মহামারী মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি

নাজমুল হুদা খান

গত দুই বছর ধরে করোনা ও বিশ্ব মুখোমুখি। বিশে^র দুইশ দেশের ৮০০ কোটি মানুষ এ অদৃশ্য শক্তির একের পর এক ঢেউ ও ধরনের আবির্ভাবে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। এ যুদ্ধে প্রাণহানি ৫৪ লাখ ছাড়িয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী না হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক বিশ্বকে হিমশিম খেতে হচ্ছে একে সামলাতে। এটি শুধু মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘতর করছে তাই নয়, প্রচ- ধাক্কা খেয়েছে আমাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নও। মহামারীর শুরু থেকেই দরিদ্র, উন্নয়নশীল, মধ্যম আয়ের এমনকি উন্নত দেশসমূহেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং অনাগত মহামারী প্রতিরোধে শক্তিশালী স্বাস্থ্য কাঠামো বিনির্মাণের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্যের আদান-প্রদান, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ, যথাযথ স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক মহামারী প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুুভূত হয়। সেই লক্ষ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২৭ ডিসেম্বর বিশে^ প্রথমবারের মতো আর্ন্তজাতিক মহামারী মোকাবিলা প্রস্তুতি দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। জাতিসংঘের সকল সদস্য দেশ, সংস্থা, বৈশি^ক, আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক সব সংগঠন, বেসামারিক খাত, সুশীল সমাজ, এনজিও, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সব ব্যক্তি শ্রেণীকে International day of Epidemic preparedness যথাযথভাবে পালনের আহবান জানানো হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য মহামারী প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সব পর্যায়ের অংশীদারিত্বকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে মজবুত ভিত্তি বিনির্মাণ করে বিশ্ববাসীকে নিরাপদ করা।

বস্তুত প্রথিবীতে মানুষ আগমনের পর থেকেই মহামারীর উপস্থিতি অনেকটাই নিয়মিত। প্লেগ, জলবসন্ত, কলেরা, স্প্যানিস ফ্লু, রাশিয়ান ফ্লু, এশিয়ান ফ্লু, হংকং ফ্লু, ইয়োলো ফিভার, সোয়াইন ফ্লু, এইচআইভি এইডস, ইবোলা, সার্স, মার্স এবং হালের নভেল করোনাভাইরাস এসব মহামারীর অন্যতম। ১৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্ল্যাগেই মৃত্যু হয়েছে ২৫০ মিলিয়নের ওপর মানুষ। সাম্প্রতিক ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যেই ১৭২টি দেশে বিভিন্ন ধরনের মহামারী দেখা দিয়েছে প্রায় ১৩০৭ বার।

পৃথিবীতে মহামারী বা অতিমারি নিয়ন্ত্রণে নানা পদ্ধতিও জানা রয়েছে পৃথিবীর মানুষের। আমরা জানি কীভাবে কলেরা, এইচআইভি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মেনিনজাইটিস, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ইত্যাদিকে পরাভূত করতে হয়। তারপরও রোগ-জীবাণুর ধরনের পরিবর্তন এবং বিশে^র মানুষের কাছে সর্বজনীন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা না পৌঁছাতে পারার কারণে আমরা বারবার এসব রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধে হোঁচট খাচ্ছি। হঠাৎ জেঁকে বসা মহামারী আমাদের প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নানাবিধ চাপ সৃষ্টি করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার উপক্রম ঘটায়। স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা, দুর্বল টেকনোলজি ও অর্থনৈতিক সংকট ইত্যাদি এসব ঝুঁকিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহও সংক্রমণের আধার হিসেবে রোগের বিস্তার ঘটায়। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য সম্মুখযোদ্ধাদের আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরও বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে।

বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, গতানুগতিক রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে সমতা ও সংহতির অভাব এবং মহামারী সংশ্লিষ্ট গুজব ও কুসংস্কারও এর বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্তরায়। মানুষের জীবনযাত্রা জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক চলাচলের গতিবৃদ্ধির কারণে বিমান, ট্রেন, বাস, স্টিমার ইত্যাদি সংক্রমণের উৎস হিসেবে কাজ করছে। জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনীয়তায় শহর ও উপশহরমুখী মানুষের ঢল এসব অঞ্চলে চাপ বৃদ্ধি করছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও মহামারী বিস্তার লাভের অন্যতম কারণ। ১৯৭০ সাল থেকে অদ্যাবধি যে ১৫০০ নতুন জীবাণু মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে এর মধ্যে প্রায় ৭০% এসেছে প্রাণী দেহ থেকে। শুরু থেকে গত ৩৫ বছরে এইডসে ৭০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু যে এইচআইভি থেকে তারও উৎপত্তি প্রাণী দেহ থেকেই। ইবোলা ভাইরাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যা ১৯৬৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্নাঞ্চলে ২৫টি মহামারীর সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নানা কারণে বাস্তুচ্যুত কিংবা জীবিকার কারণে লাখ লাখ মানুষ প্রতি বছর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কিংবা দেশান্তর হওয়ার কারণেও রোগের বিস্তার লাভ করছে।

গতানুগতিক রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও মহামারী নিয়ন্ত্রণের পথে বাধা। আধুনিক ও গতিময় বিশে^ মানুষকে এখন ঘরে বন্দী রাখা দায়। তাই উন্নত বিশে^ও সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরও লকডাউন বা কোয়ারেন্টিনের বিপক্ষে বিক্ষোভ হতে দেখা যায়। অহেতুক এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও বুমেরাং হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। ২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ রোগীর ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোন প্রয়োজন ছিল না বলে গবেষণায় প্রকাশ পায়। ১৫০০ রোগীর মধ্যে ৬ শতাংশের দেহে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ছিল অথচ সব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) নামক নীরব অতিমারির মুখোমুখি হচ্ছে সারা বিশ্ব।

মহামারী সংক্রান্ত তথ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আদান প্রদানের ক্ষেত্রে বৈশি^ক সমতা ও সংহতি মহামারী প্রতিরোধের অন্যতম কৌশলী অস্ত্র। মহামারীর উৎস, বিস্তার, অসুস্থতা ও পরিণতির সঙ্গে বৈশি^ক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশসমূহের পক্ষে এককভাবে মহামারী নিয়ন্ত্রণ দুরূহ কাজ। তবে এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (CEPI), গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (GAVI) ইত্যাদি সংস্থাগুলো এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহ আলোর মুখ দেখাচ্ছে।

ইনফোমেডিক (Infomedic) হচ্ছে মহামারী নিয়ন্ত্রণের অপর একটি বাধা। প্রাচীনকাল থেকেই মহামারীর সঙ্গে এর যাত্রা। তখন হয়ত জনস্বাস্থ্যে এ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি ছিল না। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার বর্তমান যুগেও এর ব্যাপ্তি অনেক। নতুন কোন মহামারী দেখা দিলেই সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে তথ্যপ্রবাহের এতটাই আধিক্য দেখা দেয় যে, সঠিক তথ্যটি বের করে তা কাজে লাগানো দুরূহ হয়ে পড়ে। সচেতনতার সঙ্গে গুজব কিংবা আতঙ্কও পাল্লা দিয়ে বিস্তার লাভ করতে থাকে। এ প্রসঙ্গে ২৮ মার্চ ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেন, We are not just fighting an epidemic; we are fighting an infomedic.বাংলাদেশ একটি নিম্নআয়ের দেশ হিসেবে কোভিড-১৯ অতিমারির প্রথম থেকেই বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়। অতিমারির শুরুতে প্রতিদিন ৫০ হাজার মাস্ক তৈরি করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৩টি এবং পিপিই গাউন তৈরির সক্ষমতা কোন সংস্থা বা কোম্পানির ছিল না। স্যানিটারাইজার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৭টি। সরকার ও সব প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টায় বর্তমানে ৩৫টির বেশি মাস্ক উৎপাদনকারী, ৫৪টি পিপিই গাউন প্রস্তুতকারী এবং ৭০টির বেশি স্যানিটাইজার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

কোভিড-১৯ প্রকোপের প্রথম দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনই অনুসরণ করত পুরো বিশ্ব। কোভিড ব্যবস্থাপনায় এ সংস্থাটির প্রধান মূলনীতি টেস্ট, ট্রেস এবং ট্রিটমেন্ট নীতিমালার প্রথম এবং অন্যতম উপাদান টেস্ট অর্থাৎ করোনা পরীক্ষা কাার্যক্রমে আমাদের সীমাবদ্ধতা ছিল। ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে প্রতিদিন ১০০০০ টেস্ট করার ক্ষমতা ছিল। পরবর্তীতে নিজেদের অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনবলের নিরিখে শক্তিশালী ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষমতা লাভ করে।

সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়েই বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে করোনা অতিমারি রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মীর ঘাটতি, পর্যাপ্ত শয্যা সংখ্যা, আইসিইউ বেড, প্রয়োজনীয় মেডিকেল যন্ত্রপাতির স্বল্পতা নিয়েই মোকাবেলা শুরু করে এ অতিমারিকে। পর্যায়ক্রমে প্রাতিষ্ঠাানিকভাবে হাসপাতাল শয্যা ও আইসিইউ বেডের সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি করা হয়।

জনসচেতনতার অভাব তৃতীয় বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে মহামারী নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে মাস্ক পরিধান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সাধারণ মানুষকে কমই উদ্বুদ্ধ হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি দেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা দুরূহ বিষয় হলেও মাস্ক পরিধান বিষয়টিও বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে অবহেলিত।

মহামারীর উৎস, বিস্তার, কৌশল, রোগের ধরন এবং পরিণতির ভিন্নতা থাকলেও সর্বজনীন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সিংহভাগ প্রায় একই। আন্তর্জাতিক সমতা ও সংহতি, সীমানা ও বন্দরসমূহে চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং স্ক্রিনিং, রোগ নিরূপণ সুবিধা সংযোজন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও শক্তিশালীকরণ এবং জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করে তোলা যে কোন ধরনের মহামারি মোকাবেলার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়। মহামারী নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা এখন আর স্বাস্থ্য খাতের একার কাজ নয়। বাংলাদেশ যে কোন ধরনের মহামারী বা দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে ১৭টি মন্ত্রণালয় নিয়ে পরামর্শক কমিটি, সচিবদের সমন্বয়ে টাস্ক ফোর্স, অধিদপ্তর পর্যায়ে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটি ছাড়াও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। ভবিষ্যতে অনাগত মহামারীর জন্য এসব কমিটি কার্যকর অনুশীলন চলমান রাখলে আমাদের পক্ষে মহামারীর সফল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ প্রসঙ্গে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু নিয়ন্ত্রণে ইউনিসেফ শীর্ষ পাঁচটি সফল দেশের মধ্যে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্তি উল্লেখ্য; নিপাহ এবং অ্যানথ্রাক্স প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশ অনেকটাই সফল। বাংলাদেশে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত যে স্বাস্থ্য অবকাঠামো রয়েছেÑ একে শক্তিশালী ও কার্যকর, ব্যাপকভাবে জনসম্পৃক্ত এবং বিদ্যমান সব স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মহামারীকেন্দ্রিক না করে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমেই যে কোনো মহামারীর সফল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

[লেখক : সহকারী পরিচালক,

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল]

বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ , ২০ পৌষ ১৪২৮ ২৫ জমাদিউল আউয়াল

মহামারী মোকাবিলায় চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি

নাজমুল হুদা খান

গত দুই বছর ধরে করোনা ও বিশ্ব মুখোমুখি। বিশে^র দুইশ দেশের ৮০০ কোটি মানুষ এ অদৃশ্য শক্তির একের পর এক ঢেউ ও ধরনের আবির্ভাবে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। এ যুদ্ধে প্রাণহানি ৫৪ লাখ ছাড়িয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী না হলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক বিশ্বকে হিমশিম খেতে হচ্ছে একে সামলাতে। এটি শুধু মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘতর করছে তাই নয়, প্রচ- ধাক্কা খেয়েছে আমাদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নও। মহামারীর শুরু থেকেই দরিদ্র, উন্নয়নশীল, মধ্যম আয়ের এমনকি উন্নত দেশসমূহেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং অনাগত মহামারী প্রতিরোধে শক্তিশালী স্বাস্থ্য কাঠামো বিনির্মাণের লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, তথ্যের আদান-প্রদান, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ, যথাযথ স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক মহামারী প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুুভূত হয়। সেই লক্ষ্যে ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২৭ ডিসেম্বর বিশে^ প্রথমবারের মতো আর্ন্তজাতিক মহামারী মোকাবিলা প্রস্তুতি দিবস পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। জাতিসংঘের সকল সদস্য দেশ, সংস্থা, বৈশি^ক, আঞ্চলিক এবং উপ-আঞ্চলিক সব সংগঠন, বেসামারিক খাত, সুশীল সমাজ, এনজিও, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সব ব্যক্তি শ্রেণীকে International day of Epidemic preparedness যথাযথভাবে পালনের আহবান জানানো হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য মহামারী প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সব পর্যায়ের অংশীদারিত্বকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে মজবুত ভিত্তি বিনির্মাণ করে বিশ্ববাসীকে নিরাপদ করা।

বস্তুত প্রথিবীতে মানুষ আগমনের পর থেকেই মহামারীর উপস্থিতি অনেকটাই নিয়মিত। প্লেগ, জলবসন্ত, কলেরা, স্প্যানিস ফ্লু, রাশিয়ান ফ্লু, এশিয়ান ফ্লু, হংকং ফ্লু, ইয়োলো ফিভার, সোয়াইন ফ্লু, এইচআইভি এইডস, ইবোলা, সার্স, মার্স এবং হালের নভেল করোনাভাইরাস এসব মহামারীর অন্যতম। ১৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১৮৫৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে প্ল্যাগেই মৃত্যু হয়েছে ২৫০ মিলিয়নের ওপর মানুষ। সাম্প্রতিক ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যেই ১৭২টি দেশে বিভিন্ন ধরনের মহামারী দেখা দিয়েছে প্রায় ১৩০৭ বার।

পৃথিবীতে মহামারী বা অতিমারি নিয়ন্ত্রণে নানা পদ্ধতিও জানা রয়েছে পৃথিবীর মানুষের। আমরা জানি কীভাবে কলেরা, এইচআইভি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মেনিনজাইটিস, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ইত্যাদিকে পরাভূত করতে হয়। তারপরও রোগ-জীবাণুর ধরনের পরিবর্তন এবং বিশে^র মানুষের কাছে সর্বজনীন জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা না পৌঁছাতে পারার কারণে আমরা বারবার এসব রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধে হোঁচট খাচ্ছি। হঠাৎ জেঁকে বসা মহামারী আমাদের প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নানাবিধ চাপ সৃষ্টি করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার উপক্রম ঘটায়। স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা, দুর্বল টেকনোলজি ও অর্থনৈতিক সংকট ইত্যাদি এসব ঝুঁকিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। অনেক সময় দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহও সংক্রমণের আধার হিসেবে রোগের বিস্তার ঘটায়। শুধু তাই নয়, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অন্যান্য সম্মুখযোদ্ধাদের আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আরও বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে।

বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, গতানুগতিক রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে সমতা ও সংহতির অভাব এবং মহামারী সংশ্লিষ্ট গুজব ও কুসংস্কারও এর বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্তরায়। মানুষের জীবনযাত্রা জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক চলাচলের গতিবৃদ্ধির কারণে বিমান, ট্রেন, বাস, স্টিমার ইত্যাদি সংক্রমণের উৎস হিসেবে কাজ করছে। জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনীয়তায় শহর ও উপশহরমুখী মানুষের ঢল এসব অঞ্চলে চাপ বৃদ্ধি করছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও মহামারী বিস্তার লাভের অন্যতম কারণ। ১৯৭০ সাল থেকে অদ্যাবধি যে ১৫০০ নতুন জীবাণু মানুষের দেহে সংক্রমিত হয়েছে এর মধ্যে প্রায় ৭০% এসেছে প্রাণী দেহ থেকে। শুরু থেকে গত ৩৫ বছরে এইডসে ৭০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু যে এইচআইভি থেকে তারও উৎপত্তি প্রাণী দেহ থেকেই। ইবোলা ভাইরাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যা ১৯৬৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্নাঞ্চলে ২৫টি মহামারীর সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নানা কারণে বাস্তুচ্যুত কিংবা জীবিকার কারণে লাখ লাখ মানুষ প্রতি বছর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কিংবা দেশান্তর হওয়ার কারণেও রোগের বিস্তার লাভ করছে।

গতানুগতিক রোগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিও মহামারী নিয়ন্ত্রণের পথে বাধা। আধুনিক ও গতিময় বিশে^ মানুষকে এখন ঘরে বন্দী রাখা দায়। তাই উন্নত বিশে^ও সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরও লকডাউন বা কোয়ারেন্টিনের বিপক্ষে বিক্ষোভ হতে দেখা যায়। অহেতুক এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণও বুমেরাং হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে। ২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ রোগীর ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোন প্রয়োজন ছিল না বলে গবেষণায় প্রকাশ পায়। ১৫০০ রোগীর মধ্যে ৬ শতাংশের দেহে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ছিল অথচ সব ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) নামক নীরব অতিমারির মুখোমুখি হচ্ছে সারা বিশ্ব।

মহামারী সংক্রান্ত তথ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আদান প্রদানের ক্ষেত্রে বৈশি^ক সমতা ও সংহতি মহামারী প্রতিরোধের অন্যতম কৌশলী অস্ত্র। মহামারীর উৎস, বিস্তার, অসুস্থতা ও পরিণতির সঙ্গে বৈশি^ক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশসমূহের পক্ষে এককভাবে মহামারী নিয়ন্ত্রণ দুরূহ কাজ। তবে এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস (CEPI), গ্লোবাল এলায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমুনাইজেশন (GAVI) ইত্যাদি সংস্থাগুলো এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহ আলোর মুখ দেখাচ্ছে।

ইনফোমেডিক (Infomedic) হচ্ছে মহামারী নিয়ন্ত্রণের অপর একটি বাধা। প্রাচীনকাল থেকেই মহামারীর সঙ্গে এর যাত্রা। তখন হয়ত জনস্বাস্থ্যে এ শব্দটির অন্তর্ভুক্তি ছিল না। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার বর্তমান যুগেও এর ব্যাপ্তি অনেক। নতুন কোন মহামারী দেখা দিলেই সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে তথ্যপ্রবাহের এতটাই আধিক্য দেখা দেয় যে, সঠিক তথ্যটি বের করে তা কাজে লাগানো দুরূহ হয়ে পড়ে। সচেতনতার সঙ্গে গুজব কিংবা আতঙ্কও পাল্লা দিয়ে বিস্তার লাভ করতে থাকে। এ প্রসঙ্গে ২৮ মার্চ ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেন, We are not just fighting an epidemic; we are fighting an infomedic.বাংলাদেশ একটি নিম্নআয়ের দেশ হিসেবে কোভিড-১৯ অতিমারির প্রথম থেকেই বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়। অতিমারির শুরুতে প্রতিদিন ৫০ হাজার মাস্ক তৈরি করতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৩টি এবং পিপিই গাউন তৈরির সক্ষমতা কোন সংস্থা বা কোম্পানির ছিল না। স্যানিটারাইজার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৭টি। সরকার ও সব প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টায় বর্তমানে ৩৫টির বেশি মাস্ক উৎপাদনকারী, ৫৪টি পিপিই গাউন প্রস্তুতকারী এবং ৭০টির বেশি স্যানিটাইজার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

কোভিড-১৯ প্রকোপের প্রথম দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড লাইনই অনুসরণ করত পুরো বিশ্ব। কোভিড ব্যবস্থাপনায় এ সংস্থাটির প্রধান মূলনীতি টেস্ট, ট্রেস এবং ট্রিটমেন্ট নীতিমালার প্রথম এবং অন্যতম উপাদান টেস্ট অর্থাৎ করোনা পরীক্ষা কাার্যক্রমে আমাদের সীমাবদ্ধতা ছিল। ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে প্রতিদিন ১০০০০ টেস্ট করার ক্ষমতা ছিল। পরবর্তীতে নিজেদের অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত জনবলের নিরিখে শক্তিশালী ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষমতা লাভ করে।

সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা নিয়েই বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে করোনা অতিমারি রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মীর ঘাটতি, পর্যাপ্ত শয্যা সংখ্যা, আইসিইউ বেড, প্রয়োজনীয় মেডিকেল যন্ত্রপাতির স্বল্পতা নিয়েই মোকাবেলা শুরু করে এ অতিমারিকে। পর্যায়ক্রমে প্রাতিষ্ঠাানিকভাবে হাসপাতাল শয্যা ও আইসিইউ বেডের সংখ্যা তিনগুণ বৃদ্ধি করা হয়।

জনসচেতনতার অভাব তৃতীয় বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে মহামারী নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ। কোভিড-১৯ প্রতিরোধে মাস্ক পরিধান, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সাধারণ মানুষকে কমই উদ্বুদ্ধ হতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি দেশে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা দুরূহ বিষয় হলেও মাস্ক পরিধান বিষয়টিও বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে অবহেলিত।

মহামারীর উৎস, বিস্তার, কৌশল, রোগের ধরন এবং পরিণতির ভিন্নতা থাকলেও সর্বজনীন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সিংহভাগ প্রায় একই। আন্তর্জাতিক সমতা ও সংহতি, সীমানা ও বন্দরসমূহে চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং স্ক্রিনিং, রোগ নিরূপণ সুবিধা সংযোজন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও শক্তিশালীকরণ এবং জনগণকে সম্পৃক্ত ও সচেতন করে তোলা যে কোন ধরনের মহামারি মোকাবেলার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করা হয়। মহামারী নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা এখন আর স্বাস্থ্য খাতের একার কাজ নয়। বাংলাদেশ যে কোন ধরনের মহামারী বা দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণে ১৭টি মন্ত্রণালয় নিয়ে পরামর্শক কমিটি, সচিবদের সমন্বয়ে টাস্ক ফোর্স, অধিদপ্তর পর্যায়ে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটি ছাড়াও জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। ভবিষ্যতে অনাগত মহামারীর জন্য এসব কমিটি কার্যকর অনুশীলন চলমান রাখলে আমাদের পক্ষে মহামারীর সফল প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এ প্রসঙ্গে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু নিয়ন্ত্রণে ইউনিসেফ শীর্ষ পাঁচটি সফল দেশের মধ্যে বাংলাদেশকেও অন্তর্ভুক্তি উল্লেখ্য; নিপাহ এবং অ্যানথ্রাক্স প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশ অনেকটাই সফল। বাংলাদেশে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত যে স্বাস্থ্য অবকাঠামো রয়েছেÑ একে শক্তিশালী ও কার্যকর, ব্যাপকভাবে জনসম্পৃক্ত এবং বিদ্যমান সব স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মহামারীকেন্দ্রিক না করে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমেই যে কোনো মহামারীর সফল নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

[লেখক : সহকারী পরিচালক,

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল]