উচিত। ওই বিতর্কের মধ্যেই ২০১৬ সালে লালমাটিয়া এলাকায় প্রথম পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হয়। তখন গ্রাহকভেদে দেখা যায়, প্রি-পেইড মিটারে বিল আসছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। সে সময় মিটারবিহীন গ্রাহকের ডাবল বার্নারে (দ্বিমুখী চুলা) মাসিক বিল ছিল ৬৫০ টাকা। পরে বোঝা গেল, রান্নায় গ্যাস খরচ খুব একটা হয় না। তাই বিল কম হয়। অর্থাৎ মিটারবিহীন পাইপলাইনে গ্যাসের বেশি বিল নেয় কোম্পানিগুলো। এরপর থেকে প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প থেমে যায়।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের আদেশ জারি করে। এরপর বিতরণ কোম্পানিগুলো কাগজে-কলমে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ শুরু করে। মন্ত্রণালয়কে তারা জানায়, অর্থায়নের অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

পেট্রোবাংলার অধীনে ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৮০৯টি। এ পর্যন্ত প্রিপ্রেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে তিন লাখ ৫৮ হাজার ৪৩২টি। অবশিষ্ট ৩৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৭ জন গ্রাহক এখনো পাইপলাইন থেকে সরাসরি গ্যাস ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ৯১ শতাংশের বেশি গ্রাহক এখনো প্রি-পেইড মিটার পাননি।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আবাসিক খাতে পাইপলাইনে গ্যাস ব্যবহারকারীরা গড়ে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করেন, তার বাণিজ্যিক মূল্য প্রদেয় বিলের চেয়ে কম। মাসিক বিল নিয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে, ঠকছেন গ্রাহক। গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, সারা দেশে এখনো অসংখ্য অবৈধ সংযোগ চলছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস চুরি যাচ্ছে, তা সমন্বয় করতে ‘দ্রুত মিটার না দেয়ার’ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে কোম্পানিগুলো।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো পাইপ লাইনের গ্রাহকদের কাছ থেকে কড়ায়-গ-ায় হিসাবে করেই মাসিক বিল ধার্য করে। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গেল বার্নার (একমুখী চুলা) থেকে প্রতিঘণ্টায় সর্বোচ্চ যে পরিমাণ গ্যাস বের হওয়া সম্ভব, তার পুরোটা ধরা হয়। এভাবে একমুখী চুলায় দৈনিক ১০ ঘণ্টা এবং দ্বিমুখী চুলায় দৈনিক আট ঘণ্টা জ্বলার হিসাবে ২৬ দিন দিয়ে গুন করা হয়। এর সঙ্গে ‘ডাইভারসিটি ফ্যাক্টর’ গুন করে সঞ্চালন ও বিতরণ মাশুল এবং মূল্য সংযোজন কর, ভ্যাটসহ মোট গ্যাস বিল নির্ধারণ করা হয়। এখন মিটারযুক্ত কোন গ্রাহক যদি দৈনিক ১০ ঘণ্টার স্থানে পাঁচ ঘণ্টা চুলা জ্বালায় তার গ্যাস খরচ স্বাভাবিকভাবেই অর্ধেক কমে যায়। বর্তমানে আবাসিক খাতে একমুখী চুলায় প্রতিমাসে বিল ৯২৫ টাকা এবং দ্বিমুখী চুলায় ৯৭৫ টাকা। প্রি-পেইড মিটারের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে পাইপ লাইনের দ্বিমুখী চুলার একজন গ্রাহক মাসে ৭৭ দশমিক ৩৮ ঘনমিটার গ্যাসের বিল দিচ্ছেন।

সম্প্রতি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিন-চারজন সদস্যের ছোট একটি পরিবারে প্রি-পেইড মিটার মাসে ৩৫ থেকে ৪০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার হয়, খরচ হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ওই পরিবারটি যখন বাসা বদলের কারণে পাইপ লাইনের গ্যাস ব্যবহার করেন তখন তার মাসে ৯৭৫ টাকাই বিল দিতে হয়। একই ঘটনা পাইপ লাইন এলাকা থেকে বাসা বদল করে প্রি-পেইড জোনে যাওয়া পরিবারের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের খরচ মাসে প্রায় ৩০০ টাকা কমে গেছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) সূত্রে জানায়, জাইকার অর্থায়নে তিন লাখ ২০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া আর্থিক সহযোগিতার লক্ষে তিনটি প্রকল্প দাতা সংস্থার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্রকল্পে অধীনে ডিসেম্বর, ২০২৪ সালের মধ্যে চার লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হবে। প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৩০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। একই সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় প্রকল্পের অধীনে এক হাজার ৮৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হবে। তৃতীয় প্রকল্পটিও বাস্তবায়ন হবে ২০২৪ সালের মধ্যে। স্থাপন করা হবে সাত লাখ প্রি-পেইড মিটার। ব্যয় হবে এক হাজার ৪৭৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে আরও এক লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের লক্ষ্যে প্রাক্কলন ও এলাকা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জিওবি, জাইকা ও নিজস্ব অর্থায়নে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করেছে। অবশিষ্ট গ্রাহকদের দ্রুত প্রি-পেইড মিটার দিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতা সংস্থার অর্থায়ন পেতে চীনের নেতৃত্বাধীন এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে।

জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (জেজিটিডিসিএল) ৫০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপনে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রাকশন) ঠিকাদার নিয়োগের জন্য গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেছে। অর্থায়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে দুই লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পের পিডিপিপি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠিয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) এক লাখ ২৮ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পে প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) গ্রাহক কম হওয়ায় তাদের সার্ভার ও সফটওয়ার স্থাপন করে প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় অন্যান্য কোম্পানির চেয়ে বেশি হবে। কোম্পানিটি সব গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) বাংলাদেশে গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। শীঘ্রই চুক্তি হবে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহক ২৮ লাখ, ৫৬ হাজার, ২৪৭ জন। এ ছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহক পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) দুই লাখ ৩৮ হাজার ৫৯১, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডর (জেজিটিডিসিএল) গ্রাহক দুই লাখ ১৯ হাজার ৭৭০, পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) গ্রাহক এক লাখ ২৮ হাজার ৮৪৪ এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) আবাসিক গ্রাহক দুই হাজার ৩৭২ জন।

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ , ১৯ পৌষ ১৪২৮ ২৪ জমাদিউল আউয়াল

গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার পাঁচ বছরে মাত্র ৯ ভাগ গ্রাহক পেয়েছেন

‘যতটুকু ব্যবহার ততটুকু বিল অনেকটাই অকার্যকর

ফয়েজ আহমেদ তুষার

গ্যাসের অপচয় রোধ করতে আবাসিক খাতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হলেও তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি কম। ২০১৬ সালে এ লক্ষ্যে ‘পাইলট প্রকল্প’ হাতে নেয়া হলেও প্রায় ৯১ ভাগ গ্রাহক এখনো প্রি-পেইড মিটার পাননি।

তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, বাসা-বাড়িতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত তিন লাখ ৫৮ হাজার ৪৩২ জন গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনা হয়েছে। অবশিষ্ট গ্রাহকদের ২০২৪ সালের মধ্যে প্রি-পেইড মিটার দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে যথা সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কি-না, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

‘যতটুকু ব্যবহার ততটুকু বিল’- এই ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত মিটারবিহীন অন্তত ৩৬ লাখ গ্রাহক। তারা মাসে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বিল তাদের দিতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, প্রতিমাসে একজন গ্রাহক গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা বেশি বিল দিচ্ছেন অর্থাৎ মাসে মোট গ্রাহকদেয় ১০৮ কোটি টাকা, বছরে এক হাজার ২৯৬ কোটি টাকা বেশি বিল আদায় করা হচ্ছে। অতিরিক্ত এই টাকা জমা হচ্ছে গ্যাস বিতরণে নিয়োজিত ৬টি কোম্পানির কোষাগারে।

এদিকে গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার স্থাপন অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। কমিটির সভাপতি ওয়াসিকা আয়শা খান সংবাদকে বলেন, গ্যাসের অপচয় রোধ করতে প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা খুবই জরুরি। দেশের গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে। তারা নিজস্ব অর্থায়নে এই কাজ করতে পারে। কমিটির পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে দ্রুত এ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এক সময় বলা হতো আবাসিক খাতে মিটার না থাকায় অনেক বেশি গ্যাস পুড়ছে, তাই দাম বাড়ানো উচিত। ওই বিতর্কের মধ্যেই ২০১৬ সালে লালমাটিয়া এলাকায় প্রথম পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হয়। তখন গ্রাহকভেদে দেখা যায়, প্রি-পেইড মিটারে বিল আসছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। সে সময় মিটারবিহীন গ্রাহকের ডাবল বার্নারে (দ্বিমুখী চুলা) মাসিক বিল ছিল ৬৫০ টাকা। পরে বোঝা গেল, রান্নায় গ্যাস খরচ খুব একটা হয় না। তাই বিল কম হয়। অর্থাৎ মিটারবিহীন পাইপলাইনে গ্যাসের বেশি বিল নেয় কোম্পানিগুলো। এরপর থেকে প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প থেমে যায়।

২০১৮ সালে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের আদেশ জারি করে। এরপর বিতরণ কোম্পানিগুলো কাগজে-কলমে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কাজ শুরু করে। মন্ত্রণালয়কে তারা জানায়, অর্থায়নের অভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

পেট্রোবাংলার অধীনে ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ ৪৩ হাজার ৮০৯টি। এ পর্যন্ত প্রিপ্রেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে তিন লাখ ৫৮ হাজার ৪৩২টি। অবশিষ্ট ৩৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭৭ জন গ্রাহক এখনো পাইপলাইন থেকে সরাসরি গ্যাস ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ৯১ শতাংশের বেশি গ্রাহক এখনো প্রি-পেইড মিটার পাননি।

জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, আবাসিক খাতে পাইপলাইনে গ্যাস ব্যবহারকারীরা গড়ে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করেন, তার বাণিজ্যিক মূল্য প্রদেয় বিলের চেয়ে কম। মাসিক বিল নিয়ে বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে, ঠকছেন গ্রাহক। গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, সারা দেশে এখনো অসংখ্য অবৈধ সংযোগ চলছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস চুরি যাচ্ছে, তা সমন্বয় করতে ‘দ্রুত মিটার না দেয়ার’ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে কোম্পানিগুলো।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো পাইপ লাইনের গ্রাহকদের কাছ থেকে কড়ায়-গ-ায় হিসাবে করেই মাসিক বিল ধার্য করে। এ ক্ষেত্রে সিঙ্গেল বার্নার (একমুখী চুলা) থেকে প্রতিঘণ্টায় সর্বোচ্চ যে পরিমাণ গ্যাস বের হওয়া সম্ভব, তার পুরোটা ধরা হয়। এভাবে একমুখী চুলায় দৈনিক ১০ ঘণ্টা এবং দ্বিমুখী চুলায় দৈনিক আট ঘণ্টা জ্বলার হিসাবে ২৬ দিন দিয়ে গুন করা হয়। এর সঙ্গে ‘ডাইভারসিটি ফ্যাক্টর’ গুন করে সঞ্চালন ও বিতরণ মাশুল এবং মূল্য সংযোজন কর, ভ্যাটসহ মোট গ্যাস বিল নির্ধারণ করা হয়। এখন মিটারযুক্ত কোন গ্রাহক যদি দৈনিক ১০ ঘণ্টার স্থানে পাঁচ ঘণ্টা চুলা জ্বালায় তার গ্যাস খরচ স্বাভাবিকভাবেই অর্ধেক কমে যায়। বর্তমানে আবাসিক খাতে একমুখী চুলায় প্রতিমাসে বিল ৯২৫ টাকা এবং দ্বিমুখী চুলায় ৯৭৫ টাকা। প্রি-পেইড মিটারের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে পাইপ লাইনের দ্বিমুখী চুলার একজন গ্রাহক মাসে ৭৭ দশমিক ৩৮ ঘনমিটার গ্যাসের বিল দিচ্ছেন।

সম্প্রতি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিন-চারজন সদস্যের ছোট একটি পরিবারে প্রি-পেইড মিটার মাসে ৩৫ থেকে ৪০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার হয়, খরচ হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ওই পরিবারটি যখন বাসা বদলের কারণে পাইপ লাইনের গ্যাস ব্যবহার করেন তখন তার মাসে ৯৭৫ টাকাই বিল দিতে হয়। একই ঘটনা পাইপ লাইন এলাকা থেকে বাসা বদল করে প্রি-পেইড জোনে যাওয়া পরিবারের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের খরচ মাসে প্রায় ৩০০ টাকা কমে গেছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (টিজিটিডিসিএল) সূত্রে জানায়, জাইকার অর্থায়নে তিন লাখ ২০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ ছাড়া আর্থিক সহযোগিতার লক্ষে তিনটি প্রকল্প দাতা সংস্থার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্রকল্পে অধীনে ডিসেম্বর, ২০২৪ সালের মধ্যে চার লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হবে। প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৩০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। একই সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় প্রকল্পের অধীনে এক হাজার ৮৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হবে। তৃতীয় প্রকল্পটিও বাস্তবায়ন হবে ২০২৪ সালের মধ্যে। স্থাপন করা হবে সাত লাখ প্রি-পেইড মিটার। ব্যয় হবে এক হাজার ৪৭৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। কোম্পানির নিজস্ব অর্থায়নে আরও এক লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের লক্ষ্যে প্রাক্কলন ও এলাকা নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) জিওবি, জাইকা ও নিজস্ব অর্থায়নে ইতোমধ্যে ৬০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করেছে। অবশিষ্ট গ্রাহকদের দ্রুত প্রি-পেইড মিটার দিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে দাতা সংস্থার অর্থায়ন পেতে চীনের নেতৃত্বাধীন এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) সঙ্গে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে।

জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (জেজিটিডিসিএল) ৫০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপনে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রাকশন) ঠিকাদার নিয়োগের জন্য গত অক্টোবরে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করেছে। অর্থায়ন প্রাপ্তির লক্ষ্যে দুই লাখ প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পের পিডিপিপি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠিয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) এক লাখ ২৮ হাজার প্রি-পেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পে প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) গ্রাহক কম হওয়ায় তাদের সার্ভার ও সফটওয়ার স্থাপন করে প্রি-পেইড মিটার প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় অন্যান্য কোম্পানির চেয়ে বেশি হবে। কোম্পানিটি সব গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) বাংলাদেশে গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার প্রকল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। শীঘ্রই চুক্তি হবে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহক ২৮ লাখ, ৫৬ হাজার, ২৪৭ জন। এ ছাড়া কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আবাসিক গ্রাহক পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) দুই লাখ ৩৮ হাজার ৫৯১, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডর (জেজিটিডিসিএল) গ্রাহক দুই লাখ ১৯ হাজার ৭৭০, পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) গ্রাহক এক লাখ ২৮ হাজার ৮৪৪ এবং সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (এসজিসিএল) আবাসিক গ্রাহক দুই হাজার ৩৭২ জন।