বেপরোয়া গতি, সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে

রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় গতকাল মেঘলা পরিবহন নামের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দু’জন পথচারীকে চাপা দিয়ে পিষ্ট করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে কর্ণফুলী উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় গাড়িচাপায় আবু বক্কর (১২) নামের এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

গত শুক্রবারও রাজধানীর জুরাইন এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত শাকিল হোসেন শান্ত (১৮) তার এক বন্ধুসহ মোটরসাইকেলে মাওয়া ঘাটে ঘুরতে গিয়েছিল। কাজী জিহাদ নামের বন্ধুটিও গুরুতর আহত হয়েছে।

এর আগেও গুলিস্তান এলাকায় শ্রাবণ পরিবহনের বাসচাপায় নিহত হয়েছিলেন দুইজন পথচারী। তবে বাসটি চালিয়েছিলেন পুলিশের এএসআই এমাদুল হক। পরে তাকে পুলিশ আটক করে।

শ্রাবণ পরিবহনের ওই বাসটি প্রথমে গুলিস্তান সংলগ্ন কাপ্তান বাজারের সামনে একজন পুলিশ কনস্টেবলকে ধাক্কা দেয়। এরপর চালক ও তার সহকারী বাসটি ফেলে পালিয়ে যায়। তখন বাসটি রাস্তায় পড়ে থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। এ সময় সহকারী উপপরিদর্শক এমাদুল হক নিজেই চালকের আসনে বসে বাসটি অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বাসটি আহাদ পুলিশ বক্সের কাছে এলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকের ওপর উঠে যায়। এতে বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন চারজন পথচারী।

এভাবে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ও মোটরসাইকেলে গত এক বছরে সারা দেশে পাঁচ হাজার ৩৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ২৮৪ জন নিহত

ে পৃষ্ঠা ১১ : ক : ৪

বেপরোয়া গতি সড়কে

(১ম পৃষ্ঠার পর)

এবং সাত হাজার ৪৬৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে দুই হাজার ৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই হাজার ২১৪ নিহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনায় ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ।

এ ছাড়া এক হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ৫২৩ জন পথচারী নিহত হয়েছে। এক হাজার ৮১৩টি দুর্ঘটনা হয়েছে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ও এক হাজার ৫৭টি মুখোমুখি সংর্ঘষে ৭৯৯ জন চালক ও সহকারী নিহত হয়েছে বলে সংগঠনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যা গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়।

সংগঠনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। এতে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ১০ কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুর্ঘটনায় বাসযাত্রী ৩৮৯ জন, ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি যাত্রী ৪৫৭ জন, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ যাত্রী ২৭৬ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পু-লেগুনা) ৯৩৪ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ৩৫৯ জন এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-ঠেলাগাড়ি আরোহী ১৩২ জন নিহত হয়েছে।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে চার দশমিক ২২ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে তিন দশমিক ৮৮ শতাংশ। আবার ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে এক দশমিক ২০ শতাংশ।

বেপরোয়ার গতির কারণে ঢাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনা

গত এক বছরে রাজধানীতে ১৩১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে পথচারী ৫২ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং বাস-রেকার-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-অটোভ্যান, ঠেলাগাড়ি ইত্যাদির যাত্রী ও আরোহী ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়, রাজধানীতে যানবাহনের চাপায়-ধাক্কায় পথচারী বেশি হতাহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা রাতে এবং ভোরে বেশি ঘটেছে। বাইপাস রোড না থাকার কারণে রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারে পথচারীরা নিহত হচ্ছে।

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় যানজটের কারণে যানবাহন চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ করছে। ফলে সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানীতে যানবাহনের তুলনায় অপ্রতুল সড়ক, একই সড়কে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক, স্বল্প ও দ্রুত গতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, ফুটওভার ব্রিজ যথাস্থানে নির্মাণ না হওয়া ও ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে অতিমাত্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে।

যানবহানের বেপরোয়া গতি, ফিটনেস না থাকা ও অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা হয় এর ৫০ শতাংশ নিহত হয় পথচারী। এ ছাড়া পথচারীদের ৬০ শতাংশ অতিরিক্ত বোঝাই পণ্যবাহী ট্রাক ও যানবাহনের চাপায় নিহত হয়। আমাদের বেশির ভাগ পরিবহনের ফিটনেস ও ফিটনেস সনদ সঠিক নয়। এসব মনিটরিং কোন ব্যবস্থাও নেই। তাই দিন দিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান তিনি।

এক বছরে ৭৬টি নৌ ও ১২৩টি রেল-দুর্ঘটনা ঘটেছে

৭৬টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত, ১৯২ জন আহত এবং ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছে। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে একটি লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৫১ জন নিহত, ২৩ জন চিকিৎসাধীন এবং অজ্ঞাত সংখ্যক নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া ঈদে ঘরমুখো যাত্রায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ফেরি ঘাটে তাড়াহুড়া করে নামার সময় ছয়জন নিহত এবং ৩১ জন আহত হয়েছে। ১২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছে বলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারি ডাটা না থাকায় বিভ্রান্তি

গতকাল প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জানিয়েছেন, গত বছর সড়ক পথে তিন হাজার ৭৯৩টি দুর্ঘটনায় চার হাজার ২৮৯ জন নিহত ও পাঁচ হাজার ৪২৪ জন আহত হয়েছেন। দুই সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনায় তথ্যে প্রায় দেড় হাজার পার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া নিহতের তথ্যে প্রায় দুই হাজার কম-বেশি রয়েছে। উভয় সংগঠনেই দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন তারা।

সরকারি উদ্যোগে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কোন ডাটা সেন্টার না থাকায় পরিসংখ্যানে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নিসচার চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে সরকার অথবা অন্য কোন পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো না। ২০১২ সাল থেকে আমাদের সংগঠন নিয়মিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে আসছে। বারবার বলা সত্ত্বেও দেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ডাটা সেন্টার করা হচ্ছে না। তাই সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারছে না। তবু আমরা তৈরি করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দাবি করে আসছি, সরকারি উদ্যোগে এই পরিসংখ্যান প্রকাশের ব্যবস্থা করা হলে জনগণ সড়কের প্রকৃত অবস্থান জানতে পারত। ইদানিং অনেকেই নিজেদের মতো করে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরছে। যেখানে তথ্য-উপাত্তে নানা মত প্রকাশ পায়। এতে জনমনে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।’

রবিবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২২ , ২৫ পৌষ ১৪২৮ ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বেপরোয়া গতি, সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে

image

রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় গতকাল মেঘলা পরিবহন নামের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দু’জন পথচারীকে চাপা দিয়ে পিষ্ট করেছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে কর্ণফুলী উপজেলার দৌলতপুর এলাকায় গাড়িচাপায় আবু বক্কর (১২) নামের এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে।

গত শুক্রবারও রাজধানীর জুরাইন এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় এক মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত শাকিল হোসেন শান্ত (১৮) তার এক বন্ধুসহ মোটরসাইকেলে মাওয়া ঘাটে ঘুরতে গিয়েছিল। কাজী জিহাদ নামের বন্ধুটিও গুরুতর আহত হয়েছে।

এর আগেও গুলিস্তান এলাকায় শ্রাবণ পরিবহনের বাসচাপায় নিহত হয়েছিলেন দুইজন পথচারী। তবে বাসটি চালিয়েছিলেন পুলিশের এএসআই এমাদুল হক। পরে তাকে পুলিশ আটক করে।

শ্রাবণ পরিবহনের ওই বাসটি প্রথমে গুলিস্তান সংলগ্ন কাপ্তান বাজারের সামনে একজন পুলিশ কনস্টেবলকে ধাক্কা দেয়। এরপর চালক ও তার সহকারী বাসটি ফেলে পালিয়ে যায়। তখন বাসটি রাস্তায় পড়ে থাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। এ সময় সহকারী উপপরিদর্শক এমাদুল হক নিজেই চালকের আসনে বসে বাসটি অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। বাসটি আহাদ পুলিশ বক্সের কাছে এলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকের ওপর উঠে যায়। এতে বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন চারজন পথচারী।

এভাবে বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ও মোটরসাইকেলে গত এক বছরে সারা দেশে পাঁচ হাজার ৩৭১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ২৮৪ জন নিহত

ে পৃষ্ঠা ১১ : ক : ৪

বেপরোয়া গতি সড়কে

(১ম পৃষ্ঠার পর)

এবং সাত হাজার ৪৬৮ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে দুই হাজার ৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই হাজার ২১৪ নিহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনায় ৩৫ দশমিক ২৩ শতাংশ।

এ ছাড়া এক হাজার ৫৬৬টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ৫২৩ জন পথচারী নিহত হয়েছে। এক হাজার ৮১৩টি দুর্ঘটনা হয়েছে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ও এক হাজার ৫৭টি মুখোমুখি সংর্ঘষে ৭৯৯ জন চালক ও সহকারী নিহত হয়েছে বলে সংগঠনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যা গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ করা হয়।

সংগঠনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। এতে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ১০ কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো- ১. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন; ২. বেপরোয়া গতি; ৩. চালকদের অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা; ৪. বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা; ৫. মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল; ৬. তরুণ-যুবদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো; ৭. জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা; ৮. দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা; ৯. বিআরটিএ’র সক্ষমতার ঘাটতি; ১০. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুর্ঘটনায় বাসযাত্রী ৩৮৯ জন, ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ডভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি যাত্রী ৪৫৭ জন, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ যাত্রী ২৭৬ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পু-লেগুনা) ৯৩৪ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি-বোরাক-মাহিন্দ্র-টমটম) ৩৫৯ জন এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-ঠেলাগাড়ি আরোহী ১৩২ জন নিহত হয়েছে।

২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে চার দশমিক ২২ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে তিন দশমিক ৮৮ শতাংশ। আবার ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ, প্রাণহানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং আহত বেড়েছে এক দশমিক ২০ শতাংশ।

বেপরোয়ার গতির কারণে ঢাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনা

গত এক বছরে রাজধানীতে ১৩১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে পথচারী ৫২ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং বাস-রেকার-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান-অটোভ্যান, ঠেলাগাড়ি ইত্যাদির যাত্রী ও আরোহী ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়, রাজধানীতে যানবাহনের চাপায়-ধাক্কায় পথচারী বেশি হতাহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা রাতে এবং ভোরে বেশি ঘটেছে। বাইপাস রোড না থাকার কারণে রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারে পথচারীরা নিহত হচ্ছে।

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় যানজটের কারণে যানবাহন চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ করছে। ফলে সকালে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। রাজধানীতে যানবাহনের তুলনায় অপ্রতুল সড়ক, একই সড়কে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক, স্বল্প ও দ্রুত গতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, ফুটওভার ব্রিজ যথাস্থানে নির্মাণ না হওয়া ও ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে অতিমাত্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে।

যানবহানের বেপরোয়া গতি, ফিটনেস না থাকা ও অতিরিক্ত বোঝাইয়ের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে যে পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা হয় এর ৫০ শতাংশ নিহত হয় পথচারী। এ ছাড়া পথচারীদের ৬০ শতাংশ অতিরিক্ত বোঝাই পণ্যবাহী ট্রাক ও যানবাহনের চাপায় নিহত হয়। আমাদের বেশির ভাগ পরিবহনের ফিটনেস ও ফিটনেস সনদ সঠিক নয়। এসব মনিটরিং কোন ব্যবস্থাও নেই। তাই দিন দিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানান তিনি।

এক বছরে ৭৬টি নৌ ও ১২৩টি রেল-দুর্ঘটনা ঘটেছে

৭৬টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত, ১৯২ জন আহত এবং ৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছে। ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে একটি লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৫১ জন নিহত, ২৩ জন চিকিৎসাধীন এবং অজ্ঞাত সংখ্যক নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়া ঈদে ঘরমুখো যাত্রায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ফেরি ঘাটে তাড়াহুড়া করে নামার সময় ছয়জন নিহত এবং ৩১ জন আহত হয়েছে। ১২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৪৭ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছে বলে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারি ডাটা না থাকায় বিভ্রান্তি

গতকাল প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন জানিয়েছেন, গত বছর সড়ক পথে তিন হাজার ৭৯৩টি দুর্ঘটনায় চার হাজার ২৮৯ জন নিহত ও পাঁচ হাজার ৪২৪ জন আহত হয়েছেন। দুই সংগঠনের সড়ক দুর্ঘটনায় তথ্যে প্রায় দেড় হাজার পার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া নিহতের তথ্যে প্রায় দুই হাজার কম-বেশি রয়েছে। উভয় সংগঠনেই দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইনের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন তারা।

সরকারি উদ্যোগে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কোন ডাটা সেন্টার না থাকায় পরিসংখ্যানে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নিসচার চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, ‘ইতোপূর্বে সরকার অথবা অন্য কোন পক্ষ থেকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো না। ২০১২ সাল থেকে আমাদের সংগঠন নিয়মিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে আসছে। বারবার বলা সত্ত্বেও দেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে ডাটা সেন্টার করা হচ্ছে না। তাই সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান কেউ দিতে পারছে না। তবু আমরা তৈরি করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দাবি করে আসছি, সরকারি উদ্যোগে এই পরিসংখ্যান প্রকাশের ব্যবস্থা করা হলে জনগণ সড়কের প্রকৃত অবস্থান জানতে পারত। ইদানিং অনেকেই নিজেদের মতো করে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরছে। যেখানে তথ্য-উপাত্তে নানা মত প্রকাশ পায়। এতে জনমনে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।’