কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাধা কোথায়

রেজাউল করিম খোকন

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ৫৫ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলারের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানির মাইলফলক অর্জন করে। চলতি অর্থবছরে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুসারে, উল্লেখযোগ্য কৃষিজাত রপ্তানিপণ্য হলো-শাকসবজি, চা, ফুল, ফলমূল, নানা রকম মসলা, তামাক, শুকনা খাবার ইত্যাদি। তবে এর মধ্যে ‘ড্রাই ফুড’ বা শুকনো খাদ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ সব ড্রাই ফুডের মধ্যে আছে-বিস্কুট, চানাচুর, কেক, পটেটো ক্রাকার ও বাদামের মতো নানা রকম পণ্য। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যে ১শ’ কোটি ডলারের কৃষি পণ্য রপ্তানি হয়েছে, তার মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্যের হিস্যাই বেশি।

কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ২০টি। আর রপ্তানি করছে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান। কৃষি পণ্য রপ্তানি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পণ্য রপ্তানিতে কর রেয়াত ও ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যার ফলে গত চার বছর ধরে এই খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে। তিনি মনে করেন এই খাতের উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে নতুন নতুন পণ্য রপ্তানি শুরু করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে বৈশ্বিক বাজারে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। সরকার চাচ্ছে এই সুযোগ দেশের উদ্যোক্তারা যেন কাজে লাগায় এবং সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে বেশি রপ্তানি হয় রুটি, বিস্কুট ও চানাচুর জাতীয় শুকনা খাবার, ভোজ্যতেল ও সমজাতীয় পণ্য, ফলের রস, বিভিন্ন ধরনের মসলা, পানীয় এবং জ্যাম-জেলির মতো বিভিন্ন সুগার কনফেকশনারি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিস্কুট, রুটি জাতীয় শুকনা খাবার রপ্তানি করে চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে দেশীয় কোম্পানিগুলো ৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার আয় করেছে। বাংলাদেশের কৃষি পণ্য রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হলো-ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল। তবে এসব দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীরা হচ্ছেন মূল ভোক্তা। বর্তমানে বিশে^র ১৪৫টি দেশে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি হচ্ছে।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় বাধা হয়ে উঠেছে ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সার্টিফিকেট। দেশে একটি আন্তর্জাতিকমানের ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে এ জাতীয় সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব হলে রপ্তানি ১০ গুণ বেড়ে প্রতি বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতে পারে বলে। কিন্তু এ ধরনের সার্টিফিকেট দেয়ার মতো কোন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। আমদানি-রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণে কৃষিপণ্যের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বিদেশে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের রয়েছে প্রচুর চাহিদাও। কিন্তু রপ্তানিতে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সার্টিফিকেট। দেশে একটি আন্তর্জাতিকমানের ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে এ জাতীয় সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব হলে রপ্তানি ১০ গুণ বেড়ে প্রতি বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতে পারে।

কিন্তু এ ধরনের সার্টিফিকেট দেয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। মান নিশ্চিত করে সার্টিফিকেট ইস্যু করার মতো কোন এক্রিডিটেড ল্যাবও দেশে নেই। সঠিকভাবে মান নির্ধারণ ছাড়া রপ্তানির কারণে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ভারি ধাতুর উপস্থিতি পেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পান, রাশিয়া আলু, চীন কাঁকড়া ও কুচিয়া এবং খাদ্যে শূকরের হাঁড় ও মুরগির বিষ্ঠার উপস্থিতির কারণে সৌদি আরব মিঠা পানির মাছ আমদানি বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সনদ দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মাছ রপ্তানিতে মৎস্য অধিদপ্তর, মাংস ও পশুজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য রপ্তানিতে হালাল সার্টিফিকেট ইস্যু করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও উৎপাদন পর্যায়ে ১৮১টি পণ্যের বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সনদ দেয় বিএসটিআই। এসব প্রতিষ্ঠানের কারো ক্রেতা রাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত প্যারামিটার অনুযায়ী ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সার্টিফিকেট ইস্যুর সক্ষমতা নেই। এ অবস্থায় রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশে কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এক্রিডিটেড ল্যাব স্থাপনসহ মান নির্ধারণী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি একক ‘হেলথ সার্টিফিকেশন অথরিটি’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এ জাতীয় সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব হলে কৃষিজাত ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি ১০ গুণ বেড়ে প্রতি বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

বিশ্বমানের হেলথ সার্টিফিকেট দেয়ার ব্যবস্থা না থাকায় বাংলাদেশ থেকে কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে তারা সমস্যায় পড়ছেন। এজন্য পৃথক ল্যাব স্থাপন করে মান যাচাই নিশ্চিত করে সার্টিফিকেট ইস্যুর কোন কোন বিকল্প নেই। দেশের কৃষিপণ্যের উন্নয়নে সম্প্রতি যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ডস সফর করেছে সরকারি-বেসরকারি একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় কৃষিপণ্য নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সুপারশপ সেইন্সবারি ও টেসকো। এছাড়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশ নেদারল্যান্ডসের একটি কারিগরি দল সহায়তা দিতে আগামী বছরের মার্চে আসছে বাংলাদেশে। ক্রেতার চাহিদা অনুসারে পণ্য রপ্তানি করা হলেও সব পণ্যের ল্যাব নেই বাংলাদেশে। এজন্য কিছু কিছু পণ্যে গুজরাট এবং সিঙ্গাপুর থেকে মান পরীক্ষা করিয়ে আনা হয়। গত তিন অর্থবছরে বাংলাদেশ গড়ে ১.৩০ বিলিয়ন ডলারের কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি করেছে। বর্তমানে ১৩০টি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হয়। কৃষিজাত ও খাদ্যপণ্যের মধ্যে বাংলাদেশ মূলত ক্রাসটাসিনস, চিংড়ি, কাঁকড়া, হিমায়িত মাছ, শুঁটকি মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, এরোমেটিক রাইস, গুঁড়ো মসলা, শুকনা খাবার, ফলের জুস, চা, সয়াবিন ও সরষের তেল, গুড়, তিল রপ্তানি করে থাকে। ঘি, লাচ্ছি, রসমালাই, মিষ্টি, কালোজাম, ছানা, গরুর লেজের লোম, বুলিস্টিক, হাঁসের পালক, গরু-মহিষের কান, ওমাসাম, জিলেটিন, একদিনের মুরগির বাচ্চা, গরু ও হাঁস-মুরগির মাংস, ফ্রোজেন চিকেন প্রডাক্টসের রপ্তানি সনদ দিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১৮-২১ দিন সময় নেয়।

মৎস্য অধিদপ্তর দুই-তিন দিনের মধ্যে হিমায়িত মাছের সনদ দিতে পারলেও সনদের মেয়াদ থাকে ১৫ দিন। বিএসটিআই এখন পর্যন্ত ১৮১টি পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডের সার্টিফিকেট দেয়। এসব পণ্যের মান সনদ পেতে ১০-১২ দিন সময় লাগে। বিএসটিআইর সনদ বিভিন্ন দেশ গ্রহণও করে না। পাশের দেশ ভারত ২১টি পণ্যের ক্ষেত্রে বিএসটিআইর সনদ গ্রহণ করে। সম্প্রতি বিএসটিআইর সনদপ্রাপ্ত একটি কোম্পানির হলুদের গুঁড়ো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফেরত পাঠিয়েছে। রপ্তাণিযোগ্য খাদ্যপণ্যের মান সনদ দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সংস্থাটির নিজস্ব কোনো ল্যাব নেই। বাংলাদেশ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ইউরোপ, জাপানসহ উন্নত দেশগুলোর মূল বাজারে আমরা কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে চায়। সেজন্য রপ্তানি বাধা দূর করতে ইতোমধ্যে দেশে উত্তম কৃষিচর্চা নীতিমালা (গ্যাপ) বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে। ১০ বছর আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে ৪০ কোটি ডলার বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছিল। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আড়াই গুণের বেশি বেড়ে ১০২ কোটি ৮১ লাখ ডলারে পৌঁছে। বিশ্বব্যাপী করোনার মহামারীর প্রভাবের মধ্যেও গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে কৃষিপণ্য। চলতি অর্থবছরের ২০২১-২২ প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আয় করেছে প্রায় ৫৬ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৭ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় তা দাঁড়ায় চার হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এই আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। প্রতিবেশী দেশ ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে কৃষিপণ্যের বড় বাজার।

রপ্তানি আয় বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কোন ধরনের পণ্যের পণ্য চাহিদা রয়েছে তা জানতে হবে। এ জন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন দেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ জন্য আমাদের রপ্তানিকারকদের নিজস্ব উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যে সব দেশের সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরো নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরালো করতে হবে। রপ্তানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণে বাংলাদেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষিজাত শিল্প পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন এজন্য। সরকারি দপ্তরসমূহে হয়রানি আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা অনেক সময় রপ্তানিমুখী শিল্পখাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান বাধা দূর করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ভিন্ন উচ্চতায় পেঁৗঁছে যাবে সন্দেহ নেই। এটা অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে। রপ্তানিকারকদের সার্টিফিকেট পাওয়ায় ক্ষেত্রে বিরাজমান সব জটিলতার অবসান ঘটানোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট পরিমাণে আন্তরিক হতে হবে।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]

রবিবার, ০২ জানুয়ারী ২০২২ , ১৮ পৌষ ১৪২৮ ২৮ জমাদিউল আউয়াল

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাধা কোথায়

রেজাউল করিম খোকন

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ৫৫ কোটি ৬৪ লাখ মার্কিন ডলারের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় ২৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১০০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানির মাইলফলক অর্জন করে। চলতি অর্থবছরে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ৪৪ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুসারে, উল্লেখযোগ্য কৃষিজাত রপ্তানিপণ্য হলো-শাকসবজি, চা, ফুল, ফলমূল, নানা রকম মসলা, তামাক, শুকনা খাবার ইত্যাদি। তবে এর মধ্যে ‘ড্রাই ফুড’ বা শুকনো খাদ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ সব ড্রাই ফুডের মধ্যে আছে-বিস্কুট, চানাচুর, কেক, পটেটো ক্রাকার ও বাদামের মতো নানা রকম পণ্য। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে যে ১শ’ কোটি ডলারের কৃষি পণ্য রপ্তানি হয়েছে, তার মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্যের হিস্যাই বেশি।

কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে বড় ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান আছে ২০টি। আর রপ্তানি করছে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান। কৃষি পণ্য রপ্তানি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ পণ্য রপ্তানিতে কর রেয়াত ও ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যার ফলে গত চার বছর ধরে এই খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে। তিনি মনে করেন এই খাতের উদ্যোক্তারা বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে নতুন নতুন পণ্য রপ্তানি শুরু করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। করোনা মহামারির কারণে বৈশ্বিক বাজারে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা বেড়েছে। সরকার চাচ্ছে এই সুযোগ দেশের উদ্যোক্তারা যেন কাজে লাগায় এবং সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে বেশি রপ্তানি হয় রুটি, বিস্কুট ও চানাচুর জাতীয় শুকনা খাবার, ভোজ্যতেল ও সমজাতীয় পণ্য, ফলের রস, বিভিন্ন ধরনের মসলা, পানীয় এবং জ্যাম-জেলির মতো বিভিন্ন সুগার কনফেকশনারি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিস্কুট, রুটি জাতীয় শুকনা খাবার রপ্তানি করে চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে দেশীয় কোম্পানিগুলো ৮ কোটি ৮৬ লাখ ডলার আয় করেছে। বাংলাদেশের কৃষি পণ্য রপ্তানির প্রধান গন্তব্য হলো-ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল। তবে এসব দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীরা হচ্ছেন মূল ভোক্তা। বর্তমানে বিশে^র ১৪৫টি দেশে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি হচ্ছে।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় বাধা হয়ে উঠেছে ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সার্টিফিকেট। দেশে একটি আন্তর্জাতিকমানের ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে এ জাতীয় সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব হলে রপ্তানি ১০ গুণ বেড়ে প্রতি বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতে পারে বলে। কিন্তু এ ধরনের সার্টিফিকেট দেয়ার মতো কোন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। আমদানি-রপ্তানি পণ্য বৈচিত্র্যকরণে কৃষিপণ্যের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বিদেশে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের রয়েছে প্রচুর চাহিদাও। কিন্তু রপ্তানিতে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সার্টিফিকেট। দেশে একটি আন্তর্জাতিকমানের ল্যাব প্রতিষ্ঠা করে এ জাতীয় সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব হলে রপ্তানি ১০ গুণ বেড়ে প্রতি বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতে পারে।

কিন্তু এ ধরনের সার্টিফিকেট দেয়ার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই। মান নিশ্চিত করে সার্টিফিকেট ইস্যু করার মতো কোন এক্রিডিটেড ল্যাবও দেশে নেই। সঠিকভাবে মান নির্ধারণ ছাড়া রপ্তানির কারণে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ভারি ধাতুর উপস্থিতি পেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পান, রাশিয়া আলু, চীন কাঁকড়া ও কুচিয়া এবং খাদ্যে শূকরের হাঁড় ও মুরগির বিষ্ঠার উপস্থিতির কারণে সৌদি আরব মিঠা পানির মাছ আমদানি বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সনদ দেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মাছ রপ্তানিতে মৎস্য অধিদপ্তর, মাংস ও পশুজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য রপ্তানিতে হালাল সার্টিফিকেট ইস্যু করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও উৎপাদন পর্যায়ে ১৮১টি পণ্যের বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সনদ দেয় বিএসটিআই। এসব প্রতিষ্ঠানের কারো ক্রেতা রাষ্ট্রগুলোর নির্ধারিত প্যারামিটার অনুযায়ী ‘ফিট ফর হিউম্যান কনসাম্পশন’ সার্টিফিকেট ইস্যুর সক্ষমতা নেই। এ অবস্থায় রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশে কৃষিপণ্যের অপচয় রোধ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এক্রিডিটেড ল্যাব স্থাপনসহ মান নির্ধারণী বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি একক ‘হেলথ সার্টিফিকেশন অথরিটি’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এ জাতীয় সার্টিফিকেট দেয়া সম্ভব হলে কৃষিজাত ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি ১০ গুণ বেড়ে প্রতি বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

বিশ্বমানের হেলথ সার্টিফিকেট দেয়ার ব্যবস্থা না থাকায় বাংলাদেশ থেকে কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে তারা সমস্যায় পড়ছেন। এজন্য পৃথক ল্যাব স্থাপন করে মান যাচাই নিশ্চিত করে সার্টিফিকেট ইস্যুর কোন কোন বিকল্প নেই। দেশের কৃষিপণ্যের উন্নয়নে সম্প্রতি যুক্তরাজ্য এবং নেদারল্যান্ডস সফর করেছে সরকারি-বেসরকারি একটি প্রতিনিধিদল। এ সময় কৃষিপণ্য নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সুপারশপ সেইন্সবারি ও টেসকো। এছাড়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশ নেদারল্যান্ডসের একটি কারিগরি দল সহায়তা দিতে আগামী বছরের মার্চে আসছে বাংলাদেশে। ক্রেতার চাহিদা অনুসারে পণ্য রপ্তানি করা হলেও সব পণ্যের ল্যাব নেই বাংলাদেশে। এজন্য কিছু কিছু পণ্যে গুজরাট এবং সিঙ্গাপুর থেকে মান পরীক্ষা করিয়ে আনা হয়। গত তিন অর্থবছরে বাংলাদেশ গড়ে ১.৩০ বিলিয়ন ডলারের কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানি করেছে। বর্তমানে ১৩০টি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হয়। কৃষিজাত ও খাদ্যপণ্যের মধ্যে বাংলাদেশ মূলত ক্রাসটাসিনস, চিংড়ি, কাঁকড়া, হিমায়িত মাছ, শুঁটকি মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, এরোমেটিক রাইস, গুঁড়ো মসলা, শুকনা খাবার, ফলের জুস, চা, সয়াবিন ও সরষের তেল, গুড়, তিল রপ্তানি করে থাকে। ঘি, লাচ্ছি, রসমালাই, মিষ্টি, কালোজাম, ছানা, গরুর লেজের লোম, বুলিস্টিক, হাঁসের পালক, গরু-মহিষের কান, ওমাসাম, জিলেটিন, একদিনের মুরগির বাচ্চা, গরু ও হাঁস-মুরগির মাংস, ফ্রোজেন চিকেন প্রডাক্টসের রপ্তানি সনদ দিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১৮-২১ দিন সময় নেয়।

মৎস্য অধিদপ্তর দুই-তিন দিনের মধ্যে হিমায়িত মাছের সনদ দিতে পারলেও সনদের মেয়াদ থাকে ১৫ দিন। বিএসটিআই এখন পর্যন্ত ১৮১টি পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডের সার্টিফিকেট দেয়। এসব পণ্যের মান সনদ পেতে ১০-১২ দিন সময় লাগে। বিএসটিআইর সনদ বিভিন্ন দেশ গ্রহণও করে না। পাশের দেশ ভারত ২১টি পণ্যের ক্ষেত্রে বিএসটিআইর সনদ গ্রহণ করে। সম্প্রতি বিএসটিআইর সনদপ্রাপ্ত একটি কোম্পানির হলুদের গুঁড়ো ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফেরত পাঠিয়েছে। রপ্তাণিযোগ্য খাদ্যপণ্যের মান সনদ দেয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সংস্থাটির নিজস্ব কোনো ল্যাব নেই। বাংলাদেশ শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ইউরোপ, জাপানসহ উন্নত দেশগুলোর মূল বাজারে আমরা কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে চায়। সেজন্য রপ্তানি বাধা দূর করতে ইতোমধ্যে দেশে উত্তম কৃষিচর্চা নীতিমালা (গ্যাপ) বাস্তবায়নে কাজ শুরু হয়েছে। ১০ বছর আগে ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষিপণ্য রপ্তানি থেকে ৪০ কোটি ডলার বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছিল। গত ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আড়াই গুণের বেশি বেড়ে ১০২ কোটি ৮১ লাখ ডলারে পৌঁছে। বিশ্বব্যাপী করোনার মহামারীর প্রভাবের মধ্যেও গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে কৃষিপণ্য। চলতি অর্থবছরের ২০২১-২২ প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আয় করেছে প্রায় ৫৬ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৭ টাকা ধরে বাংলাদেশি মুদ্রায় তা দাঁড়ায় চার হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এই আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। প্রতিবেশী দেশ ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে কৃষিপণ্যের বড় বাজার।

রপ্তানি আয় বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কোন ধরনের পণ্যের পণ্য চাহিদা রয়েছে তা জানতে হবে। এ জন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন দেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ জন্য আমাদের রপ্তানিকারকদের নিজস্ব উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যে সব দেশের সঙ্গে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরো নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরালো করতে হবে। রপ্তানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে আমাদের উৎপাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণে বাংলাদেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষিজাত শিল্প পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন এজন্য। সরকারি দপ্তরসমূহে হয়রানি আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা অনেক সময় রপ্তানিমুখী শিল্পখাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান বাধা দূর করতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবাইকে উদ্যোগী হতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতি ভিন্ন উচ্চতায় পেঁৗঁছে যাবে সন্দেহ নেই। এটা অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিতে পারে। রপ্তানিকারকদের সার্টিফিকেট পাওয়ায় ক্ষেত্রে বিরাজমান সব জটিলতার অবসান ঘটানোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট পরিমাণে আন্তরিক হতে হবে।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার]