বিদায় বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক

বিদায়ি বছরে মহামারী করোনায় জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়লেও বিচারবহির্ভূত হত্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সাম্প্রদায়িতক সহিংসতা, মত প্রকাশের অধিকার লঙ্ঘন, সাংবাদিক নির্যাতন সীমান্ত হত্যাসহ নানা ইস্যুতে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিসকেন্দ্র এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ২০২১ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আসকের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব মো. নূর খান লিটন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মানবাধিকার ইস্যুতে মানুষের সহ্য ক্ষমতা অতিক্রম করেছে। বর্তমান অবস্থাকে বর্বরতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সবমিলিয়ে ২০২১ সালকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরমতম বছর বলা যায়। এ পরিস্থিতি থেকে উন্নতি ঘটাতে মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যারা গত এক যুগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করে দেখবে।

বিচারবহির্ভূত হত্যা

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বরাবারের মতোই বিচারবহির্র্ভূত হত্যা, ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধসহ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাসমূহ অস্বীকার করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেন আমাদের সিস্টেমে কেউ ইচ্ছা করে ক্রসফায়ার বা ইচ্ছে করলে গুলি করতে পারে না। অন্যদিকে আরেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ক্রসফায়ারের সমর্থনে বক্তব্য দেন। সরকারের মন্ত্রীদের এ ধরনের বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ক্রসফায়ারকে উৎসাহিত করে যা প্রকৃতপক্ষে দেশের সংবিধান প্রদত্ত মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার হরণসহ আইনের আশ্রয়লাভ সংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থায় সরকারের দেয়া অঙ্গিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০২১ সালে ৮০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

আসক বলছে, ২০২১ সালে ক্রয়ফায়াসে বিভিন্ন এলাকায় ৫১ জন মারা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে ৮ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের পর শারিরিক নির্যাতনে ৬ জন এবং গ্রেপ্তারের আগে শারীরিক নির্যাতনে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আইনজীবী শারীরিক নির্যাতনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি মারা। এছাড়া ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে মিলন বিকাশ ত্রিপুরা নামের এক বন্দীর মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্যের তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুম :

দেশে গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সরকার গুমের ঘটনা অস্বীকার করে আসছে। ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ৭ জনকে অপহরণ বা গুম করা হয়েছে। এর মধ্যে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও ১ জনের কোন সন্ধান মেলেনি। গুম বা অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ করে র‌্যাব এবং গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। তুলে নেয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়। ২০২১ সালের ৬ নভেম্বর ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ছনকান্দা বটতলা এলাকার ইমাম মাহাদী ডলার নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়া হয়। ওই ঘটনায় ফুলবাড়িয়া থানায় জিডি করা হলেও তার কোন সন্ধান মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই ডলারকে অপহরণ করেছে।

সংখ্যালঘু পরিবারের অধিকার পরিস্থিতি :

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে ২০২১ সাল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২০৪ প্রতীমা, পূজাম-প, মন্দির ভাঙচুর- অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৪৮টি বাড়িঘর, ৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা- ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ১টি বাড়িতে হামলাও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে চাঁদপুরের হাজিগঞ্জে ৫ জন এবং ফেনীতে ১ জন মুসলিম পরিবারের লোক মারা গেছে।

মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণœ সাংবাদিক নির্যাতন :

অন্য বছরের মতো ২০২১ সালেও ভিন্নমতকে দমন করার লক্ষ্যে হয়রানিমূলক মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নানা ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১১৩৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন থানায় ৮৮৩টি মামলা এবং আদালতে ২৫১টি মামলা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, করোনাকালে এবং এর আগে ও পরে পেশগত দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন দল এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রোষানলে পড়ে হামলা, মামলাসহ নানাভাবে নির্যতানের শিকার হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। আসকের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ২১০ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একপক্ষের গুলিতে নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে মোজাক্কির নামের এক সাংবাদিক মারা গেছেন।

সভা সমাবেশে বাধাদান :

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংবিধানের ৩৭ ধারা অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সভা সমাবেশে যোগ দেয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু ২০২১ সালের বছরে বিরোধী দলগুলোকে কর্মসূচির অনুমতি না দেয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধাদানের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া দাবির আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে। ৪ মার্চ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে খুলনায় সমাবেশে পুলিশ বাধা দিয়েছে।

সীমান্ত হত্যা :

২০২১ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে বিভিন্ন সীমান্তে ১৬ জনসহ মোটা ১৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিভিন্ন সময়ে ভারত প্রতিশ্রতি দিলেও কোন বাস্তবায়ন হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা, ২০২১ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩২১ নারী। এরমধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ১২৮ নারী। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৭৭ পুরুষ। উত্ত্যক্তকরণে আত্মহত্যা করেছেন ১২ নারী। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ৫ পুরুষসহ খুন হয়েছেন মোট ৮ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৪০ নারী। যার মধ্যে নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন ৩৭২ জন ও আত্মহত্যা করেছেন ১৪২ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২১০ নারী। এরমধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হন ৭২ নারী ও আত্মহত্যা করেন ১৩ নারী। শালিস ও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২ নারী।

এদিকে, শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয়েছে মোট ৫৯৬ শিশু। বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪২৬ শিশু। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৭৪ শিশু, যৌন হয়রানির শিকার হয় ১৮৫ শিশু, বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৭৮ শিশু।

আসক জানায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ মোট ৯৩২টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে মোট ১৫৭ জন, আহত হয়েছে ১০ হাজার ৮৩৩ জন। ২০২১ সালে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৬৭২টি সংঘাতের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭২ জন, আহত হয়েছে ৭ হাজার ২০১ জন। এছাড়া পৌর ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে ৮৩টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৭৮৮ জন আহত হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারির ঘটনা ঘটেছে ২০ বার। মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সংবাদ সম্মেলনে আসকের পক্ষ থেকে ১২টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

শনিবার, ০১ জানুয়ারী ২০২২ , ১৭ পৌষ ১৪২৮ ২৭ জমাদিউল আউয়াল

বিদায় বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

বিদায়ি বছরে মহামারী করোনায় জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়লেও বিচারবহির্ভূত হত্যা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সাম্প্রদায়িতক সহিংসতা, মত প্রকাশের অধিকার লঙ্ঘন, সাংবাদিক নির্যাতন সীমান্ত হত্যাসহ নানা ইস্যুতে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও শালিসকেন্দ্র এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে ২০২১ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন আসকের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব মো. নূর খান লিটন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মানবাধিকার ইস্যুতে মানুষের সহ্য ক্ষমতা অতিক্রম করেছে। বর্তমান অবস্থাকে বর্বরতার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সবমিলিয়ে ২০২১ সালকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরমতম বছর বলা যায়। এ পরিস্থিতি থেকে উন্নতি ঘটাতে মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে। যারা গত এক যুগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্ত করে দেখবে।

বিচারবহির্ভূত হত্যা

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বরাবারের মতোই বিচারবহির্র্ভূত হত্যা, ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধসহ হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাসমূহ অস্বীকার করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে বলেন আমাদের সিস্টেমে কেউ ইচ্ছা করে ক্রসফায়ার বা ইচ্ছে করলে গুলি করতে পারে না। অন্যদিকে আরেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ক্রসফায়ারের সমর্থনে বক্তব্য দেন। সরকারের মন্ত্রীদের এ ধরনের বক্তব্য বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ক্রসফায়ারকে উৎসাহিত করে যা প্রকৃতপক্ষে দেশের সংবিধান প্রদত্ত মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার হরণসহ আইনের আশ্রয়লাভ সংক্রান্ত সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- বন্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থায় সরকারের দেয়া অঙ্গিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ২০২১ সালে ৮০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

আসক বলছে, ২০২১ সালে ক্রয়ফায়াসে বিভিন্ন এলাকায় ৫১ জন মারা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে ৮ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তারের পর শারিরিক নির্যাতনে ৬ জন এবং গ্রেপ্তারের আগে শারীরিক নির্যাতনে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আইনজীবী শারীরিক নির্যাতনে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি মারা। এছাড়া ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারে মিলন বিকাশ ত্রিপুরা নামের এক বন্দীর মৃত্যু নিয়ে নানা রহস্যের তৈরি হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ ও গুম :

দেশে গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সরকার গুমের ঘটনা অস্বীকার করে আসছে। ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ৭ জনকে অপহরণ বা গুম করা হয়েছে। এর মধ্যে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে ৬ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও ১ জনের কোন সন্ধান মেলেনি। গুম বা অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ করে র‌্যাব এবং গোয়েন্দা পুলিশের পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। তুলে নেয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়। ২০২১ সালের ৬ নভেম্বর ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ছনকান্দা বটতলা এলাকার ইমাম মাহাদী ডলার নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়া হয়। ওই ঘটনায় ফুলবাড়িয়া থানায় জিডি করা হলেও তার কোন সন্ধান মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই ডলারকে অপহরণ করেছে।

সংখ্যালঘু পরিবারের অধিকার পরিস্থিতি :

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে ২০২১ সাল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। ২০২১ সালে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২০৪ প্রতীমা, পূজাম-প, মন্দির ভাঙচুর- অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৪৮টি বাড়িঘর, ৫০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা- ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছে। এছাড়া বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ১টি বাড়িতে হামলাও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে চাঁদপুরের হাজিগঞ্জে ৫ জন এবং ফেনীতে ১ জন মুসলিম পরিবারের লোক মারা গেছে।

মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণœ সাংবাদিক নির্যাতন :

অন্য বছরের মতো ২০২১ সালেও ভিন্নমতকে দমন করার লক্ষ্যে হয়রানিমূলক মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নানা ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল উদ্বেগজনক। ২০২১ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১১৩৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন থানায় ৮৮৩টি মামলা এবং আদালতে ২৫১টি মামলা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, করোনাকালে এবং এর আগে ও পরে পেশগত দায়িত্ব পালনকালে সরকারি কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন দল এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রোষানলে পড়ে হামলা, মামলাসহ নানাভাবে নির্যতানের শিকার হয়েছেন গণমাধ্যম কর্মীরা। আসকের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ২১০ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একপক্ষের গুলিতে নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জে মোজাক্কির নামের এক সাংবাদিক মারা গেছেন।

সভা সমাবেশে বাধাদান :

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংবিধানের ৩৭ ধারা অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সভা সমাবেশে যোগ দেয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু ২০২১ সালের বছরে বিরোধী দলগুলোকে কর্মসূচির অনুমতি না দেয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাধাদানের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়া দাবির আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশ লাঠিপেটা করেছে। ৪ মার্চ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোটের উদ্যোগে খুলনায় সমাবেশে পুলিশ বাধা দিয়েছে।

সীমান্ত হত্যা :

২০২১ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে বিভিন্ন সীমান্তে ১৬ জনসহ মোটা ১৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধে বিভিন্ন সময়ে ভারত প্রতিশ্রতি দিলেও কোন বাস্তবায়ন হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা, ২০২১ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩২১ নারী। এরমধ্যে ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন ১২৮ নারী। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৭৭ পুরুষ। উত্ত্যক্তকরণে আত্মহত্যা করেছেন ১২ নারী। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৩ নারী ও ৫ পুরুষসহ খুন হয়েছেন মোট ৮ জন। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬৪০ নারী। যার মধ্যে নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন ৩৭২ জন ও আত্মহত্যা করেছেন ১৪২ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২১০ নারী। এরমধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যার শিকার হন ৭২ নারী ও আত্মহত্যা করেন ১৩ নারী। শালিস ও ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১২ নারী।

এদিকে, শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয়েছে মোট ৫৯৬ শিশু। বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৪২৬ শিশু। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৭৪ শিশু, যৌন হয়রানির শিকার হয় ১৮৫ শিশু, বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৭৮ শিশু।

আসক জানায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ মোট ৯৩২টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে মোট ১৫৭ জন, আহত হয়েছে ১০ হাজার ৮৩৩ জন। ২০২১ সালে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৬৭২টি সংঘাতের ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৭২ জন, আহত হয়েছে ৭ হাজার ২০১ জন। এছাড়া পৌর ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে ৮৩টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৭৮৮ জন আহত হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারির ঘটনা ঘটেছে ২০ বার। মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সংবাদ সম্মেলনে আসকের পক্ষ থেকে ১২টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।