ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়ার এক সপ্তাহ পর জানা গেল ডিবি হেফাজতে

গত ১৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার কাপড় ব্যবসায়ী সাইদুর রহমানের দোকানে যায় বেশ কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তি। নিজেদের ক্রেতা পরিচয় দিয়ে সাইদুর রহমানের কাছ থেকে তারা কাপড় কেনার কথা বলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর পাশের মার্কেট থেকে আরও কিছু কাপড় দেখিয়ে দিতে সহযোগিতা চেয়ে দোকান থেকে সঙ্গে নিয়ে যান ব্যবসায়ী সাইদুরকে। তদের সঙ্গে ব্যবসায়ী সাইদুর নিচে আসার পর তাকে তুলে নিয়ে যান। এরপর থেকে এক সপ্তাহ খোঁজ ছিল না সাইদুরের। এক সপ্তাহ পর ব্যবসায়ীর পরিবার সাইদুরকে অপহরণের অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমে কথা বলার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে ফোন দিয়ে জানানো হয় সাইদুর রহমান তাদের হেফাজতে আছে। এরপর জানা গেল তিনি জাল টাকা মামলার আসামি। তাও সেটি ১৯ নভেম্বর ক্ষিলক্ষেত থানা পুলিশের করা মামলার।

ওই ব্যবসায়ী নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন ব্যবসায়ী সাইদুরের পরিবার এবং অন্য ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, সাইদুরের বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকলেও তাকে যে কায়দায় তুলে নেয়া হয়েছে এবং ধরে নিয়েএক সপ্তাহ গুম করে রাখার পর জাল টাকার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। তাকে গ্রেপ্তার করার সময় বলা হয়েছে ২৬ ডিসেম্বর। ইসলামপুরের দোকান থেকে ধরে নিয়ে গেলেও যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করার কথা জানানো হয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে পরিবারের দাবি, জাল টাকার মামলায় ব্যবসায়ী সাইদুরকে ফাঁসিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ। তাদের ধারণা, পরিবারের কাছ থেকে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। হয়তো এসব কারণে সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সাইদুরের বড় ভাই ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম টেলিফোনে সংবাদকে বলেন, আমার ছোট ভাই সাইদুর রহমান ইসলামপুর খান প্লাজার ৩১ এবং ৩২ নম্বর দোকানের কাপড় ব্যবসায়ী। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিদিনের মতো তিনি দোকানে কাপড় বিক্রিতে ব্যস্থ ছিলেন। ওইদিন দুপুরের দিকে দুজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি এসে আমার ভাইকে খোঁজাখুঁজি করে। এ সময় দুজন ব্যক্তি পাশের চায়না মার্কেটে কাপড় কেনার জন্য সহযোগিতা করতে হবে বলে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আমরা ভাইয়ের আর কোন খোঁজ ছিল না। আমরা বিভিন্নভাবে ভাইয়ের নিখোঁজ থাকার বিষয়ে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করি। এ বিষয়ে ২৬ ডিসেম্বর আমরা একটি সংবাদ সম্মেলন করি সকালে। বিকেল ৪টায় মার্কেটের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ নিয়ে আমরা ডিএমপি কমিশনারের কাছে যাই। সেখান থেকে কোতয়ালি থানায় ফোন করা হয় এবং আমাদের একটি জিডি নিতে বলে। আমরা একটি জিডি লিখে নিয়ে গেলে দেখি একজন এডিসি ও কোতয়ালি থানার ওসি আমাদের অপেক্ষায় আছেন। তারা আমাদের বলেন, এ বিষয়ে আপনারা কেন পুলিশ কমিশনারের অফিসে গেলেন। পরে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বসিয়ে আমাদের লেখা জিডি না নিয়ে তারা তাদের লেখা একটি জিডি এন্ট্রি করে। তখন তারা আমার ভাইয়ের অবস্থান মগবাজারের আশপাশে বলে জানায়। এর মধ্যে একজন নিজেকে রমনা থানার ওসি (তদন্ত) পরিচয় দিয়ে আমার ভাইয়ের মুক্তিপণের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। আমি তখন সরাসরি রমনা থানার ওসি তদন্তের কাছে গিয়ে বলি, আপনার পরিচয় দিয়ে আমাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। তিনি তখন বলেন এই নাম্বার আমার নয়। এরপর আমরা বিভিন্ন জায়গায় আমার ভাইয়ের সন্ধান করতে থাকি।

শফিকুল ইসলাম জানান, আমরা ২৮ ডিসেম্বর জানতে পারি আমার ভাই ডিবি হেফাজতে আছে। তখন আমাদের জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআইকে জানালে তিনি নিশ্চিত হন আমার ভাই ডিবি হেফাজতে আছেন। কিন্তু কি কারণে তাকে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে তখনও আমরা বিষয়টি পরিষ্কার নই। ৩০ ডিসেম্বর আমার ভাইকে আদালতে হাজির করা হলে আমরা জানতে পারি একটি জাল টাকার মামলায় আমার ভাইকে জাল টাকার ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখনো হয়েছে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ৬ ভাইয়ের মধ্যে ফজলুল হক গত ২৫ বছর ধরে পাকিস্তানে আছেন। তার সম্পর্কেও বলা হয়েছে, জাল টাকার মূল চক্রটি সে চালায়। তাকে সহযোগিতা করে আমার ছোট ভাই সাইদুর রহমান। অথব ফজলুল হকের সঙ্গে আমাদের যোগযোগও নেই। আমার ভাই সাইদুরকে ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো ইসলামপুর থেকে। আর ২৬ ডিসেম্বরের একটি জাল নোটের মামলায় আমার ভাইকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে। তাকে আদালতে হাজির করা হলো ৩০ ডিসেম্বর। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোন আসামিকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নিয়ম থাকলেও পুলিশ সেই নিয়মের তোয়াক্কা করেনি। গতকাল আমরা আমার ভাইয়ের মুক্তির দাবি করে একটি মানববন্ধন করেছি। এরপর ডিবি থেকে ফোন করে আমাকে ডিবিতে যেতে বলা হয়েছে। আমি তাদের বলেছি, আমি পুলিশ কমিশনার বরাবার একটি অভিযোগ করেছি। সেই অভিযোগের তদন্তের জন্য যদি আমাকে ডাকা হয় তাহলে আপনারা নোটিশের মাধ্যমে আমাকে ডাকলে আমি সঙ্গে সঙ্গে হাজির হবো। এরপর থেকে তারা আর যোগাযোগ করেনি।

মামলার ফরোয়ার্ডিংয়ে পুলিশ উল্লেখ করেছে, ২৬ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে অভিযান চালিয়ে সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে। অথচ ইসলামপুরের খান প্লাজাসহ আশপাশের কয়েকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ১৯ ডিসেম্বর দুপুরে সাইদুরকে তার দোকান থেকে ডেকে নিয়ে গাড়িতে তোলা হচ্ছে।

পুলিশ উল্লেখ করেছে, ২৬ নভেম্বর খিলক্ষেত থানা পুলিশের একটি টিম বিশেষ অভিযান চালিয়ে ফাতেমা আক্তর অপি এবং শেখ মো. আবু তালেবকে গ্রেপ্তার করে। পরে এসআই সোহরাব হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধারের কথা বলা হয়। মামলায় আসামি করা হয় সুলতান (৩২), শফি (৬০) নামে কয়েকজনকে। শফি এবং সুলতানের ঠিকানা বলা হয়েছে পাকিস্তানের লাহোরে। তাদের কাছে সাত কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপিও হেফাজতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিবি দাবি করেছে, খিলক্ষেত থানার মামলাটি তাদের কাছে তদন্তে আসলে তারা ফাতেমা আক্তার অপিকে দুই দিনের রিমান্ড হেফাজতে আনে। রিমান্ডে অপি পুলিশকে জানিয়েছে তার সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃত শেখ মো. আবু তালেবসহ শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট আন্তঃদেশীয় জাল রুপি আমাদনি ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক ফরিদ ওরফে ফজুলুর রহামন পাকিস্তানে বসে এ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে মিথ্য ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জাল রুপি বাংলাদেশে পাঠায়। পাকিস্তানি নাগরিক ফরিদ ও সুলতান বাংলাদেশি সহযোগীরা ঢাকায় ও আশপাশে অবস্থান করছে। ফাতেমার দেয়া তথ্যে ২৬ ডিসেম্বর ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার দেবাশীষ কর্মকারের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে মো. কামাল হোসেন ওরফে শাজাহানকে ফকিরাপুল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাকিস্তানি নাগরিক ফজলুর রহমানের ভাই সাইদুর রহমানকে যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোড থেকে রাত সাড়ে ৯টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা জাল রুপি বিক্রি করে যে টাকা পায় তা হুন্ডির মাধ্যমে পাকিস্তানে পাঠায় এবং নিজেরা ভাগাভাগি করে নেয়।

শফিকুল ইসলামের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন এবং ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করায় ডিবির ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম আমাদের মামলায় ফাঁসানো, ধরে নিয়ে যাওয়াসহ নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। আমরা সঠিক তদন্ত চাই। ৯ জানুয়ারি পুলিশ কমিশানেরর কাছে যাবতীয় প্রমাণপত্রসহ একটি অভিযোগ করা হয়েছে। আমার বক্তব্য হলো আমার ভাই দোষী হলে তাকে জেল দেয়া হবে, তার বিচার হবে। সে যদি জাল টাকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তার শাস্তি হবে। কিন্তু ১৯ ডিসেম্বর তুলে নিয়ে অস্বীকার করা, আবার ২৬ ডিসেম্বর অন্য জায়গা থেকে গ্রেপ্তার দেখানো সবকিছুই আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়। যে মহিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাকে আমরা চিনি না। এমনকি এ মামলায় অন্য যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরও আমার ভাই চিনে না।

অভিযোগের বিষয়ে ডিবির গুলশান বিভাগের অবৈধ অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ টিমের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম টেলিফোনে সংবাদকে জানান, ক্ষিলক্ষেত থানা পুলিশ ভারতীয় জাল রুপিসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পাথর আমদানির কথা বলে পাথরের মধ্যে সাত কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপি পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামি আবু তালেবকে ওই এলসির বিপরীতে সহযোগিতা করে সাইদুর রহমান। সাইদুর রহমানের বড় ভাই ফজলুর রহমান ওরফে ফরিদ এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতেও তাদের নাম এসেছে। মূলত মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আসামিপক্ষ সংবাদ সম্মেলনসহ নানা অভিযোগ করছে। আমাদের কাছে আরও অনেক গরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। আরও অনেকের নাম আছে যারা জাল রুপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

বুধবার, ১২ জানুয়ারী ২০২২ , ২৮ পৌষ ১৪২৮ ৮ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ব্যবসায়ীকে তুলে নেয়ার এক সপ্তাহ পর জানা গেল ডিবি হেফাজতে

গত ১৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার কাপড় ব্যবসায়ী সাইদুর রহমানের দোকানে যায় বেশ কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তি। নিজেদের ক্রেতা পরিচয় দিয়ে সাইদুর রহমানের কাছ থেকে তারা কাপড় কেনার কথা বলেন। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর পাশের মার্কেট থেকে আরও কিছু কাপড় দেখিয়ে দিতে সহযোগিতা চেয়ে দোকান থেকে সঙ্গে নিয়ে যান ব্যবসায়ী সাইদুরকে। তদের সঙ্গে ব্যবসায়ী সাইদুর নিচে আসার পর তাকে তুলে নিয়ে যান। এরপর থেকে এক সপ্তাহ খোঁজ ছিল না সাইদুরের। এক সপ্তাহ পর ব্যবসায়ীর পরিবার সাইদুরকে অপহরণের অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমে কথা বলার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে ফোন দিয়ে জানানো হয় সাইদুর রহমান তাদের হেফাজতে আছে। এরপর জানা গেল তিনি জাল টাকা মামলার আসামি। তাও সেটি ১৯ নভেম্বর ক্ষিলক্ষেত থানা পুলিশের করা মামলার।

ওই ব্যবসায়ী নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছেন ব্যবসায়ী সাইদুরের পরিবার এবং অন্য ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, সাইদুরের বিরুদ্ধে কোন মামলা না থাকলেও তাকে যে কায়দায় তুলে নেয়া হয়েছে এবং ধরে নিয়েএক সপ্তাহ গুম করে রাখার পর জাল টাকার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। তাকে গ্রেপ্তার করার সময় বলা হয়েছে ২৬ ডিসেম্বর। ইসলামপুরের দোকান থেকে ধরে নিয়ে গেলেও যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করার কথা জানানো হয়েছে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে পরিবারের দাবি, জাল টাকার মামলায় ব্যবসায়ী সাইদুরকে ফাঁসিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ। তাদের ধারণা, পরিবারের কাছ থেকে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। হয়তো এসব কারণে সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সাইদুরের বড় ভাই ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম টেলিফোনে সংবাদকে বলেন, আমার ছোট ভাই সাইদুর রহমান ইসলামপুর খান প্লাজার ৩১ এবং ৩২ নম্বর দোকানের কাপড় ব্যবসায়ী। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর প্রতিদিনের মতো তিনি দোকানে কাপড় বিক্রিতে ব্যস্থ ছিলেন। ওইদিন দুপুরের দিকে দুজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি এসে আমার ভাইকে খোঁজাখুঁজি করে। এ সময় দুজন ব্যক্তি পাশের চায়না মার্কেটে কাপড় কেনার জন্য সহযোগিতা করতে হবে বলে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আমরা ভাইয়ের আর কোন খোঁজ ছিল না। আমরা বিভিন্নভাবে ভাইয়ের নিখোঁজ থাকার বিষয়ে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করি। এ বিষয়ে ২৬ ডিসেম্বর আমরা একটি সংবাদ সম্মেলন করি সকালে। বিকেল ৪টায় মার্কেটের সিসি ক্যামেরা ফুটেজ নিয়ে আমরা ডিএমপি কমিশনারের কাছে যাই। সেখান থেকে কোতয়ালি থানায় ফোন করা হয় এবং আমাদের একটি জিডি নিতে বলে। আমরা একটি জিডি লিখে নিয়ে গেলে দেখি একজন এডিসি ও কোতয়ালি থানার ওসি আমাদের অপেক্ষায় আছেন। তারা আমাদের বলেন, এ বিষয়ে আপনারা কেন পুলিশ কমিশনারের অফিসে গেলেন। পরে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বসিয়ে আমাদের লেখা জিডি না নিয়ে তারা তাদের লেখা একটি জিডি এন্ট্রি করে। তখন তারা আমার ভাইয়ের অবস্থান মগবাজারের আশপাশে বলে জানায়। এর মধ্যে একজন নিজেকে রমনা থানার ওসি (তদন্ত) পরিচয় দিয়ে আমার ভাইয়ের মুক্তিপণের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। আমি তখন সরাসরি রমনা থানার ওসি তদন্তের কাছে গিয়ে বলি, আপনার পরিচয় দিয়ে আমাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। তিনি তখন বলেন এই নাম্বার আমার নয়। এরপর আমরা বিভিন্ন জায়গায় আমার ভাইয়ের সন্ধান করতে থাকি।

শফিকুল ইসলাম জানান, আমরা ২৮ ডিসেম্বর জানতে পারি আমার ভাই ডিবি হেফাজতে আছে। তখন আমাদের জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআইকে জানালে তিনি নিশ্চিত হন আমার ভাই ডিবি হেফাজতে আছেন। কিন্তু কি কারণে তাকে ডিবি হেফাজতে রাখা হয়েছে তখনও আমরা বিষয়টি পরিষ্কার নই। ৩০ ডিসেম্বর আমার ভাইকে আদালতে হাজির করা হলে আমরা জানতে পারি একটি জাল টাকার মামলায় আমার ভাইকে জাল টাকার ব্যবসায়ী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখনো হয়েছে।

শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার ৬ ভাইয়ের মধ্যে ফজলুল হক গত ২৫ বছর ধরে পাকিস্তানে আছেন। তার সম্পর্কেও বলা হয়েছে, জাল টাকার মূল চক্রটি সে চালায়। তাকে সহযোগিতা করে আমার ছোট ভাই সাইদুর রহমান। অথব ফজলুল হকের সঙ্গে আমাদের যোগযোগও নেই। আমার ভাই সাইদুরকে ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো ইসলামপুর থেকে। আর ২৬ ডিসেম্বরের একটি জাল নোটের মামলায় আমার ভাইকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে। তাকে আদালতে হাজির করা হলো ৩০ ডিসেম্বর। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কোন আসামিকে গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার নিয়ম থাকলেও পুলিশ সেই নিয়মের তোয়াক্কা করেনি। গতকাল আমরা আমার ভাইয়ের মুক্তির দাবি করে একটি মানববন্ধন করেছি। এরপর ডিবি থেকে ফোন করে আমাকে ডিবিতে যেতে বলা হয়েছে। আমি তাদের বলেছি, আমি পুলিশ কমিশনার বরাবার একটি অভিযোগ করেছি। সেই অভিযোগের তদন্তের জন্য যদি আমাকে ডাকা হয় তাহলে আপনারা নোটিশের মাধ্যমে আমাকে ডাকলে আমি সঙ্গে সঙ্গে হাজির হবো। এরপর থেকে তারা আর যোগাযোগ করেনি।

মামলার ফরোয়ার্ডিংয়ে পুলিশ উল্লেখ করেছে, ২৬ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে অভিযান চালিয়ে সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে। অথচ ইসলামপুরের খান প্লাজাসহ আশপাশের কয়েকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ১৯ ডিসেম্বর দুপুরে সাইদুরকে তার দোকান থেকে ডেকে নিয়ে গাড়িতে তোলা হচ্ছে।

পুলিশ উল্লেখ করেছে, ২৬ নভেম্বর খিলক্ষেত থানা পুলিশের একটি টিম বিশেষ অভিযান চালিয়ে ফাতেমা আক্তর অপি এবং শেখ মো. আবু তালেবকে গ্রেপ্তার করে। পরে এসআই সোহরাব হোসেন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় তাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার ভারতীয় জাল রুপি উদ্ধারের কথা বলা হয়। মামলায় আসামি করা হয় সুলতান (৩২), শফি (৬০) নামে কয়েকজনকে। শফি এবং সুলতানের ঠিকানা বলা হয়েছে পাকিস্তানের লাহোরে। তাদের কাছে সাত কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপিও হেফাজতে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিবি দাবি করেছে, খিলক্ষেত থানার মামলাটি তাদের কাছে তদন্তে আসলে তারা ফাতেমা আক্তার অপিকে দুই দিনের রিমান্ড হেফাজতে আনে। রিমান্ডে অপি পুলিশকে জানিয়েছে তার সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃত শেখ মো. আবু তালেবসহ শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট আন্তঃদেশীয় জাল রুপি আমাদনি ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক ফরিদ ওরফে ফজুলুর রহামন পাকিস্তানে বসে এ চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে মিথ্য ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জাল রুপি বাংলাদেশে পাঠায়। পাকিস্তানি নাগরিক ফরিদ ও সুলতান বাংলাদেশি সহযোগীরা ঢাকায় ও আশপাশে অবস্থান করছে। ফাতেমার দেয়া তথ্যে ২৬ ডিসেম্বর ডিবির সহকারী পুলিশ কমিশনার দেবাশীষ কর্মকারের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে মো. কামাল হোসেন ওরফে শাজাহানকে ফকিরাপুল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাকিস্তানি নাগরিক ফজলুর রহমানের ভাই সাইদুর রহমানকে যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোড থেকে রাত সাড়ে ৯টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা জাল রুপি বিক্রি করে যে টাকা পায় তা হুন্ডির মাধ্যমে পাকিস্তানে পাঠায় এবং নিজেরা ভাগাভাগি করে নেয়।

শফিকুল ইসলামের অভিযোগ, সংবাদ সম্মেলন এবং ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ করায় ডিবির ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম আমাদের মামলায় ফাঁসানো, ধরে নিয়ে যাওয়াসহ নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। আমরা সঠিক তদন্ত চাই। ৯ জানুয়ারি পুলিশ কমিশানেরর কাছে যাবতীয় প্রমাণপত্রসহ একটি অভিযোগ করা হয়েছে। আমার বক্তব্য হলো আমার ভাই দোষী হলে তাকে জেল দেয়া হবে, তার বিচার হবে। সে যদি জাল টাকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তার শাস্তি হবে। কিন্তু ১৯ ডিসেম্বর তুলে নিয়ে অস্বীকার করা, আবার ২৬ ডিসেম্বর অন্য জায়গা থেকে গ্রেপ্তার দেখানো সবকিছুই আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়। যে মহিলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাকে আমরা চিনি না। এমনকি এ মামলায় অন্য যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদেরও আমার ভাই চিনে না।

অভিযোগের বিষয়ে ডিবির গুলশান বিভাগের অবৈধ অস্ত্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণ টিমের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম টেলিফোনে সংবাদকে জানান, ক্ষিলক্ষেত থানা পুলিশ ভারতীয় জাল রুপিসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পাথর আমদানির কথা বলে পাথরের মধ্যে সাত কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপি পাকিস্তান থেকে আনা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামি আবু তালেবকে ওই এলসির বিপরীতে সহযোগিতা করে সাইদুর রহমান। সাইদুর রহমানের বড় ভাই ফজলুর রহমান ওরফে ফরিদ এ চক্রের সঙ্গে জড়িত। আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দিতেও তাদের নাম এসেছে। মূলত মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আসামিপক্ষ সংবাদ সম্মেলনসহ নানা অভিযোগ করছে। আমাদের কাছে আরও অনেক গরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। আরও অনেকের নাম আছে যারা জাল রুপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।