র‌্যাগিংয়ের অপসংস্কৃতি

মাছুম বিল্লাহ

যে মহান ব্রত, উদ্দেশ্য ও আশা নিয়ে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হয়, ক্যাম্পাসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের র‌্যাগিং নামক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, থমকে যায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা। র‌্যাগিংয়ের মাধ্যমে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এমনকি বিকলাঙ্গ হচ্ছে, কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছে। হল, শ্রেণীকক্ষ, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি, ক্যাম্পাসের নির্জন জায়গা সর্বত্রই চলে র‌্যাগিং নামক শিক্ষার্থী টর্চার। ফলে, যাদের সামর্থ্য আছে তারা হল ছেড়ে আশ্রয় নেয় মেসে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতায় যুগের পর যুগ চলছে এ অপসংস্কৃতি। যারা নির্যাতিত হয় তারা সেই শোধ মেটানোর জন্য এবং মানসিক বৈকল্যের কারণে পরবর্তীতে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তাদের ওপর চালায় অমানবিক এ অত্যাচার।

গণমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন শতাধিক র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেছে যার মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত এক মাসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ২৭টি র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে। ছাত্রছাত্রী নির্বিশেষে সবার ওপর চলে এই র‌্যাগিং নামক নির্যাতন। এ পরিসংখ্যান শুধু যেগুলো রিপোর্টেড হয়েছে। অজানা অনেক তথ্য আছে যেগুলো এ হিসাবে আসেনি। এ কেমন কালচার! কেন আমরা এটিকে টিকিয়ে রাখছি? কোথা থেকে এ কালচার এলো? একদিকে ছাত্রনেতা ও ক্যাডারদের অত্যচার, অন্যদিকে আবার এ র‌্যাগিং!

ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচিতে যেতে না পারলে বাড়ি যেতে চাইলে ‘গেস্টরুমে বড় ভাইদের’ কাছ থেকে ছুটি নিতে হয়। রাতে এসব রুমে ডেকে এনে নিরীহ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়। এ সংস্কৃতির মূল উৎস হচ্ছে সিট দখল নিয়ে আধিপত্য। আবার বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এসব আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। আর সাধারণ ছাত্ররা রাতে ঘুমাতে না পেরে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে বিরক্ত, অতিষ্ঠ ও পরে অনেক অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। কি শিখতে এসেছে শিক্ষার্থীরা এসব উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর কি শিখছে? গালাগাল করা, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরিয়ে উঠবস করানো, চেয়ার ছাড়া চেয়ারে বসার ভান করানো, মাটিতে বসে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কান ধরে মুরগি হওয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতন। পায়ের নিচ দিয়ে কান ধরিয়ে স্টাম্পের ওপর বসানো এবং স্টাম্প ও প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে বেধড়ক প্রহার। থাপ্পড় দেয়া, দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, একশতবার সালাম দেয়ানো, অর্ধনগ্ন করে ছবি তোলা। কান ধরে উঠবস করানো, দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে বা এক টাকার কয়েন দিয়ে রুমের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাপতে দেয়ার মতো অভিনব পন্থায় শাস্তি প্রদান করা হয়। অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে নিকটবর্তী মেসে ওঠে কিন্তু সেখানেও রেহাই নেই এ র‌্যাগিংয়ের হাত থেকে।

র‌্যাগিং শুধু শারীরিক নয়, এক ধরনের মানসিক নির্যাতনও। এর মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীদের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়। ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থীরা সদাচার শেখার পরিবর্তে তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি জন্মে ঘৃণা আর ভয়ের সংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়-যদিও এ বিষয়টি নিয়ে কেউ আর তেমন তৎপর নন, কারণ তারা চাকরি করেন, বেতন আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি থাকুক আর না থাকুক তাতে তো কারুর কিছু যায় আসে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র অনেকটা পাল্টে গেছে আবরার হত্যার পর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারি বেড়েছে। কমেছে র‌্যাগিং। ২০১৯ সালের অক্টোবরের আগে যা হতো তা হচ্ছে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সালাম না দিলেও শুরু হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অথচ এত মেধাবী ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের এসব নিয়ে ভাবারই সময় ছিল না। তথাকথিত রাজনীতি তাদের এভাবে পাল্টে দিয়েছে।

শুধু উন্নত বিশে^র বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি ব্লেন্ডেড লার্নিং, ই-লার্নিংসহ নিয়মিত গবেষণা ও উন্নতমানের শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করছে যাতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে না পড়ে এবং শিক্ষার আন্তর্জাতিকমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে। আর আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেই চলছে ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি ও মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রতি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণে। করোনা অতিমারিতে তা আরও প্রকট হয়েছে। গত দুই বছরে শিক্ষাঙ্গনে নেমে এসেছে প্রায় স্থবিরতা। এর বাইরেও রয়েছে নানা সমস্যা, অনিয়ম ও দুর্নীতি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাত্র খুলেছে অথচ র‌্যাগিংও শুরু হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করলে এগুলো থাকত না বলে অনেক শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেছেন। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে যদি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা প্রকৃত শিক্ষালয়ে পরিণত করতে চাই। জাতীয় উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন সূচক নিয়ে। শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রকাশনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সুযোগ-সুবিধার বিভিন্ন উপাদান ও পরিচালনের নানাদিক বিবেচনায় নিয়ে বৈশি্বকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘র‌্যাংকিং’ করার ব্যবস্থা রয়েছে। বস্তুত একাধিক র‌্যাংকিং অনুশীলন কার্যকর রয়েছে কিন্তু প্রায় সব র‌্যাংকিং অনুশীলনেই বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই। এ নিয়ে আমাদের কোন চিন্তাও নেই।

বিশে্ব এখন চলছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঢেউ। প্রথম শিল্পবিপ্লব স্টিম ইঞ্জিন, দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বিদ্যুৎ, তৃতীয় শিল্পবিপ্লব কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে। সেই প্রেক্ষাপটে বৈশি^ক প্রতিযোগিতা তথা চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশে প্রচলিত উচ্চ শিক্ষার সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুরূপ দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত অনুকূল নয়। সে জন্য উচ্চ শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষাদানের মান উন্নত করা, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলোতে সম্পৃক্ত করা, তাদের উপলব্ধি করানো, উন্নত শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এবং র‌্যাগিং ও ছাত্র রাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের নিজেদের, শিক্ষকসমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং নিয়োগের পর শিক্ষকদের অবশ্যই সৃষ্টিশীল ও গবেষণামনস্ক, নিষ্ঠাবান, আন্তরিক, পরিশ্রমী ও উন্নত নৈতিকতাসম্পন্ন হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

[লেখক : প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব) ]

বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ , ২০ পৌষ ১৪২৮ ২৫ জমাদিউল আউয়াল

র‌্যাগিংয়ের অপসংস্কৃতি

মাছুম বিল্লাহ

যে মহান ব্রত, উদ্দেশ্য ও আশা নিয়ে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হয়, ক্যাম্পাসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের র‌্যাগিং নামক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়, থমকে যায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার আশা। র‌্যাগিংয়ের মাধ্যমে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার এমনকি বিকলাঙ্গ হচ্ছে, কেউ কেউ প্রাণও হারাচ্ছে। হল, শ্রেণীকক্ষ, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি, ক্যাম্পাসের নির্জন জায়গা সর্বত্রই চলে র‌্যাগিং নামক শিক্ষার্থী টর্চার। ফলে, যাদের সামর্থ্য আছে তারা হল ছেড়ে আশ্রয় নেয় মেসে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতায় যুগের পর যুগ চলছে এ অপসংস্কৃতি। যারা নির্যাতিত হয় তারা সেই শোধ মেটানোর জন্য এবং মানসিক বৈকল্যের কারণে পরবর্তীতে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে তাদের ওপর চালায় অমানবিক এ অত্যাচার।

গণমাধ্যম থেকে জানা যায় যে, গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন শতাধিক র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটেছে যার মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত এক মাসে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ২৭টি র‌্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে। ছাত্রছাত্রী নির্বিশেষে সবার ওপর চলে এই র‌্যাগিং নামক নির্যাতন। এ পরিসংখ্যান শুধু যেগুলো রিপোর্টেড হয়েছে। অজানা অনেক তথ্য আছে যেগুলো এ হিসাবে আসেনি। এ কেমন কালচার! কেন আমরা এটিকে টিকিয়ে রাখছি? কোথা থেকে এ কালচার এলো? একদিকে ছাত্রনেতা ও ক্যাডারদের অত্যচার, অন্যদিকে আবার এ র‌্যাগিং!

ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচিতে যেতে না পারলে বাড়ি যেতে চাইলে ‘গেস্টরুমে বড় ভাইদের’ কাছ থেকে ছুটি নিতে হয়। রাতে এসব রুমে ডেকে এনে নিরীহ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করা হয়। এ সংস্কৃতির মূল উৎস হচ্ছে সিট দখল নিয়ে আধিপত্য। আবার বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে এসব আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। আর সাধারণ ছাত্ররা রাতে ঘুমাতে না পেরে ক্যাম্পাসে ঘুরে ঘুরে বিরক্ত, অতিষ্ঠ ও পরে অনেক অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। কি শিখতে এসেছে শিক্ষার্থীরা এসব উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আর কি শিখছে? গালাগাল করা, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা, কান ধরিয়ে উঠবস করানো, চেয়ার ছাড়া চেয়ারে বসার ভান করানো, মাটিতে বসে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কান ধরে মুরগি হওয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতন। পায়ের নিচ দিয়ে কান ধরিয়ে স্টাম্পের ওপর বসানো এবং স্টাম্প ও প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে বেধড়ক প্রহার। থাপ্পড় দেয়া, দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখা, এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা, একশতবার সালাম দেয়ানো, অর্ধনগ্ন করে ছবি তোলা। কান ধরে উঠবস করানো, দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে বা এক টাকার কয়েন দিয়ে রুমের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাপতে দেয়ার মতো অভিনব পন্থায় শাস্তি প্রদান করা হয়। অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে নিকটবর্তী মেসে ওঠে কিন্তু সেখানেও রেহাই নেই এ র‌্যাগিংয়ের হাত থেকে।

র‌্যাগিং শুধু শারীরিক নয়, এক ধরনের মানসিক নির্যাতনও। এর মাধ্যমে নতুন শিক্ষার্থীদের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়। ফলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিক্ষার্থীরা সদাচার শেখার পরিবর্তে তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি জন্মে ঘৃণা আর ভয়ের সংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়-যদিও এ বিষয়টি নিয়ে কেউ আর তেমন তৎপর নন, কারণ তারা চাকরি করেন, বেতন আসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি থাকুক আর না থাকুক তাতে তো কারুর কিছু যায় আসে না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র অনেকটা পাল্টে গেছে আবরার হত্যার পর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারি বেড়েছে। কমেছে র‌্যাগিং। ২০১৯ সালের অক্টোবরের আগে যা হতো তা হচ্ছে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সালাম না দিলেও শুরু হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। অথচ এত মেধাবী ও সিনিয়র শিক্ষার্থীদের এসব নিয়ে ভাবারই সময় ছিল না। তথাকথিত রাজনীতি তাদের এভাবে পাল্টে দিয়েছে।

শুধু উন্নত বিশে^র বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি ব্লেন্ডেড লার্নিং, ই-লার্নিংসহ নিয়মিত গবেষণা ও উন্নতমানের শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করছে যাতে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে না পড়ে এবং শিক্ষার আন্তর্জাতিকমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে। আর আমাদের দেশে সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানের অবনতি ঘটেই চলছে ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি ও মানসম্পন্ন শিক্ষার প্রতি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণে। করোনা অতিমারিতে তা আরও প্রকট হয়েছে। গত দুই বছরে শিক্ষাঙ্গনে নেমে এসেছে প্রায় স্থবিরতা। এর বাইরেও রয়েছে নানা সমস্যা, অনিয়ম ও দুর্নীতি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মাত্র খুলেছে অথচ র‌্যাগিংও শুরু হয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করলে এগুলো থাকত না বলে অনেক শিক্ষাবিদ মন্তব্য করেছেন। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে যদি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা প্রকৃত শিক্ষালয়ে পরিণত করতে চাই। জাতীয় উন্নয়নের বিভিন্ন সূচক থেকে শুরু করে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন সূচক নিয়ে। শিক্ষাদান, গবেষণা, প্রকাশনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সুযোগ-সুবিধার বিভিন্ন উপাদান ও পরিচালনের নানাদিক বিবেচনায় নিয়ে বৈশি্বকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘র‌্যাংকিং’ করার ব্যবস্থা রয়েছে। বস্তুত একাধিক র‌্যাংকিং অনুশীলন কার্যকর রয়েছে কিন্তু প্রায় সব র‌্যাংকিং অনুশীলনেই বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই। এ নিয়ে আমাদের কোন চিন্তাও নেই।

বিশে্ব এখন চলছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঢেউ। প্রথম শিল্পবিপ্লব স্টিম ইঞ্জিন, দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব বিদ্যুৎ, তৃতীয় শিল্পবিপ্লব কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে। সেই প্রেক্ষাপটে বৈশি^ক প্রতিযোগিতা তথা চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে আমাদের দেশে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। বর্তমানে দেশে প্রচলিত উচ্চ শিক্ষার সিলেবাস ও কারিকুলাম অনুরূপ দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত অনুকূল নয়। সে জন্য উচ্চ শিক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষাদানের মান উন্নত করা, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলোতে সম্পৃক্ত করা, তাদের উপলব্ধি করানো, উন্নত শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এবং র‌্যাগিং ও ছাত্র রাজনীতির অপসংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থীদের নিজেদের, শিক্ষকসমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের সর্বোচ্চ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা এবং নিয়োগের পর শিক্ষকদের অবশ্যই সৃষ্টিশীল ও গবেষণামনস্ক, নিষ্ঠাবান, আন্তরিক, পরিশ্রমী ও উন্নত নৈতিকতাসম্পন্ন হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

[লেখক : প্রেসিডেন্ট, ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব) ]