৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ : লন্ডনে বঙ্গবন্ধু

মহিউদ্দিন আহমদ

টেলিফোনটি ধরতেই ওই প্রান্ত থেকে এমএম রেজাউল করিম আমাকে বলছেন, বঙ্গবন্ধু লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন। তিনি হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আমাকে টেলিফোন করেছেন। আমি হিথ্রো বিমানবন্দরে যাচ্ছি। তুমি তাড়াতাড়ি আসো।

এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করে আছি সেই কতদিন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৬ ডিসেম্বরে। কিন্তু মহানায়ক ছাড়া উৎসব-উল্লাস প্রাণ পাচ্ছে না। তার অবর্তমানে বিজয়ের আনন্দ-বেদনা প্রকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধ ু স্বদেশে ফিরে গিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব আবার কাঁধে নেবেন, দেশের প্রতিটি মানুষ তা চাইছে।

জায়গিরদার সাহেব আমার পাশের সিটে। আমি স্টিয়ারিং হুইল হাতে নিয়ে বসি। গাড়ি দক্ষিণ লন্ডন থেকে সেন্ট্রাল লন্ডন পেরিয়ে উত্তর লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে যাবে। হিথ্রো বিমানবন্দরে ভিআইপি সুইটটিতে ঢুকতে আমার এতটুকু অসুবিধা হলো না। প্রধান ফটকে বা ভেতরে কেউ আমাদের আটকালো না। প্রধান ফটকে অবশ্য একজন প্রশ্ন করেছিল, কোথায় যাচ্ছ? উত্তর দিলাম, বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে। মনে হলো এই নিরাপত্তাপ্রহরীও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। দ্বিতীয় প্রশ্নটি না করে বা কোনো পরিচয়পত্র না দেখেই ছেড়ে দিল। বঙ্গবন্ধুর নাম সেই রাতে সেই ব্রিটিশ দ্বাররক্ষীর কাছে ‘ওপেন সিস্টেম’র কাজ করল।

ভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকে দেখলাম সেই অসাধারণ দৃশ্য। বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন রেজাউল করিম সাহেবের সঙ্গে, পাশে ডক্টর কামাল হোসেন। আর একটু দূরে মিসেস হামিদা হোসেন তাদের দুই শিশুকন্যা নিয়ে বসে আছেন। লক্ষ্য করলাম, ইয়ান সাদারল্যান্ড টেলিফোনে কথা বলছেন কারও সঙ্গে। ইয়ান সাদারল্যান্ড তখন ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধÑ সব তখন তার সরাসরি দায়িত্বের মধ্যে। কামরায় ঢুকতেই রেজাউল করিম সাহেব বঙ্গবন্ধুর কাছে দুই-তিনটি বাক্যে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন : বঙ্গবন্ধু, এই আমাদের মহিউদ্দিন, আমাদের বাংলাদেশ মিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি। আমি বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে সরে যাচ্ছিলাম। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাকে অপ্রত্যাশিতভাবে তার বুকে টেনে নিলেন। আর আমার চোখ দিয়ে নদী প্রবাহিত হতে থাকল, মিনিটখানেক। বঙ্গবন্ধু বললেন, ভয় নেই, আমি এসে গেছি। আমার কান্নাতে মনে হলো, তার গলাও আটকে গেছে।

আলকক অ্যান্ড ব্রাউন সুইটে মিনিট দশেক কাটিয়েছি। সাদারল্যান্ড এসে খবর দিলেন, বঙ্গবন্ধু এবং ডক্টর কামাল হোসেনের জন্য ক্ল্যারিজেস হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের এখন ওখানে যেতে হবে। তখন অনুমান করি সকাল সাড়ে ৬টা। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রেজাউল করিম সাহেবের ফোর্ড কর্টিনা এবং আমার অস্টিন গাড়িকেই সব চাইতে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ মনে করা হলো। এই অত সকালে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লিমুজিনের ব্যবস্থাও হয়ে গেল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দিলেন তিনি রেজাউল করিম সাহেবের গাড়িতেই যাবেন এবং রেজাউল করিম সাহেব নিজেই চালাবেন। তার পাশের সিটে বঙ্গবন্ধু বসলেন এবং লিমুজিনে ডক্টর কামাল হোসেন, তার স্ত্রী এবং তাদের দুই মেয়ে। আমার গাড়িতে আমি এবং জায়গিরদার। তবে বঙ্গবন্ধু ও ডক্টর কামালের স্যুটকেস, যা দু-একটি ছিল তা আমার গাড়িতে উঠালাম। তাতেই আমি, বাংলাদেশ মিশনের দ্বিতীয় সচিব মহিউদ্দিন আহমদ দারুণ সম্মানিতবোধ করলাম। ভিআইপি রুম থেকে বের হতে যাবÑ এমন সময় দেখি, দরজায় আট-দশজন ক্যামেরাম্যান এবং সাংবাদিক এসে উপস্থিত। ইতোমধ্যে বিবিসি খবর প্রচার করা শুরু করেছে যে, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন। এ সাংবাদিকদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুকে আরও তিন-চার মিনিট সোফায় বসে কাটাতে হলো। তিনি পাইপ ধরাচ্ছেন। আমি তার পাইপে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছি, এইসব চিত্র টেলিভিশনে সেদিন দেখানোও হলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দিলেন না। তার নিজের সম্পর্কেও কোনো কথা সেদিন সকালে তিনি ভিআইপি রুমে বলেননি।

ক্ল্যারিজেস হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে ৭টা বেজে গেল। আনুষ্ঠানিকতা তেমন কিছু ছিল না। ওখানে পৌঁছার পর যা কিছু করার সব সাদারল্যান্ডই দেখলেন। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ব্রিটিশ সরকার তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সহানুভূতি এবং জনগণের সক্রিয় সমর্থন পুরো নয় মাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। সেই বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর কোথাও না গিয়ে লন্ডনে এসেছেন। বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের জন্যও গৌরব ও আনন্দের। সারা দুনিয়ার সব নিউজ বুলেটিনে এই মানুষটির লন্ডনে পৌঁছানোই এক নম্বর খবর হলো। সুতরাং ব্রিটিশ সরকার তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং সম্মান দেবে, তা-ই তো সাধারণ প্রত্যাশা।

ক্ল্যারিজেস হোটেলের কামরাটির নম্বর এত বছর পর এখন সঠিক মনে নেই। তবে খুব সম্ভব ১১১ বা এই ধরনের কিছু একটি। যতটুকু মনে পড়ে, তার সঙ্গে এই অত ভোরে প্রথম দেখা করতে আসেন বেগম খুরশীদ (আবু সাঈদ) চৌধুরী, সঙ্গে কায়সার, যে এখন আবুল হাসান চৌধুরী নামে বেশি পরিচিত; কায়সারের ছোটো ভাই খালেদ এবং তাদের একমাত্র বোন শিরিন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তখন লন্ডনে ছিলেন না, তিনি মাত্র তিন দিন আগে কলকাতা হয়ে ঢাকার উদ্দেশে লন্ডন ছেড়ে গেছেন।

ক্ল্যারিজেস হোটেলে পৌঁছে আমরা বাংলাদেশ দূতাবাসের তিনজন দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি করছি। দূতাবাসের অন্য সব কর্মকর্তাকে খবর দিয়েছি ইতোমধ্যে। কর্মচারীদের সবাইকেও ডেকে পাঠিয়েছি। হোটেলে আমাদের অফিস হিসেবে আলাদা একটি কামরা পেলাম, একটু দূরে। ’৭১-এ লন্ডনে আমাদের প্রেস বিভাগের প্রধান মহিউদ্দিন চৌধুরী (এক সময় ঢাকায় পিআইএ’র জনসংযোগ কর্মকর্তা) এই কামরার দায়িত্বে থাকলেন। বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ প্রার্থীদের ওখানেই তিনি প্রথম অভ্যর্থনা জানাবেন। সাক্ষাৎ প্রার্থীদের ওখানে বসিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুইটে আমাদের খবর দিবেন। তারপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার।

সেই সকালেই ডেভিড ফ্রস্ট এসে উপস্থিত। একটি মাত্র অনুরোধ, বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার চাই। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু তখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষাৎকার কাউকে দেননি। সুতরাং যিনিই প্রথম সাক্ষাৎকারটি পাবেন, তিনি একটি স্কুপ পেয়ে গেলেন।

ডেভিড ফ্রস্টকে দেখে আমরা আবার গর্বিত হলাম। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন সারা দুনিয়ার মশহুর টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডেভিড ফ্রস্ট। বঙ্গবন্ধু ফ্রস্টকেও আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন, একান্ত আপনজনের মতো কথা বললেন ফ্রস্টের সঙ্গে। পরে আমরা কারণটি বুঝেছিলাম, কয়েকদিন পর লন্ডন টাইমসে একটি খবর পড়ে। ওই ষাটের দশকে ‘ফ্রস্ট রিপোর্ট’ নামে যে অনুষ্ঠানটি ঢাকা টেলিভিশনে দেখানো হতো, বঙ্গবন্ধু তা নিয়মিত দেখতেন এবং তিনিও একজন ফ্রস্টভক্ত হয়ে উঠেছিলেন।

ফ্রস্টের অনুষ্ঠান তখন কয়েক মাস ব্রিটিশ টিভি চ্যানেলে বন্ধ ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ফ্রস্ট প্রস্তাব করলেন, তিনি বিশ^বিখ্যাত লোকদের সাক্ষাৎকার নিয়ে আরেকটি নতুন সিরিজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার দিয়ে সিরিজের শুরু করতে চান। এমন প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধুও খুশি হলেন। বললেন, তোমার এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকার তো আর এখানে হতে পারে না। এখানে এত লোকজন। এছাড়া এতক্ষণ সময় তো আমি তোমাকে দিতে পারব না এখন। ঠিক আছে, আমার মেহমান হিসেবে বাংলাদেশে এসে যাও, যতক্ষণ তুমি আমার সঙ্গে থাকতে চাও এবং ঘুরতে চাও, ততক্ষণ সময় তুমি পাবে। এরপর ফ্রস্টের প্রশ্ন, আমি কখন আসতে পারি। বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক জবাব, তুমি যেদিন আসতে পার, যখনই আসতে পার। দুই-তিনদিন পরই ফ্রস্ট বাংলাদেশে হাজির হয়েছিলেন এবং ওই জানুয়ারির শেষদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েই তার নতুন সিরিজ বিবিসিতে শুরু হয়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে তার নিজের এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা পান পৃথিবীর কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শক। পরে এই সাক্ষাৎকারের একটি টেপের জন বিবিসি’কে আমরা অনুরোধ করেছিলাম। এই টেপটিই পরে আমাদের টিভিতে দেখানো হয়েছিল।

আপা পন্থ লন্ডনে তখন ভারতীয় হাইকমিশনার, সঙ্গে আইপি খোসলা (পরে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার), ভারতীয় হাইকমিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সেলর, আরও আছেন ভারতীয় হাইকমিশনের আরেকজন কর্মকর্তা ব্যানার্জি, আমাদের সঙ্গে যার সরাসরি যোগাযোগ ছিল সেই আমলে। আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ডাক্তার হোসেন। আপা পন্থ একটির পর একটি মেসেজ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং খুব সম্ভব ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরির কাছ থেকে। মিসেস গান্ধী তখন বোধহয় দিল্লিতে ছিলেন না। দিল্লির বাইরে কোনো এক প্রদেশে তিনি সেদিন সফরে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু লন্ডনে পৌঁছেছেন শোনামাত্রই তিনি বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, আপা পন্থ খবর দিলেন। পরে তারা দুজন ওইদিনই টেলিফোনে কথা বলেছিলেন; বঙ্গবন্ধু মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে মিসেস গান্ধীর ব্যক্তিগত, ভারত সরকার এবং ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন রকমের সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

রেজাউল করিম সাহেব ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোনে কানেকশন দিয়েছেন বেগম মুজিবের সঙ্গে। আমরা তখন কেউ তার বেডরুমে ছিলাম না। তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলছেন, আমরা শুনেছি, তাজ কাঁদিসনে, আমি এসে গেছি। শীঘ্রই তোদের সঙ্গে দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।

পিটার শোর, এক বাঙালি প্রেমিক শ্রমিকদলীয় কমন সভার সদস্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেনে কতবড় এক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তিনি এলেন সকালের দিকে একবার। বিকেলের দিকে তিনি আবার আসলেন। এইবার ব্রিটিশ শ্রমিক দল নেতা হ্যারল্ড উইলসনকে নিয়ে। কথাটি এই প্রথম শুনলাম একজন বিদেশির মুখে। আমাদের বঙ্গবন্ধুকে বলছেন, It is great to see your Excellency. একজন বিদেশি এই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও সম্বোধন করলেন। এলেন আরনল্ড স্মিথ, কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল। একজন বাঙালিপ্রেমিক কানাডীয়।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের জন্য অস্থায়ীভাবে স্থাপিত অফিস দেখাশোনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিউদ্দিন চৌধুরী একসময় এসে বলল, বঙ্গবন্ধুর জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে এগারো-বারোটি টেলিফোন ‘কল’ লাইনে অপেক্ষায় আছে বলে হোটেলের টেলিফোন অপারেটর তাকে জানিয়েছেন। অপারেটর এখন কী করবেন, এই সম্পর্কে নির্দেশ-পরামর্শ চায়। আমি বলি, মহিউদ্দিন চৌধুরীকেই সামলাতে হবে এই ধরনের সমস্যা। মহিউদ্দিন চৌধুরীর তারিফ করতে হয়। ঢাকা থেকে কত বিখ্যাত বিখ্যাত লোকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে কানেকশন দিতে অপারেটরকে নিষেধ করে দিয়েছিল সেদিন। সে এক প্রচ- চাপ গেছে তার ওপর তখন। টেলিফোন ‘কল’ এবং সাক্ষাৎকার প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বঙ্গবন্ধুকে সামলানো একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। বাইরে হোটেলের সামনে ফুটপাত থেকে প্রায়ই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগান শোনা যাচ্ছে কামরার ভেতর থেকে, বঙ্গবন্ধুও শুনছেন। সবাই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে এবং পারলে বঙ্গবন্ধুর হোটেলের কামরায় এসে তাকে একটু স্পর্শ করতে চায়।

বঙ্গবন্ধু ছুটে গিয়ে ব্যালকনিতে দুই-তিনবার দাঁড়িয়েছেন, হাত নেড়ে সমবেত জনতার অভিনন্দনের জবাব দিয়েছেন। নিজেই জয় বাংলা সেøাগান উঠিয়েছেন একই ব্যালকনি থেকে। নিচের হাজার হাজার মানুষও তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে জয় বাংলা সেøাগান দিয়েছে। আশপাশের ব্রিটিশ লোকজন দেখছে; কিন্তু বুঝতে পারছে না। একসময় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোকজন এসে আমাদের বলল, বঙ্গবন্ধুর এমন করে তাদের না জানিয়ে ব্যালকনিতে ছুটে যাওয়া তার নিরাপত্তার জন্য প্রচ- এক হুমকি। সেদিন দুপুর ১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন হলো। কত হবে উপস্থিত সাংবাদিক এবং ক্যামেরাম্যানদের সংখ্যা, তিনশ না চারশ? আমরা কেউ গুনে দেখিনি, তবে কামরাটি ভর্তি ছিল। অনেকেই দাঁড়িয়ে

থেকে প্রেস কনফারেন্সটি কাভার করেছেন, আবার অনেকেই কামরার বাইরে থেকেও নোট নেয়ার চেষ্টা করেছেন। পাকিস্তানি সাংবাদিক নাসিম আহমদকে দেখে উত্তেজিত হয়ে গেলাম আমি। নাসিম আহমদ লন্ডনে করাচির ইংরেজি ডন পত্রিকার প্রতিনিধি ছিলেন। এমন কট্টর বাঙালিবিরোধী অথচ আজ এখানে কেন। পাকিস্তান হাইকমিশনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কত রকমের অপমানজনক কথা বলেছেন এই নাসিম আহমদ। আমি বলি, নাসিম আহমদকে এখানে থাকতে দেয়া যায় না। নাসিম আহমদ বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার প্রতি একটি হুমকি। ফজলুল করিম প্রেস কনফারেন্সের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমার সিনিয়র, আমার এই প্রতিবাদ তিনি উপেক্ষা করলেন। পূর্বঘোষিত সময়ের একটু পরে বঙ্গবন্ধু বসলেন তার নির্ধারিত চেয়ারটিতে। বঙ্গবন্ধুর একপাশে ডক্টর কামাল হোসেন, আরেক পাশে রেজাউল করিম। মহিউদ্দিন চৌধুরী বসার জন্য কোনো আসন পাননি। কিন্তু এই প্রেস কনফারেন্সের অফিসিয়াল রেকর্ড রাখার জন্য কোথা থেকে একটি টেপরেকর্ডার জোগাড় করে ওটি নিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং রেজাউল করিম সাহেবের চেয়ার দুটোর মাঝে ‘ফ্লোরে’ বসে বঙ্গবন্ধুর প্রেস কনফারেন্স টেপ করল। পরের দিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই প্রেস কনফারেন্সের ওপর প্রকাশিত ছবিতেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর শুধু মাথাটি দেখা যাচ্ছিল।

বঙ্গবন্ধু প্রথমে একটি লিখিত বিবৃতি পড়লেন। এই বিবৃতিটি রচনা করেন মুখ্যত রেজাউল করিম; আর দেখে দেন ডক্টর কামাল হোসেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার এবং জনগণের সমর্থনের কথা তিনি উল্লেখ করলেন এই বিবৃতিতে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী এবং তাদের দোসররা জানমালের যে ব্যাপক ক্ষতি করেছে, এর বর্ণনা দিয়ে বিশ^বাসীর কাছে সাহায্য

চাইলেন। এই বিবৃতি চূড়ান্ত করার আগে রেজাউল করিম সাহেব বঙ্গবন্ধুকে একবার দেখিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর একটিই মন্তব্য ছিল সেদিন এই বিবৃতির ওপর। বললেন, রেজাই করিম, (বঙ্গবন্ধু রেজাউল করিম সাহেবকে রেজাই করিমই ডাকতেন) তুমি তো বলেছ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেনি; কিন্তু ওই দেশের মানুষজন তো আমাদের পক্ষে ছিল। তো মার্কিন জনগণের সমর্থনের কথাটি এখানে লাগিয়ে দাও না। রেজাউল করিম সাহেব তা-ই করেছিলেন।

বিবৃতিটি পড়া শেষে প্রশ্নোত্তরের পালা। কিন্তু প্রথম প্রশ্নটিই যে এমন হবে, সেজন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। বঙ্গবন্ধুর ডান পাশে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতোই মাটিতে বসা শুধু মাথাটি দেখা যাচ্ছেÑ এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, আপনি দুনিয়ার সব দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের পুনর্বাসনে সাহায্য চাইছেন। যে কোনো দেশ আপনার সাহায্যে এগিয়ে এলে আপনি কি সেই সাহায্য গ্রহণ করবেন? বঙ্গবন্ধু ইতিবাচক জবাব দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এবার সাপ্লিমেন্টারি প্রশ্ন। ইসরায়েল যদি এমন সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে, আপনি কি তা গ্রহণ করবেন? কয়েক সেকেন্ড আমরা সবাই চুপ। আগেই বলেছি, এমন

প্রশ্নের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। এই মানুষটি তখন বললেন, না, ইসরায়েল যদি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে, সেই সাহায্য গ্রহণ করার আগে আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হবে। ভদ্র কূটনৈতিক ভাষায় ইসরায়েলের সাহায্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন বঙ্গবন্ধু। সেই দিনই আরব দেশগুলোর প্রতি বঙ্গবন্ধু আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেছিলেন। মধ্যপ্রাচে ইসরায়েলের অন্যায় অত্যাচারীর আচরণ, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েেলর আরবভূমি দখল, নিজ দেশে ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী জীবনযাপনÑ এসবের প্রতিবাদ হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের প্রথমদিনেই তার পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক স্তÍম্ভের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরববিশে^র প্রতি আমাদের সংহতি এবং সহমর্মিতা সেদিন বঙ্গবন্ধু যেমন ঘোষণা করেছিলেন, তা আজও একই রকম অব্যাহত আছে। বঙ্গবন্ধুর আমলে এবং তারপর এমন একাত্মতা আমরা বারবার প্রকাশ করেছি। কিন্তু প্রশ্ন, আরববিশ^ কি তেমনভাবে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে দেখেছে? বঙ্গবন্ধুকে সম্মান, মর্যাদা দিয়েছে?

এই দিন বিকালে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে দেখা করতে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে গেলেন। আমাদের মধ্যে একজন আবারও রেজাউল করিম সাহেবকে প্রশ্ন করলেন, আমাদের প্রেসিডেন্ট ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে যাবেন কেন? এডওয়ার্ড হিথেরই তো আসা উচিত ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে; যেমনটি এসেছেন হ্যারল্ড উইলসন এবং অন্য নেতারা। রেজাউল করিম সাহেব বুঝিয়ে বলেন, ব্রিটিশ সরকার এই নয় মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে যতসব সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে, তার জন্য ধন্যবাদ জানাতেই বঙ্গবন্ধু ডাউনিং স্ট্রিটে গেছেন। এতে প্রটোকল ভঙ্গ হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর এই সাক্ষাৎকারকালে তার সঙ্গে ছিলেন ডক্টর কামাল হোসেন। পরদিন রোববার ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর লন্ডন কর্মসূচির ওপর যেসব ছবি ছাপা হয়, তার মধ্যে একটি ছিল প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১০ নম্বর ডাউন স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় সংবর্ধনা জানাচ্ছেন, পাশে ডক্টর কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের সবার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ও অভিজ্ঞতা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি এই প্রথম আরেকটি স্ব^াধীন-সার্বভৌম দেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন।

(সংক্ষেপিত। লেখাটি ইতিপূর্বে সংবাদ-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)

[লেখক : সাবেক পররাষ্ট্র সচিব]

image

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২, লন্ডনে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু

আরও খবর
গবেষণায় সময় দিতে চিকিৎসকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
ইসি গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আ’লীগের সংলাপ ১৭ জানুয়ারি
এক নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওলট-পালট
জনগণ কখনো গডফাদারকে গ্রহণ করেনি : আইভী
মাউশিতে কর্মচারী নিয়োগে অনিয়ম অভিযান চলছে দুদকের
তীব্র শীতের কারণে শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ লক্ষাধিকের, মৃত্যু ১৬
সরকার এখনই লকডাউন দেয়ার কথা ভাবছে না পররাষ্ট্রমন্ত্রী
ধলেশ্বরীতে ট্রলার ডুবি, চার দিন পর ৬ লাশ উদ্ধার
পিপিপি ভিত্তিতে নির্মাণ হবে চার লেনের মহাসড়ক
গারো কিশোরী ধর্ষণ মামলায় ৫ আসামি রিমান্ডে
জামালপুরে মা-মেয়েকে খুন করা হয় ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে
উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফের আগুন
প্রতিবন্ধী আরফাতুলের স্বপ্ন পুড়ে ছাই করে দিল সন্ত্রাসীরা

সোমবার, ১০ জানুয়ারী ২০২২ , ২৬ পৌষ ১৪২৮ ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ : লন্ডনে বঙ্গবন্ধু

মহিউদ্দিন আহমদ
image

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২, লন্ডনে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু

টেলিফোনটি ধরতেই ওই প্রান্ত থেকে এমএম রেজাউল করিম আমাকে বলছেন, বঙ্গবন্ধু লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন। তিনি হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আমাকে টেলিফোন করেছেন। আমি হিথ্রো বিমানবন্দরে যাচ্ছি। তুমি তাড়াতাড়ি আসো।

এই মুহূর্তটির জন্য অপেক্ষা করে আছি সেই কতদিন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ১৬ ডিসেম্বরে। কিন্তু মহানায়ক ছাড়া উৎসব-উল্লাস প্রাণ পাচ্ছে না। তার অবর্তমানে বিজয়ের আনন্দ-বেদনা প্রকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধ ু স্বদেশে ফিরে গিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের দায়িত্ব আবার কাঁধে নেবেন, দেশের প্রতিটি মানুষ তা চাইছে।

জায়গিরদার সাহেব আমার পাশের সিটে। আমি স্টিয়ারিং হুইল হাতে নিয়ে বসি। গাড়ি দক্ষিণ লন্ডন থেকে সেন্ট্রাল লন্ডন পেরিয়ে উত্তর লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে যাবে। হিথ্রো বিমানবন্দরে ভিআইপি সুইটটিতে ঢুকতে আমার এতটুকু অসুবিধা হলো না। প্রধান ফটকে বা ভেতরে কেউ আমাদের আটকালো না। প্রধান ফটকে অবশ্য একজন প্রশ্ন করেছিল, কোথায় যাচ্ছ? উত্তর দিলাম, বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাতে। মনে হলো এই নিরাপত্তাপ্রহরীও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। দ্বিতীয় প্রশ্নটি না করে বা কোনো পরিচয়পত্র না দেখেই ছেড়ে দিল। বঙ্গবন্ধুর নাম সেই রাতে সেই ব্রিটিশ দ্বাররক্ষীর কাছে ‘ওপেন সিস্টেম’র কাজ করল।

ভিআইপি লাউঞ্জে ঢুকে দেখলাম সেই অসাধারণ দৃশ্য। বঙ্গবন্ধু কথা বলছেন রেজাউল করিম সাহেবের সঙ্গে, পাশে ডক্টর কামাল হোসেন। আর একটু দূরে মিসেস হামিদা হোসেন তাদের দুই শিশুকন্যা নিয়ে বসে আছেন। লক্ষ্য করলাম, ইয়ান সাদারল্যান্ড টেলিফোনে কথা বলছেন কারও সঙ্গে। ইয়ান সাদারল্যান্ড তখন ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধÑ সব তখন তার সরাসরি দায়িত্বের মধ্যে। কামরায় ঢুকতেই রেজাউল করিম সাহেব বঙ্গবন্ধুর কাছে দুই-তিনটি বাক্যে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন : বঙ্গবন্ধু, এই আমাদের মহিউদ্দিন, আমাদের বাংলাদেশ মিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি। আমি বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে সরে যাচ্ছিলাম। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাকে অপ্রত্যাশিতভাবে তার বুকে টেনে নিলেন। আর আমার চোখ দিয়ে নদী প্রবাহিত হতে থাকল, মিনিটখানেক। বঙ্গবন্ধু বললেন, ভয় নেই, আমি এসে গেছি। আমার কান্নাতে মনে হলো, তার গলাও আটকে গেছে।

আলকক অ্যান্ড ব্রাউন সুইটে মিনিট দশেক কাটিয়েছি। সাদারল্যান্ড এসে খবর দিলেন, বঙ্গবন্ধু এবং ডক্টর কামাল হোসেনের জন্য ক্ল্যারিজেস হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের এখন ওখানে যেতে হবে। তখন অনুমান করি সকাল সাড়ে ৬টা। এই সময়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য রেজাউল করিম সাহেবের ফোর্ড কর্টিনা এবং আমার অস্টিন গাড়িকেই সব চাইতে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ মনে করা হলো। এই অত সকালে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাওয়ার জন্য লিমুজিনের ব্যবস্থাও হয়ে গেল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দিলেন তিনি রেজাউল করিম সাহেবের গাড়িতেই যাবেন এবং রেজাউল করিম সাহেব নিজেই চালাবেন। তার পাশের সিটে বঙ্গবন্ধু বসলেন এবং লিমুজিনে ডক্টর কামাল হোসেন, তার স্ত্রী এবং তাদের দুই মেয়ে। আমার গাড়িতে আমি এবং জায়গিরদার। তবে বঙ্গবন্ধু ও ডক্টর কামালের স্যুটকেস, যা দু-একটি ছিল তা আমার গাড়িতে উঠালাম। তাতেই আমি, বাংলাদেশ মিশনের দ্বিতীয় সচিব মহিউদ্দিন আহমদ দারুণ সম্মানিতবোধ করলাম। ভিআইপি রুম থেকে বের হতে যাবÑ এমন সময় দেখি, দরজায় আট-দশজন ক্যামেরাম্যান এবং সাংবাদিক এসে উপস্থিত। ইতোমধ্যে বিবিসি খবর প্রচার করা শুরু করেছে যে, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ বিমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডনে এসে পৌঁছেছেন। এ সাংবাদিকদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধুকে আরও তিন-চার মিনিট সোফায় বসে কাটাতে হলো। তিনি পাইপ ধরাচ্ছেন। আমি তার পাইপে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছি, এইসব চিত্র টেলিভিশনে সেদিন দেখানোও হলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার দিলেন না। তার নিজের সম্পর্কেও কোনো কথা সেদিন সকালে তিনি ভিআইপি রুমে বলেননি।

ক্ল্যারিজেস হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে ৭টা বেজে গেল। আনুষ্ঠানিকতা তেমন কিছু ছিল না। ওখানে পৌঁছার পর যা কিছু করার সব সাদারল্যান্ডই দেখলেন। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ব্রিটিশ সরকার তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সহানুভূতি এবং জনগণের সক্রিয় সমর্থন পুরো নয় মাস বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। সেই বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর কোথাও না গিয়ে লন্ডনে এসেছেন। বিষয়টি ব্রিটিশ সরকারের জন্যও গৌরব ও আনন্দের। সারা দুনিয়ার সব নিউজ বুলেটিনে এই মানুষটির লন্ডনে পৌঁছানোই এক নম্বর খবর হলো। সুতরাং ব্রিটিশ সরকার তাকে যথাযোগ্য মর্যাদা এবং সম্মান দেবে, তা-ই তো সাধারণ প্রত্যাশা।

ক্ল্যারিজেস হোটেলের কামরাটির নম্বর এত বছর পর এখন সঠিক মনে নেই। তবে খুব সম্ভব ১১১ বা এই ধরনের কিছু একটি। যতটুকু মনে পড়ে, তার সঙ্গে এই অত ভোরে প্রথম দেখা করতে আসেন বেগম খুরশীদ (আবু সাঈদ) চৌধুরী, সঙ্গে কায়সার, যে এখন আবুল হাসান চৌধুরী নামে বেশি পরিচিত; কায়সারের ছোটো ভাই খালেদ এবং তাদের একমাত্র বোন শিরিন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তখন লন্ডনে ছিলেন না, তিনি মাত্র তিন দিন আগে কলকাতা হয়ে ঢাকার উদ্দেশে লন্ডন ছেড়ে গেছেন।

ক্ল্যারিজেস হোটেলে পৌঁছে আমরা বাংলাদেশ দূতাবাসের তিনজন দৌড়াদৌড়ি ছোটাছুটি করছি। দূতাবাসের অন্য সব কর্মকর্তাকে খবর দিয়েছি ইতোমধ্যে। কর্মচারীদের সবাইকেও ডেকে পাঠিয়েছি। হোটেলে আমাদের অফিস হিসেবে আলাদা একটি কামরা পেলাম, একটু দূরে। ’৭১-এ লন্ডনে আমাদের প্রেস বিভাগের প্রধান মহিউদ্দিন চৌধুরী (এক সময় ঢাকায় পিআইএ’র জনসংযোগ কর্মকর্তা) এই কামরার দায়িত্বে থাকলেন। বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ প্রার্থীদের ওখানেই তিনি প্রথম অভ্যর্থনা জানাবেন। সাক্ষাৎ প্রার্থীদের ওখানে বসিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুইটে আমাদের খবর দিবেন। তারপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার।

সেই সকালেই ডেভিড ফ্রস্ট এসে উপস্থিত। একটি মাত্র অনুরোধ, বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার চাই। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু তখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষাৎকার কাউকে দেননি। সুতরাং যিনিই প্রথম সাক্ষাৎকারটি পাবেন, তিনি একটি স্কুপ পেয়ে গেলেন।

ডেভিড ফ্রস্টকে দেখে আমরা আবার গর্বিত হলাম। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নিতে এসেছেন সারা দুনিয়ার মশহুর টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডেভিড ফ্রস্ট। বঙ্গবন্ধু ফ্রস্টকেও আন্তরিক অভ্যর্থনা জানালেন, একান্ত আপনজনের মতো কথা বললেন ফ্রস্টের সঙ্গে। পরে আমরা কারণটি বুঝেছিলাম, কয়েকদিন পর লন্ডন টাইমসে একটি খবর পড়ে। ওই ষাটের দশকে ‘ফ্রস্ট রিপোর্ট’ নামে যে অনুষ্ঠানটি ঢাকা টেলিভিশনে দেখানো হতো, বঙ্গবন্ধু তা নিয়মিত দেখতেন এবং তিনিও একজন ফ্রস্টভক্ত হয়ে উঠেছিলেন।

ফ্রস্টের অনুষ্ঠান তখন কয়েক মাস ব্রিটিশ টিভি চ্যানেলে বন্ধ ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ফ্রস্ট প্রস্তাব করলেন, তিনি বিশ^বিখ্যাত লোকদের সাক্ষাৎকার নিয়ে আরেকটি নতুন সিরিজ শুরু করার পরিকল্পনা করেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার দিয়ে সিরিজের শুরু করতে চান। এমন প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধুও খুশি হলেন। বললেন, তোমার এক ঘণ্টার সাক্ষাৎকার তো আর এখানে হতে পারে না। এখানে এত লোকজন। এছাড়া এতক্ষণ সময় তো আমি তোমাকে দিতে পারব না এখন। ঠিক আছে, আমার মেহমান হিসেবে বাংলাদেশে এসে যাও, যতক্ষণ তুমি আমার সঙ্গে থাকতে চাও এবং ঘুরতে চাও, ততক্ষণ সময় তুমি পাবে। এরপর ফ্রস্টের প্রশ্ন, আমি কখন আসতে পারি। বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক জবাব, তুমি যেদিন আসতে পার, যখনই আসতে পার। দুই-তিনদিন পরই ফ্রস্ট বাংলাদেশে হাজির হয়েছিলেন এবং ওই জানুয়ারির শেষদিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েই তার নতুন সিরিজ বিবিসিতে শুরু হয়েছিল। ওই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে তার নিজের এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা পান পৃথিবীর কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শক। পরে এই সাক্ষাৎকারের একটি টেপের জন বিবিসি’কে আমরা অনুরোধ করেছিলাম। এই টেপটিই পরে আমাদের টিভিতে দেখানো হয়েছিল।

আপা পন্থ লন্ডনে তখন ভারতীয় হাইকমিশনার, সঙ্গে আইপি খোসলা (পরে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার), ভারতীয় হাইকমিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সেলর, আরও আছেন ভারতীয় হাইকমিশনের আরেকজন কর্মকর্তা ব্যানার্জি, আমাদের সঙ্গে যার সরাসরি যোগাযোগ ছিল সেই আমলে। আমরা তার নাম দিয়েছিলাম ডাক্তার হোসেন। আপা পন্থ একটির পর একটি মেসেজ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকে, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং খুব সম্ভব ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরির কাছ থেকে। মিসেস গান্ধী তখন বোধহয় দিল্লিতে ছিলেন না। দিল্লির বাইরে কোনো এক প্রদেশে তিনি সেদিন সফরে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু লন্ডনে পৌঁছেছেন শোনামাত্রই তিনি বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, আপা পন্থ খবর দিলেন। পরে তারা দুজন ওইদিনই টেলিফোনে কথা বলেছিলেন; বঙ্গবন্ধু মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে মিসেস গান্ধীর ব্যক্তিগত, ভারত সরকার এবং ভারতীয় জনগণের বিভিন্ন রকমের সাহায্য, সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

রেজাউল করিম সাহেব ইতোমধ্যে বঙ্গবন্ধুকে টেলিফোনে কানেকশন দিয়েছেন বেগম মুজিবের সঙ্গে। আমরা তখন কেউ তার বেডরুমে ছিলাম না। তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলছেন, আমরা শুনেছি, তাজ কাঁদিসনে, আমি এসে গেছি। শীঘ্রই তোদের সঙ্গে দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।

পিটার শোর, এক বাঙালি প্রেমিক শ্রমিকদলীয় কমন সভার সদস্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেনে কতবড় এক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তিনি এলেন সকালের দিকে একবার। বিকেলের দিকে তিনি আবার আসলেন। এইবার ব্রিটিশ শ্রমিক দল নেতা হ্যারল্ড উইলসনকে নিয়ে। কথাটি এই প্রথম শুনলাম একজন বিদেশির মুখে। আমাদের বঙ্গবন্ধুকে বলছেন, It is great to see your Excellency. একজন বিদেশি এই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ হিসেবেও সম্বোধন করলেন। এলেন আরনল্ড স্মিথ, কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল। একজন বাঙালিপ্রেমিক কানাডীয়।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের জন্য অস্থায়ীভাবে স্থাপিত অফিস দেখাশোনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিউদ্দিন চৌধুরী একসময় এসে বলল, বঙ্গবন্ধুর জন্য দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে এগারো-বারোটি টেলিফোন ‘কল’ লাইনে অপেক্ষায় আছে বলে হোটেলের টেলিফোন অপারেটর তাকে জানিয়েছেন। অপারেটর এখন কী করবেন, এই সম্পর্কে নির্দেশ-পরামর্শ চায়। আমি বলি, মহিউদ্দিন চৌধুরীকেই সামলাতে হবে এই ধরনের সমস্যা। মহিউদ্দিন চৌধুরীর তারিফ করতে হয়। ঢাকা থেকে কত বিখ্যাত বিখ্যাত লোকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে কানেকশন দিতে অপারেটরকে নিষেধ করে দিয়েছিল সেদিন। সে এক প্রচ- চাপ গেছে তার ওপর তখন। টেলিফোন ‘কল’ এবং সাক্ষাৎকার প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও বঙ্গবন্ধুকে সামলানো একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। বাইরে হোটেলের সামনে ফুটপাত থেকে প্রায়ই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগান শোনা যাচ্ছে কামরার ভেতর থেকে, বঙ্গবন্ধুও শুনছেন। সবাই বঙ্গবন্ধুকে দেখতে এবং পারলে বঙ্গবন্ধুর হোটেলের কামরায় এসে তাকে একটু স্পর্শ করতে চায়।

বঙ্গবন্ধু ছুটে গিয়ে ব্যালকনিতে দুই-তিনবার দাঁড়িয়েছেন, হাত নেড়ে সমবেত জনতার অভিনন্দনের জবাব দিয়েছেন। নিজেই জয় বাংলা সেøাগান উঠিয়েছেন একই ব্যালকনি থেকে। নিচের হাজার হাজার মানুষও তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে জয় বাংলা সেøাগান দিয়েছে। আশপাশের ব্রিটিশ লোকজন দেখছে; কিন্তু বুঝতে পারছে না। একসময় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোকজন এসে আমাদের বলল, বঙ্গবন্ধুর এমন করে তাদের না জানিয়ে ব্যালকনিতে ছুটে যাওয়া তার নিরাপত্তার জন্য প্রচ- এক হুমকি। সেদিন দুপুর ১টার দিকে সংবাদ সম্মেলন হলো। কত হবে উপস্থিত সাংবাদিক এবং ক্যামেরাম্যানদের সংখ্যা, তিনশ না চারশ? আমরা কেউ গুনে দেখিনি, তবে কামরাটি ভর্তি ছিল। অনেকেই দাঁড়িয়ে

থেকে প্রেস কনফারেন্সটি কাভার করেছেন, আবার অনেকেই কামরার বাইরে থেকেও নোট নেয়ার চেষ্টা করেছেন। পাকিস্তানি সাংবাদিক নাসিম আহমদকে দেখে উত্তেজিত হয়ে গেলাম আমি। নাসিম আহমদ লন্ডনে করাচির ইংরেজি ডন পত্রিকার প্রতিনিধি ছিলেন। এমন কট্টর বাঙালিবিরোধী অথচ আজ এখানে কেন। পাকিস্তান হাইকমিশনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কত রকমের অপমানজনক কথা বলেছেন এই নাসিম আহমদ। আমি বলি, নাসিম আহমদকে এখানে থাকতে দেয়া যায় না। নাসিম আহমদ বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার প্রতি একটি হুমকি। ফজলুল করিম প্রেস কনফারেন্সের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আমার সিনিয়র, আমার এই প্রতিবাদ তিনি উপেক্ষা করলেন। পূর্বঘোষিত সময়ের একটু পরে বঙ্গবন্ধু বসলেন তার নির্ধারিত চেয়ারটিতে। বঙ্গবন্ধুর একপাশে ডক্টর কামাল হোসেন, আরেক পাশে রেজাউল করিম। মহিউদ্দিন চৌধুরী বসার জন্য কোনো আসন পাননি। কিন্তু এই প্রেস কনফারেন্সের অফিসিয়াল রেকর্ড রাখার জন্য কোথা থেকে একটি টেপরেকর্ডার জোগাড় করে ওটি নিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং রেজাউল করিম সাহেবের চেয়ার দুটোর মাঝে ‘ফ্লোরে’ বসে বঙ্গবন্ধুর প্রেস কনফারেন্স টেপ করল। পরের দিন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এই প্রেস কনফারেন্সের ওপর প্রকাশিত ছবিতেও মহিউদ্দিন চৌধুরীর শুধু মাথাটি দেখা যাচ্ছিল।

বঙ্গবন্ধু প্রথমে একটি লিখিত বিবৃতি পড়লেন। এই বিবৃতিটি রচনা করেন মুখ্যত রেজাউল করিম; আর দেখে দেন ডক্টর কামাল হোসেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার এবং জনগণের সমর্থনের কথা তিনি উল্লেখ করলেন এই বিবৃতিতে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী এবং তাদের দোসররা জানমালের যে ব্যাপক ক্ষতি করেছে, এর বর্ণনা দিয়ে বিশ^বাসীর কাছে সাহায্য

চাইলেন। এই বিবৃতি চূড়ান্ত করার আগে রেজাউল করিম সাহেব বঙ্গবন্ধুকে একবার দেখিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর একটিই মন্তব্য ছিল সেদিন এই বিবৃতির ওপর। বললেন, রেজাই করিম, (বঙ্গবন্ধু রেজাউল করিম সাহেবকে রেজাই করিমই ডাকতেন) তুমি তো বলেছ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার আমাদের এই মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করেনি; কিন্তু ওই দেশের মানুষজন তো আমাদের পক্ষে ছিল। তো মার্কিন জনগণের সমর্থনের কথাটি এখানে লাগিয়ে দাও না। রেজাউল করিম সাহেব তা-ই করেছিলেন।

বিবৃতিটি পড়া শেষে প্রশ্নোত্তরের পালা। কিন্তু প্রথম প্রশ্নটিই যে এমন হবে, সেজন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। বঙ্গবন্ধুর ডান পাশে মহিউদ্দিন চৌধুরীর মতোই মাটিতে বসা শুধু মাথাটি দেখা যাচ্ছেÑ এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, আপনি দুনিয়ার সব দেশের কাছ থেকে বাংলাদেশের পুনর্বাসনে সাহায্য চাইছেন। যে কোনো দেশ আপনার সাহায্যে এগিয়ে এলে আপনি কি সেই সাহায্য গ্রহণ করবেন? বঙ্গবন্ধু ইতিবাচক জবাব দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এবার সাপ্লিমেন্টারি প্রশ্ন। ইসরায়েল যদি এমন সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে, আপনি কি তা গ্রহণ করবেন? কয়েক সেকেন্ড আমরা সবাই চুপ। আগেই বলেছি, এমন

প্রশ্নের জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। এই মানুষটি তখন বললেন, না, ইসরায়েল যদি সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসে, সেই সাহায্য গ্রহণ করার আগে আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হবে। ভদ্র কূটনৈতিক ভাষায় ইসরায়েলের সাহায্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন বঙ্গবন্ধু। সেই দিনই আরব দেশগুলোর প্রতি বঙ্গবন্ধু আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেছিলেন। মধ্যপ্রাচে ইসরায়েলের অন্যায় অত্যাচারীর আচরণ, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েেলর আরবভূমি দখল, নিজ দেশে ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী জীবনযাপনÑ এসবের প্রতিবাদ হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের প্রথমদিনেই তার পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক স্তÍম্ভের ঘোষণা দিয়েছিলেন। আরববিশে^র প্রতি আমাদের সংহতি এবং সহমর্মিতা সেদিন বঙ্গবন্ধু যেমন ঘোষণা করেছিলেন, তা আজও একই রকম অব্যাহত আছে। বঙ্গবন্ধুর আমলে এবং তারপর এমন একাত্মতা আমরা বারবার প্রকাশ করেছি। কিন্তু প্রশ্ন, আরববিশ^ কি তেমনভাবে বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশকে দেখেছে? বঙ্গবন্ধুকে সম্মান, মর্যাদা দিয়েছে?

এই দিন বিকালে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে দেখা করতে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে গেলেন। আমাদের মধ্যে একজন আবারও রেজাউল করিম সাহেবকে প্রশ্ন করলেন, আমাদের প্রেসিডেন্ট ব্রিটিশ প্রাইম মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা করতে তার বাড়িতে যাবেন কেন? এডওয়ার্ড হিথেরই তো আসা উচিত ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে; যেমনটি এসেছেন হ্যারল্ড উইলসন এবং অন্য নেতারা। রেজাউল করিম সাহেব বুঝিয়ে বলেন, ব্রিটিশ সরকার এই নয় মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে যতসব সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে, তার জন্য ধন্যবাদ জানাতেই বঙ্গবন্ধু ডাউনিং স্ট্রিটে গেছেন। এতে প্রটোকল ভঙ্গ হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর এই সাক্ষাৎকারকালে তার সঙ্গে ছিলেন ডক্টর কামাল হোসেন। পরদিন রোববার ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর লন্ডন কর্মসূচির ওপর যেসব ছবি ছাপা হয়, তার মধ্যে একটি ছিল প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১০ নম্বর ডাউন স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় সংবর্ধনা জানাচ্ছেন, পাশে ডক্টর কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের সবার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ও অভিজ্ঞতা ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি এই প্রথম আরেকটি স্ব^াধীন-সার্বভৌম দেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন।

(সংক্ষেপিত। লেখাটি ইতিপূর্বে সংবাদ-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)

[লেখক : সাবেক পররাষ্ট্র সচিব]