খুনিকে আশ্রয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, গণতন্ত্রের ছবক দেয় : প্রধানমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মামলায় দণ্ডপ্রান্ত খুনিদের আশ্রয়দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমাদের আইনের শাসনের ছবক শুনতে হয়, মানবাধিকারে কথা শুনতে হয়, গণতন্ত্রের কথা শুনতে হয়, ন্যায়বিচারের কথা শুনতে হয়, সেটিই খুব অবাক লাগে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমেরিকা, যারা সবসময় ন্যায় বিচারের কথা বলে। গণতন্ত্রের কথা বলে, ভোটাধিকারের কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে। আমি সরকারে আসার পর থেকে বারবার যতজন রাষ্ট্রপতি এসেছে তাদের প্রত্যেকের কাছে বারবার অনুরোধ করেছি, একটা সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আপনারা কীভাবে আশ্রয় দেন? আপনাদের জুডিশিয়ারি কীভাবে আশ্রয় দেয়? কীভাবে আপনারা একজন খুনিকে আশ্রয় দেন? অথচ খুনি রাশেদ এখন আমেরিকায়। আর নূরকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে কানাডা। তারপরও তাদের কাছ থেকে আমাদের আইনের শাসনের ছবকও শুনতে হয়, গণতন্ত্রের কথাও শুনতে হয়, ন্যায়বিচারের কথাও শুনতে হয়! সেটিই আমার কাছে খুব অবাক লাগে।’

গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বিচার বিভাগ’ শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ এবং ‘ন্যায় কণ্ঠ’ শীর্ষক মুজিববর্ষ স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে যুক্ত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের শাসন কায়েম হবে, আইনে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে কি হয়েছিল? বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে। ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর ইমডেমনিটি অর্ডিন্যান্স পাস হলো। সেই অর্ডিন্যান্সে দেয়া হলো, ওই খুনিদের কোনদিন বিচার করা যাবে না। ওই হত্যার মামলা করা যাবে না।’

১৫ আগস্টের ঘটনা কারবালার ঘটনাকেও হার মানিয়েছিল উল্লেখ করে এক রাতে নিজের পরিবারের সবাইকে হারিয়ে দুই বোনের বেঁচে থাকার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও প্রথমে ক্ষমতায় এসেছিল আমার বাবার মন্ত্রিসভার মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক। সেটি সংবিধান লঙ্ঘন করেই তার ক্ষমতা আরোহণ। কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার জিয়াউর রহমান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতে কোন সন্দেহ নেই এবং তারই প্ররোচনায় এই ঘটনা। আর এর সঙ্গে যে ষড়যন্ত্রকারী ছিল সেটা এখনো বের করা হয়নি। একদিন সেটিও বের হবে।’

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘আসলে বেঈমান বা মোনাফেক যারা হয় তাদের মানুষ ব্যবহার করে, কিন্তু কখনো রাখে না। আসল যে থাকে সে তাকে পর্দার আড়ালে। সেই পলাশীর ঘটনাও যদি দেখি, তখনও মীরজাফর ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে মিশে ষড়যন্ত্র করে নবাব হওয়ার আশায়। সে কিন্তু তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আপনারাও একটু দেখবেন, খন্দকার মোশতাকও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। পর্দার আড়াল থেকে আসল লোক ক্ষমতা দখল করে চলে আসে, সেটি হলো জেনারেল জিয়াউর রহমান।’

সেনাপ্রধান হিসেবে জিয়ার ক্ষমতা দখল করে দল গঠন করাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্মি রুলস অ্যান্ড অ্যাক্টেও ছিল যে সেনাপ্রধান কখনো নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে ঘোষণাই শুধু দেয়নি, এরপর গণভোট দিল, হ্যাঁ-না ভোট দিল। সেটার নামে একটা প্রহসন। তারপর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও করল এবং সেই নির্বাচন করেছিল সে তখন ঘোষিত রাষ্ট্রপতি প্ল্যাস সেনাবাহিনী প্রধান। আমার প্রশ্ন গণতন্ত্রটা তাহলে কোথায়?’

‘আমাদের অনেকেই তার পিছনে খুব বাহবা দিয়ে নেমে পড়ল, হাতে তালি দিয়ে গণতন্ত্র পেয়েছে? সেনাপ্রধান এবং ঘোষিত রাষ্ট্রপতি; আর্মি রুলস যেমন ব্রেক করল, সংবিধান লঙ্ঘন করল তারপর ইলেকশন মানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রহসন দিয়ে ক্ষমতায় এসে এরপরে তার পর দল গঠন।’

‘তখন আর রাজনীতিবিদ হতে আর কোন লজ্জা থাকল না। উর্দি খুলে তখন সেই দল গঠন। আর ক্ষমতায় উত্তরণ করে তারপরে তার রাজনীতিতে আসা, তারপর দল গঠন করলে আর দল গঠন করলে খুব স্বাভাবিকভাকে দল গঠন করতে গিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, নির্বাচিত প্রতিনিধি যে যেখানে ছিল একেবারে সেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে সবাইকে চাপ দিয়ে দিয়ে তার দলে ভেড়ানো। আর যে দল না ভিড়বে তাকে ভোগ করতে হবে অত্যাচার নির্যাতন মিথ্যা মামলা, নির্যাতন করে করে অনেককে দলে ভেড়ানো হলো, কাউকে প্রলোভন দিয়ে, কেউ লোভে আসল, কেউ অত্যাচারিত হয়ে আসল, কেউ নির্যাতিত হয়ে আসল; এইভাবে দল গঠন। সেই দলটাই হচ্ছে বিএনপি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। এর আগে আরও কয়েকটা করে তারপরও ওঠাকে দাঁড় করাতে পারল।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘সেখানে আবার শোনা গেল বহুদলীয় গণতন্ত্র? আর সেখানে নির্বাচনের সামনে প্রহসন। একটি দল জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলতে শিখল না, হাঁটতে শিখল না, এ-গাছের ছাল ও-গাছের বাকল দিয়ে একটা দল করে সেই দল আবার নির্বাচনে একেবারে টু থার্ড মেজরিটি (দুই তৃতীয়াংশ) পেয়ে যায়! অর্থাৎ অবৈধভাবে দখল করা ক্ষমতাকে ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে সেই ক্ষমতাকে কণ্টকমুক্ত করার জন্য একটা প্রচেষ্টা।’

‘আর ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স দিয়ে খুনিদের বিচার না করা, বিচারহীনতার যে কালচার। আমরা কোন একটা ঘটনা ঘটলে যেমন বিচারের জন্য যখন সকলে দাবি করে আমার তখন এটাই মনে হয় আমরা যারা আপনজন হারিয়েছিলাম আমরা তো ৩৬ বছর সময় লেগেছিল বিচার পেতে। সেটাও যখন আমরা বেঁচে ছিলাম, জানি না আল্লাহর ইচ্ছা! ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলাম বলেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিলের জন্য আমরা আপিল করি। আমরা রিট করি, মামলা করা হয়, সে জন্য ধন্যবাদ জানাই উচ্চ আদালতকে। উচ্চ আদালত সেই জিনিসটা আমলনামায় নেন এবং সেটার ওপর এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সটা বাতিল করেন। সে জন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ, যারা এই অর্ডিন্যান্স বাতিল করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাহলে মামলা করার জন্য আমরা যারা আপনজন হারিয়েছি, আমাদের ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার বিচার চাওয়ার অধিকার হরণ করা হয়েছিল। আমার মতো যারা সবাইকে হারিয়েছিলাম। তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকারটা ছিল কোথায়? মৌলিক অধিকার কোথায় ছিল? মানুষের অধিকার কোথায় ছিল? আমি যদি বেঁচে না থাকতাম বা আর কোনদিন ক্ষমতায় আসতে না পারতাম তাহলে কোনদিন আর এই বিচার হতো না। এটাই হলো বাস্তবতা। কোনদিনেই বিচার হতো না। সেই ইনডেমনিটি অর্থাৎ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে যেত। কিন্তু আমাদের সংবিধানে তো ন্যায়বিচার পাওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু সেই বিচার হয়নি, এটিই হলো বাস্তবতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারে আসার পর বিচার হয়েছে। যদিও এই বিচারের রায় দিতে যেয়ে বা বিচার করতে যেয়ে অনেকেই উচ্চ আদালতে সেই সাহসটা পাননি, আমি জানি! একটা পর্যায়ে সরে গেছেন, কেন সেটা! তারপরও আমি বলব, এই বিচারের রায় আমরা পেয়েছি এই বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। এখনো কয়েকজন রিফিউজিটিভে আছে তারা পালিয়ে আছে। তাদেরকেও খোঁজা হচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা আমেরিকার মতো জায়গা, যারা সবসময় ন্যায়বিচারের কথা বলে, গণতন্ত্রের কথা বলে, ভোটাধিকারের কথা বলে, তারা মানবাধিকারের কথা বলে, কিন্তু আমাদের যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল আমরা যে ন্যায়বিচার পাইনি, তারপর যখন এই বিচার হলো সেই খুনিদের আশ্রয় দিয়ে বসে আছে। আমি সরকারে আসার পর থেকে বারবার যতজন রাষ্ট্রপতি এসেছে প্রত্যেকের কাছে বারবার অনুরোধ করেছি, একটা সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আপনারা কিভাবে আশ্রয় দেন? আপনাদের জুডিশিয়ারি কিভাবে আশ্রয় দেয়? কিভাবে আপনারা একজন খুনিকে আশ্রয় দেন?’

‘যে খুনিটা ১৫ আগস্ট যখন আমার সেজো ফুফুর বাড়ি আক্রমণ করে সেইখানে যে গ্রুপটা যায়, তার কমান্ডিং অফিসার ছিল ওই রাশেদ। সেই খুনি এখন পর্যন্ত আমেরিকায়। তাকে আজকে পর্যন্ত কেউই ফেরত দিল না। আমেরিকা গণতন্ত্রের জন্য কথা বলে আর খুনিদের আশ্রয় দেয়, প্রশ্রয় দেয় কেন? আমি জানি না! তারা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ। আমি এতবার প্রত্যেক রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছি। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, আমরা বারবার চেষ্টা করেছি।’

কানাডায় মেজর নূর, সে ছিল ৩২ নম্বরে হত্যাকাণ্ডের জন্য কমান্ডিং অফিসার হিসেবে। আর ফারুক ছিল ট্যাংকের দায়িত্বে। আর নূর ঢুকেছিল সেই ছিল কমান্ডিং অফিসার। অথচ নূরকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে কানাডা। আর খুনি রাশেদ এখনো আমেরিকায়। তাদের কাছ থেকে আমাদের আইনের শাসনের ছবকও শুনতে হয়, গণতন্ত্রের কথাও শুনতে হয়, ন্যায়বিচারের কথাও শুনতে হয়! সেটিই আমার কাছে খুব অবাক লাগে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সব সময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে। আমাদের দেশটাও যেন বিশ্বে একটা মর্যাদা নিয়ে চলবে, সেই সরঙ্গ একটি দেশের সব অঙ্গও যেন সেভাবে মর্যাদা নিয়ে চলতে পারে, আমরা সেটাই করতে চাই। সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

বিচারকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারকদের থাকার ব্যবস্থা, তাদের চলার ব্যবস্থা, সব ধরনের ব্যবস্থা, সুযোগ সুবিধা আমরা সাধ্যমত করে দিয়েছি।

বিচারকদের দক্ষতা বাড়াতে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আইন কমিশন আমরা গঠন করি। বিচারকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আমি প্রতিষ্ঠা করে দেই। এখনতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্রেনিং নেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। অন্য দেশে কীভাবে হয় সেটা আমাদের দেশের মানুষের জানা উচিত, সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি।

সরকার প্রধান বলেন, গ্রামের যেসব হতদরিদ্র মানুষ বিচার পায় না, তাদের জন্য লিগাল এইড কমিটি গঠন ও এ জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। গরিব সাধারণ মানুষ যেন বিচার পায় সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। এটা আমরা ২০০০ সালে প্রণয়ন করেছি।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আগে মাত্র হাতে গোনা ৭ জনের বেশি বিচারক বসতে পারতেন না, এনেক্স ভবন করে দিয়েছি। ৪০টা চেম্বারের ব্যবস্থা করে দিলাম। পাশাপাশি প্রত্যেকটা জেলা কোর্ট নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।

উচ্চ আদালতে নারী বিচারক নিয়োগে নিজের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে যে আইন ছিল সেখানে বিচার প্রক্রিয়ায় নারীরা অংশ নিতে পারবে না। জাতির পিতা সেই আইন পরিবর্তন করে সুযোগ দিলেন। কিন্তু আমি এসে দেখলাম আমাদের উচ্চ আদালতে কোন নারী নেই। আমি অনুরোধ করলাম প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রপতিকে যে, সেখানে নারীদের সুযোগ দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ , ১৯ পৌষ ১৪২৮ ২৪ জমাদিউল আউয়াল

খুনিকে আশ্রয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, গণতন্ত্রের ছবক দেয় : প্রধানমন্ত্রী

সংবাদ ডেস্ক

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মামলায় দণ্ডপ্রান্ত খুনিদের আশ্রয়দাতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আমাদের আইনের শাসনের ছবক শুনতে হয়, মানবাধিকারে কথা শুনতে হয়, গণতন্ত্রের কথা শুনতে হয়, ন্যায়বিচারের কথা শুনতে হয়, সেটিই খুব অবাক লাগে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমেরিকা, যারা সবসময় ন্যায় বিচারের কথা বলে। গণতন্ত্রের কথা বলে, ভোটাধিকারের কথা বলে, মানবাধিকারের কথা বলে। আমি সরকারে আসার পর থেকে বারবার যতজন রাষ্ট্রপতি এসেছে তাদের প্রত্যেকের কাছে বারবার অনুরোধ করেছি, একটা সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আপনারা কীভাবে আশ্রয় দেন? আপনাদের জুডিশিয়ারি কীভাবে আশ্রয় দেয়? কীভাবে আপনারা একজন খুনিকে আশ্রয় দেন? অথচ খুনি রাশেদ এখন আমেরিকায়। আর নূরকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে কানাডা। তারপরও তাদের কাছ থেকে আমাদের আইনের শাসনের ছবকও শুনতে হয়, গণতন্ত্রের কথাও শুনতে হয়, ন্যায়বিচারের কথাও শুনতে হয়! সেটিই আমার কাছে খুব অবাক লাগে।’

গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু ও বিচার বিভাগ’ শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ এবং ‘ন্যায় কণ্ঠ’ শীর্ষক মুজিববর্ষ স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে যুক্ত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আইনের শাসন কায়েম হবে, আইনে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে কি হয়েছিল? বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদেছে। ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যা করার পর ইমডেমনিটি অর্ডিন্যান্স পাস হলো। সেই অর্ডিন্যান্সে দেয়া হলো, ওই খুনিদের কোনদিন বিচার করা যাবে না। ওই হত্যার মামলা করা যাবে না।’

১৫ আগস্টের ঘটনা কারবালার ঘটনাকেও হার মানিয়েছিল উল্লেখ করে এক রাতে নিজের পরিবারের সবাইকে হারিয়ে দুই বোনের বেঁচে থাকার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদিও প্রথমে ক্ষমতায় এসেছিল আমার বাবার মন্ত্রিসভার মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক। সেটি সংবিধান লঙ্ঘন করেই তার ক্ষমতা আরোহণ। কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার জিয়াউর রহমান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এতে কোন সন্দেহ নেই এবং তারই প্ররোচনায় এই ঘটনা। আর এর সঙ্গে যে ষড়যন্ত্রকারী ছিল সেটা এখনো বের করা হয়নি। একদিন সেটিও বের হবে।’

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘আসলে বেঈমান বা মোনাফেক যারা হয় তাদের মানুষ ব্যবহার করে, কিন্তু কখনো রাখে না। আসল যে থাকে সে তাকে পর্দার আড়ালে। সেই পলাশীর ঘটনাও যদি দেখি, তখনও মীরজাফর ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে মিশে ষড়যন্ত্র করে নবাব হওয়ার আশায়। সে কিন্তু তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। আপনারাও একটু দেখবেন, খন্দকার মোশতাকও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। পর্দার আড়াল থেকে আসল লোক ক্ষমতা দখল করে চলে আসে, সেটি হলো জেনারেল জিয়াউর রহমান।’

সেনাপ্রধান হিসেবে জিয়ার ক্ষমতা দখল করে দল গঠন করাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্মি রুলস অ্যান্ড অ্যাক্টেও ছিল যে সেনাপ্রধান কখনো নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে ঘোষণাই শুধু দেয়নি, এরপর গণভোট দিল, হ্যাঁ-না ভোট দিল। সেটার নামে একটা প্রহসন। তারপর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও করল এবং সেই নির্বাচন করেছিল সে তখন ঘোষিত রাষ্ট্রপতি প্ল্যাস সেনাবাহিনী প্রধান। আমার প্রশ্ন গণতন্ত্রটা তাহলে কোথায়?’

‘আমাদের অনেকেই তার পিছনে খুব বাহবা দিয়ে নেমে পড়ল, হাতে তালি দিয়ে গণতন্ত্র পেয়েছে? সেনাপ্রধান এবং ঘোষিত রাষ্ট্রপতি; আর্মি রুলস যেমন ব্রেক করল, সংবিধান লঙ্ঘন করল তারপর ইলেকশন মানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রহসন দিয়ে ক্ষমতায় এসে এরপরে তার পর দল গঠন।’

‘তখন আর রাজনীতিবিদ হতে আর কোন লজ্জা থাকল না। উর্দি খুলে তখন সেই দল গঠন। আর ক্ষমতায় উত্তরণ করে তারপরে তার রাজনীতিতে আসা, তারপর দল গঠন করলে আর দল গঠন করলে খুব স্বাভাবিকভাকে দল গঠন করতে গিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী, নির্বাচিত প্রতিনিধি যে যেখানে ছিল একেবারে সেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে সবাইকে চাপ দিয়ে দিয়ে তার দলে ভেড়ানো। আর যে দল না ভিড়বে তাকে ভোগ করতে হবে অত্যাচার নির্যাতন মিথ্যা মামলা, নির্যাতন করে করে অনেককে দলে ভেড়ানো হলো, কাউকে প্রলোভন দিয়ে, কেউ লোভে আসল, কেউ অত্যাচারিত হয়ে আসল, কেউ নির্যাতিত হয়ে আসল; এইভাবে দল গঠন। সেই দলটাই হচ্ছে বিএনপি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করল। এর আগে আরও কয়েকটা করে তারপরও ওঠাকে দাঁড় করাতে পারল।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘সেখানে আবার শোনা গেল বহুদলীয় গণতন্ত্র? আর সেখানে নির্বাচনের সামনে প্রহসন। একটি দল জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলতে শিখল না, হাঁটতে শিখল না, এ-গাছের ছাল ও-গাছের বাকল দিয়ে একটা দল করে সেই দল আবার নির্বাচনে একেবারে টু থার্ড মেজরিটি (দুই তৃতীয়াংশ) পেয়ে যায়! অর্থাৎ অবৈধভাবে দখল করা ক্ষমতাকে ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিয়ে সেই ক্ষমতাকে কণ্টকমুক্ত করার জন্য একটা প্রচেষ্টা।’

‘আর ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স দিয়ে খুনিদের বিচার না করা, বিচারহীনতার যে কালচার। আমরা কোন একটা ঘটনা ঘটলে যেমন বিচারের জন্য যখন সকলে দাবি করে আমার তখন এটাই মনে হয় আমরা যারা আপনজন হারিয়েছিলাম আমরা তো ৩৬ বছর সময় লেগেছিল বিচার পেতে। সেটাও যখন আমরা বেঁচে ছিলাম, জানি না আল্লাহর ইচ্ছা! ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলাম বলেই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স বাতিলের জন্য আমরা আপিল করি। আমরা রিট করি, মামলা করা হয়, সে জন্য ধন্যবাদ জানাই উচ্চ আদালতকে। উচ্চ আদালত সেই জিনিসটা আমলনামায় নেন এবং সেটার ওপর এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সটা বাতিল করেন। সে জন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ, যারা এই অর্ডিন্যান্স বাতিল করার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাহলে মামলা করার জন্য আমরা যারা আপনজন হারিয়েছি, আমাদের ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার বিচার চাওয়ার অধিকার হরণ করা হয়েছিল। আমার মতো যারা সবাইকে হারিয়েছিলাম। তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকারটা ছিল কোথায়? মৌলিক অধিকার কোথায় ছিল? মানুষের অধিকার কোথায় ছিল? আমি যদি বেঁচে না থাকতাম বা আর কোনদিন ক্ষমতায় আসতে না পারতাম তাহলে কোনদিন আর এই বিচার হতো না। এটাই হলো বাস্তবতা। কোনদিনেই বিচার হতো না। সেই ইনডেমনিটি অর্থাৎ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে যেত। কিন্তু আমাদের সংবিধানে তো ন্যায়বিচার পাওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু সেই বিচার হয়নি, এটিই হলো বাস্তবতা।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সরকারে আসার পর বিচার হয়েছে। যদিও এই বিচারের রায় দিতে যেয়ে বা বিচার করতে যেয়ে অনেকেই উচ্চ আদালতে সেই সাহসটা পাননি, আমি জানি! একটা পর্যায়ে সরে গেছেন, কেন সেটা! তারপরও আমি বলব, এই বিচারের রায় আমরা পেয়েছি এই বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। এখনো কয়েকজন রিফিউজিটিভে আছে তারা পালিয়ে আছে। তাদেরকেও খোঁজা হচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা আমেরিকার মতো জায়গা, যারা সবসময় ন্যায়বিচারের কথা বলে, গণতন্ত্রের কথা বলে, ভোটাধিকারের কথা বলে, তারা মানবাধিকারের কথা বলে, কিন্তু আমাদের যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল আমরা যে ন্যায়বিচার পাইনি, তারপর যখন এই বিচার হলো সেই খুনিদের আশ্রয় দিয়ে বসে আছে। আমি সরকারে আসার পর থেকে বারবার যতজন রাষ্ট্রপতি এসেছে প্রত্যেকের কাছে বারবার অনুরোধ করেছি, একটা সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে আপনারা কিভাবে আশ্রয় দেন? আপনাদের জুডিশিয়ারি কিভাবে আশ্রয় দেয়? কিভাবে আপনারা একজন খুনিকে আশ্রয় দেন?’

‘যে খুনিটা ১৫ আগস্ট যখন আমার সেজো ফুফুর বাড়ি আক্রমণ করে সেইখানে যে গ্রুপটা যায়, তার কমান্ডিং অফিসার ছিল ওই রাশেদ। সেই খুনি এখন পর্যন্ত আমেরিকায়। তাকে আজকে পর্যন্ত কেউই ফেরত দিল না। আমেরিকা গণতন্ত্রের জন্য কথা বলে আর খুনিদের আশ্রয় দেয়, প্রশ্রয় দেয় কেন? আমি জানি না! তারা নাকি বিশ্বের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক দেশ। আমি এতবার প্রত্যেক রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছি। বারবার তাদের অনুরোধ করেছি, আমরা বারবার চেষ্টা করেছি।’

কানাডায় মেজর নূর, সে ছিল ৩২ নম্বরে হত্যাকাণ্ডের জন্য কমান্ডিং অফিসার হিসেবে। আর ফারুক ছিল ট্যাংকের দায়িত্বে। আর নূর ঢুকেছিল সেই ছিল কমান্ডিং অফিসার। অথচ নূরকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে কানাডা। আর খুনি রাশেদ এখনো আমেরিকায়। তাদের কাছ থেকে আমাদের আইনের শাসনের ছবকও শুনতে হয়, গণতন্ত্রের কথাও শুনতে হয়, ন্যায়বিচারের কথাও শুনতে হয়! সেটিই আমার কাছে খুব অবাক লাগে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের সব সময় বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হবে। আমাদের দেশটাও যেন বিশ্বে একটা মর্যাদা নিয়ে চলবে, সেই সরঙ্গ একটি দেশের সব অঙ্গও যেন সেভাবে মর্যাদা নিয়ে চলতে পারে, আমরা সেটাই করতে চাই। সেভাবেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

বিচারকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচারকদের থাকার ব্যবস্থা, তাদের চলার ব্যবস্থা, সব ধরনের ব্যবস্থা, সুযোগ সুবিধা আমরা সাধ্যমত করে দিয়েছি।

বিচারকদের দক্ষতা বাড়াতে দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আইন কমিশন আমরা গঠন করি। বিচারকদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট আমি প্রতিষ্ঠা করে দেই। এখনতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্রেনিং নেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। অন্য দেশে কীভাবে হয় সেটা আমাদের দেশের মানুষের জানা উচিত, সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি।

সরকার প্রধান বলেন, গ্রামের যেসব হতদরিদ্র মানুষ বিচার পায় না, তাদের জন্য লিগাল এইড কমিটি গঠন ও এ জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। গরিব সাধারণ মানুষ যেন বিচার পায় সেই ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। এটা আমরা ২০০০ সালে প্রণয়ন করেছি।

অবকাঠামোগত উন্নয়নের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আগে মাত্র হাতে গোনা ৭ জনের বেশি বিচারক বসতে পারতেন না, এনেক্স ভবন করে দিয়েছি। ৪০টা চেম্বারের ব্যবস্থা করে দিলাম। পাশাপাশি প্রত্যেকটা জেলা কোর্ট নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে।

উচ্চ আদালতে নারী বিচারক নিয়োগে নিজের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে যে আইন ছিল সেখানে বিচার প্রক্রিয়ায় নারীরা অংশ নিতে পারবে না। জাতির পিতা সেই আইন পরিবর্তন করে সুযোগ দিলেন। কিন্তু আমি এসে দেখলাম আমাদের উচ্চ আদালতে কোন নারী নেই। আমি অনুরোধ করলাম প্রধান বিচারপতি এবং রাষ্ট্রপতিকে যে, সেখানে নারীদের সুযোগ দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ছাড়াও অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।