ইংরেজি ও গণিতের কারণে বেড়েছে পাসের হার

ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পরীক্ষা না হওয়া এবং জেএসসি পরীক্ষায় ‘ভালো গ্রেড’ থাকায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের সব সূচকেই সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এবার ‘জিপিএ-৫’-এর রেকর্ডও হয়েছে।

এই পরীক্ষায় এক বছরেই গড় পাসের হার প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার এই পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এক বছরেই পূর্ণাঙ্গ ‘জিপিএ’ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৪৭ হাজার ৪৪২ জন।

এবছর এই পরীক্ষায় মোট এক লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন শিক্ষার্থী ‘জিপিএ-৫’ অর্থাৎ গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ’ পেয়েছে। গত বছর এই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন।

এ হিসাবে গড় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই ক্ষেত্রেই এবার সর্বোচ্চ ফল লাভ করেছে শিক্ষার্থীরা। এর আগে মাধ্যমিক স্তরের এই পরীক্ষা সর্বোচ্চ ফল অর্জন হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই বছর সব বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ছিল ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ; এতদিন সেটাই ছিল সর্বোচ্চ।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. এসএম আমিরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘সাধারণত ইংরেজি ও গণিত বিষয়েই শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করে থাকে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে এবার সংক্ষিপ্ত সিলবাসে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে; এবং ইংরেজি ও গণিতে পরীক্ষা হয়নি। এ কারণে এবার পাসের হার বেড়েছে। এ ছাড়া জেএসসি-জেডিসিতে ভালো গ্রেড থাকায় সেটিও ভালো ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি নতুন বছরের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানেই ফল প্রকাশ করা হয়। সেখানেই সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

সাধারণত গত ১০/১২ বছর ধরেই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে শুরু হয়ে আসছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির প্রথমদিকে গতবছর এই পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হলেও এবার তা ৯ মাস পিছিয়ে যায়।

তাছাড়া করোনা মহামারীর কারণে টানা প্রায় দেড় বছর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। দশম শ্রেণিতে মাত্র চার মাস সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ পায় পরীক্ষার্র্থীরা। প্রায় ৯ মাস পিছিয়ে গত ১৪ নভেম্বর এ পরীক্ষা শুরু হয়।

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় এবার পরীক্ষা হয়েছে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে। তিন ঘণ্টার পরিবর্তে দেড় ঘণ্টায় পরীক্ষা নেয়া হয়। শুধুমাত্র তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ের পরীক্ষায় বসতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এ কারণে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়গুলোতে এবার পরীক্ষা না নিয়ে আগের পাবলিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২২ লাখ ৪০ হাজার ৩৯৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৪৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এ হিসেবে গড় পাসের হার ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম সংবাদকে বলেন, ‘বাংলা, ইংরেজি ও গণিত এগুলো বেসিক সাবজেক্ট। এসব বিষয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হলেও পরীক্ষা নেয়া হলে ভালো হতো। এরপরও যেহেতু পরীক্ষা নেয়া হয়নি; সে ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে কি-না আমার জানা নেই।’

সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ে ফল

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এবছর শুধুমাত্র তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ে পরীক্ষার্র্থীরা অংশগ্রহণ করেছে। অবশিষ্ট বিষয়গুলোর নম্বর জেএসসি/জেডিসি থেকে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। চতুর্থ বিষয়ের ক্ষেত্রে, যে তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ের পরীক্ষা নেয়া হয় সেসব বিষয় ব্যতীত চতুর্থ বিষয়ের সঙ্গে সামজস্যপূর্ণ জেএসসি/জেডিসি পর্যায়ের আবশ্যিক বিষয় হতে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চতুর্থ বিষয় উচ্চতর গণিতের ক্ষেত্রে জেএসসি/জেডিসির গণিত বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর এবং চতুর্থ বিষয় জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জেএসসি/জেডিসির বিজ্ঞানের প্রাপ্ত নম্বর সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর মূল্যায়ন

গত বছরের তুলনায় এবছর ফলের সূচকে বেশকিছু ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘এর পেছনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমন-বিনামূল্যে সঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়া, টেলিভিশনে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠদান প্রচার।’

শিক্ষার উপকরণ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ও সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা পরিচালনায় ভালো ফল অর্জনে অবদান রেখেছে মন্তব্য করে মন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট এবং পরীক্ষার আগে দুই মাস শ্রেণী কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে। এই পরীক্ষার জন্য সিলেবাস পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

পাসের হার ও জিপিএ-৫ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘পাসের হার যে বেড়েছে সেটার কারণ হতে পারে এবার পরীক্ষায় তিনটি বিষয়ে নিয়েছি, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে নিয়েছি, প্রশ্নপত্রের বিকল্প অনেক বেশি ছিল। এসব কারণে পরীক্ষার্থীরা অনেক বেশি ভালো করেছে অন্য সময়ের চেয়ে।’ এ ছাড়া কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষার্থীদের উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রে অধিক বিকল্প প্রশ্ন রাখা, পরীক্ষা কেন্দ্রে অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীদের ভিড় এড়াতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়সমূহের পরীক্ষা ভিন্ন ভিন্ন তারিখ ও সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্নপত্রে নম্বর ও সময় সংক্ষিপ্ত করার কারণে ভালো ফল হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষামন্ত্রী।

কমেছে শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

একজন পরীক্ষার্থীও পাস করেনি- এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবছর কমেছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এক অর্থে খুবই স্বস্তিকর যে ১০৪ থেকে এই সংখ্যাটি ১৮-তে নেমে এসেছে। আমরা অনেক দিন থেকে এ বিষয়টায় নজর দিচ্ছি যে, এমন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন থাকবে যে যেখানে একজন শিক্ষার্র্থীও পাস করতে পারবে না।’ যেসব প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি সেই কারণ খুঁজে বের করা হবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অনেক জায়গায় অর্থনৈতিক নানা কারণ থাকে, হয়তো প্রতিষ্ঠানের অবস্থা একেবারেই ভালো নয় বা অন্য কিছু। যে কারণই থাকুক আমরা কারণগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো দূর করবার চেষ্টা করবো।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোভিড-১৯ বিবেচনায় এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থেকে সরাসরি মোবাইল ফোনে ফল প্রাপ্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফল প্রকাশের দিন কোন ধরনের সমাবেশ বা উৎসব না করার নির্দেশনাও দেয়া হয়। গত বছরও সম্পূর্ণ পেপারলেস ফল প্রকাশিত হয়।

ওয়েবসাইটে(িি.িবফঁপধঃরড়হনড়ধৎফৎবংঁষঃং.মড়া.নফ) পরীক্ষার্থীদের রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে এসএসসির ফল পাওয়া যাবে। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে ঝঝঈ লিখে স্পেস দিয়ে শিক্ষা বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০২১ লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে ফল জানা যাবে।

দাখিলের ফল পেতে উধশযরষ লিখে স্পেস দিয়ে গধফ লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০২১ লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠাতে হবে।

কারিগরি বোর্ডের ক্ষেত্রে ঝঝঈ লিখে স্পেস দিয়ে ঞবপ লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০২১ লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠালে ফিরতি এসএমএসে ফল জানা যাবে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অফিস থেকে ফলাফলের কপি সংগ্রহ করা যাবে বলে জানিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

পুনঃনিরীক্ষার আবেদন ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড জানায়, পুনঃনিরীক্ষণের জন্য এসএমএসের মাধ্যমে আজ থেকে ৬ জানুয়ারি আবেদন গ্রহণ করা হবে। আবেদন পদ্ধতি শিক্ষাবোর্ডগুলোর ওয়েবসাইট এবং টেলিটকের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা যাবে। ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, কারিগরি বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম খান এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা উপস্থিত ছিলেন।

শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ , ১৬ পৌষ ১৪২৮ ২৬ জমাদিউল আউয়াল

ইংরেজি ও গণিতের কারণে বেড়েছে পাসের হার

রাকিব উদ্দিন

image

উত্তরা রাজউক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্ররা -সংবাদ

ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে পরীক্ষা না হওয়া এবং জেএসসি পরীক্ষায় ‘ভালো গ্রেড’ থাকায় এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের সব সূচকেই সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এবার ‘জিপিএ-৫’-এর রেকর্ডও হয়েছে।

এই পরীক্ষায় এক বছরেই গড় পাসের হার প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে এবার এই পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এক বছরেই পূর্ণাঙ্গ ‘জিপিএ’ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ৪৭ হাজার ৪৪২ জন।

এবছর এই পরীক্ষায় মোট এক লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন শিক্ষার্থী ‘জিপিএ-৫’ অর্থাৎ গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ’ পেয়েছে। গত বছর এই পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন।

এ হিসাবে গড় পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই ক্ষেত্রেই এবার সর্বোচ্চ ফল লাভ করেছে শিক্ষার্থীরা। এর আগে মাধ্যমিক স্তরের এই পরীক্ষা সর্বোচ্চ ফল অর্জন হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই বছর সব বোর্ড মিলিয়ে গড় পাসের হার ছিল ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ; এতদিন সেটাই ছিল সর্বোচ্চ।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. এসএম আমিরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘সাধারণত ইংরেজি ও গণিত বিষয়েই শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করে থাকে। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে এবার সংক্ষিপ্ত সিলবাসে পরীক্ষা নেয়া হয়েছে; এবং ইংরেজি ও গণিতে পরীক্ষা হয়নি। এ কারণে এবার পাসের হার বেড়েছে। এ ছাড়া জেএসসি-জেডিসিতে ভালো গ্রেড থাকায় সেটিও ভালো ফলাফলে ভূমিকা রেখেছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি নতুন বছরের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানেই ফল প্রকাশ করা হয়। সেখানেই সকাল ১১টায় সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

সাধারণত গত ১০/১২ বছর ধরেই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে শুরু হয়ে আসছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির প্রথমদিকে গতবছর এই পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হলেও এবার তা ৯ মাস পিছিয়ে যায়।

তাছাড়া করোনা মহামারীর কারণে টানা প্রায় দেড় বছর দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। দশম শ্রেণিতে মাত্র চার মাস সরাসরি ক্লাস করার সুযোগ পায় পরীক্ষার্র্থীরা। প্রায় ৯ মাস পিছিয়ে গত ১৪ নভেম্বর এ পরীক্ষা শুরু হয়।

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় এবার পরীক্ষা হয়েছে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে। তিন ঘণ্টার পরিবর্তে দেড় ঘণ্টায় পরীক্ষা নেয়া হয়। শুধুমাত্র তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ের পরীক্ষায় বসতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এ কারণে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়গুলোতে এবার পরীক্ষা না নিয়ে আগের পাবলিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২২ লাখ ৪০ হাজার ৩৯৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ৫৪৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। এ হিসেবে গড় পাসের হার ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম সংবাদকে বলেন, ‘বাংলা, ইংরেজি ও গণিত এগুলো বেসিক সাবজেক্ট। এসব বিষয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে হলেও পরীক্ষা নেয়া হলে ভালো হতো। এরপরও যেহেতু পরীক্ষা নেয়া হয়নি; সে ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পোষাতে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু এই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে কি-না আমার জানা নেই।’

সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ে ফল

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এবছর শুধুমাত্র তিনটি নৈর্বচনিক বিষয়ে পরীক্ষার্র্থীরা অংশগ্রহণ করেছে। অবশিষ্ট বিষয়গুলোর নম্বর জেএসসি/জেডিসি থেকে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। চতুর্থ বিষয়ের ক্ষেত্রে, যে তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ের পরীক্ষা নেয়া হয় সেসব বিষয় ব্যতীত চতুর্থ বিষয়ের সঙ্গে সামজস্যপূর্ণ জেএসসি/জেডিসি পর্যায়ের আবশ্যিক বিষয় হতে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চতুর্থ বিষয় উচ্চতর গণিতের ক্ষেত্রে জেএসসি/জেডিসির গণিত বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর এবং চতুর্থ বিষয় জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জেএসসি/জেডিসির বিজ্ঞানের প্রাপ্ত নম্বর সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর মূল্যায়ন

গত বছরের তুলনায় এবছর ফলের সূচকে বেশকিছু ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি বলেন, ‘এর পেছনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমন-বিনামূল্যে সঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়া, টেলিভিশনে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠদান প্রচার।’

শিক্ষার উপকরণ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার ও সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা পরিচালনায় ভালো ফল অর্জনে অবদান রেখেছে মন্তব্য করে মন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট এবং পরীক্ষার আগে দুই মাস শ্রেণী কার্যক্রম চলমান রাখা হয়েছে। এই পরীক্ষার জন্য সিলেবাস পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

পাসের হার ও জিপিএ-৫ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘পাসের হার যে বেড়েছে সেটার কারণ হতে পারে এবার পরীক্ষায় তিনটি বিষয়ে নিয়েছি, সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে নিয়েছি, প্রশ্নপত্রের বিকল্প অনেক বেশি ছিল। এসব কারণে পরীক্ষার্থীরা অনেক বেশি ভালো করেছে অন্য সময়ের চেয়ে।’ এ ছাড়া কোভিড পরিস্থিতি বিবেচনায় পরীক্ষার্থীদের উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রে অধিক বিকল্প প্রশ্ন রাখা, পরীক্ষা কেন্দ্রে অভিভাবক ও পরীক্ষার্থীদের ভিড় এড়াতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার বিষয়সমূহের পরীক্ষা ভিন্ন ভিন্ন তারিখ ও সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্নপত্রে নম্বর ও সময় সংক্ষিপ্ত করার কারণে ভালো ফল হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষামন্ত্রী।

কমেছে শূন্য পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

একজন পরীক্ষার্থীও পাস করেনি- এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবছর কমেছে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এক অর্থে খুবই স্বস্তিকর যে ১০৪ থেকে এই সংখ্যাটি ১৮-তে নেমে এসেছে। আমরা অনেক দিন থেকে এ বিষয়টায় নজর দিচ্ছি যে, এমন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন থাকবে যে যেখানে একজন শিক্ষার্র্থীও পাস করতে পারবে না।’ যেসব প্রতিষ্ঠানে কেউ পাস করেনি সেই কারণ খুঁজে বের করা হবে জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অনেক জায়গায় অর্থনৈতিক নানা কারণ থাকে, হয়তো প্রতিষ্ঠানের অবস্থা একেবারেই ভালো নয় বা অন্য কিছু। যে কারণই থাকুক আমরা কারণগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো দূর করবার চেষ্টা করবো।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোভিড-১৯ বিবেচনায় এবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘরে থেকে সরাসরি মোবাইল ফোনে ফল প্রাপ্তির ব্যবস্থা নেয়া হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফল প্রকাশের দিন কোন ধরনের সমাবেশ বা উৎসব না করার নির্দেশনাও দেয়া হয়। গত বছরও সম্পূর্ণ পেপারলেস ফল প্রকাশিত হয়।

ওয়েবসাইটে(িি.িবফঁপধঃরড়হনড়ধৎফৎবংঁষঃং.মড়া.নফ) পরীক্ষার্থীদের রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দিয়ে এসএসসির ফল পাওয়া যাবে। মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে ঝঝঈ লিখে স্পেস দিয়ে শিক্ষা বোর্ডের নামের প্রথম তিন অক্ষর লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০২১ লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠাতে হবে। ফিরতি এসএমএসে ফল জানা যাবে।

দাখিলের ফল পেতে উধশযরষ লিখে স্পেস দিয়ে গধফ লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০২১ লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠাতে হবে।

কারিগরি বোর্ডের ক্ষেত্রে ঝঝঈ লিখে স্পেস দিয়ে ঞবপ লিখে স্পেস দিয়ে রোল নম্বর লিখে স্পেস দিয়ে ২০২১ লিখে ১৬২২২ নম্বরে পাঠালে ফিরতি এসএমএসে ফল জানা যাবে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অফিস থেকে ফলাফলের কপি সংগ্রহ করা যাবে বলে জানিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড।

পুনঃনিরীক্ষার আবেদন ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড জানায়, পুনঃনিরীক্ষণের জন্য এসএমএসের মাধ্যমে আজ থেকে ৬ জানুয়ারি আবেদন গ্রহণ করা হবে। আবেদন পদ্ধতি শিক্ষাবোর্ডগুলোর ওয়েবসাইট এবং টেলিটকের বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা যাবে। ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, কারিগরি বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম খান এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা উপস্থিত ছিলেন।