‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...’

এম এ কবীর

কালের প্রবাহে বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটে, সম্ভবত তার তাৎপর্য ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ভাষণ ছিল জনগণের জন্য ইতিহাস ও সমকাল সম্পর্কে জানার মুক্তমঞ্চ। ছাত্র-তরুণ থেকে সাধারণ কৃষক-শ্রমিক এমন আয়োজন থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য জানতে পারতেন। নিজেদের চলার পথের দিশাও পেতেন। জনগণের জন্য বড় সুযোগ ছিল অভিজ্ঞ নেতাদের সংস্পর্শ, তাদের ঘরোয়া বৈঠকের আলাপচারিতা।

ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে ব্যাপক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধির উচ্চহার বা মাথাপিছু গড় আয়ের বিপুল বৃদ্ধি সত্ত্বেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য শুধুই বাড়ছে। বাড়ছে ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন। দূরকল্পনা সুবিচারপ্রাপ্তি। এখন একজন রাজনীতিক গণবিচ্ছিন্ন দূরের মানুষ। রাজনীতির ময়দানে সাধারণের স্থান সংকুচিত। রাজনীতি এখন সম্পন্ন মানুষের ক্ষমতাচর্চার এবং উচ্চাভিলাষীর সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের অবলম্বন মাত্র। তাদের প্রয়োজন টাকা, সাদা বা কালো যাই হোক। প্রয়োজন বিত্ত। বৈধ বা অবৈধ যাই হোক। সফল রাজনীতিকের লক্ষণ হলো তাকে ঘিরে থাকবে অসংখ্য উমেদার-চাটুকার, কৃপাপ্রার্থী- তিনি যেন মৌচাক, ক্ষমতা আর বিত্তের ভান্ডার।

যে রাজনীতি গণতন্ত্রকে লালন করে, তার অবসান হয়েছে। নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন, সাংস্কৃতিক জগত, নাগরিকের স্বাভাবিক বিনোদন সবই ক্ষীয়মাণ। নানামুখী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে থেকে কোনো সমাজের পক্ষেই তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে বিচ্ছিন্ন কিছু স্ফুলিঙ্গের প্রকাশ আমাদের চমকিত করলেও তা সর্বসাধারণের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত জীবনবিকাশের কোনো প্রমাণ দেয় না। সাংবিধানিক অভিপ্রায়কে সমকালীনতা দান এবং জাতীয় বিকাশের যাত্রাপথ নিয়ে অন্তত মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ইতিহাসের এ মহৎ সন্ধিক্ষণে একবার থেমে পেছনে ফিরে চিন্তাশীল মানুষদের ভাবা দরকার, দেশ ও বিশে^র পরিবর্তিত বাস্তবতায় আমাদের ঘোষিত নীতির কী ব্যাখ্যা হবে, কোথায় পরিমার্জন প্রয়োজন, কোথায় বা নতুন সংযোজন দরকার। দেশের নানা ক্ষেত্রে চমকপ্রদ উন্নতি দেখে খুশি হওয়া যায়, তাতে বিভোর হওয়ার উপায় নেই। কেননা তাতে সংকট বাড়বে, উন্নত হয়েও সুশাসন অধরা থেকে যাবে।

চারদিকে ঘোর অন্ধকার। আলোর দেখা নেই। একের পর এক অঘটন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ক্ষমতাবানরা যে যেভাবে পারছে, যা ইচ্ছে তাই করছে। কেউ কালোবাজারি, কেউ নারী পাচারকারী, কেউ টাকা পাচারকারী, কেউ লুটপাটকারী, কেউ দুর্নীতিবাজ, কেউ নির্যাতনকারী, অসাধু চক্রের হরিলুট প্রকল্প, অনুৎপাদনশীল খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, বনখেকো, নদীখেকো, অবৈধ দখলদার, মাদক কারবারি, চোরা কারবারি, আইনের অপপ্রয়োগকারী যে যা পারছে করছে। আবার এরা সবাই সাধু, এরা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণে অকারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট। আজ চালের দাম বৃদ্ধি তো কাল তেলের, পরশু ডাল পেঁয়াজ রসুন চিনি এভাবেই বেড়ে চলছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য। পকেট ফাঁকা হচ্ছে জনগণের। ভোগান্তি বাড়ছে অসহনীয়ভাবে। নৈতিকতা, মূল্যবোধ অবক্ষয়ের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ঘুষ এখন স্পিড মানি। কোথাও কোথাও বকশিশ। হাসপাতাল থেকে লাশ বের করতেও লাগে বকশিশ। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমি, বিদ্যুৎ সেবার পরিবর্তে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হয়েছে।

যেই কৃষক-শ্রমিকের সুস্থতার সঙ্গে দেশের উন্নতি সম্পৃক্ত তাদের সুস্থতার প্রতি যেন সবাই বে-খেয়াল। ক্ষমতায় যেতে যারা উদগ্রীব তারাও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল নয়। তাদের দাবিগুলোও জনমুখী নয়। তারা জনসমস্যাগুলোকে পরোক্ষভাবে আড়াল করার চেষ্টা করে। জনসংকটগুলো ধীরে ধীরে ঘনীভূত হচ্ছে। যতই উন্নতি হচ্ছে ততই বৈষম্য বাড়ছে। প্রবাসী শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যাদের রেমিটেন্সে অর্থনীতির চাকা সচল, রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তারা অবহেলিত উপেক্ষিত। রক্তে কেনা সোনার বাংলায় এ ঘোর অন্ধকার কোনোভাবেই কাম্য নয়।

মাঝ নদীতে দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে লঞ্চ। মানুষের আহাজারি। কেউ পুড়ে মরছে। কেউ পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। কেউ ফেলে আসা সন্তান, প্রিয়জনকে খুঁজতে আগুনেও ঝাঁপ দিচ্ছে। এ ঘাটে ভিড়তে চায় তো ওই ঘাটে ভিড়তে চায়। ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ ডাকে মাঝরাতে আশপাশের গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙে। আগুনের তীব্রতায় লাল নদী। পানি নয়, যেন বয়ে যায় রক্ত স্রোত। যুগের পর যুগ লঞ্চে বরিশালগামী কোনো মানুষও প্রথম দেখায় বিশ্বাস করতে চাইবে না, সেখানকারই কোনো নদীতে কোনো লঞ্চের লোমহর্ষক দৃশ্য এটি। যখন নদীর ভরা যৌবন নেই, উত্তাল ঢেউ নেই, প্রবল স্রোতে নেই, ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠেছে ডুবোচর তখনই কিনা এমন কেয়ামত ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে। চারদিকে থই থই পানিতে এ কেমন কারবালা!

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী লঞ্চে যাত্রী ছিল হাজারখানেক। শীতের রাতে বেশির ভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে। কত মানুষ মরেছে, সে হিসাব কি আদৌ জানা যাবে? কেবিনে কেবিনে হাড়গোড় আর খুলি পড়ে আছে, একটা শরীর কতটুকু জ্বললে তার হাড়গোড় সাদা হয়ে যায় জানি না। ঝালকাঠির মিনিপার্কে গাছের নিচে সারি সারি লাশের সাদা ব্যাগ। সেসবের ভেতরে আদৌ কি কোনো লাশ আছে! এক ভিডিওতে উদ্ধারকর্মীদের দেখা গেল ব্যাগের ভেতর স্রেফ কয়লার স্তূপ ঢোকাতে।

স্বজনের আহাজারি ও লাশ নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য, তদন্ত কমিটি গঠন ও কিছু টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, জাহাজের কী ত্রুটি ছিল, জাহাজের নকশা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান এসব নিয়েই কিছুদিন খবর, প্রতিবেদন, টক শো, কলম চলবে। কিছু লাশ বেওয়ারিশ দাফন হয়ে যাবে, কিছু লাশ পড়ে থাকবে ডিএনএ টেস্টের জন্য মর্গে, কোনো লাশ খুঁজেও পাওয়া যাবে না কখনো, কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ঠান্ডায় মারা গিয়ে নদীতেই ভেসে গেছে। ট্রলার নিয়ে ছুটে যাওয়া পাড়ের মানুষেরাই বলেছেন, অনেক শিশু লাফ দিয়ে পানিতে পড়তে না পড়তেই হারিয়ে গেছে। আগে স্ত্রী-সন্তান নাকি মা কিংবা বাবাকে বাঁচাবেন এই দ্বন্দ্বে পড়ে কাউকে বাঁচাতে পারা, কাউকে না পারা ব্যক্তির যন্ত্রণা কী আমরা কখনো দেখব?

শত শত কোটি টাকার উৎসব হয় একের পর এক। অথচ এই দেশে সড়ক, রেল, নৌ- কোনো পথেই নিরাপদ যোগাযোগ গড়ে উঠে না। হয় রাস্তায় পিষে মরো, নয় পানিতে মরো, নয় পুড়ে মরো। পালিয়ে গিয়েও কী মেলে মুক্তি? অনেকে তো ভূমধ্যসাগরেই ডুবে মরছে, নয়তো বিদেশের জেলখানা, যৌনপল্লীতে পচে মরছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়েই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিল এমভি অভিযাত্রী-১০। যাত্রীরাই বলেছেন, শুরু থেকেই ছিল বেপরোয়া গতি। ত্রুটি থাকায় টেকনিশিয়ানরা ইঞ্জিন মেরামতের কাজ করছিলেন। এজন্য পুরো গতিতে দুটি ইঞ্জিন চালিয়ে ট্রায়াল দেয়া হচ্ছিল। আর এতেই মূলত ইঞ্জিনের অতিরিক্ত তাপে আগুন ধরে যায়। আগুন লেগে যাওয়ার পর নেভানোর কোনো চেষ্টা না করে লঞ্চটির শ্রমিক-কর্মচারী ও মালিক লঞ্চ থেকে সটকে পড়েন। অথচ যাত্রী ছাড়াই সেই ট্রায়াল হওয়ার কথা ছিল যাত্রার আগে। আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে তীরে ভেড়াতেও ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে।

একটা অব্যবস্থাপনা যে আরও কত অব্যবস্থাপনাকে উন্মোচন করে! বরিশাল বিভাগে এত বড় হাসপাতাল এত বড় মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট বন্ধ হয়ে আছে দুই বছর ধরে। দগ্ধ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বরগুনা থেকে এত দূর ঢাকায় বার্ন ইনস্টিটিউটে আনতে হয়। পথেই শেষ হয়ে যায় এক শিশুর বাকিটুকু প্রাণ।

এটা কি স্রেফ দুর্ঘটনা? এটা যে কাঠামোগত হত্যা, সেটা নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হয় না। লঞ্চ পরিদর্শনে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এর পেছনে কোনো রহস্য থাকতে পারে। কারণ এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু সেটিই কি হওয়ার কথা ছিল না! ‘সব অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার’ এ অব্যবস্থাপনা কি তিলে তিলে তৈরি হয়নি? লঞ্চের মালিক বলেছেন, গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়েছিল। তবে সেজন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেয়া হয়নি। এ অনুমতি না নেয়ার সংস্কৃতি কেন গড়ে উঠল, কারা তৈরি করল? বেশির ভাগ লঞ্চে পুরনো ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মূলত সমুদ্রগামী জাহাজের জেনারেটর ইঞ্জিন। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ছিল লঞ্চটিতে। এ কারণে লাইফ জ্যাকেটও সবার পাওয়ার কথা নয়। এটা তো ঈদের মৌসুম নয় যে, অতিরিক্ত যাত্রী নিতে হবে। মুনাফার লোভে অন্ধ লঞ্চ মালিকরা প্রতিদিন সেটিই করে আসছেন। ঢাকা-বরগুনা পথে ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট থাকলেও মালিকরা রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চ পরিচালনা করেন। এ পদ্ধতির কারণে যাত্রীর চাপ থাকলেও প্রতিদিন উভয়প্রান্ত থেকে মাত্র দুটি লঞ্চ চালানো হয়। লঞ্চে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, বালুর বাক্স, ফায়ার বাকেট ও পানির পাম্প ছিল। আবার লঞ্চ মালিকই বলেছেন, লঞ্চ কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছিল কিনা, তিনি জানেন না। মূলত প্রশিক্ষণের বিষয়টি তো থাকে কাগজে-কলমে। প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির দায়িত্বে থাকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ, যাদের সবার ওপরে আছে নৌ মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি তো আছেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রভাষক ইমরান উদ্দিন বলছেন, অনেকবার সুপারিশে অগ্নিনির্বাপণের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হলেও কখনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সুপারিশগুলোও কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যান্য দেশে তিন বা ছয় মাস পর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকে। তা না হলে লঞ্চের নিবন্ধন নবায়ন হয় না। আসলে পুরো ব্যবস্থাই তো ত্রুটিপূর্ণ। ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে সেটা একেক সময় একেকভাবে প্রকাশ পায়।

সাদা কুয়াশা আর নিকষ অন্ধকার নদী চিরে জ্বলছে বিশাল লঞ্চ। কোনো সিনেমার দৃশ্যই মনে হবে। আদতে বাস্তবিক জীবনের অস্তিত্ব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আর একের পর এক সিনেমার স্ক্রিনে নিজেদেরই দেখে চলেছি আমরা। কোনো দৃশ্যে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স, একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার বা আইসিইউ সিট পেতে আরেকজনের মৃত্যু কামনা। কোনো দৃশ্যে ময়লার ট্রাক আমাদের পিষে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো দৃশ্যে বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভেতরে সাউন্ডবক্সে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে বা সমুদ্র সৈকত থেকে তুলে নিয়ে চলছে ধর্ষণ। কোনে দৃশ্যে নিজের মোটরবাইকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে তরুণ। কোনো দৃশ্যে ক্ষুধার জ্বালায় স্ত্রী-সন্তানকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করছে কেউ। কোনো দৃশ্যে ঘরের সামনে মাইক্রোবাস এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কাউকে। কোনো দৃশ্যে শুধু গুলির আওয়াজ আর ব্যাকগ্রাউন্ডে কান্না- আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে! আহ্?, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...’।

মুক্তচিন্তা চর্চার পরিবেশ বজায় রাখতে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হতে হয়। সংবিধান স্বীকৃত খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হয় রাষ্ট্রকেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক, বিচারিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হয় রাষ্ট্রকেই। দুর্নীতিবাজরা রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়। আরো বেশি শিকড় গজানোর আগেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে সোনার বাংলা গড়তে এদের উৎখাত প্রয়োজন। ঘোর অন্ধকার দূর করে আলোর পথ ধরে চলতে যে কোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ করে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের হতে হবে যূথবদ্ধ।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]

শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ , ১৬ পৌষ ১৪২৮ ২৬ জমাদিউল আউয়াল

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...’

এম এ কবীর

কালের প্রবাহে বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটে, সম্ভবত তার তাৎপর্য ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ভাষণ ছিল জনগণের জন্য ইতিহাস ও সমকাল সম্পর্কে জানার মুক্তমঞ্চ। ছাত্র-তরুণ থেকে সাধারণ কৃষক-শ্রমিক এমন আয়োজন থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য জানতে পারতেন। নিজেদের চলার পথের দিশাও পেতেন। জনগণের জন্য বড় সুযোগ ছিল অভিজ্ঞ নেতাদের সংস্পর্শ, তাদের ঘরোয়া বৈঠকের আলাপচারিতা।

ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের যে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলছে, তাতে ব্যাপক উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধির উচ্চহার বা মাথাপিছু গড় আয়ের বিপুল বৃদ্ধি সত্ত্বেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য শুধুই বাড়ছে। বাড়ছে ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন। দূরকল্পনা সুবিচারপ্রাপ্তি। এখন একজন রাজনীতিক গণবিচ্ছিন্ন দূরের মানুষ। রাজনীতির ময়দানে সাধারণের স্থান সংকুচিত। রাজনীতি এখন সম্পন্ন মানুষের ক্ষমতাচর্চার এবং উচ্চাভিলাষীর সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের অবলম্বন মাত্র। তাদের প্রয়োজন টাকা, সাদা বা কালো যাই হোক। প্রয়োজন বিত্ত। বৈধ বা অবৈধ যাই হোক। সফল রাজনীতিকের লক্ষণ হলো তাকে ঘিরে থাকবে অসংখ্য উমেদার-চাটুকার, কৃপাপ্রার্থী- তিনি যেন মৌচাক, ক্ষমতা আর বিত্তের ভান্ডার।

যে রাজনীতি গণতন্ত্রকে লালন করে, তার অবসান হয়েছে। নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন, সাংস্কৃতিক জগত, নাগরিকের স্বাভাবিক বিনোদন সবই ক্ষীয়মাণ। নানামুখী ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে থেকে কোনো সমাজের পক্ষেই তার সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে বিচ্ছিন্ন কিছু স্ফুলিঙ্গের প্রকাশ আমাদের চমকিত করলেও তা সর্বসাধারণের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত জীবনবিকাশের কোনো প্রমাণ দেয় না। সাংবিধানিক অভিপ্রায়কে সমকালীনতা দান এবং জাতীয় বিকাশের যাত্রাপথ নিয়ে অন্তত মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

ইতিহাসের এ মহৎ সন্ধিক্ষণে একবার থেমে পেছনে ফিরে চিন্তাশীল মানুষদের ভাবা দরকার, দেশ ও বিশে^র পরিবর্তিত বাস্তবতায় আমাদের ঘোষিত নীতির কী ব্যাখ্যা হবে, কোথায় পরিমার্জন প্রয়োজন, কোথায় বা নতুন সংযোজন দরকার। দেশের নানা ক্ষেত্রে চমকপ্রদ উন্নতি দেখে খুশি হওয়া যায়, তাতে বিভোর হওয়ার উপায় নেই। কেননা তাতে সংকট বাড়বে, উন্নত হয়েও সুশাসন অধরা থেকে যাবে।

চারদিকে ঘোর অন্ধকার। আলোর দেখা নেই। একের পর এক অঘটন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। ক্ষমতাবানরা যে যেভাবে পারছে, যা ইচ্ছে তাই করছে। কেউ কালোবাজারি, কেউ নারী পাচারকারী, কেউ টাকা পাচারকারী, কেউ লুটপাটকারী, কেউ দুর্নীতিবাজ, কেউ নির্যাতনকারী, অসাধু চক্রের হরিলুট প্রকল্প, অনুৎপাদনশীল খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, বনখেকো, নদীখেকো, অবৈধ দখলদার, মাদক কারবারি, চোরা কারবারি, আইনের অপপ্রয়োগকারী যে যা পারছে করছে। আবার এরা সবাই সাধু, এরা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণে অকারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজার নিয়ন্ত্রণে সিন্ডিকেট। আজ চালের দাম বৃদ্ধি তো কাল তেলের, পরশু ডাল পেঁয়াজ রসুন চিনি এভাবেই বেড়ে চলছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য। পকেট ফাঁকা হচ্ছে জনগণের। ভোগান্তি বাড়ছে অসহনীয়ভাবে। নৈতিকতা, মূল্যবোধ অবক্ষয়ের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ঘুষ এখন স্পিড মানি। কোথাও কোথাও বকশিশ। হাসপাতাল থেকে লাশ বের করতেও লাগে বকশিশ। শিক্ষা, চিকিৎসা, ভূমি, বিদ্যুৎ সেবার পরিবর্তে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হয়েছে।

যেই কৃষক-শ্রমিকের সুস্থতার সঙ্গে দেশের উন্নতি সম্পৃক্ত তাদের সুস্থতার প্রতি যেন সবাই বে-খেয়াল। ক্ষমতায় যেতে যারা উদগ্রীব তারাও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বশীল নয়। তাদের দাবিগুলোও জনমুখী নয়। তারা জনসমস্যাগুলোকে পরোক্ষভাবে আড়াল করার চেষ্টা করে। জনসংকটগুলো ধীরে ধীরে ঘনীভূত হচ্ছে। যতই উন্নতি হচ্ছে ততই বৈষম্য বাড়ছে। প্রবাসী শ্রমিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যাদের রেমিটেন্সে অর্থনীতির চাকা সচল, রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় তারা অবহেলিত উপেক্ষিত। রক্তে কেনা সোনার বাংলায় এ ঘোর অন্ধকার কোনোভাবেই কাম্য নয়।

মাঝ নদীতে দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে লঞ্চ। মানুষের আহাজারি। কেউ পুড়ে মরছে। কেউ পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। কেউ ফেলে আসা সন্তান, প্রিয়জনকে খুঁজতে আগুনেও ঝাঁপ দিচ্ছে। এ ঘাটে ভিড়তে চায় তো ওই ঘাটে ভিড়তে চায়। ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ ডাকে মাঝরাতে আশপাশের গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙে। আগুনের তীব্রতায় লাল নদী। পানি নয়, যেন বয়ে যায় রক্ত স্রোত। যুগের পর যুগ লঞ্চে বরিশালগামী কোনো মানুষও প্রথম দেখায় বিশ্বাস করতে চাইবে না, সেখানকারই কোনো নদীতে কোনো লঞ্চের লোমহর্ষক দৃশ্য এটি। যখন নদীর ভরা যৌবন নেই, উত্তাল ঢেউ নেই, প্রবল স্রোতে নেই, ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠেছে ডুবোচর তখনই কিনা এমন কেয়ামত ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে। চারদিকে থই থই পানিতে এ কেমন কারবালা!

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী লঞ্চে যাত্রী ছিল হাজারখানেক। শীতের রাতে বেশির ভাগ যাত্রী তখন ঘুমিয়ে। কত মানুষ মরেছে, সে হিসাব কি আদৌ জানা যাবে? কেবিনে কেবিনে হাড়গোড় আর খুলি পড়ে আছে, একটা শরীর কতটুকু জ্বললে তার হাড়গোড় সাদা হয়ে যায় জানি না। ঝালকাঠির মিনিপার্কে গাছের নিচে সারি সারি লাশের সাদা ব্যাগ। সেসবের ভেতরে আদৌ কি কোনো লাশ আছে! এক ভিডিওতে উদ্ধারকর্মীদের দেখা গেল ব্যাগের ভেতর স্রেফ কয়লার স্তূপ ঢোকাতে।

স্বজনের আহাজারি ও লাশ নিয়ে ঘরে ফেরার দৃশ্য, তদন্ত কমিটি গঠন ও কিছু টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, জাহাজের কী ত্রুটি ছিল, জাহাজের নকশা নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান এসব নিয়েই কিছুদিন খবর, প্রতিবেদন, টক শো, কলম চলবে। কিছু লাশ বেওয়ারিশ দাফন হয়ে যাবে, কিছু লাশ পড়ে থাকবে ডিএনএ টেস্টের জন্য মর্গে, কোনো লাশ খুঁজেও পাওয়া যাবে না কখনো, কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ঠান্ডায় মারা গিয়ে নদীতেই ভেসে গেছে। ট্রলার নিয়ে ছুটে যাওয়া পাড়ের মানুষেরাই বলেছেন, অনেক শিশু লাফ দিয়ে পানিতে পড়তে না পড়তেই হারিয়ে গেছে। আগে স্ত্রী-সন্তান নাকি মা কিংবা বাবাকে বাঁচাবেন এই দ্বন্দ্বে পড়ে কাউকে বাঁচাতে পারা, কাউকে না পারা ব্যক্তির যন্ত্রণা কী আমরা কখনো দেখব?

শত শত কোটি টাকার উৎসব হয় একের পর এক। অথচ এই দেশে সড়ক, রেল, নৌ- কোনো পথেই নিরাপদ যোগাযোগ গড়ে উঠে না। হয় রাস্তায় পিষে মরো, নয় পানিতে মরো, নয় পুড়ে মরো। পালিয়ে গিয়েও কী মেলে মুক্তি? অনেকে তো ভূমধ্যসাগরেই ডুবে মরছে, নয়তো বিদেশের জেলখানা, যৌনপল্লীতে পচে মরছে।

যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়েই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিল এমভি অভিযাত্রী-১০। যাত্রীরাই বলেছেন, শুরু থেকেই ছিল বেপরোয়া গতি। ত্রুটি থাকায় টেকনিশিয়ানরা ইঞ্জিন মেরামতের কাজ করছিলেন। এজন্য পুরো গতিতে দুটি ইঞ্জিন চালিয়ে ট্রায়াল দেয়া হচ্ছিল। আর এতেই মূলত ইঞ্জিনের অতিরিক্ত তাপে আগুন ধরে যায়। আগুন লেগে যাওয়ার পর নেভানোর কোনো চেষ্টা না করে লঞ্চটির শ্রমিক-কর্মচারী ও মালিক লঞ্চ থেকে সটকে পড়েন। অথচ যাত্রী ছাড়াই সেই ট্রায়াল হওয়ার কথা ছিল যাত্রার আগে। আগুন লাগার পর লঞ্চটিকে তীরে ভেড়াতেও ৪৫ মিনিটের বেশি সময় লাগে।

একটা অব্যবস্থাপনা যে আরও কত অব্যবস্থাপনাকে উন্মোচন করে! বরিশাল বিভাগে এত বড় হাসপাতাল এত বড় মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট বন্ধ হয়ে আছে দুই বছর ধরে। দগ্ধ মানুষকে চিকিৎসার জন্য বরগুনা থেকে এত দূর ঢাকায় বার্ন ইনস্টিটিউটে আনতে হয়। পথেই শেষ হয়ে যায় এক শিশুর বাকিটুকু প্রাণ।

এটা কি স্রেফ দুর্ঘটনা? এটা যে কাঠামোগত হত্যা, সেটা নিশ্চয়ই কাউকে বলে দিতে হয় না। লঞ্চ পরিদর্শনে এসে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এর পেছনে কোনো রহস্য থাকতে পারে। কারণ এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। কিন্তু সেটিই কি হওয়ার কথা ছিল না! ‘সব অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার’ এ অব্যবস্থাপনা কি তিলে তিলে তৈরি হয়নি? লঞ্চের মালিক বলেছেন, গত অক্টোবর মাসে ইঞ্জিন বদলানো হয়েছিল। তবে সেজন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে অনুমতি নেয়া হয়নি। এ অনুমতি না নেয়ার সংস্কৃতি কেন গড়ে উঠল, কারা তৈরি করল? বেশির ভাগ লঞ্চে পুরনো ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়, যেগুলো মূলত সমুদ্রগামী জাহাজের জেনারেটর ইঞ্জিন। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী ছিল লঞ্চটিতে। এ কারণে লাইফ জ্যাকেটও সবার পাওয়ার কথা নয়। এটা তো ঈদের মৌসুম নয় যে, অতিরিক্ত যাত্রী নিতে হবে। মুনাফার লোভে অন্ধ লঞ্চ মালিকরা প্রতিদিন সেটিই করে আসছেন। ঢাকা-বরগুনা পথে ছয়টি লঞ্চের রুট পারমিট থাকলেও মালিকরা রোটেশন পদ্ধতিতে লঞ্চ পরিচালনা করেন। এ পদ্ধতির কারণে যাত্রীর চাপ থাকলেও প্রতিদিন উভয়প্রান্ত থেকে মাত্র দুটি লঞ্চ চালানো হয়। লঞ্চে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, বালুর বাক্স, ফায়ার বাকেট ও পানির পাম্প ছিল। আবার লঞ্চ মালিকই বলেছেন, লঞ্চ কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ছিল কিনা, তিনি জানেন না। মূলত প্রশিক্ষণের বিষয়টি তো থাকে কাগজে-কলমে। প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত তদারকির দায়িত্বে থাকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ, যাদের সবার ওপরে আছে নৌ মন্ত্রণালয়, সংসদীয় কমিটি তো আছেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রভাষক ইমরান উদ্দিন বলছেন, অনেকবার সুপারিশে অগ্নিনির্বাপণের বিষয়টি নিয়ে কথা বলা হলেও কখনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সুপারিশগুলোও কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যান্য দেশে তিন বা ছয় মাস পর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক থাকে। তা না হলে লঞ্চের নিবন্ধন নবায়ন হয় না। আসলে পুরো ব্যবস্থাই তো ত্রুটিপূর্ণ। ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলে সেটা একেক সময় একেকভাবে প্রকাশ পায়।

সাদা কুয়াশা আর নিকষ অন্ধকার নদী চিরে জ্বলছে বিশাল লঞ্চ। কোনো সিনেমার দৃশ্যই মনে হবে। আদতে বাস্তবিক জীবনের অস্তিত্ব আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আর একের পর এক সিনেমার স্ক্রিনে নিজেদেরই দেখে চলেছি আমরা। কোনো দৃশ্যে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স, একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার বা আইসিইউ সিট পেতে আরেকজনের মৃত্যু কামনা। কোনো দৃশ্যে ময়লার ট্রাক আমাদের পিষে নিয়ে যাচ্ছে। কোনো দৃশ্যে বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভেতরে সাউন্ডবক্সে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে বা সমুদ্র সৈকত থেকে তুলে নিয়ে চলছে ধর্ষণ। কোনে দৃশ্যে নিজের মোটরবাইকে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে তরুণ। কোনো দৃশ্যে ক্ষুধার জ্বালায় স্ত্রী-সন্তানকে মেরে নিজে আত্মহত্যা করছে কেউ। কোনো দৃশ্যে ঘরের সামনে মাইক্রোবাস এসে তুলে নিয়ে যাচ্ছে কাউকে। কোনো দৃশ্যে শুধু গুলির আওয়াজ আর ব্যাকগ্রাউন্ডে কান্না- আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে! আহ্?, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি...’।

মুক্তচিন্তা চর্চার পরিবেশ বজায় রাখতে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগী হতে হয়। সংবিধান স্বীকৃত খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হয় রাষ্ট্রকেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনিক, বিচারিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হয় রাষ্ট্রকেই। দুর্নীতিবাজরা রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নয়। আরো বেশি শিকড় গজানোর আগেই রাষ্ট্রের উন্নয়নের স্বার্থে সোনার বাংলা গড়তে এদের উৎখাত প্রয়োজন। ঘোর অন্ধকার দূর করে আলোর পথ ধরে চলতে যে কোনো মূল্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ করে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের হতে হবে যূথবদ্ধ।

[লেখক : ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সভাপতি, ঝিনাইদহ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটি]