অবিমিশ্র অভিশপ্ত এক বছর

শঙ্কর প্রসাদ দে

একাত্তরের সাক্ষী হিসেবে আমাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী পর্ব। মুক্তিযোদ্ধাদের খুব কাছ থেকে দেখে বুঝেছি, হিসেবি মানুষ যুদ্ধে যায়নি। নিতান্ত বৈষয়িক মানুষ বলে বহুজন মুক্তিযুদ্ধে যাননি। পরবর্তীকালে দেখলাম এরাই লম্বা লম্বা কথা বলছে, বড় বড় নেতা হয়েছে। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আত্মসমর্পণের সংবাদ আকাশবাণী ও বিবিসিতে প্রচার হচ্ছিল। রেডিওকে ঘিরে পুরো কাঁঠালছড়ি ক্যাম্পের আবালবৃদ্ধবনিতার জটলা। বাবা বলছিলেন, বঙ্গে কয়েক শতাব্দীর হিন্দু-মুসলিম বিরোধ সমাপ্ত হলো। ধর্মীয় পরিচয়কে ছাপিয়ে বাঙালিত্বই হবে এ নতুন রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি। ২০২১ সালে এসে বুঝলাম মিছে কথা। স্বাধীনতা কিছু মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে সোনালি দিন। কোটিপতির সংখ্যা দেশে হাজার হাজার। এরাই স্বাধীনতার সোনালি সন্তান। জীবনে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারতেন কিনা সন্দেহ এমন বহু আমলা স্বাধীনতার পর সচিব পর্যন্ত হতে পেরেছেন। কর্নেল হতে পারতেন না, এমন বহু লোক হয়েছেন মেজর জেনারেল। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে পাস করার কথা ছিল না এমন লোক এদেশে মন্ত্রী হয়েছেন। এরা স্বাধীনতার হীরক সন্তান।

স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, পাকিস্তানি কায়দায় এ লুটপাট আর শোষণ প্রক্রিয়া উচ্ছেদ করা না গেলে মুক্তিযুদ্ধই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দেশ গড়ার পথে পা বাড়ালেন। পাকিস্তানপন্থিরা ঐক্যবদ্ধ হলো এই বলে যে, শেখের বেটাকে থামাতে হবে। সেনাকর্তারা সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্যে মেসেজ ছিল- ক্ষমতা নিয়েই এরা বাতিল করল জয় বাংলা, বাংলাদেশ বেতার, বঙ্গবন্ধু আর জাতির পিতা শব্দগুচ্ছ।

নতুন প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না যে, পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই, দীর্ঘ একুশ বছর রেডিও টিভিতে একবারও জয়বাংলা বঙ্গবন্ধু শব্দ উচ্চারিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে হয়নি কোন অনুষ্ঠানমালা। বিটিভিতে সন্ধ্যায় এক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিল বাচ্চু রাজাকার। প্রতিদিন নিত্যনতুন নওমুসলিমকে হাজির করা হতো। দেখতে দেখতে ভাবতাম এজন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? একদিন অনুষ্ঠানটি দেখতে দেখতে এক আত্মীয় বলে উঠলেন, নাহ এ দেশে থাকব না। যেই বলা সেই কাজ। বিরানব্বইয়ে একতরফা হিন্দু নির্যাতনের পর সপরিবারে চলে গেলেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এখন সুভাষ গ্রামে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আমার দুই আত্মীয় সেদিন ফোন করে বলেছেন, কলকাতা গেলেই যেন একনজর দেখে আসি।

কয়েক বছর পরপর এ দেশে হিন্দু পেটানোর জোশ জেগে ওঠে। যে লোক জীবনে বউ পেটানোর সাহস দেখাতে পারেনি, এমন লোকও মিছিল করে মন্দিরে হামলা চালায়। এ দেশে বউ পেটানোর চেয়ে হিন্দু পেটানো সহজ। হিন্দু পিটিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়, সম্পত্তি পাওয়া যায়, ভাগ্য ভালো হলে সুন্দরী মেয়েও পাওয়া যায়। ২০২১ সালে এ কী দেখলাম? বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ একযুগ ধরে ক্ষমতায়। স্বপ্নেও ভাবিনি এমন ন্যক্কারজনক হিন্দু নির্যাতন ঘটবে। হনুমানের কোলের উপর একজন কোরআন রেখে এলো- আর শুরু হলো কোরআন অবমাননার অভিযোগ। শুরু হলো মন্দির আর প্রতিমা ভাঙচুর, মারধর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর হত্যাযজ্ঞ।

এজন্যই শিরোনামে অবিমিশ্র শব্দটি ব্যবহার করেছি। ১৬ ডিসেম্বর একাত্তর হিন্দু-মুসলিম সমস্যায় সমাধান হয়নি। ১৫ আগস্ট পঁচাত্তর মোশতাক-জিয়া-এরশাদ-বেগম জিয়ার উত্থান হলো, বাংলাদেশ হলো পাকিস্তানি ভাবধারার বাংলাদেশ।

দেশে অবশ্যই বহু উন্নয়ন হয়েছে, অথচ বাড়ি গেলে বাজারের হাড্ডিসার লোকগুলো দেখে ভাবি, এত উন্নয়নের অর্থ যায় কোথায়? আসলে স্বাধীনতা সমাজের বৈষম্য কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক লোক ধনী হয়েছে। আমাদের মতো অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত একটু উপরে উঠে মধ্যবিত্ত হয়েছে। গরিবদের অনেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত হয়েছে। একেবারে সহায়-সম্বলহীনরা এখনো হাড্ডিসার, ছিন্নবস্ত্র, শিক্ষাহীন, বিত্তহীন। পঞ্চাশ বছরে ধান, গম, মাছ, সবজি, পোল্ট্রি, গার্মেন্টস, লৌহ, সিমেন্টসহ বহু কিছু উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রবাসীদের আয়সহ রেমিটেন্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কমার কথা ছিল সমাজের বৈষম্য। উল্টো সেটিও বেড়েছে বহুগুণ। এজন্যই বললাম সুবর্ণজয়ন্তী নিয়ে এসেছে অবিমিশ্র দুঃখ সুখের বাতায়ন।

অভিশপ্ত বললাম নিজের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি ধরে। ১৯৭৩, ১৯৭৫, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১, ২০১২, ২০১৬ এর ঘটনাগুলো দেখার পরও দেশ ছাড়ার চিন্তা একবারও মাথায় আসেনি। ২০২১ সালের ঘটনা দেখে আমি স্তম্ভিত। এক বন্ধুর ছেলে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, ভালো চাকরি করে। ইদানীং সে বলছে, কানাডা চলে যাবে। যে কোন বিচারে হিন্দুদের জন্য মহাকালের গর্ভজাত এক অভিশপ্ত সালের নাম ২০২১।

[লেখক : আইনজীবী]

শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ , ১৬ পৌষ ১৪২৮ ২৬ জমাদিউল আউয়াল

অবিমিশ্র অভিশপ্ত এক বছর

শঙ্কর প্রসাদ দে

একাত্তরের সাক্ষী হিসেবে আমাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ সাক্ষী পর্ব। মুক্তিযোদ্ধাদের খুব কাছ থেকে দেখে বুঝেছি, হিসেবি মানুষ যুদ্ধে যায়নি। নিতান্ত বৈষয়িক মানুষ বলে বহুজন মুক্তিযুদ্ধে যাননি। পরবর্তীকালে দেখলাম এরাই লম্বা লম্বা কথা বলছে, বড় বড় নেতা হয়েছে। রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আত্মসমর্পণের সংবাদ আকাশবাণী ও বিবিসিতে প্রচার হচ্ছিল। রেডিওকে ঘিরে পুরো কাঁঠালছড়ি ক্যাম্পের আবালবৃদ্ধবনিতার জটলা। বাবা বলছিলেন, বঙ্গে কয়েক শতাব্দীর হিন্দু-মুসলিম বিরোধ সমাপ্ত হলো। ধর্মীয় পরিচয়কে ছাপিয়ে বাঙালিত্বই হবে এ নতুন রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি। ২০২১ সালে এসে বুঝলাম মিছে কথা। স্বাধীনতা কিছু মানুষের জীবনে নিয়ে এসেছে সোনালি দিন। কোটিপতির সংখ্যা দেশে হাজার হাজার। এরাই স্বাধীনতার সোনালি সন্তান। জীবনে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট হতে পারতেন কিনা সন্দেহ এমন বহু আমলা স্বাধীনতার পর সচিব পর্যন্ত হতে পেরেছেন। কর্নেল হতে পারতেন না, এমন বহু লোক হয়েছেন মেজর জেনারেল। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে পাস করার কথা ছিল না এমন লোক এদেশে মন্ত্রী হয়েছেন। এরা স্বাধীনতার হীরক সন্তান।

স্বাধীনতার তিন বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন, পাকিস্তানি কায়দায় এ লুটপাট আর শোষণ প্রক্রিয়া উচ্ছেদ করা না গেলে মুক্তিযুদ্ধই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দেশ গড়ার পথে পা বাড়ালেন। পাকিস্তানপন্থিরা ঐক্যবদ্ধ হলো এই বলে যে, শেখের বেটাকে থামাতে হবে। সেনাকর্তারা সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্যে মেসেজ ছিল- ক্ষমতা নিয়েই এরা বাতিল করল জয় বাংলা, বাংলাদেশ বেতার, বঙ্গবন্ধু আর জাতির পিতা শব্দগুচ্ছ।

নতুন প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না যে, পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই, দীর্ঘ একুশ বছর রেডিও টিভিতে একবারও জয়বাংলা বঙ্গবন্ধু শব্দ উচ্চারিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে হয়নি কোন অনুষ্ঠানমালা। বিটিভিতে সন্ধ্যায় এক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিল বাচ্চু রাজাকার। প্রতিদিন নিত্যনতুন নওমুসলিমকে হাজির করা হতো। দেখতে দেখতে ভাবতাম এজন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? একদিন অনুষ্ঠানটি দেখতে দেখতে এক আত্মীয় বলে উঠলেন, নাহ এ দেশে থাকব না। যেই বলা সেই কাজ। বিরানব্বইয়ে একতরফা হিন্দু নির্যাতনের পর সপরিবারে চলে গেলেন। জীবনের শেষপ্রান্তে এখন সুভাষ গ্রামে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। আমার দুই আত্মীয় সেদিন ফোন করে বলেছেন, কলকাতা গেলেই যেন একনজর দেখে আসি।

কয়েক বছর পরপর এ দেশে হিন্দু পেটানোর জোশ জেগে ওঠে। যে লোক জীবনে বউ পেটানোর সাহস দেখাতে পারেনি, এমন লোকও মিছিল করে মন্দিরে হামলা চালায়। এ দেশে বউ পেটানোর চেয়ে হিন্দু পেটানো সহজ। হিন্দু পিটিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়, সম্পত্তি পাওয়া যায়, ভাগ্য ভালো হলে সুন্দরী মেয়েও পাওয়া যায়। ২০২১ সালে এ কী দেখলাম? বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ একযুগ ধরে ক্ষমতায়। স্বপ্নেও ভাবিনি এমন ন্যক্কারজনক হিন্দু নির্যাতন ঘটবে। হনুমানের কোলের উপর একজন কোরআন রেখে এলো- আর শুরু হলো কোরআন অবমাননার অভিযোগ। শুরু হলো মন্দির আর প্রতিমা ভাঙচুর, মারধর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ আর হত্যাযজ্ঞ।

এজন্যই শিরোনামে অবিমিশ্র শব্দটি ব্যবহার করেছি। ১৬ ডিসেম্বর একাত্তর হিন্দু-মুসলিম সমস্যায় সমাধান হয়নি। ১৫ আগস্ট পঁচাত্তর মোশতাক-জিয়া-এরশাদ-বেগম জিয়ার উত্থান হলো, বাংলাদেশ হলো পাকিস্তানি ভাবধারার বাংলাদেশ।

দেশে অবশ্যই বহু উন্নয়ন হয়েছে, অথচ বাড়ি গেলে বাজারের হাড্ডিসার লোকগুলো দেখে ভাবি, এত উন্নয়নের অর্থ যায় কোথায়? আসলে স্বাধীনতা সমাজের বৈষম্য কমাতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক লোক ধনী হয়েছে। আমাদের মতো অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত একটু উপরে উঠে মধ্যবিত্ত হয়েছে। গরিবদের অনেকে নিম্ন-মধ্যবিত্ত হয়েছে। একেবারে সহায়-সম্বলহীনরা এখনো হাড্ডিসার, ছিন্নবস্ত্র, শিক্ষাহীন, বিত্তহীন। পঞ্চাশ বছরে ধান, গম, মাছ, সবজি, পোল্ট্রি, গার্মেন্টস, লৌহ, সিমেন্টসহ বহু কিছু উৎপাদনে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। প্রবাসীদের আয়সহ রেমিটেন্স লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। কমার কথা ছিল সমাজের বৈষম্য। উল্টো সেটিও বেড়েছে বহুগুণ। এজন্যই বললাম সুবর্ণজয়ন্তী নিয়ে এসেছে অবিমিশ্র দুঃখ সুখের বাতায়ন।

অভিশপ্ত বললাম নিজের অভিজ্ঞতাকে ভিত্তি ধরে। ১৯৭৩, ১৯৭৫, ১৯৯০, ১৯৯২, ২০০১, ২০১২, ২০১৬ এর ঘটনাগুলো দেখার পরও দেশ ছাড়ার চিন্তা একবারও মাথায় আসেনি। ২০২১ সালের ঘটনা দেখে আমি স্তম্ভিত। এক বন্ধুর ছেলে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, ভালো চাকরি করে। ইদানীং সে বলছে, কানাডা চলে যাবে। যে কোন বিচারে হিন্দুদের জন্য মহাকালের গর্ভজাত এক অভিশপ্ত সালের নাম ২০২১।

[লেখক : আইনজীবী]