এক্সক্লুসিভ সংবাদের অনবদ্য কারিগর

আশাফা সেলিম

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। রংপুরের প্রথম একুশে পদকপ্রাপ্ত হলেও নিজে সেই সম্মান দেখে যেতে পারেননি। তবে এ নিয়ে তার মধ্যে কখনো কোনো আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখিনি। দিনমান গ্রামগঞ্জে, মাঠে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহের কাজে ডুবে থাকা এ মানুষটি এসব নিয়ে ভাববার ফুরসতই হয়তো পাননি! চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনকে তার মত্যুর দুই বছর পর ১৯৯৭ সালে (মৃত্যু ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫) ‘একুশে পদক’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। তবে জীবদ্দশায় তিনি তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক সম্মান ও পদক অর্জন করেছেন। এর মধ্যে- ফিলিপস পুরস্কার, ভয়েস অব আমেরিকার ‘পদ্মার ঢেউ’; ‘জহুর হোসেন স্মৃতি পদক’, ‘আইডিই পুরস্কার’, ‘বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার’, সমাজ ও প্রযুক্তি বিষয়ক পত্রিকা ‘কারিগর’-এর ‘সম্মানসূচক প্রতীক’, রংপুর পৌরসভা কর্তৃক প্রদত্ত ‘নাগরিক সংবর্ধনা’, রংপুর পদাতিক কর্তৃক প্রদত্ত ‘গুণীজন সংবর্ধনা’, ‘অশোকা ফেলোশিপ’ ইত্যাদি অন্যতম।

শুধু পুরস্কারের মানদ-ে মোনাজাতউদ্দিনকে বিচার করলে তা হবে অসম্পূর্ণ। কারণ তিনি সাধারণ সাংবাদিক ছিলেন না। সাধারণ ঘটনার মধ্য থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের উপকরণ খুঁজে বের করতেন। তৈরি করতেন আলোচিত, আকর্ষণীয় সব সংবাদ; যা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। জীবনব্যাপী সাংবাদিকতায় বিরল সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন। অন্য সব সাংবাদিকের মাঝে একই সমাজে বসবাস করলেও তিনি কাজ করতেন কিছুটা নিভৃতে, অন্তর্চক্ষু ব্যবহার করে। কোনো একটি নিউজ কাভার করতে অন্য সাংবাদিকদের সাথে মোনাজাত ভাইও যেতেন। কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি গঁৎবাধা সংবাদের বাইরে স্বতন্ত্র স্টাইলের একটি নিউজ লিখে ফেলতেন। পরদিন ‘দৈনিক সংবাদ’-এ ছাপা হবার পর দেখা যেত তার নিউজটিই হয়ে গেছে এক্সক্লুসিভ আইটেম। এরকম অসংখ্য এক্সক্লুসিভ সংবাদ বা প্রতিবেদনের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃত মোনাজাতউদ্দিনকে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো যখন কোনো একটি ইস্যু নিয়ে নিউজ, ফিচার ছাপতে ব্যস্ত, সেই সময় মোনাজাত ভাই একই ইস্যুর একটি ভিন্ন স্বাদের নিউজ করতেন। যেমন ১৯৯২ সালে বিশ^কাপ ফুটবলের কিছু ম্যাচ আমেরিকার বোস্টন স্টেডিয়ামে চলছিল। বিশ^কাপ জয়ী ফুটবল তারকা ম্যারাডোনাকে নিয়ে সারাবিশ^ মাতোয়ারা; এ দেশের অনেক ক্রেজিভক্তরা ম্যারাডোনার জন্য জীবন বাজি রাখছেন। শীর্ষ পত্রিকাগুলো সেসব নিউজ হটকেক হিসেবেই গুরুত্ব দিয়ে ছাপছে। সেই সময়ে মোনাজাত ভাই ‘দৈনিক সংবাদ’-এ ‘বোস্টন থেকে বামনডাঙ্গা : পরীবানু (প্রকৃত নামটি মনে নেই) জানে না, ম্যারাডোনা কে’ শিরোনামে একটি এক্সক্লুসিভ নিউজ করলেন। অর্থাৎ বিশ^কাপ ফুটবল ফোবিয়ার মধ্যেই গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা উপজেলার একজন কিষানী ‘পরীবানু’ ম্যারাডোনার নামও শোনেননি। পরিচয়ও জানেন না। এমনকি বিশ^কাপ ফুটবল নিয়ে তার কোনো ধারণাই নেই।

যেকোনো সৃজনশীল কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে কাউকে টিকে থাকতে হলে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়; অর্থাৎ তৃতীয় নয়ন বা থার্ড আইয়ের অধিকারী হতে হয়। মোনাজাত ভাই সেই তৃতীয় নয়নের অধিকারী ছিলেন। মোনাজাত ভাইয়ের সাথে কাজ করার সুবাদে, তাকে কাছ থেকে যতটা দেখেছি, বেশভুষায় কিছুটা সাদামাটা হলেও তিনি ছিলেন এক্সক্লুসিভ, ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ছিলেন আপাদমস্তক একজন প্রগতিশীল মানবিক মানুষও। তার শহর রংপুরের সাহিত্য-সাস্কৃতিক সংগঠনের নামকরণ, নামলিপি অংকন/নকশাকরণ (‘সারথি নাট্য সম্প্রদায়’, ‘শিখা সংসদ’ ইত্যাদি), সাইনবোর্ডের ডিজাইনে (বর্ণসজ্জা প্রেস, ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরি, চন্দ্রবিন্দু কম্পিউটার্স ইত্যাদি) আজও তিনি রয়ে গেছেন উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে। খুব বেশি না লিখলেও যে কয়েকটা নাটক ও ছড়া লিখেছেন তা মাস্টারপিস। তার হাতের লেখার স্টাইলও ছিল সুন্দর এবং সর্বাধুনিক-উত্তরাধুনিক।

মোনাজাত ভাই ‘দৈনিক সংবাদ’-এ প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছেন। ‘উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি’ হিসেবে অব্যাহতি নিয়ে (১৯৯৫ সালের এপ্রিলে) দৈনিক জনকণ্ঠে ‘উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি’ হিসেবে যোগ দেন। জনকণ্ঠে যোগ দিয়ে, দুর্ধর্ষ চক্র কর্তৃক ব্রক্ষ্মপুত্র নদের ফেরিঘাটের ট্যাংকলরির তেল চুরির ওপর ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী সিরিজ প্রতিবেদন করেছিলেন। পর্বগুলোর তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটে, ‘কালাসোনার চর’ এলাকায় ফেরির ছাদ থেকে ‘নদীতে পড়ে গিয়ে’ (?) ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। একজন কলমযোদ্ধা তার পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে (কলম যুদ্ধরত অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করায় তাকে শহীদ সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

এই ক্ষণজন্মা সাংবাদিকের স্মৃতি রক্ষায় কেন্দ্রীয়ভাবে এমনকি তার নিজের শহর রংপুরেও উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। কেন্দ্রীয় উদ্যোগ বলতে মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুর পর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ড. আতিউর রহমান, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, সাংবাদিক দীনেশ দাশসহ কয়েকজন গুণীজন মিলে ‘মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি সংসদ’ গঠন এবং ‘মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পদক’ প্রবর্তন করেছিলেন। সাংবাদিকতায় অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হতো। সাংবাদিক দীনেশ দাসের মৃত্যুর পর (মৃত্যু ২০১২ সালে) এই পদক প্রদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুর পর কিছুদিন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠসহ কিছু পত্রিকায় তাকে নিয়ে সংবাদ, কলাম বা উপসম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে আজ অবধি কোনো সাংবাদিক বা কলামিস্টের কলম থেকে তাকে নিয়ে আর কোনো লেখা চোখে পড়ে না। অথচ সংবাদপত্র জগতে ‘মোনাজাতউদ্দিন স্টাইল’ নিউজ তথা মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিকের প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি। দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা ক্লাসে সংবাদপত্র বিষয়ে পড়াতে গেলে, রেফারেন্স হিসেবে তার সংবাদ সঙ্গত কারণেই আলোচিত হয়। আলোচিত হন মোনাজাতউদ্দিন।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র রংপুরে মোনাজাতউদ্দিনের নামে একটি সড়কের নামকরণ করেছিলেন। সেই নামের কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে এবং রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের উদ্যোগে মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যু দিবস পালন করা হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা মোনাজাতউদ্দিনের স্মৃতি রক্ষায় বিভিন্ন প্রস্তাব দেন কিন্তু সেসবের বাস্তব প্রতিফলন নেই।

ইলেক্ট্রনিক-ডিজিটাল যুগের প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই কেবল নিজের যোগ্যতায় কীভাবে তিনি ‘চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন’ হয়ে উঠেছিলেনÑ এ প্রজন্মের সংবাদ কর্মীদের তা জানতে হবে। শুধু গড্ডল প্রবাহে গা ভাসানো, কপি পেস্ট, টেবিল মেড নিউজ আর সত্য-মিথ্যা যাচাই ব্যাতিরেকেই কালোস্বার্থে, বিরুদ্ধধর্মী নিউজ করা বন্ধ করতে হবে। তা নাহলে সাংবাদিকদের সমাজে প্রচলিত নানা ধরনের কটূক্তি হজম করতে হবে। যেমন কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়Ñ ‘ওরা তো সাংবাদিক না, সাংঘাতিক!’।

মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিকদের নিশ্চয়ই কখনো ‘সাংঘাতিক’ নামের গালি খেতে হয় না। সংবাদপত্র জগতে তার মতো স্বতন্ত্র স্টাইলের সাংবাদিক ইদানীং খুব একটা চোখে পড়ে না। কালেভদ্রে দুই-একজন সেরকম সম্ভাবনাসহ মাথা তুলে, আবার কোথায় যেন হারিয়ে যান! ‘সাংবাদিক’ নামের আড়ালে অর্থ-বিত্তবৈভবের সাগরে হাবুডুবু খান অথবা রক্তচক্ষুর শাসানিতে স্তিমিত হয়ে পড়েন।

পরিতাপের বিষয়Ñ বর্তমান প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক-সংবাদকর্মীই মোনাজাতউদ্দিনের নামটি পর্যন্ত শোনেননি। এমনকি তার নিজ শহর রংপুরেও এ চিত্র। অথচ সব সাংবাদিকেরই জানা দরকার তার কাজ সম্পর্কে। সেটা জানতে হলে তার বইগুলো পড়তে হবে। শুধু সংবাদকর্মীদেরই নয়, প্রতিটি মানুষেরই মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিক জীবন ও তার বইগুলো পাঠ করা উচিত।

[লেখক : মোনাজাতউদ্দিনের সহযোগী]

বৃহস্পতিবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২১ , ২০ পৌষ ১৪২৮ ২৫ জমাদিউল আউয়াল

এক্সক্লুসিভ সংবাদের অনবদ্য কারিগর

আশাফা সেলিম

চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। রংপুরের প্রথম একুশে পদকপ্রাপ্ত হলেও নিজে সেই সম্মান দেখে যেতে পারেননি। তবে এ নিয়ে তার মধ্যে কখনো কোনো আক্ষেপ প্রকাশ করতে দেখিনি। দিনমান গ্রামগঞ্জে, মাঠে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহের কাজে ডুবে থাকা এ মানুষটি এসব নিয়ে ভাববার ফুরসতই হয়তো পাননি! চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিনকে তার মত্যুর দুই বছর পর ১৯৯৭ সালে (মৃত্যু ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫) ‘একুশে পদক’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। তবে জীবদ্দশায় তিনি তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক সম্মান ও পদক অর্জন করেছেন। এর মধ্যে- ফিলিপস পুরস্কার, ভয়েস অব আমেরিকার ‘পদ্মার ঢেউ’; ‘জহুর হোসেন স্মৃতি পদক’, ‘আইডিই পুরস্কার’, ‘বগুড়া লেখকচক্র পুরস্কার’, সমাজ ও প্রযুক্তি বিষয়ক পত্রিকা ‘কারিগর’-এর ‘সম্মানসূচক প্রতীক’, রংপুর পৌরসভা কর্তৃক প্রদত্ত ‘নাগরিক সংবর্ধনা’, রংপুর পদাতিক কর্তৃক প্রদত্ত ‘গুণীজন সংবর্ধনা’, ‘অশোকা ফেলোশিপ’ ইত্যাদি অন্যতম।

শুধু পুরস্কারের মানদ-ে মোনাজাতউদ্দিনকে বিচার করলে তা হবে অসম্পূর্ণ। কারণ তিনি সাধারণ সাংবাদিক ছিলেন না। সাধারণ ঘটনার মধ্য থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের উপকরণ খুঁজে বের করতেন। তৈরি করতেন আলোচিত, আকর্ষণীয় সব সংবাদ; যা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের পরিচায়ক। জীবনব্যাপী সাংবাদিকতায় বিরল সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন। অন্য সব সাংবাদিকের মাঝে একই সমাজে বসবাস করলেও তিনি কাজ করতেন কিছুটা নিভৃতে, অন্তর্চক্ষু ব্যবহার করে। কোনো একটি নিউজ কাভার করতে অন্য সাংবাদিকদের সাথে মোনাজাত ভাইও যেতেন। কিন্তু সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি গঁৎবাধা সংবাদের বাইরে স্বতন্ত্র স্টাইলের একটি নিউজ লিখে ফেলতেন। পরদিন ‘দৈনিক সংবাদ’-এ ছাপা হবার পর দেখা যেত তার নিউজটিই হয়ে গেছে এক্সক্লুসিভ আইটেম। এরকম অসংখ্য এক্সক্লুসিভ সংবাদ বা প্রতিবেদনের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃত মোনাজাতউদ্দিনকে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো যখন কোনো একটি ইস্যু নিয়ে নিউজ, ফিচার ছাপতে ব্যস্ত, সেই সময় মোনাজাত ভাই একই ইস্যুর একটি ভিন্ন স্বাদের নিউজ করতেন। যেমন ১৯৯২ সালে বিশ^কাপ ফুটবলের কিছু ম্যাচ আমেরিকার বোস্টন স্টেডিয়ামে চলছিল। বিশ^কাপ জয়ী ফুটবল তারকা ম্যারাডোনাকে নিয়ে সারাবিশ^ মাতোয়ারা; এ দেশের অনেক ক্রেজিভক্তরা ম্যারাডোনার জন্য জীবন বাজি রাখছেন। শীর্ষ পত্রিকাগুলো সেসব নিউজ হটকেক হিসেবেই গুরুত্ব দিয়ে ছাপছে। সেই সময়ে মোনাজাত ভাই ‘দৈনিক সংবাদ’-এ ‘বোস্টন থেকে বামনডাঙ্গা : পরীবানু (প্রকৃত নামটি মনে নেই) জানে না, ম্যারাডোনা কে’ শিরোনামে একটি এক্সক্লুসিভ নিউজ করলেন। অর্থাৎ বিশ^কাপ ফুটবল ফোবিয়ার মধ্যেই গাইবান্ধার বামনডাঙ্গা উপজেলার একজন কিষানী ‘পরীবানু’ ম্যারাডোনার নামও শোনেননি। পরিচয়ও জানেন না। এমনকি বিশ^কাপ ফুটবল নিয়ে তার কোনো ধারণাই নেই।

যেকোনো সৃজনশীল কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে কাউকে টিকে থাকতে হলে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হতে হয়; অর্থাৎ তৃতীয় নয়ন বা থার্ড আইয়ের অধিকারী হতে হয়। মোনাজাত ভাই সেই তৃতীয় নয়নের অধিকারী ছিলেন। মোনাজাত ভাইয়ের সাথে কাজ করার সুবাদে, তাকে কাছ থেকে যতটা দেখেছি, বেশভুষায় কিছুটা সাদামাটা হলেও তিনি ছিলেন এক্সক্লুসিভ, ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ছিলেন আপাদমস্তক একজন প্রগতিশীল মানবিক মানুষও। তার শহর রংপুরের সাহিত্য-সাস্কৃতিক সংগঠনের নামকরণ, নামলিপি অংকন/নকশাকরণ (‘সারথি নাট্য সম্প্রদায়’, ‘শিখা সংসদ’ ইত্যাদি), সাইনবোর্ডের ডিজাইনে (বর্ণসজ্জা প্রেস, ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরি, চন্দ্রবিন্দু কম্পিউটার্স ইত্যাদি) আজও তিনি রয়ে গেছেন উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে। খুব বেশি না লিখলেও যে কয়েকটা নাটক ও ছড়া লিখেছেন তা মাস্টারপিস। তার হাতের লেখার স্টাইলও ছিল সুন্দর এবং সর্বাধুনিক-উত্তরাধুনিক।

মোনাজাত ভাই ‘দৈনিক সংবাদ’-এ প্রায় দেড় যুগ কাজ করেছেন। ‘উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি’ হিসেবে অব্যাহতি নিয়ে (১৯৯৫ সালের এপ্রিলে) দৈনিক জনকণ্ঠে ‘উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি’ হিসেবে যোগ দেন। জনকণ্ঠে যোগ দিয়ে, দুর্ধর্ষ চক্র কর্তৃক ব্রক্ষ্মপুত্র নদের ফেরিঘাটের ট্যাংকলরির তেল চুরির ওপর ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী সিরিজ প্রতিবেদন করেছিলেন। পর্বগুলোর তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ি ঘাটে, ‘কালাসোনার চর’ এলাকায় ফেরির ছাদ থেকে ‘নদীতে পড়ে গিয়ে’ (?) ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। একজন কলমযোদ্ধা তার পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে (কলম যুদ্ধরত অবস্থায়) মৃত্যুবরণ করায় তাকে শহীদ সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়া উচিত বলে মনে করি।

এই ক্ষণজন্মা সাংবাদিকের স্মৃতি রক্ষায় কেন্দ্রীয়ভাবে এমনকি তার নিজের শহর রংপুরেও উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। কেন্দ্রীয় উদ্যোগ বলতে মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুর পর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, ড. আতিউর রহমান, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, সাংবাদিক দীনেশ দাশসহ কয়েকজন গুণীজন মিলে ‘মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি সংসদ’ গঠন এবং ‘মোনাজাতউদ্দিন স্মৃতি পদক’ প্রবর্তন করেছিলেন। সাংবাদিকতায় অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হতো। সাংবাদিক দীনেশ দাসের মৃত্যুর পর (মৃত্যু ২০১২ সালে) এই পদক প্রদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।

মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যুর পর কিছুদিন দৈনিক সংবাদ, দৈনিক জনকণ্ঠসহ কিছু পত্রিকায় তাকে নিয়ে সংবাদ, কলাম বা উপসম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে আজ অবধি কোনো সাংবাদিক বা কলামিস্টের কলম থেকে তাকে নিয়ে আর কোনো লেখা চোখে পড়ে না। অথচ সংবাদপত্র জগতে ‘মোনাজাতউদ্দিন স্টাইল’ নিউজ তথা মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিকের প্রয়োজন আজও ফুরিয়ে যায়নি। দেশের বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতা ক্লাসে সংবাদপত্র বিষয়ে পড়াতে গেলে, রেফারেন্স হিসেবে তার সংবাদ সঙ্গত কারণেই আলোচিত হয়। আলোচিত হন মোনাজাতউদ্দিন।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র রংপুরে মোনাজাতউদ্দিনের নামে একটি সড়কের নামকরণ করেছিলেন। সেই নামের কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে এবং রংপুর বিভাগ উন্নয়ন আন্দোলন পরিষদের উদ্যোগে মোনাজাতউদ্দিনের মৃত্যু দিবস পালন করা হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা মোনাজাতউদ্দিনের স্মৃতি রক্ষায় বিভিন্ন প্রস্তাব দেন কিন্তু সেসবের বাস্তব প্রতিফলন নেই।

ইলেক্ট্রনিক-ডিজিটাল যুগের প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই কেবল নিজের যোগ্যতায় কীভাবে তিনি ‘চারণসাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন’ হয়ে উঠেছিলেনÑ এ প্রজন্মের সংবাদ কর্মীদের তা জানতে হবে। শুধু গড্ডল প্রবাহে গা ভাসানো, কপি পেস্ট, টেবিল মেড নিউজ আর সত্য-মিথ্যা যাচাই ব্যাতিরেকেই কালোস্বার্থে, বিরুদ্ধধর্মী নিউজ করা বন্ধ করতে হবে। তা নাহলে সাংবাদিকদের সমাজে প্রচলিত নানা ধরনের কটূক্তি হজম করতে হবে। যেমন কাউকে কাউকে বলতে শোনা যায়Ñ ‘ওরা তো সাংবাদিক না, সাংঘাতিক!’।

মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিকদের নিশ্চয়ই কখনো ‘সাংঘাতিক’ নামের গালি খেতে হয় না। সংবাদপত্র জগতে তার মতো স্বতন্ত্র স্টাইলের সাংবাদিক ইদানীং খুব একটা চোখে পড়ে না। কালেভদ্রে দুই-একজন সেরকম সম্ভাবনাসহ মাথা তুলে, আবার কোথায় যেন হারিয়ে যান! ‘সাংবাদিক’ নামের আড়ালে অর্থ-বিত্তবৈভবের সাগরে হাবুডুবু খান অথবা রক্তচক্ষুর শাসানিতে স্তিমিত হয়ে পড়েন।

পরিতাপের বিষয়Ñ বর্তমান প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক-সংবাদকর্মীই মোনাজাতউদ্দিনের নামটি পর্যন্ত শোনেননি। এমনকি তার নিজ শহর রংপুরেও এ চিত্র। অথচ সব সাংবাদিকেরই জানা দরকার তার কাজ সম্পর্কে। সেটা জানতে হলে তার বইগুলো পড়তে হবে। শুধু সংবাদকর্মীদেরই নয়, প্রতিটি মানুষেরই মোনাজাতউদ্দিনের সাংবাদিক জীবন ও তার বইগুলো পাঠ করা উচিত।

[লেখক : মোনাজাতউদ্দিনের সহযোগী]