১০ জানুয়ারি কী বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

আমি আপনাদের কাছে দু-এক কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারব না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে। আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, ফাঁসিকাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালি কে দাবায় রাখতে পারবে না। আমি আমার যেই ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে তাদের আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

আজ প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মেরে ফেলা হয়ে হয়েছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে ও ১ম বিশ্বযুদ্ধেও এত মানুষ মৃত্যুবরণ করেনি, শহীদ হয়নি। আমি জানতাম না আমি আপনাদের কাছে ফিরে আসবো। আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম, তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও কোন আপত্তি নাই মৃত্যুর পরে তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিওÑ এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।

আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে, আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের জনগণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের সামরিক বাহিনীকে। আমি মোবারকবাদ জানাই রাশিয়ার জনগণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই জার্মানি, ব্রিটিশ, ফ্রান্স সব জায়গার জনগণকে। তাদের আমি মোবারকবাদ জানাই যারা আমাকে সমর্থন করেছে।

আমি মোবারকবাদ জানাই আমেরিকার জনসাধারণকে, মোবারকবাদ জানাই সারা বিশ্বের মজলুম জনগণকে যারা আমার এই মুক্তি সংগ্রামকে সাহায্য করেছে। আমার বলতে হয় ১ কোটি লোক এই বাংলাদেশ থেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের জনসাধারণ, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় দিয়েছেন তাদের আমি মোবারকবাদ না দিয়ে পারি না। যারা সাহায্য করেছেন তাদের মোবারকবাদ দিতে হয়।

তবে মনে রাখা উচিত বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না। বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। আমি যাবার আগে বলেছিলামÑ ও বাঙালি এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। আমি বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে সংগ্রাম করছো।

আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি। বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।

আমি আশা করি, দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন- আমার রাস্তা নাই, আমার ঘাট নাই, আমার খাবার নাই, আমার জনগণ গৃহহারা-সর্বহারা, আমার মানুষ পথের ভিখারী। তোমরা আমার মানুষকে সাহায্য করো। মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র এর কাছে আমি সাহায্য চাই। তোমরা আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও দিতে হবে, উপায় নাই দিতে হবে। আমি আমরা হার মানবো না আমরা হার মানতে জানি না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনÑ ‘সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি।’

কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ।আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোকজান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।

আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুমÑ ভাই হিসেবেÑ নেতা হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছো তোমরা রক্ত দিয়েছো, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।

একটা কথা আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়। বাংলায় যারা অন্য লোক আছে অন্য দেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক বাংলায় কথা বলে না তাদের বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমি আমার ভাইদের বলছি তাদের উপর হাত তুলো না। আমরা মানুষ, মানুষ ভালোবাসি।

তবে যারা দালালি করেছে, যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করছে, তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে। তাদের বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন, একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে। আমি দেখিয়ে দিতে চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালি রক্ত দিতে জানে শান্তিপূর্ণ বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।

আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিলো। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম আমি বাঙালি আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো। আমার বাঙালি জাত কে অপমান করে যাবো না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না। এবং যাবার সময় বলে যাবো জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।

ভাইয়েরা আমার যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে আমার সকল জনগণকে দরকার যেখানে রাস্তা ভেঙে গিয়েছে নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে যাও ধান বুনো, কর্মচারীদের বলি একজন ও ঘুষ খাবেন না। মনে রাখবেন তখন সুযোগ ছিলো না, আমি অপরাধ ক্ষমা করবো না।

আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাজউদ্দীন, নজরুলেরাÑ ওরা কাঁদছিল। আমি বলি তোরা চলে যা আমার রাস্তা রইলোÑ আমি এই বাড়িতে মরতে চাই। এটাই হবে বাংলায় জায়গা, এখানেই আমি মরতে চাই ওদের কাছে মাথানত করে আমি পারবো না।

ড. কামালকে নিয়ে ৩ মাস জেরা করছে- আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দাও। কয়েকজন বাঙালি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে। তাদের আমরা জানি চিনি এবং তাদের বিচারও হবে।

পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের বলি তোমরা সুখে থাকো। তোমার সামরিক বাহিনীর লোকেরা যা করেছে আমার মা বোনদের রেপ করেছে, আমার ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দিয়েছে, যাও সুখে থাকো। তোমাদের সাথে আর না। শেষ হয়ে গেছে তোমরা স্বাধীন থাকো, আমিও স্বাধীন থাকি। তোমাদের সাথে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বন্ধুত্ব হতে পারে তাছাড়া বন্ধুত্ব হতে পারে না। তবে যারা অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হবে।

আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাই আমি আরেকদিন বক্তৃতা করবো একটু সুস্থ হয়ে লই। আপনারা চেয়ে দেখেন আমি সেই মুজিবর রহমান আর নাই। আমার বাংলার দিকে চেয়ে দেখেন সমান হয়ে গেছে জায়গা, গ্রাম এরপর গ্রাম পুড়ে গেছে এমন কোন পরিবার নাই যার মধ্যে আমার লোককে হত্যা করা হয় নাই।

কত বড় কাপুরুষ যে নিরপরাধ লোককে এভাবে হত্যা করে এভাবে সামরিক বাহিনীর লোকেরা। আর তারা বলে কি আমরা পাকিস্তানের মুসলমান সামরিক বাহিনী। ঘৃণা করা উচিত জানানো উচিত দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরে বাংলাদেশই ২য় মুসলিম দেশ, ভারত ৩য়, পাকিস্তান ৪র্থ।

আমার রাষ্ট্রে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এ বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র। এ বাংলাদেশে হবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

যারা জানতে চান আমি বলে দিবার চাই আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা হয়েছে আমি আপনাদের বলতে পারি তাকে জানি আমি তাকে আমি শ্রদ্ধা করি সে প-িত নেহরুর কন্যা, সে মতিলাল নেহরুর ছেলের মেয়ে। আজকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। যেদিন আমি বলবো সেদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু সরিয়ে নিচ্ছেন।

যে সাহায্য তিনি করেছেন আমি আমার ৭ কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে তাকে, তার সরকার কে ভারতের জনগণকে শ্রদ্ধা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই।

ক্ষমা করো আমার ভাইয়েরা, ক্ষমা করো আজ, আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই। একটা মানুষকেও তোমরা কিছু বলো না। অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দিবো। আইন নিজের হাতে তুলে নিও না। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তোমরা আমার সালাম গ্রহণ করো, ছাত্রসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ করো, শ্রমিকসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ করো, বাংলার হতভাগ্য হিন্দু-মুসলমান আমার সালাম গ্রহণ করো।

আর আমার কর্মচারী পুলিশ, ইপিআর যাদের উপর মেশিনগান চালিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা মা বোন ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছে তার স্ত্রীদের ধরে কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়া হয়েছে তোমাদের আমি সালাম জানাই, তোমাদের আমি শ্রদ্ধা জানাই।

নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা। বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে, বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে- এই আমার সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য। আমি যেন এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারিÑ এই আশীর্বাদ, এই দোয়া আপনার আমাকে করবেন। এই কথা বলে আপনাদের কাছে থেকে বিদায় নিবার চাই।

এ কথা সত্য আসার সময় ভুট্টো আমায় বললেনÑ শেখ সাব দেখেন দুই অংশের কোন একটা বাঁধন রাখা যায় নাকি। আমি বললাম, আমি বলতে পারি না, আমি বলতে পারব না। আমি কোথায় আছি বলতে পারি না। আমি বাংলায় গিয়ে বলা। আজ বলছি ভুট্টো সাহেব সুখে থাকো। বাঁধন ছিঁড়ে গেছে আর না। তুমি যদি কোন বিশেষ শক্তির সঙ্গে গোপন করে আমার বাংলার স্বাধীনতা হরণ করতে চাও, মনে রেখ দলের নেতৃত্ব দিবে শেখ মুজিবুর রহমানÑমরে যাব স্বাধীনতা হারাতে দেব না।

ভাইয়েরা আমার, আমার ৪ লক্ষ বাঙালি আছে পাকিস্তানে আমি অনুরোধ করব, তবে একটা জিনিস আমি বলতে চাই, ইন্টারন্যাশনাল ফোরামে জাতিসংঘের মাধ্যমে অথবা ওয়ার্ল্ড জুরির পক্ষ থেকে একটা ইনকোয়ারি হতে হবে। কি পাশবিক অত্যাচার কিভাবে হত্যা করা হয়েছে আমার লোকেদের এ সত্য দুনিয়ার মানুষকে জানতে হবে। আমি দাবি করব জাতিসংঘকে বাংলাদেশ কে আসতে দাও এবং ইনকোয়ারি করো। ভাইয়েরা আমার যদি কেউ চেষ্টা করেন ভুল করবেন আমি জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই সাবধান বাঙালিরা ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই।

একদিন বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, একদিন বলেছিলাম যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধ করো, বলেছিলাম এ সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামÑ এ জায়গায় ৭ মার্চ। আজ বলছি তোমরা ঠিক থাকো একতাবদ্ধ থাকো, কারো কথা শুনো না।

ইনশাআল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি স্বাধীন থাকবো একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে এই সংগ্রাম চলবে। আজ আমি আর বক্তৃতা করতে পারছি না একটু সুস্থ হলে আবার বক্তৃতা করব। আপনারা আমাকে মাফ করে দেন আপনারা আমাকে দোয়া করেন আপনারা আমার সাথে সকলে একটা মোনাজাত করেন। (সংক্ষেপিত)

image

১০ জানুয়ারির জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু

আরও খবর

সোমবার, ১০ জানুয়ারী ২০২২ , ২৬ পৌষ ১৪২৮ ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

১০ জানুয়ারি কী বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু

image

১০ জানুয়ারির জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধু

আমি আপনাদের কাছে দু-এক কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারব না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবী যেভাবে সংগ্রাম করেছে। আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, ফাঁসিকাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালি কে দাবায় রাখতে পারবে না। আমি আমার যেই ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে তাদের আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

আজ প্রায় ৩০ লাখ মানুষ মেরে ফেলা হয়ে হয়েছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে ও ১ম বিশ্বযুদ্ধেও এত মানুষ মৃত্যুবরণ করেনি, শহীদ হয়নি। আমি জানতাম না আমি আপনাদের কাছে ফিরে আসবো। আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম, তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও কোন আপত্তি নাই মৃত্যুর পরে তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে দিয়ে দিওÑ এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।

আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে, আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের জনগণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের সামরিক বাহিনীকে। আমি মোবারকবাদ জানাই রাশিয়ার জনগণকে। আমি মোবারকবাদ জানাই জার্মানি, ব্রিটিশ, ফ্রান্স সব জায়গার জনগণকে। তাদের আমি মোবারকবাদ জানাই যারা আমাকে সমর্থন করেছে।

আমি মোবারকবাদ জানাই আমেরিকার জনসাধারণকে, মোবারকবাদ জানাই সারা বিশ্বের মজলুম জনগণকে যারা আমার এই মুক্তি সংগ্রামকে সাহায্য করেছে। আমার বলতে হয় ১ কোটি লোক এই বাংলাদেশ থেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের জনসাধারণ, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় দিয়েছেন তাদের আমি মোবারকবাদ না দিয়ে পারি না। যারা সাহায্য করেছেন তাদের মোবারকবাদ দিতে হয়।

তবে মনে রাখা উচিত বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না। বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। আমি যাবার আগে বলেছিলামÑ ও বাঙালি এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। আমি বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে সংগ্রাম করছো।

আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি। বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।

আমি আশা করি, দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন- আমার রাস্তা নাই, আমার ঘাট নাই, আমার খাবার নাই, আমার জনগণ গৃহহারা-সর্বহারা, আমার মানুষ পথের ভিখারী। তোমরা আমার মানুষকে সাহায্য করো। মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র এর কাছে আমি সাহায্য চাই। তোমরা আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও দিতে হবে, উপায় নাই দিতে হবে। আমি আমরা হার মানবো না আমরা হার মানতে জানি না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনÑ ‘সাত কোটি বাঙালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি।’

কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ।আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোকজান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।

আজ থেকে আমার অনুরোধ, আজ থেকে আমার আদেশ, আজ থেকে আমার হুকুমÑ ভাই হিসেবেÑ নেতা হিসেবে নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছো তোমরা রক্ত দিয়েছো, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।

একটা কথা আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়। বাংলায় যারা অন্য লোক আছে অন্য দেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক বাংলায় কথা বলে না তাদের বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমি আমার ভাইদের বলছি তাদের উপর হাত তুলো না। আমরা মানুষ, মানুষ ভালোবাসি।

তবে যারা দালালি করেছে, যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করছে, তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে। তাদের বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন, একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে। আমি দেখিয়ে দিতে চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালি রক্ত দিতে জানে শান্তিপূর্ণ বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।

আমার ফাঁসির হুকুম হয়ে গেছে আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিলো। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম আমি বাঙালি আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো। আমার বাঙালি জাত কে অপমান করে যাবো না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না। এবং যাবার সময় বলে যাবো জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।

ভাইয়েরা আমার যথেষ্ট কাজ পড়ে রয়েছে আমার সকল জনগণকে দরকার যেখানে রাস্তা ভেঙে গিয়েছে নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে যাও ধান বুনো, কর্মচারীদের বলি একজন ও ঘুষ খাবেন না। মনে রাখবেন তখন সুযোগ ছিলো না, আমি অপরাধ ক্ষমা করবো না।

আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাজউদ্দীন, নজরুলেরাÑ ওরা কাঁদছিল। আমি বলি তোরা চলে যা আমার রাস্তা রইলোÑ আমি এই বাড়িতে মরতে চাই। এটাই হবে বাংলায় জায়গা, এখানেই আমি মরতে চাই ওদের কাছে মাথানত করে আমি পারবো না।

ড. কামালকে নিয়ে ৩ মাস জেরা করছে- আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দাও। কয়েকজন বাঙালি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে। তাদের আমরা জানি চিনি এবং তাদের বিচারও হবে।

পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের বলি তোমরা সুখে থাকো। তোমার সামরিক বাহিনীর লোকেরা যা করেছে আমার মা বোনদের রেপ করেছে, আমার ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দিয়েছে, যাও সুখে থাকো। তোমাদের সাথে আর না। শেষ হয়ে গেছে তোমরা স্বাধীন থাকো, আমিও স্বাধীন থাকি। তোমাদের সাথে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বন্ধুত্ব হতে পারে তাছাড়া বন্ধুত্ব হতে পারে না। তবে যারা অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হবে।

আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাই আমি আরেকদিন বক্তৃতা করবো একটু সুস্থ হয়ে লই। আপনারা চেয়ে দেখেন আমি সেই মুজিবর রহমান আর নাই। আমার বাংলার দিকে চেয়ে দেখেন সমান হয়ে গেছে জায়গা, গ্রাম এরপর গ্রাম পুড়ে গেছে এমন কোন পরিবার নাই যার মধ্যে আমার লোককে হত্যা করা হয় নাই।

কত বড় কাপুরুষ যে নিরপরাধ লোককে এভাবে হত্যা করে এভাবে সামরিক বাহিনীর লোকেরা। আর তারা বলে কি আমরা পাকিস্তানের মুসলমান সামরিক বাহিনী। ঘৃণা করা উচিত জানানো উচিত দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরে বাংলাদেশই ২য় মুসলিম দেশ, ভারত ৩য়, পাকিস্তান ৪র্থ।

আমার রাষ্ট্রে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এ বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র। এ বাংলাদেশে হবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

যারা জানতে চান আমি বলে দিবার চাই আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা হয়েছে আমি আপনাদের বলতে পারি তাকে জানি আমি তাকে আমি শ্রদ্ধা করি সে প-িত নেহরুর কন্যা, সে মতিলাল নেহরুর ছেলের মেয়ে। আজকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে। যেদিন আমি বলবো সেদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু সরিয়ে নিচ্ছেন।

যে সাহায্য তিনি করেছেন আমি আমার ৭ কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে তাকে, তার সরকার কে ভারতের জনগণকে শ্রদ্ধা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই।

ক্ষমা করো আমার ভাইয়েরা, ক্ষমা করো আজ, আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই। একটা মানুষকেও তোমরা কিছু বলো না। অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দিবো। আইন নিজের হাতে তুলে নিও না। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তোমরা আমার সালাম গ্রহণ করো, ছাত্রসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ করো, শ্রমিকসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহণ করো, বাংলার হতভাগ্য হিন্দু-মুসলমান আমার সালাম গ্রহণ করো।

আর আমার কর্মচারী পুলিশ, ইপিআর যাদের উপর মেশিনগান চালিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা মা বোন ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছে তার স্ত্রীদের ধরে কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়া হয়েছে তোমাদের আমি সালাম জানাই, তোমাদের আমি শ্রদ্ধা জানাই।

নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা। বাংলার মানুষ হাসবে, বাংলার মানুষ খেলবে, বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে, বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে- এই আমার সাধনা, এই আমার জীবনের কাম্য। আমি যেন এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারিÑ এই আশীর্বাদ, এই দোয়া আপনার আমাকে করবেন। এই কথা বলে আপনাদের কাছে থেকে বিদায় নিবার চাই।

এ কথা সত্য আসার সময় ভুট্টো আমায় বললেনÑ শেখ সাব দেখেন দুই অংশের কোন একটা বাঁধন রাখা যায় নাকি। আমি বললাম, আমি বলতে পারি না, আমি বলতে পারব না। আমি কোথায় আছি বলতে পারি না। আমি বাংলায় গিয়ে বলা। আজ বলছি ভুট্টো সাহেব সুখে থাকো। বাঁধন ছিঁড়ে গেছে আর না। তুমি যদি কোন বিশেষ শক্তির সঙ্গে গোপন করে আমার বাংলার স্বাধীনতা হরণ করতে চাও, মনে রেখ দলের নেতৃত্ব দিবে শেখ মুজিবুর রহমানÑমরে যাব স্বাধীনতা হারাতে দেব না।

ভাইয়েরা আমার, আমার ৪ লক্ষ বাঙালি আছে পাকিস্তানে আমি অনুরোধ করব, তবে একটা জিনিস আমি বলতে চাই, ইন্টারন্যাশনাল ফোরামে জাতিসংঘের মাধ্যমে অথবা ওয়ার্ল্ড জুরির পক্ষ থেকে একটা ইনকোয়ারি হতে হবে। কি পাশবিক অত্যাচার কিভাবে হত্যা করা হয়েছে আমার লোকেদের এ সত্য দুনিয়ার মানুষকে জানতে হবে। আমি দাবি করব জাতিসংঘকে বাংলাদেশ কে আসতে দাও এবং ইনকোয়ারি করো। ভাইয়েরা আমার যদি কেউ চেষ্টা করেন ভুল করবেন আমি জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই সাবধান বাঙালিরা ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই।

একদিন বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, একদিন বলেছিলাম যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধ করো, বলেছিলাম এ সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রামÑ এ জায়গায় ৭ মার্চ। আজ বলছি তোমরা ঠিক থাকো একতাবদ্ধ থাকো, কারো কথা শুনো না।

ইনশাআল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি স্বাধীন থাকবো একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে এই সংগ্রাম চলবে। আজ আমি আর বক্তৃতা করতে পারছি না একটু সুস্থ হলে আবার বক্তৃতা করব। আপনারা আমাকে মাফ করে দেন আপনারা আমাকে দোয়া করেন আপনারা আমার সাথে সকলে একটা মোনাজাত করেন। (সংক্ষেপিত)